কাউকে ইন্তেকালের আহবান করা অন্যায়, অবৈধ! কারো আহবানে উত্তেজিত হয়ে যদি কেউ ইন্তেকাল করেও বসে তাহলে ফৌজদারি আইনে সে অপরাধী হবে। তাকে গ্রেফতার হতে হবে! এটা জেনেও আমি ইন্তেকালের আহবান করেছি ভিন্ন কারণে। কেননা ইন্তেকাল শব্দটির সাথে বাংলাদেশের ছেলে-বুড়ো সবাই একযোগে পরিচিত। প্রতিদিন পত্রিকাতে ইন্তেকালের খবর পাওয়া যায়। মুসলমান মারা গেলে অমুক ব্যক্তি ইন্তেকাল করেছেন বলে ঘোষণা করা হয়।
ইন্তেকালের বিপরীতে মৃত্যু বরণ, মারা যাওয়া, দেহত্যাগ, প্রাণত্যাগ, প্রাণ-বায়ুত্যাগ, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ, ইহলোক ত্যাগ, পরলোকগত শব্দগুলো ব্যবহার হয়। হাল আমলের কিছু মানুষ ইন্তেকাল শব্দটিকেও পরিহার করে চলে কিন্তু তারা জানে না যে, আমাদের পুরো জাতিই নিজের অজান্তে রাত-দিন চব্বিশ ঘণ্টায় ইন্তেকাল নিয়ে ব্যস্ত। বাংলাদেশের সর্বত্র এখন ইন্তেকালের জয় জয়কার।
ইন্তেকাল শব্দটি মূলত আরবি। এই শব্দের প্রকৃত অর্থ হল, অর্থকড়ি স্থানান্তর, পরিবহন। মোগল শাসনামলে এই শব্দটি দেওয়ানী আদালত ও রাজস্ব বিভাগের অন্যতম পরিচিত শব্দ হয়ে উঠে। ব্রিটিশ আমলেও সরকার সেই পরিভাষা পরিবর্তন করেনি। মানুষ সাব রেজিস্ট্রি অফিসে গেলে ভূমির মালিকানা পরিবর্তন, সম্পত্তির হাত বদল, রাজস্ব খাতের এক অর্থকে অন্যত্র স্থানান্তর করার পদ্ধতিকে ইন্তেকালি বলে। আজকের দিনে জমির নাম জারি করা হয়, সে নাম জারির পদ্ধতিকে দেওয়ানি আদালতের ভাষায় ইন্তেকালি করানো বলা হয়। যাদের কাছে এখনও পুরানা দিনের দলিল-দস্তাবেজ আছে সেখানে ইন্তেকাল শব্দের বহু ব্যবহার দেখে থাকবেন।
আবার বাংলা ভাষায় যে নকল শব্দটি ব্যবহার হয়, সেটিও ইন্তেকালের প্রতিশব্দ অর্থাৎ ইন্তেকাল শব্দটি তৈরি হয়েছে আরবি ‘নকল’ শব্দ থেকেই। বর্তমান বাংলাদেশে নকল ছাড়া তো ও শিক্ষা ব্যবস্থাই অচল। পণ্যে নকল, শিক্ষায় নকল, উৎপাদনে নকল, মানুষে নকল, ব্যবসায় নকল, উন্নয়নে নকল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের কোন জিনিষটাতে নকলের ব্যবহার নাই?
এই নকল শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়েছিল রাজস্ব বিভাগ থেকে। কারো মূল দলীল হারিয়ে গেলে কিংবা পুড়ে গেলে মহা সমস্যায় পড়তে হত। তখন তো আর ফটোকপি মেশিন ছিলনা। তাই রাজস্ব বিভাগে দরখাস্ত করলে, সরকারী হেফাজত খানায় রক্ষিত অন্য মূল দলীল দেখে, সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি আসল জিনিষটির বর্ণনা ও তথ্য হুবহু আরেকটি কাগজে লিখে দিতেন। দস্তখত ও সিলের মাধ্যমে সত্যায়িত করা সে কাগজটি দিয়েও মূল কাগজের মত ব্যবহার করা যেত। দস্তখত ও সিল করা সেই দলীল কেই বলত ‘নকল’ কপি।
সে থেকেই দেশে আসল আর নকলের ব্যবহার শুরু হয়। শুধু তাই না, সরকারের রাজস্ব খাতে সরকারি বেতন ভুক্ত যে ব্যক্তিরা এই কাজ করত তাদের পেশার নামই ছিল ‘নকল’ পেশা। এসব কর্মকর্তারা আদালতে বসে ‘নকল’ করেন বলে গর্বে সহিত বলতে পারতেন। এ থেকে বুঝা যায়, নকল হল সেই দলিল, যার মাধ্যমে আসল জিনিষের রূপ, পরিমাণ, গুন, স্থান ইত্যাদি প্রকাশ পায়। কিন্তু বর্তমানে নকলের সেই সম্মান নাই। বরং নকলে নকলে পুরো জাতি আজ বিপর্যস্ত ও বিধ্বস্ত।
বলছিলাম ইন্তেকালের কথা, ইন্তেকাল শব্দটি ইসলামী পরিভাষা হিসেবে সমাদৃত। কেউ মারা গেলে মুসলমানেরা ইন্তেকাল শব্দই ব্যবহার করে। ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করেনা। উপরে উল্লেখিত যে অর্থে রাজস্ব মন্ত্রণালয়ে ইন্তেকাল শব্দের ব্যবহার, সে অর্থেই মানুষ মারা গেলে যে ইন্তেকাল বলা হয়ে থাকে, তা যথার্থ। কেননা ইসলামি দৃষ্টিকোণ মানুষ কখনও মরে না। সে জীবিত থাকে কিন্তু তার অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। অর্থাৎ
– মানুষ দুনিয়াতে আসার আগেও জীবিত ছিল,
– আসার পরেও জীবিত থাকে
– এবং মরার পরেও জীবন অব্যাহত থাকে
উপরোক্ত প্রতিটি ধাপে মানুষের একটি পর্যায়ের পরিবর্তন ঘটে, এই পরিবর্তনের নামই আরবি ভাষায় ইন্তেকাল তথা অবস্থার পরিবর্তন কিংবা স্থানান্তর বুঝায়।
আবদুল্লাহ যখন মারা যায়, তখন ঘোষণা হয় মরহুম আবদুল্লা ইন্তেকাল করেছেন! অথচ তখনও আবদুল্লাহ’র মৃত দেহ সবার সামনে পড়ে থাকে কিন্তু ঘোষণা হয় তিনি মারা গেছেন। অর্থাৎ আবদুল্লাহ দেহ আছে কিন্তু সে দেহে প্রাণ নেই। এ থেকে বুঝা যায়, প্রাণের নামই আবদুল্লাহ, দেহের নাম নয়।
প্রাণ ছাড়া বাহন চলতে পারেনা, সেজন্য দুনিয়াতে আসার সময় আবদুল্লাহর সেই প্রাণকে দেহ নামক একটি বাহন দিয়ে চলতে দেওয়া হয়। আবদুল্লাহর প্রাণ বহনকারী এই বাহনের মালিক আবদুল্লাহ নয়। সে জন্য দেহকে যথাযথ পরিচর্যা করতে হয় আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক এবং সে দেহকে হত্যা তথা আত্মহত্যা করার অনুমতি আল্লাহ কাউকে দেন নাই। যেভাবে ভাড়া করা গাড়ি কিংবা ভাড়ার বাড়ী ভাড়াটিয়া আগুন জ্বালিয়ে পুড়াতে পারেন না। তাকে গ্রেফতার করা হয়। শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। নিজের দেহের উপর অবিচার করলেও, তাকে জাহান্নামে যেতে হবে নিশ্চিত।
দেহ দুনিয়ার মাটি দিয়েই তৈরি, মাটির বিভিন্ন খনিজ উপাদান দিয়েই দেহ কোষের সৃষ্টি। সে জন্য দেহকে বাঁচিয়ে রাখতে মানুষকে মাটির উপর নির্ভরশীল হতে হয়। মানুষের প্রবৃত্তি ও দেহ, চোখ, মুখ, জিহ্বা, নাক, কান মাটি থেকে সৃষ্ট জিনিষের প্রতি সর্বদা আকৃষ্ট থাকে। অবশেষে মানুষের ইন্তেকালের পরে সেই দেহটাকে মাটির কাছে সোপর্দ করে যেতে হয়। প্রাণটা প্রাণের জায়গায় জীবন্ত অবস্থায় ফিরে যায়, যেভাবে সে জীবন্ত অবস্থায় দুনিয়ায় মানুষের দেহে ফিরে এসেছিল।
ইসলামে রুহ তথা প্রাণের এই আসা যাওয়ার পর্যায়কে ইন্তেকাল বলে। মানুষ কখনও মরে না, তাকে তার হিসাবের মুখোমুখি হতেই হবে এই দৃঢ় বিশ্বাস ও আস্তা আছে বলে ইসলামে মৃত্যু না বলে ইন্তেকাল শব্দের প্রয়োগ করা হয়। জন্ম যখন নেওয়া হয়েছে, তখন মানুষকে মৃত্যুর স্বাধ নিতেই হবে। এটাই তকরদিরের ফায়সালা। যত গুরুত্বপূর্ণ উত্তম কাজ আছে তা দুনিয়াতেই অর্জন করতে হয়। হাশরের ময়দানে মানুষ আফসোস করে বলবে, হায়! আমাকে দুনিয়াতে আরেকবার ফেরত পাঠাও, আমি ভাল করে আসি। না, তখন সেটা সম্ভব হবেনা কেননা তখন দুনিয়া বলে কিছুই থাকবে না, সবই ধ্বংস করা হবে। মানুষের জন্যই এই দুনিয়া বানানো হয়েছিল, তারা কিছুদিন এখানে থাকবে, মশল্লা সংগ্রহ করবে এবং ফিরে যাবে। এই অর্থে দুনিয়াতে আসা এবং ফিরে যাবার নামই, ‘ইন্তেকাল’। একটু ভাবুন, যদি গতকাল রাত্রে আমরা মারা যেতাম, আজকের দিনটি যদি পৃথিবীতে না হয়ে অন্য জগতে হত, তাহলে আমি কিংবা আমরা সফল হতাম কিনা।


Discussion about this post