আস্তে আস্তে আমার তাবিজ গত নানা গুঞ্জরন থিতিয়ে আসল। বন্ধুরা কৌতূহলে দুই একটি প্রশ্ন করলেও আমার সাদামাটা উত্তরে তাদের আগ্রহ কমে গেল। তারপরও আমার ভাবুক প্রকৃতির স্বভাবটাকে অনেকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখত। গ্রামের সকল মানুষ আমাকে এমনিতেই পছন্দ করত। ভাল শিষ্টাচার পাইয়ে দিতে আমার মায়ের দিন রাত প্রচেষ্টা থাকত। তিনি আমার দৈনন্দিন ভুলগুলো নজরে রাখতেন, রাত্রে শোয়ার সময় আদর করে একাকী আলোচনা করতেন এবং আমার ভুলগুলো স্মরণ করিয়ে দিয়ে, আগামীকাল থেকে এসব ভুল না করানোর জন্য ওয়াদা নিতেন।
মাকে খুব ভালবাসতাম বলে, তাঁর ওয়াদার কথা আমার মনে থাকা পর্যন্ত সেই ভুলটি দ্বিতীয়বার করতাম না। হাই স্কুলে উঠেই মসজিদে এতেকাফে যাওয়ার অভ্যাস করি। এসব কারণে মুরুব্বীরা আমাকে খুবই পছন্দ করত। আমাদের বাড়ীর সামনেই স্কুল, মসজিদ, বড় পুকুর ও কবরস্থান। মনের ভিতরে যথেষ্ট সাহস রাখতাম!
গ্রামের কোন মানুষ মারা গেলে অন্ধকার রাত্রে কবরস্থানের আশে পাশে ঘুরঘুর করতাম। এই প্রত্যাশায় যে, ভাগ্যক্রমে যদি কোন জ্বিনের সাথে সাক্ষাৎ ঘটে যায়! জ্বিনের ভয় হতনা! কেননা হুজুরের বাণীতে শতভাগ নিশ্চিত হয়েছিলাম যে, সুরা ফাতেহা, ইখলাস, ফালাক, নাস পড়ে শরীরে ফুঁ-দিলে সাপ-কুকুরে কামড়াতে পারে বটে কিন্তু জ্বিনের বাপের সাধ্য নাই যে, কাউকে স্পর্শ করার!
লক্ষ্য করতাম! বাজার ফেরৎ একাকী পথচারী গভীর রাত্রে কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাবার সময় কলিজার ভয় দুর করতে ভাটিয়ালী কিংবা পল্লী-গীতির টান মারতেন! নিস্তব্ধ রজনীতে গ্রামের মানুষ বিনা পয়সায় এসব পথিকের বেসুরো গলার, সুরেলা গান আনন্দ চিত্তে উপভোগ করতেন! কদাচিৎ কেউ চলমান গানের মাঝে হঠাৎ করে ছন্দপতন ঘটিয়ে চিৎকার করে বলে উঠত ‘ওরে বাবারে, ভূত’!
পথিকের ভীতিকর এসব ডাক শুনে, গাঁয়ের মানুষ তার সাহাযার্থে হারিকেন বাতি, চেরাগ নিয়ে দৌড়ে যেতেন। তবে সেসব সাহায্যকারীদের মাঝে সর্বদা আমিই অগ্রগণ্য থাকতাম! বলা বাহুল্য, অন্ধকার রাত্রে জ্বিনের সন্ধানে কবরস্থানে ঘুর ঘুর করা অবস্থায়, পথিক আবছা আবছা আমার অবয়ব দেখে, আমাকেই জিন-ভূত ভেবে চিৎকার করে উঠতেন!
টর্চ লাইট তখনও সবার জন্য সহজলভ্য ছিলনা, ফলে মানুষকে অন্ধকারেই আসা যাওয়া করতে হত। অভিজ্ঞতায় দেখেছি নিকষ কালো ঘন অন্ধকারে বের হওয়া মাত্র, নিজের হাত খানা এক বিঘত নিকটে আনলেও কেউ তা ভালভাবে দেখতে পায় না। তবে ঘন অন্ধকারে কিছুক্ষণ দাঁড়ালে আকাশের তারার আলোর মাধ্যমে রাস্তা কিছুটা পরিষ্কার দেখা যায়। এটাই ভূত দেখার উপযোগী পরিবেশ!
অমাবস্যার আকাশে মেঘ থাকলে ভূত দেখা দূরে থাক, পথ দেখাও দুষ্কর হয়। একদা এমনি এক রাত্রে, হাট থেকে ফিরার পথে; জন্মান্ধ ব্যক্তির সাথে মুখোমুখি ও নাকে নাকে তালি খেয়ে দুই জনে এক সাথে চিৎকার করে উঠেছিলাম! অন্ধ ব্যক্তি আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, আমার চোখ নাই? বললাম! চোখ তো আছে কিন্তু নিকষ কালো অন্ধকারে কিছুই তো দেখতে পাচ্ছিনা! তিনি খেদোক্তি করে বললেন, ‘এরকম অন্ধকারেই তিনি তার ৬০ খানা বছর পার করেছেন, কখনও কারো সাথে তালি খায় নাই! উপদেশ মিশ্রিত পরামর্শ দিলে বললেন, ভবিষ্যতে যেন হারিকেন নিয়েই রাস্তায় নামি! কেননা, চোখ ওয়ালাদের আলোর দরকার হয়, অন্ধের জন্য কোন আলোর দরকার নাই’! ‘অল্প শোকে কাতর আর অধিক শোকে পাথর’ কথাটি শুনেছি। চক্ষুষ্মান ব্যক্তির প্রতি অন্ধের উপদেশ শুনে আমি ‘থ’ পাথর হয়ে ‘থ’ দাড়িয়ে রইলাম!
যাক, অন্ধের দুর্নাম করা আমার লক্ষ্য নয়, আমি বলছিলাম কবরস্থানে জ্বিনের তালাশে ঘুর ঘুর করার কথা!
রাত্রিকালে পথিকের ভুতের ভয়ের কারণ কি, আমার মা-বাবা আলবৎ এসব আন্দাজ অনুমান করতে পারতেন! তাঁরা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন, কি করা যায় এই ভেবে! অবশেষে আমাকে পাহারা দেওয়া আর পড়ানোর মত দুটি কাজ একত্রে সম্পন্ন করার জন্য, ঘরে একজন লজিং মাষ্টার রেখে দিলেন! মাষ্টার মহোদয় আমাদের ঘরে রাজার হালতে থাকতেন এবং স্বভাবে আধা নাস্তিক প্রকৃতির লোক ছিলেন! জিন-ভূতের আদিম গাল-গল্পে বিশ্বাস করতেন না!
কখনও সন্ধ্যা রাত্রে পড়ার ফাঁকে টয়লেটে যাবার নাম করে স্যার থেকে সাময়িক ছুটি নিতাম। শয়ন কক্ষের সাথেই পায়খানা করার ব্যবস্থা তদানিন্তন গ্রামীণ জীবনে চালু ছিলনা! শহরের মানুষের এসব ভদ্রজনোচিত আচরণ গ্রামের মানুষেরা তখনও রপ্ত করেনি। গ্রামে বাড়ির বাহিরেই টয়লেটের ব্যবস্থা থাকত। এই সুযোগ ব্যবহার করেই রাত্রিকালে কবরস্থান পরিদর্শনের সুযোগটি হাতিয়ে নিতাম!
মাষ্টার মহোদয় একরাতে বাসায় ফেরার সময় নতুন কবরের চারিদিকে ঘুর ঘুর করা জিন স্ব-চক্ষে দেখতে পান! আল্লার প্রতি অবিশ্বাস থাকলেও নিজের চোখকে তো আর অবিশ্বাস করা যায়না? চাক্ষুষ জিন নিজের চোখে দেখতে পেয়ে তিনি ভয়ে মূর্ছা গেলেন! পর দিন থেকে, জ্বিনের উপদ্রবে আক্রান্ত বাড়ীতে তিনি আর লজিং থাকবেন না বলে চলে গেলেন!
পরিশেষে, আমার শান্ত স্বভাব, ভাবুক প্রকৃতি, জিন-ভুত আতঙ্কের মোকাবেলায়, প্রতিটি ঘটনায় সহসা আমার উপস্থিতি এবং আমাকে সাহায্যকারী দের মাঝে অগ্রগণ্য দেখে; অনেকে মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, আমার উপরই জিন ভর করেছে। তাই, অনেকেই বাবাকে পরামর্শ দিতেন, ছেলেটাকে তাড়াতাড়ি জিন মুক্ত করুন! এলাকার বদনামী ঘুচবে। বাবাকে একজন মনে করিয়ে দিলেন যে, ‘ওদের মেয়ের বিয়েটি ভেঙ্গে গেল এই কারণে যে, মানুষের বিশ্বাস করে, আমাদের বাড়িটি জিন উপদ্রুত বাড়ী। তাই তারা আত্বীয়তা করতে ইচ্ছুক নয়। যদি সময় থাকতে সচেতন না হন! তাহলে, জ্বিনেরা আপনার ছেলেটাকেই নিয়ে যাবে, তাই চিকিৎসায় দেরী করলে সব হারাবেন!
বাবাকে সবাই ‘হাঁট’ বসানোর পরামর্শ দিলেন! আমি মা-বাবাকে বুঝালাম অনেক টাকা খরচ করে হাঁট বসানোর দরকার নাই।
আমি ব্যাপার গুলো বুঝাতে চেষ্টা করলাম। তাদের বললাম, জিন-ভূত সম্পর্কিত ব্যাপার আমি বই পড়েছি, কিছু ঘটনা মানুষের মুখে শুনেছি, তাছাড়া এলাকায় প্রচুর বৈদ্যদের কৌতূহলী জীবন যাপন দেখে, নিতান্ত আগ্রহের কারণেই জ্বিনের সন্ধান করতে কবরস্থানে যেতাম। আমার উপর কোন জ্বিনের বদ নজর নাই, কিংবা আমি জ্বিনের আছর গ্রস্ত কোন বালকও নই!
বাবা আমার কথা সন্তোষজনক ভাবে শুনলেন এবং বললেন এসব কাজ খুবই বিপদজনক তাই আগ্রহ পরিত্যাগ করাই উত্তম। তিনি আরেকটি নতুন কথা যোগ করে বললেন যে, আমার বাবা নিজেই এই ধরনের আগ্রহ নিয়ে কাজ করতে যেয়ে, একদা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলেন! এসব নিয়ে আগ্রহ থাকলেও, যেন অধিক বয়সে থিসিস করার চেষ্টা করি, কক্ষনো যেন অল্প বয়সে না করি।
বাবা আমার কথায় আশ্বস্ত হলেও মা বললেন ভিন্ন কথা! তাঁর সাফ কথা, আমি গুছিয়ে পেঁচিয়ে যে কথাগুলো বাবাকে গিলিয়েছি, ওগুলো সব জিনদের শেখানো কথা! তিনি আরো যোগ করে বললেন, আমি একাকী কারো সাথে জটিল ভাষায় কথা বলি, কখনও উত্তেজিত হয়ে বকাবকি করি। এগুলো সব জিনদেরই প্ররোচনা!
মাকে বুঝাতে ব্যর্থ হলাম যে, কবি নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা মুখস্থ করে, তা কবির ছোট ছেলে সব্যসাচীর মত উচ্চারণ ও অঙ্গভঙ্গি অনুশীলন করেছিলাম। এটা না জিনদের সাথে কথা বলা! না বকাবকি! এটা কবি নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার কঠিন শব্দগুলোর আবৃতি ও উচ্চারণ মাত্র! মা কিছুটা ক্ষান্ত হলেও আমার কথায় পুরোপুরি বিশ্বাস রাখলেন না! তাই তিনি আমার কথার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য গ্রামে অবস্থান করা পারাতো শিক্ষিত ভাই, আবুল বশর বি,এ,বি,এফ! (ব্যাচেলর অব আর্টস বাট ফেল) এর শরণাপন্ন হলেন!
বশর সাহেব আমার মুখে অনর্গল ও বাধামুক্ত ভাবে কবি নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা শুনে চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘এই কবিতা অক্ষরে অক্ষরে শিখা ও হুবহু না দেখে বলতে পারাটা এম, এ পাশ করা ব্যক্তির পক্ষেও সম্ভব নয়! সেই ধরনের একটি জটিল কবিতা কারো সহযোগিতা ছাড়া, আমি অবলীলায় অনর্গল বলে গেলাম! এটা জ্বিনের সাহায্যের কারণেই হয়েছে, ফলে আমাকে যে জ্বিনে ধরেছে সে কথা প্রায় সত্যের কাছাকাছি হয়ে গেল! তাছাড়া আমার উপর ভর করা জিন, কোন যেমন তেমন সাধারণ জিন নয়! পুরো দস্তুর শিক্ষিত জ্বিনের পাল্লায় পড়েছি বলেই সাব্যস্ত হল…………..!
মানুষের সমালোচনার মুখ বন্ধ করতে একটি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার কথা বাবা ভাবতে রইলেন। লোক দেখানো চিকিৎসা করতে গেলেও সমান খরচ। বাবা আমার অন্তহীন মতি গতি বুঝতে পারতেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা-ধন্ধে ভুগতেন যে, সমস্যাটি আমার স্বভাব গত নাকি জ্বিনের উপদ্রবের কারণে হয়। ধারনা করতেন যে, সেটি নিতান্ত কৌতূহলের কারণেই হবে, একদিন এমনিতেই এসব চুকে যাবে। তিনি মাকে বুঝাতে গেলে মুসিবতে পড়ে যান, মা উল্টো দোষ দিয়ে বলেন, তুমি এসবকে হাল্কা ভাবে নিয়ে ছেলের জীবনটাকে ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছ! যার সন্তান নাই সেই বুঝে সন্তান না থাকার ব্যথা!
সিদ্ধান্ত আগেই চূড়ান্ত হয়েছিল যে, এই জিন তাড়াতেই হবে। অবশেষে খারাপ জিন থেকে আমাকে মুক্ত করতে মালেক মৌলভীকে আবারো তলব করা হল। তিনি যথারীতি কিতাবাদি নিয়ে আমাদের বাড়ীতে হাজির। বিষয়বস্তু সব শুনে তিনি হাজিরাতে নিমগ্ন হলেন। দীর্ঘক্ষণ ধ্যানের পরে তিনি ঘোষণা করলেন এটা একটা খারাপ জ্বিনের কাণ্ড। সেটা যেমনি শক্তিশালী, তেমনি ধুরন্ধর। এই এলাকায় যত জিন আছে, সে তাদের সকলের সর্দার। এই সেই জিন যে, দীর্ঘদিন আমাকে পুকুরের ঘাটে, জমিনের আলে, মাঠের ধারে সমস্যা করত; এখন সে তার আসল রূপে প্রকাশ করেছে!
মা প্রশ্ন করলেন, আমার ছেলেকে পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা থেকে সেই জিন কবে, কিভাবে বিরত হবে? আর কেনই বা সে তাঁর ছেলের পিছু নিয়েছে? মৌলভী নিশ্চিত করে বললেন, এই বারে সে এর একটা বিহিত করেই ছাড়বে, তবে সেজন্য অনেক টাকার দরকার হবে। মা বললেন, পুরো জীবনে টাকা আপনাকে কম দিলাম কবে? কত লাগবে একবারেই বলেন, আমি চাই আমার ছেলে মুক্ত জীবনের বাতাস নিচ্ছে।
মৌলভীকে পুনরায় হাজিরাতে বসতে হবে, সেজন্য নতুন করে ওজুর দরকার, ফলে পুকুরের ঘাটে গেলেন। কিছুক্ষণ পরেই তিনি ‘ওরে বাবারে’ বলে চিল্লিয়ে উঠলেন। সবাই দৌড়ে গেলাম, মৌলভী পুকুরের ঘাটে পা রাখা মাত্র অমনি ধপাস করে আছড়ে পানিতে পড়ে গেছেন! সেকি যেমন তেমন আছাড়! একেবারে পুকুরেই নিমজ্জিত হয়ে গেলেন! হাতের একটি আঙ্গুল ভেঙ্গে ফেলেছেন!
তাঁর এই ধরনের বিদঘুটে পতনে মা বেজায় বিরক্ত হলেন। মা বললেন, ‘এই পুকুরের এক ঘাটে পিছলা খাবার কারণে আপনি আমার ছেলেকে বহুবার তাবিজ দিয়েছেন! আর আপনি আজ সেই পুকুরের ঘাটে জ্বিনের ধাক্কায় রীতিমত আছাড় খেয়ে পানিতে চুবে গেছেন! বুঝা যাচ্ছে সেই বজ্জাত জিন থেকে আপনিও মুক্ত নন, তাহলে আপনি কিভাবে আমার ছেলেকে রক্ষা করবেন’?
বেচারা মৌলভী আছাড় খাওয়ার উছিলায় আমার মায়ের অতিরিক্ত সহানুভূতির মাধ্যমে টাকার অংকটা ভালই আশা করেছিলেন! সহানুভূতির স্থলে তিনি উল্টো অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত হলেন অধিকন্তু বদ জিন দৌড়ানোর তাঁর পুরো এসাইন্টমেন্টটাই বাতিল হয়ে গেল! আছাড় খেয়ে ভাঙ্গা আঙ্গুল ঠিক করানোর জন্য মায়ের নিকট থেকে প্রয়োজনীয় টাকা নিয়ে তিনি সেই যে গেলেন, বাকী জীবনে আর কোনদিন আমাদের বাড়ী মুখো হননি! অবশ্য তাঁর আর আসার দরকারও হয়নি কেননা ততদিনে তাঁর স্থলে নতুন আরেকজনের উত্থান ঘটে যায়। চলবে……….


Discussion about this post