চাকুরী ছিল গ্রীসের এথেন্সে। তখন গ্রীসের অবস্থা খুবই ভাল। পৃথিবীর বিখ্যাত দশটি কোম্পানির মধ্যে আমাদের কোম্পানিটিও ছিল অন্যতম। পৃথিবীর দেশে দেশে এদের কাজ আর এথেন্সে ছিল হেড অফিস। ভাল চাকুরী, সুখের চাকুরী। Micro Station জানা চল্লিশ জন দক্ষ ও ইমারত নির্মাণে অভিজ্ঞ মানুষ দরকার, কোম্পানি এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশ সেঁচে দশ জন মানুষ জোগাড় করতে পেরেছিল। তার মধ্যে আমিও একজন। তাই কদর ছিল তোলা তোলা। বিয়ের সময় প্রায় ঠিক হয়ে গিয়েছিল, তাই ফ্যামিলি সেখানে নিয়ে যাব, না দেশে রাখব এমন একটি দোদুল্যমান সময়ে আমার বাসার অনতিদূরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়ে যাই। ইসলামী সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠা মানুষের জন্য সেখানকার সংস্কৃতি মেনে নেওয়াটা কঠিন। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষের একটা ঘটনা দেখে সে দেশে পরিবার না আনা কিংবা অনাগত সন্তানকে সেখানে না পড়ানোর জন্য দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
স্কুলের সামনে পানি পান করার জন্য ট্যাবের ব্যবস্থা আছে। এক জায়গায় পাথরের তৈরি দাঁড়ানো একটি পুরুষ মূর্তি ছিল। যার সামনে চকচক করা স্টেইনলেস স্টিলের কিছু একটা লাগানো ছিল। মূর্তির প্রতি নজর যাওয়ার আগে, চকচকে জিনিষটি বহু দূর থেকে নজর কেড়ে নেয়। টিফিন পিরিয়ডে দেখলাম, শিশুরা সেই চকচকে জিনিষের উপর কিল মারছে, করছে টানাটানি, চলছে হাসাহাসি, খাচ্ছে গড়াগড়ি! তাদের দাদা-দাদীরাও নাতীদের এসব আনন্দ ভালই উপভোগ করছে। স্কুলের প্রধান মহোদয়কে পায়চারি করতে দেখলাম; ভাব দেখে মনে হল তিনি পরিতৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন এই ভাবনায় যে, শিশুদের আনন্দ উল্লাসের জন্য স্কুল আঙ্গিনায় এমন একটি জিনিষের ব্যবস্থা তিনি করতে পেরেছিলেন।
দৃশ্যটি দূরে থেকেই দেখছিলাম, নিকটে গিয়ে দেখার কৌতূহল হল। নিকটে গিয়ে যা দেখলাম তা দেখার জন্য অন্তত দুই মিনিট আগেও প্রস্তুত ছিলাম না। মূর্তির সামনে সাদা চকচকে জিনিষটা মূলত, উলঙ্গ মূর্তির লিঙ্গ, যা স্পেশালী স্টেইনলেস স্টিল দিয়ে তৈরি। সেটাকে কায়দা করে বানিয়ে রূপান্তর করা হয়েছে একটি পানির ট্যাবে। শিশুরা সেটিকেই টানছে, মোচড়াচ্ছে! নিচের দিকে চাপ দিলে প্রস্রাব বের হচ্ছে। প্রস্রাব হিসেবে বের হওয়া তরলই হল পানিয় জল। আশে পাশে আরো পানির ট্যাবের ব্যবস্থা থাকলেও শিশুদের কাছে এটিই বেশী আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু!
আমাদের দেশের সংস্কৃতি ও কৃষ্টিতে ব্যাপারটি দৃষ্টিকটু হলেও, পাশ্চাত্যের অনেক দেশে এর চেয়েও বেশী দৃষ্টিকটু ব্যবস্থা শিক্ষাঙ্গনে উপস্থিত রয়েছে। তাদের চিন্তা হল শিশুদের মত নিষ্পাপ হৃদয়ে কিছুটা হাসি আনন্দের ব্যবস্থা করতে পারাই তো শিক্ষার অন্যতম ধাপ! এটা একটা সাফল্য বটে। ব্যক্তিগত ভাবে আমার ভাবনা ছিল পরিবার আনা কিংবা না আনার দোদুল্যমানতা। এই ঘটনাটি আমাকে পরিবার না আনার পিছনে কাজ করেছিল। কেননা এই শিক্ষা ব্যবস্থায় ওরা উৎসাহী হলেও, আমার অধস্তনদের জন্য এটা আমাকে আতঙ্কিত করেছিল।
পিতা-মাতা যত শিক্ষিত ও সতর্ক হউক না কেন, উত্তম পরিবেশ ও তার উপকরণ হল শিশুদের মেধা, চরিত্র ও শিষ্টাচার বিকাশের মাধ্যম। পরিবেশ ও উপকরণ ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় পরিবর্তন করা যায়না। বেশীর বেশী এটাকে ঘৃণা করা যায়, তাতে ঘৃণাকারীর কোন লাভ তো হয়না। উল্টো সমাজ বহির্ভূত হিসেবে নিজেকেই আলাদা হয়ে যেতে হয়। ছাগল নারিকেল কে ঘৃণা করে তাতে নারিকেলের কিছু আসে যায় না। মূল পরিবেশের দায়িত্বভার যখন রাষ্ট্রের হয়ে যায়, তখন ব্যক্তি প্রচেষ্টায় সেখানে করার কিছুই থাকেনা। এতটুকু সিদ্ধান্ত হয়ত নেওয়া যায় যে, সেটা মেনে নেওয়া হবে? নাকি নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া হবে। ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায়, জীবনের একটি রঙ্গিন স্বপ্ন, একটু সুখের চিন্তায় প্রতিটি পিতা-মাতাকে এই মহাসত্যের মুখোমুখি হতে হয়। সিদ্ধান্ত যেদিকে সন্তানের ধাবমান হবার সুযোগও সেদিকে যায়।
Discussion about this post