জাতীয়তাবাদ ইসলাম অবলম্বন করে কিন্তু তার ধ্বংসকেও নিষ্ঠুরভাবে উপভোগ করে
নজরুল ইসলাম টিপু
জাতীয়তাবাদ ধর্মকে স্বীকার করে, ধর্মকে মেনেও চলে কিন্তু ব্যক্তি স্বার্থ, দলীয় স্বার্থ, গোষ্ঠী স্বার্থের প্রশ্নে ধর্মীয় অধিকারকে দ্বিতীয় স্থানে রাখে। জাতীয়তাবাদের মূল স্পিরিট হল নিজ জাতির শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্য থাকবে সকল কিছুর উপরে। তার জাতি থেকে উত্তম, অভিজাত, মেধাবী, শক্তিশালী, শাসনে, যোগ্যতায়, নেতৃত্বে কর্তৃত্বে এবং আধিপত্যে অন্য কোন জাতি নাই। পৃথিবীর সকল জাতির উপর খবরদারী করা, অভিভাবকত্ব জাহির করা ও রক্ষণাবেক্ষণ করার যোগ্যতা একমাত্র তাদেরই আছে।
জাতীয়তাবাদ হল পাহাড়ি নদীর সেই ঝর্ণা ধারার মত, যেটি সমতলে বহু শাখা প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে ভূমিকে বহু টুকরায় বিভক্ত করে রেখেছে। যার এক টুকরার সাথে অন্য টুকরার কোন সংশ্রব ও সংযোগ নাই। ফলে জাতীয়তাবাদী উ-শৃঙ্খলতা ও প্রেরণা একটি সবল ও শক্তিশালী রাষ্ট্রকে টুকরা করে দুর্বল ভিতের উপর দাঁড় করায়। ঘৃণা আর সঙ্কাবোধ হল জাতীয়তাবাদের আসল পুঁজি; হীনমন্যতা, একগুঁয়েমি, গর্ব ও অহংকার হল তার মূল ভিত্তি! জাতীয়তাবাদী জোশ, আবেগ-উদ্দীপনা ততক্ষন পর্যন্ত সৃষ্টি করা যায়না, যতক্ষন না জাতীর সামনে এমন কিছু হাজির করা না যায়, যাকে ঘৃণা ও ভয় করা না যায়! ঘৃণা ও ভয়কে উষ্কে দিয়ে মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলা হয়। জাতীয়তাবাদী চেতনায় জাতীকে উন্নয়ন করার কথা বলে উষ্কে দেওয়া হলেও, মূলত ভূ-খন্ডকে টুকরো টুকরো করে, মিলে-মিশে খাওয়া ও শাসন করার মতলব থাকে মূল উদ্দেশ্য। কোন অবস্থাতেই তা জাতিকে উন্নত মানদণ্ডে উপনীত করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়না! শেখ মুজিবর রহমান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৯৭১ সালে সুযোগকে এভাবেই কাজে লাগিয়েছিল।
যখন পুরো ইউরোপ খৃষ্ট ধর্মের প্রভাবে এক ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছিল। তখন তারা সেই বলে বলীয়ান হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় জেহাদ তথা ক্রুসেড চালাতে সক্ষম হয়েছিল। যখন তাদের অন্তরে ধর্মের আহবান দুর্বল হয়ে পড়ে, জাতীয়তাবাদের হীনমন্য গর্ব-অহংকার হৃদয়ে ঝেঁকে বসে; তখন তাদের মধ্যে গ্রীক জাতি, ব্রিটিশ জাতি, রুশ জাতি, আইরিশ, পর্তুগীজ, স্প্যানিশ, স্কটিশ, সার্বিয়ান এবং জার্মান জাতির নামে ব্যাপক ভেদাভেদ, হিংসা, জিঘাংসা, আধিপত্য, আক্রমণ ও অত্যাচার চেপে বসে। ফলে তারা বহু ভাগে বিভক্ত হয় এবং অতীতের চেয়ে অধিকতর দুর্বল হয়ে পড়ে। পৃথিবীতে সংঘটিত দুটি বিশ্বযুদ্ধ জাতীয়তাবাদের অহংবোধ থেকেই সৃষ্টি হয়েছিল।
জাতীয়তাবাদী মতবাদ যদি একবার কোন গোষ্ঠীর রক্তে ঢুকে পড়ে, তাহলে তার নিশ্চিত পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। ফলে বন্ধু রাষ্ট্র ঘৃণা করে এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র সমূহ শত্রুতে পরিণত হয়। পুরো দুনিয়াকে নেতৃত্ব দেবার যোগ্যতা সৃষ্টির হবার পরও, হিনমন্য চিন্তার কারণে জার্মানি দুটো বিশ্বযুদ্ধ করে নেতিয়ে পড়ে। তুর্কি সাম্রাজ্য ও বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য জাতীয়তাবাদের হীনমন্যতায় বিলীন হয়েছে। আজকের ইরান ও ইসরায়েল একই মতবাদের কারণে পুরো দুনিয়ার শত্রুতে পরিণত হয়েছে। রোম আর পারস্যের চির জীবনের ধন্ধই ছিল জাতীয়তাদের মত হীনমন্য চিন্তাধারার বিশ্বাসের কারণে। জাতীয়তাবাদী চিন্তায় আচ্ছন্ন রোমানেরা যখন খৃষ্ট ধর্মের বাহক হয়ে যায়, খৃষ্ট ধর্ম তখনই তাদের পুরানা ঐতিহ্য চিরতরে হারিয়ে ফেলে!
ইসলাম ধর্ম বিভিন্ন জাতি, গোষ্ঠী, সংস্কৃতি ও কৃষ্টির মানুষকে এক কাতারে নিয়ে আসার প্রেরণা যোগায়। ইসলাম মরুভূমির অশিক্ষিত বর্বর আরবদের শিক্ষার আলোতে মানুষ করে, ইউরোপের বনে জঙ্গলে বসবাস উলঙ্গ করা মানুষদের জ্ঞানের আলো দেখিয়েছে। বন্ধু ও ভ্রাতৃত্বের এক ছায়ায় নিয়ে আসে। আফ্রিকার মরক্কো থেকে চীন, ইউরোপ থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত আধা দুনিয়ার বিশাল ভু-খণ্ডে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল; সমুদয় গোত্র, গোষ্ঠী, জাতি, সম্প্রদায়, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সীমা রেখা ভেঙ্গেই। পরবর্তীতে যখন এসব স্থানে জাতীয়তাবাদী চিন্তা ও চেতনা কাজ করা শুরু করল, তখন থেকেই নদীর ভাটি অঞ্চলের নিয়মের মত মুসলিম দুনিয়া বহু টুকরায় বিভক্ত হল।
ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ দেখতে একটি দাড়ি পাল্লার মত! যার এক দিকে কিছু কমলে অন্য দিকে বেড়ে যায়; আবার সেটিকে কমলে অন্য এদিকে বেড়ে যায়। সে কারণে ইসলামী পুনরুজ্জীবন ঘটলে জাতীয়তাবাদ হুমকির মুখে পড়ে, ক্ষমতা হারার ভয়ে তারা ভীত হয়। জাতীয়তাবাদ ধর্মকে অস্বীকার করতে পারেনা, কেননা তারা বুঝে ধর্ম একটি সংঘটিত শক্তি, যাকে সুবিধা মত সময়ে ব্যবহার করা যায়। কখনও ধর্মীয় বিভিন্ন দল, উপদলের মাঝে সংঘাত বেধে গেলে জাতীয়তাবাদীরা নিঃশ্চুপ থাকে এবং নিষ্ঠুর ভাবে তা উপভোগ করে। কেননা ধর্মীয় দলের কেউ এক পক্ষ বেঁচে থাকলেও তাদের লাভ, আবার দুই পক্ষ নির্মূল হয়ে গেলেও তাদের কোন ক্ষতি নাই। ধর্মীয় দলের বিভক্তিই জাতীয়তাবাদীদের এক প্রকার পুঁজি। তাই কোন বহিঃশত্রু বা রাষ্ট্র কোন ধর্মীয় গোষ্ঠীকে নির্মম হাতে নির্মূল করার ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও জাতীয়তাবাদীরা মুখে কোন কথা বলেনা, চোখে কিছু দেখে না বরং ভিতরে ভিতরে এসব ধ্বংস ও উৎপীড়ন উপভোগ করে! যাতে করে, সংগঠিত শক্তি ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাক। অতঃপর তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলগুলোকে অর্থ ও ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে নিজেদের বাসনা পূরণ করা যায়। যাদের কাজের ভিত্তিই হল বিভ্রান্তি, অ-বিশ্বস্ততা লুকোচুরি আর হঠকারিতা। এসবের সবগুলোই হীনমন্যতার পরিচায়ক আর সে কারণেই বলা হয় জাতীয়তাবাদ হল হীনমন্যতার মতবাদ।

Discussion about this post