মৃত্যু, মৃত্যু সংবাদ, ইন্নালিল্লাহ পড়া অতঃপর কেউ মরহুম হওয়া নতুন কোন ঘটনা নয়, এটি বাংলাদেশের মুসলিম সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই কারো মৃত্যু সংবাদ প্রচার করা আজকের ব্লগের মূল বিষয় নয়। বিষয়টি অন্যত্র, তাই পাঠকের দুটি মিনিট সময় নষ্ট করব।
মরে যাবার পর কবরে দাফন করার আগেই মৃত ব্যক্তি ‘মরহুম’ হয়ে যায়। আমাদের দেশে ‘আলহাজ্ব’ শব্দের পরেই দ্বিতীয় সম্মানিত শব্দের নাম ‘মরহুম’! আলহাজ্ব খ্যাতির ব্যক্তিরা জীবিত থাকে বলে, এই পদবীর কিছু দোষ সমাজে থাকলেও, মরহুম শব্দের কোন দোষ কদাচিৎ চোখে পড়েনা তাই অনেক সময় এটি উপাধির মত হয়ে যায়!
অনেক টাকা খরচ করে, কবরে নেম প্লেট লাগানোর পরে দেখা গেল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদবী ‘মরহুম’ লিখা হয় নাই! লাখ টাকায় নির্মিত কবরের নেম প্লেট, কুড়াল দিয়ে ভেঙ্গে ‘মরহুম’ যোগ করতে দেখেছি! একদা জেলা শহরের জাতীয় মাঠের বিশাল জনসভায়, প্রধান অতিথির নাম ঘোষণার সময়, পদবী বলতে গিয়ে, সভার পরিচালক প্রধান অতিথিকে মরহুম বলে ফেলেন!
দৃশ্যত কেউ মারা গেলে আমরা ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পড়ি। টিভিতে যখন খবর পড়া হয়, খবরের পাঠিকাও মৃত্যু সংবাদ পড়ার সাথে সাথেই ইন্না লিল্লাহ পড়েন! যদিও তাদের চেহারায় মৃত ব্যক্তির প্রতি কোন দয়া রেখাপাত হয়না! তিনি তা পড়তে বাধ্য, তাই তিনি পাঠ করেন। একদা এক সংবাদ পাঠিকা হিন্দু ব্যক্তির মৃত্যু সংবাদ পড়তে গিয়ে ‘ইন্না লিল্লাহ’ কিছুটা বলে থেমে যান। খানিকটা ভেবে নিলেন, হিন্দুর মৃত্যুতে এই দোয়া পড়া হয় কিনা! উপস্থিত বিবেচনায় পাঠিকা ‘সরি’ না বলে দোয়া শেষ করেন! এর কারণ হয় দোয়ার মূল ভাব না বুঝা ও দোয়া পড়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য না জানা।
আমাদের সকলের বিশ্বাস, মৃত্যু সংবাদ শোনার পরে এই দোয়া পড়লে, তার প্রভাব মৃত ব্যক্তির রুহের উপর পড়বে এবং মৃত ব্যক্তি উপকৃত হবে! কিন্তু অনেকেই জানেন না যে, এই দোয়ার সাথে মৃত ব্যক্তির কোন দূরতম সম্পর্ক নেই। আরো অনেকেই মূল কথাটিই জানেন না যে, এই দোয়াটি মৃত ব্যক্তির জন্য নয় বরং নিজের জন্যই পড়া হয়!
এই দোয়ার উদ্দেশ্য হল, কোন মানুষ যখন কারো মৃত্যু সংবাদ শুনে, তখন সে যাতে উপস্থিত ক্ষেত্রে চিন্তা করে নেয়, এভাবে তিনিও হঠাৎ করে, যে কোন এক মুহূর্তে মারা যেতে পারেন। আসুন দেখে নেই আমরা সেই দোয়াতে কি পড়ে থাকি।
আমরা কি পড়ি: ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’।
যার সরল অর্থ:
‘ইন্না লিল্লাহ’ – নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য।
‘ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ – এবং নিশ্চিতই আমাদের তাঁর সান্নিধ্যে ফিরে যেতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘সকল মুসলমান যেন দৈনিক ২০ বার মৃত্যুর কথা স্মরণ করে’। আর এই মৃত্যু স্মরণ করার অন্যতম উপায় হল, কারো মৃত্যু দেখে, কারো মৃত্যু সংবাদ শুনে যেন, নিজের মৃত্যু সম্পর্কে সম্যক অবগত হয় এবং উপলব্ধি করে যে, ক্ষণকালের এই দুনিয়া থেকে যে কোন মুহূর্তে বিদায় নিতে হবে, তাই যেন সর্বদা প্রস্তুত থাকে।
সুতরাং কোন বোধশক্তি সম্পন্ন মানুষ; হিন্দু, মুসলিম, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী যার মৃত্যুই দেখে, তিনি এই দোয়াটি এমনিতেই পড়বেন! কেননা তিনি মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করেছেন। আর চিন্তাশীল মানুষ যে কারো মৃত্যু সংবাদ শুনে, দোয়াটি পড়বেন এ কারণে যে, দুনিয়া থেকে কারো বিদায়ের ঘটনায়, নিজের বিদায়ের কথা মনে আসবে।
আর নির্বোধ ব্যক্তি হলে, এই দোয়া পড়ায় না তার উপকারে আসবে; আর না মৃত ব্যক্তির কাজে লাগবে। তাছাড়া রেডিও-টিভিতে, মসজিদের মাইকে, রিক্সায় চড়ে এই দোয়া পড়তে পড়তে যদি জগতের সকল মানুষের কান ঝালা-পালা করেও ফেলে তাতেও কারো কোন লাভ নাই।
তাই আসুন, কোরআনের প্রতিটি কথাকে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করি, রাসুল (সাঃ) প্রতিটি উপদেশকে আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করি ও মেনে চলি। তাহলে আমাদের মৃত্যুর পর কেউ যদি এই দোয়া না পড়ে কিংবা কোন জানাজার নামাজও না পড়া হয়, তাহলেও কোন দুঃচিন্তার কারণ থাকবেনা। তাই আসুন অন্যরা নিজের জানাজা নামাজ পড়ার আগে, নিজের নামাজ নিজে পড়ার অভ্যাস গড়ি। সর্বদা মৃত্যুর কথা মনে করি বার বার, বহু বার, অনেক বার। তাহলে ইন্না লিল্লাহ পড়ার সার্থকতা ঘুচবে না হলে নয়।

Discussion about this post