সমাজতন্ত্র! সকল ধর্মের সাথে গলাগলি হলেও ইসলামের মোকাবেলায় সে নির্দয়-নির্মম!
জার্মান চিন্তাবিদ হেগেল ও তাঁর শিষ্য কার্ল মার্কসের শত-বছরের অব্যাহত লিখনির মাধ্যমে, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে প্রথম ভূমিষ্ঠ হয়েছিল সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া! সবাইকে সমান অধিকার পাইয়ে দেবার কথা তুলে সারা দুনিয়ার ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, কুলি, মজুর, মেহনতি জনতাকে রাজপথে নামিয়েছিল। লেলিন, স্টালিন, ট্রটস্কির মত রাজনীতিবিধ; মাক্সিম গোর্কি আর লিও টলষ্টয়ের মত সাহিত্যেদিক দের হাতে সে সমাজের কল্পনার ছবি দেখে বহু বিখ্যাত মুসলিম তো বটেই বাংলাদেশের জাতীয় নেতা মাওলানা ভাসানীর মত কালজয়ী ধর্মীয় ব্যক্তি পর্যন্ত ভাবতে শুরু করে যে, সমাজে সমতা আনার ক্ষেত্রে সমাজতন্ত্রই বুঝি দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম মতবাদ! বিশ্ব জোড়া খ্যাতি, যাদুকরী ঐক্যের বন্ধন নিয়ে যে সমাজতন্ত্রের জন্ম হয়েছিল রাশিয়ায়; ৭০ বছর যেতে না যেতেই তা নিজ ঘরেই এতিম অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। লেলিনের সু-উচ্চ মূর্তিকে ভূতলে আছড়ে ফেলে তারই অনুসারীরা গণন বিদারী উল্লসিত চিৎকারে বলেছিল, আজই হল রাশিয়ার মানুষের প্রকৃত মুক্তির দিন। রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের জন্মস্থানে করুন মৃত্যু হলেও, দেহের বিষ ফোড়ার ন্যায় পৃথিবীর স্থানে স্থানে তা মাথা চাড়া দিয়ে উঠে কিছু চালাক বুদ্ধিজীবীর কল্যাণে!
সমাজতন্ত্র মতবাদে রাষ্ট্রের সবাইকে সমান করে দিলে কিংবা একেবারে কিছুই না দিলে পৃথিবীর অন্য কোন ধর্মের মাথা ব্যথা নাই, তাদের আপত্তি নাই। তাই তাদের সাথে সমাজতন্ত্রের কোন ঝামেলা হয়না। ইসলাম সবাইকে সমান করে দেবার দাবী করে না বরং এই দাবীর প্রচন্ড বিরোধিতা করে। কেননা ইসলাম দাবী করে যে, প্রতিটি ব্যক্তির যোগ্যতা, দক্ষতা, প্রয়োজনীয়তা ও কাজের অবদানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তার প্রাপ্য অধিকার শরীরের ঘাম শুকানোর আগেই তাকে পরিশোধ করো। দ্বিমত পোষণ এবং ভিন্নমত সৃষ্টি করে বাধা সৃষ্টির জন্য সমাজতন্ত্র যেখানেই ইসলামকে সামনে পেয়েছে, সেখানেই কচু কাটা করেছে! রাশিয়ার প্রতিবেশী অসচেতন মানুষদের, সমান অধিকারের লোভ লাগিয়ে, তাজিকিস্তান, কাজাকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কিরগিজিস্থান, আজারবাইজান, সমর খন্দ, বোখারা সহ পুরো মধ্য এশিয়ার কোটি কোটি নিরীহ মুসলমানের রক্তের বন্যায় দাড়িয়ে জনগণকে সমান অধিকার বিলিয়েছিল বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র!
সমাজতন্ত্রের পুরো ভিত্তিটাই দাঁড়ানো আছে একদল কপট মানুষের হঠকারী চালাকির উপর। তারা দাবী করে, নাঙল যার জমি তার। এই কথায় কৃষক বুঝে থাকে, নাঙল যেহেতু কৃষকের হাতে থাকে, তাহলে জমিদার থেকে জমি ছিনিয়ে নিয়ে ভূমির মালিকও তাকে বানানো হবে! এখানে একজন সাধারণ কৃষককে জমির মালিকের বিরুদ্ধে উস্কে দিয়ে ছিনতাইয়ের মানসিকতা বানানো হয়েছে! আর এই কথার মুল রহস্য হল, নাঙল যখন সরকারের, তাহলে জমিও সরকারের! তারা আরো দাবী করে, দুনিয়ার মজদুর এক হও! কিন্তু যারা নেতা তারা মজদুরের কেউ নয়! কেননা সেখানে যত আইন রচিত হয়েছে তা মজদুরদের জন্য, নেতাদের জন্য নয়! এমনকি নেতাদের প্রশ্নের সম্মুখীন হবার কোন বাধ্যবাধকতা নাই! সবাইকে সমান অধিকার দেওয়া হবে! কিসের ভিত্তিতে, কোন সমান অধিকার? তার ব্যাখা দেওয়া হয়না। একজন কামার আর একজন বিজ্ঞানী কি সমান? কর্ম ও যোগ্যতায় সমান হলে অবশ্যই সমান অধিকার তার প্রাপ্য যদি দু‘জন সমান না হবার পরও সমান দেওয়া হয় তাহলে সেটি অন্যায়। মূলত সমাজতন্ত্রে মানবিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, জাতি প্রেমের কোন বালাই নেই! তাদের চিন্তায় জটর জ্বালা নিবারণই যেন মানব জাতির মূল লক্ষ্য!
একটি পরিপূর্ণ সমাজতান্ত্রিক সমাজের চিত্র বুঝতে হলে, একটি মুরগী খামারের মালিকের কাজে ফুটে উঠে! মুরগী খামারী শিশু অবস্থাতেই কিছু মুরগীকে বাছাই করে ডিম দেবার জন্য। এসব মুরগী আজীবন ডিম দেবে কিন্তু ডিমে তা দিয়ে ফুটিয়ে মা হতে পারবে না। কিছু পুরুষ বাচ্চাকে বাছাই করা হয়, নারী মুরগীদের ধর্ষণ করার জন্য। এসব মোরগ পরিণত বয়সে অবিরত ধর্ষণে ব্যস্ত থাকবে, মুরগীর অনিচ্ছার সুযোগ নাই। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে যে মোরগ ধর্ষণ কাজে অযোগ্য হবে তার মৃত্যু তত কাছাকাছি সময়ে হবে। কিছু বাচ্চাকে বাছাই করা হবে, গোশতের জন্য, সে গোশতের ভারেই চলতে পারেনা। কিছু বাচ্চাকে ঔষধ খাইয়ে, শরীরের গোশতকে লবণাক্ত বানানো হয়, ফাস্ট ফুডের দোকানের জন্য! এখানে মুরগীর ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন গুরুত্ব নাই। খামারী ব্যক্তির ইচ্ছাই হল এখানে মুখ্য বিষয়। সেভাবে সমাজতান্ত্রিক সমাজে নিজের ইচ্ছেমত একটি পেশা বাছাইয়ের সুযোগ নাই। কবিকে কবিতা লিখা, গাইয়েন কে গান গাইতে দেওয়া, চিত্র শিল্পীকে নিজের খুশী মত আঁকতে দেবার কোন সুযোগ সে সমাজে নাই। এই সুযোগ সে চাইতে পারেনা। কেননা স্বল্প সংখ্যক নিদ্দিষ্ট কিছু মানুষ ছাড়া, রাষ্ট্রে কবিতা, গান ও চিত্র করের প্রয়োজন অনুভব করেনা। মূলত সমাজের অল্পশিক্ষিত মানুষের কোন ইচ্ছাই থাকতে নেই সমাজতান্ত্রিক সমাজে! আর সে কারণেই বলা হয় সমাজতন্ত্র হল হৃদয়ের বন্দীশালা।
সেখানে একজন মজদুরের শ্রম আর একজন বিজ্ঞানীর শ্রমের মর্যাদা একই যেহেতু অধিকার সমান। একজন মাতা তার আগ্রহে অতিরিক্ত আরেকটি সন্তানের মা হবার ইচ্ছা রাখাটা অন্যায়! নিজের দেশের একটি শহর থেকে অন্য আরেকটি শহরে কাজের সন্ধানে যাবার কোন মৌলিক অধিকার সেখানে স্বীকৃত নয়। মানুষের মনের কোন খোরাক নাই, অন্তরের ভাল লাগা, ভাল বাসার কোন গুরুত্ব নাই সে সমাজে। ফলে পুরো সমাজে উঁচু থেকে নিচু পর্যন্ত সকল শ্রেণীর সকল স্তরে স্থবিরতা নেমে আসে। নিজের অতিরিক্ত যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার ঘোষণা দিলে কোন প্রমোশন তো জুঠেই না বরং অতিরিক্ত কাজের চাপ মাথায় উঠার ভয় থাকে। যোগ্য মানুষ হাত গুটাতে বাধ্য হয়, রাষ্ট্রীয় আইনের শক্ত প্রয়োগের কারণে তখন যোগ্য ও অযোগ্য সকল মানুষ এমনিতেই এক সমান হয়ে যায়। পৃথিবীর দেশে দেশে তাদের হাজারো যোগ্য নেতা কর্মী থাকা স্বত্বতেও সমাজতন্ত্রের করুন পতনের এটাই একমাত্র মূল কারণ।
শ্রেণী শত্রু দমানোর নামে তারা প্রতিপক্ষকে নির্মমভাবে নিশ্চিহ্ন করে। শ্রেণী শত্রু হিসেবে কদাচিৎ নিজ দলের, নিজ পদের প্রতি হুমকি, এমন কাছাকাছি নেতাকে হত্যা করা তাদের জন্য মামুলী ব্যাপার! জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে কিংবা পাবলিসিটির সুযোগ নিতে, কখনও নিজ দলের কর্মী হত্যাকে দলের জন্য অবদান মনে করে। সেই কর্মীর লাশ নিয়ে আন্দোলন করে তারা সর্বদা জনগণের মাঝে আলোচিত থাকাকে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা মনে করে। ধার্মীক মানুষ তাদের চরম অপছন্দ! তাদের চিন্তা ধার্মীক মানুষের অতি মানবিক মূল্যবোধের কারণে, অর্থ শালীরা সম্পদ লুটের সুযোগ নেয়। দলের কাছে পরিপূর্ন ধর্ম বিদ্ধেষী না হওয়া পর্যন্ত, দলের গুরুত্বপূর্ন পদে তাকে রাখাটা বিপদজ্জনক মনে করে। হিন্দু-বৌদ্ধের দেশে সমাজতন্ত্রীরা হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্ম দ্ধারা চ্যালেঞ্জ প্রাপ্ত হয়না। কেননা সে সব ধর্মে রাষ্ট্র ও নেতার পদ হরণের কোন আলামত নাই। সে কারণে উক্ত সমাজে ধর্মের সাথে তাদের কোন সংঘাত বাধে না বরং দেখা যায়, ধর্মবিদ্ধেষী সমাজতন্ত্রী নেতারা নিজেরাই কপালে চন্দন তিলক লাগিয়ে, পূজা মণ্ডপে ঘুরে বেড়াচ্ছে! এখানে সমাজতন্ত্রীরা দ্বিমুখী সুবিধা পায়। তবে, তাদের এসব কর্মকাণ্ডে ইসলাম প্রচণ্ড ভাবে বাধা দেয়। তেল আর পানি যেভাবে একসাথে মিশতে পারেনা। সেভাবে ইসলাম ও সমাজতন্ত্র একসঙ্গে একত্রে থাকতে পারেনা। তাই তাদের মাঝে চরম সংঘাত অনিবার্য হয়ে পরে এবং এই সংঘাত অব্যাহত ভাবে চলতে থাকে।
ইসলামী সমাজে সমাজতন্ত্রীরা বেঁচে থাকার জন্য জুচ্চোরী, কপটতা ও ঠগবাজী পদ্ধতি গ্রহণ করে। তারা ইসলামী ইতিহাসের ন্যায়-বিচার ও ক্ষমার কাহিনীকে পূঁজি করেই সামনে চলতে থাকে। তারা বলতে থাকে, ইসলামের স্বর্ণ যুগে একদা এভাবে সুবিচার করেছিল কিন্তু বর্তমানের ভণ্ড ইসলামী নেতারা তা অনুসরণ করছে না! এসব ভণ্ড ও প্রতারক মৌলভী দিয়ে দেশে কোনদিন আইনের শাসন আসবে না! এভাবে তারা একদিকে ইসলামী ইতিহাসের সূত্র ধরে ইসলামী নেতা, ব্যক্তি, ব্যক্তিত্ব, অনুষ্ঠান ও সামাজিকতাকে কষে গালা-গালি করে অন্যদিকে ইসলামী নেতা-আলেমদের ভণ্ড বলে জনগণের মনে ইসলামী নেতাদের যোগ্যতাকে খাটো, হাস্য-পদ ও অযোগ্য করে। জনগণের মনে প্রশ্ন যুগিয়ে দেয়, তোমরাই ভেবে দেখ, এসব মানুষ কিভাবে রাষ্ট্র চালাবে! সমাজতন্ত্রীদের এই ঘৃণ্য আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে, কেউ যদি কেউ আক্রমণ করতে উদ্যত হয়, তখন অনুনয় করে বলতে থাকে, ইসলাম শান্তির ধর্ম, মহান ধর্ম! আমারা আপনার কাছে ইসলামের নবীর মত সুবিচার আশা করছি! মুসলমানকে আক্রমণ করতে তারা ইসলামকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, আবার নিজেরা বেঁচে থাকতে ইসলাম ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের অধিকাংশ সুশীলের চরিত্রই এটা। এই চরিত্রের সকল উপদেশ দাতার অন্তর ও ভিতর প্রতারনা, হঠকারী, কপটতা আর চরম মিথ্যায় ভরা, তা শুধু গলার টাই আর ক্লিন সেভ চেহারার কল্যানে চাপা থাকে!
মৃত্যুর কোন প্রমাণ থাকবে না, এমন সুযোগে কোন ইসলামী নেতাকে যদি সুযোগ মত পেয়ে যায়, তাহলে তাদের নৃশংসতার সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে ইসলামী ব্যক্তি ও নেতাদের নিশ্চিহ্ন করতে বিন্দু মাত্র দ্বিধা করেনা। ইসলামী নেতা হত্যায় তাদের কাছে শিয়া, সুন্নি, ওয়াবী সবই এক সমান। কেননা মরলে তো শালার একজন মুসলমানই মরল, তাছাড়া তার মৃত্যুর সূত্র ধরে কষে ইসলামকে গালাগালি করার অগ্রিম সুযোগ তো হাতেই থাকছে। ইসলামী সমাজে বসবাস করে তারা যদি উপরের কোনটাই বাস্তবায়ন করতে না পারে; তখন তারা জাতীয়তাবাদী, ধর্মনিরপেক্ষতা-বাদী, জড়বাদী, ভোগবাদী সহ যে কোন ইস্যু-বাদী দলে ঢুকে পড়ে। তারা সে সব দলের হয়ে, যে শাখায় চলা ফেরা করুন না কেন, তাদের বন্দুকের নল থাকে ইসলাম ও ইসলামী শক্তির ভিতের দিকে! আর যে দলে তারা ঢুকে পড়েছে, সে দলের মানুষকে নাস্তিক বানাতে সচেষ্ট হয়! তাও সম্ভব না হলে সে ব্যক্তি যে ধর্মে বিশ্বাসী তার উপর অনাস্থা সৃষ্টি করে। কেননা নীতি-বোধ, নৈতিকতা, সুবিচার, ন্যায়-শাসনের প্রবণতা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বড় বাধা, আর এসব মূল্যবোধ সৃষ্টি করে শুধুমাত্র ইসলাম ধর্ম। আর সে কারণেই ইসলাম ধর্মকে তারা সাক্ষাৎ দুষমন মনে করে।
Discussion about this post