হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন বাম ঘরানার। নামাজ তো পড়েতেন না উল্টো নামাজি ছাত্র দেখলে উৎপীড়ন করতেন। ভূগোল পড়াতেন, অসম্ভব পাণ্ডিত্য ছিল তার। গোলার্ধ ও দ্রাগিমাংসের বিভিন্ন জটিল প্রশ্ন করে সে সব ছাত্রদের বেকায়দায় ফেলে মারের পরিবেশ সৃষ্টি করতেন। এভাবে তো মার খেতই, উল্টো অধিক লম্বা বেতের আঘাত যার গায়ে পড়ার কথা তাকে মৃদু আঘাত করে ভারী আঘাতটি লক্ষ্যনীয় ছাত্রের গায়ে আছড়ে পড়ত!
গুগুলের কল্যানে বিশ্ব ম্যাপে দক্ষ হয়ে গিয়েছিল তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ুয়া আমারই সন্তান। তার খেলাই ছিল, মাউসের ক্লিক মেরে দুনিয়ার দেশে দেশে ঘুরে বেড়ানো। কিন্তু তখনকার দিনে ক্ষুদ্র বইয়ের পঁচা পাতায় অঙ্কিত, সাদা-কালো দাগের চিহ্ন বুঝাটা ও তা আত্বস্থ করা কিছুটা দূরহ ছিল বৈকি। সুতরাং তার হাতে মার খাওয়ার মোক্ষম সুযোগ এমনিতেই সৃষ্টি হত। অনেক ছাত্ররা বুঝতে পারত না, অযথা কেন মার খাওয়া লাগে। পরকালের মার তো পরকালেই হবে, দুনিয়ার নগদ ও তাজা মার খাওয়ার ভয়ে অনেক ছাত্র নামাজ ছেড়ে দিত।
স্যার রিটায়ার করেছেন, একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালান, স্বীয় কন্যারা বড় হয়েছে, বিয়ের দরকার। বিশ্ববিদ্যালয় ফেরত এলাকার বিদ্ধান, স্মার্ট ও চাকুরীজিবী যে সব ছেলে তাঁর নজরে পড়ে সবাই নামাজি। বে নামাজী তাঁর পছন্দ হলেও, নানাবিধ কারণে পাত্রদের ছোট-খাট দোষ ত্রুটি তিনি মানতে পারেন না। তিনি মানলেও মেয়ে ও মেয়ের মায়ের মানার ব্যাপার ও থাকে।
প্রবাস থেকে দেশে যাবার পরে, শুনতে পাই পিছন থেকে কেউ ডাকছেন। সাথের জন্য বললেন, স্যার ডাকছেন, থামলাম। কোন ভূমিকা ছাড়াই তিনি সরাসরি বললেন, আমি এখন অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছি। মুখে দাড়ি, মাথায় টুপি দেখে বিলক্ষণ বুঝতে বাকি থাকেনি তিনি কি বুঝাতে চাইছেন।
পরিবর্তন তো আপনাকে হতেই হবে স্যার! কেননা আপনার কন্যাদের বিয়ে দিতে হবে, আর হবু বর হিসেবে যারা এলাকায় গিজ গিজ করে তারা আপনার চেয়ে ভিন্ন।
কথাটি মুখ ফসকে বেড়িয়ে গিয়েছিল। চোখের উপর ভেসে উঠেছিল অতীতের কিছু স্মৃতি, অযথা মার খাওয়া ছাত্রদের হাত-পিট মালিশ করা দৃশ্যটি! যখন মাষ্টার মহাশয়ের হাতে জোড় ও ক্ষমতা ছিল তখন এসব নিরীহ ছাত্রকে গরু তুল্য করত, সবাইকে মসজিদ ছাড়া করেছে। এখন সব হারিয়ে বুঝেছেন কাজটা তিনি ভাল করেননি। সময়ের পরিক্রমায় এটাকে উপহাস বলব নাকি তাচ্ছিল্য বলব বুঝতে পারছিলামনা। আরো তাজ্জব হয়েছিলাম এটা দেখে যে, গরুর মত মার খাওয়া ছাত্রগুলোই একে একে তাঁর কন্যাদের জামাই বনে যেতে!
শেষ ভাল যার সব ভাল তার। স্যারের জীবনের শেষটা ইতিবাচক ছিল এবং বৃদ্ধ বয়সেও কোন দ্বিধা ছাড়াই বলে দিচ্ছিলেন আমি পরিবর্তন হয়েছি। এই স্বীকারোক্তিতে না ছিল কোন লজ্জা না ছিল গোস্বার ভাব। পরিবর্তনের আনন্দই তাকে ছাত্রদের কাছে বুড়ো ছাত্রের মত বলার সাহস যুগিয়েছিল।
ক্যাসেট ও সিডির যুগের শহুরে জীবনে, আরেক বাবাকে দেখেছিলাম, সে উচ্চস্বরে বলত, আমার মেয়েকে ঐ নায়িকার মত বানাব। আরেকবার বলত সেই নায়িকার মত বানাব। তার মুখে নায়িকার শুনে সবাই বুঝতে পারত, এই পরিবার আজ ঘরে বসে উল্লেখিত নায়িকার ছবি দেখেছে। মেয়ে যাতে নায়িকা হয়ে বেড়ে উঠতে পারে সে ব্যাপারে যথেষ্ট সজাগ ছিল। গানে, অভিনয়ে একাকার দক্ষতা ছিল। ভদ্রলোকের চাকুরী ও ব্যবসা ছিল। পয়সার গরম ছিল, ভাবত কন্যারা বড় হলে, নায়িকাদের মত আধুনিকা হবে ফলে ছেলেরা তার বাড়ীতে লাইন ধরবে।
প্রতিবেশীরা তার এসব শ্রুতিকটু কথা শুনে ত্যক্ত বিরক্ত হলেও তার কোন দ্বিধা ছিলনা। এসব কথা দশ কানে দশ মহল্লার মানুষ জানে। ঘটনাচক্রে তার একটি মেয়েকে যতজন নায়িকার মত করে বানাবে বলে দাম্ভিকতা দেখাত; একে একে সে ততটি কন্যা সন্তানের পিতা হয়েছে। এখন সবাই এক সাইজের হয়েছে। বরও আসেনা, ঘরও আসেনা ফলে স্বামী স্ত্রীর ঝগড়ার বিষয় এখন এসব নিয়ে। মেয়েরা শিক্ষিত হলেও, ঝগড়াটে পরিবার হিসেবে ইতিমধ্যে মহল্লায় সুনাম কুড়িয়েছে।
এসব লিখে কারো পরিবারের বদনাম করা লক্ষ্য নয়। তাছাড়া বর্তমানে এসব কোন বড় ঘটনাও নয়। যতগুলো ঘটনার বর্ণনা তুলে আনা হয়েছে, সব গুলোতেই পিতা-মাতা শিক্ষিত ছিল, তারা সন্তানের খ্যাতিময় জীবন সৃষ্টির জন্য বহু ত্যাগ করেছেন। তাদের মধ্যে বিদেশী সিলেবাসের শিক্ষার্থী যেমন ছিল, দেশী সিলেবাসের শিক্ষার্থীও আছে। তবুও পিতা-মাতা যে ধরনের সন্তান আশা করে তাদের মানুষ করেছে, শেষমেষ সে ধরণের সন্তানের পিতা হতে ব্যর্থ হয়েছে। সন্তান প্রতিষ্ঠিত হলেও, বৃদ্ধ বয়সে সবাই একাকি হয়েছেন। কেউ সন্তানের কাছে অপমানিত হয়েছে, কেউ সন্তানের কাছে শেষ আশ্রয় পেতে ব্যর্থ হয়েছে। অনেক পিতা নিজের অর্থ সম্পদের লোভ দেখিয়েও সন্তানের পায়ে স্নেহের রসি পড়াতে অপারগ হয়েছে। আমরা বুঝতেই পারি, সেটা পুরোপুরি সিলেবাস কিংবা বিদ্যা শিক্ষার ধরণের দোষ নয়। হতে পারে সিলেবাসে মৌলিকত্ব উপাদানের ঘাটতি আছে। তারপরও একথা অনসীকার্য প্রকৃত শিক্ষা ঘর থেকে পেতে হয়, তারপর সমাজ থেকে, তারপর আত্মীয় থেকে অতঃপর অনাত্মীয় ও বাহিরের মানুষের প্রভাব থেকে। বর্তমান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আমরা শুধুমাত্র ব্যবহারীক ও বস্তুগত শিক্ষা পাচ্ছি; যা মানুষ হবার জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়।

Discussion about this post