জিন তাড়াতে এবার গুহায় গমনের সিদ্ধান্ত পাকাপোক্ত হল। কেননা ভোটা মামা ও শাহ সাহেবের দরগাহে মা কয়েকবার মানত করে ব্যর্থ হয়েছেন। ভোটা মামা পাগল ছিলেন, অর্ধ উলঙ্গ থাকতেন, খাদ্যের অভাবে বিভিন্ন ব্যক্তির গাছের পাকা ফলে হাত দিতেন।
ফলে তিনি বহুবার নির্যাতিত হয়েছেন। লোকমুখে শোনা যায় যারা তাঁকে নির্যাতন করেছে, তারা সবাই পরবর্তী কালে নির্যাতনের পায়চিত্ত হিসেবে মৃত্যু পর্যন্ত নানাবিধ কষ্ট পেয়েছেন। ভোটা মামা জীবদ্দশায় অন্ন বস্ত্রের অভাবে কষ্ট পেলেও, মৃত্যুর পরে সেখানকার কিছু মানুষের অন্ন বস্ত্রের অভাব মিঠে যায়।
তাঁর মাজার পাকা হল, কবরে গিলাফ লাগানো হল, প্রতি বছর মহা ধুমধামে ওরস উদযাপিত হতে লাগল! মানুষ নিজের মনস্কামনা পূরণের লক্ষ্যে পুরো বছর অবিরত মানতের উপহার সামগ্রী নিয়ে আসে, এতে অনেকের কপাল খুলে যায়!
পাশের গ্রামের পীর, শাহ সাহেব মারা গেলে পর, তাঁকেও ভোটা মামার পাশে কবরস্থ করা হয়। এতে তাঁর জীবিত সন্তানেরা বেকার হয়ে পড়ে এবং দুনিয়াবি ফায়দা তুলতে ব্যর্থ হন।
তাঁরা বলা শুরু করলেন যে, কবরের ভিতরে শাহ সাহেব ও ভোটা মামা সর্বদা বিতর্ক করতে থাকেন, এতে বাকী কবরবাসীদের সেখানে অবস্থান করা দুষ্কর হচ্ছে।
তাই শাহ সাহেব তাঁর সন্তানদের স্বপ্নের মাধ্যমে বলেছেন, তাঁর লাশ যেন সেখান থেকে তুলে বাড়ীর সন্নিকটস্থ, রাস্তার পাশে, পুকুর পাড়ে দাফন করা হয়! দুই মৃত পীরের কবরের অভ্যন্তরের বিতর্ক দূর করতে, শাহ সাহেবের সন্তানেরা এগিয়ে আসেন।
লাশ দাফনের ৪০ তম দিনে মতান্তরে একবছর পরে, মহা আয়োজনের মাধ্যমে শাহ সাহেবের লাশ উত্তোলন পূর্বক একটি জনবহুল স্থানের পাশে পুনরায় জানাজা নামাজের মাধ্যমে দাফন হয়! এতে এলাকায় দুটি বাবার মাজার সৃষ্টির ফলে, মানুষের মানত পূরণের সুবিধা আরো বৃদ্ধি পেল!
এলাকার হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবাই নিজেদের মানত পূরণ ও কলানার্থে দলে দলে দুটি দরগাহে বিভিন্ন বস্তু, খাদ্য সামগ্রী নজরানা হিসেবে পেশ করতে লাগল। লোকমুখে জানা গেল এই দুই বাবার দরগাহে মানত দেবার পরে কেউ খালি হাতে ফিরে গেছে, এমন নজীর কোথাও নাই!
দুর্ভাগ্য আমার স্নেহময়ী মায়ের! তাঁকে এই প্রসিদ্ধ দুটি দরবার থেকেও খালি হাতে ফেরৎ যেতে হয়েছে! তিনি আক্ষেপ করলেন, ‘আল্লাহ আমাকে তোমার মত হতচ্ছাড়া ছেলের মা বানিয়েছেন, যার প্রতি মৃত দরবেশের পর্যন্ত সামান্য অনুকম্পা হয়না’! গোস্বা করে বললেন, ‘বুঝেছি তোমার জীবন জিনের অনুকম্পাতেই শেষ হবে’।
যাক, কম অর্থকড়ি ব্যয়ে ছেলেকে জ্বিনের খপ্পর থেকে বাঁচানোর জন্য আরেকটি রাস্তা বাকি থাকল! সেটা হল সুন্দর শাহের সিলায় মানত, সেটাও করতে তিনি বদ্ধপরিকর হলেন।
সবার পরামর্শে মা আমাকে সুন্দর সাহেবের সিলায় নিয়ে হাজির হলেন! এটা সেই জায়গা, যেখানে গেলে জিন তো দুরের কথা সাথে থাকা ভূত-প্রেত পর্যন্ত পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়! তবে তা হতে হবে সেখানকার কিছু নিয়ম-নিতীর অনুসরণের মাধ্যমে।
সুন্দর সাহেবের সিলার কিছু উল্লেখযোগ্য নিয়ম হল, নিজেদের জবাই করা প্রাণী নিজেরা খাবে এবং অন্যদেরকেও খাওয়াতে হবে। কোন দুষ্টমি করা যাবেনা, চুরি করা যাবেনা, বেশী বেশী প্রশ্ন করা যাবেনা, তাহলেই মানতও পূরণ হবে। আরো কিছু নিয়ম আছে যা, যথাস্থানে উল্লেখ করা হবে।
একদা মা, খালা, চাচী, জেঠিদের নিয়ে, পাহাড়ী পথ পাড়ী দিয়ে, একটি ছোট-খাট তীর্থ যাত্রী দল নিয়ে আমার মা, আমাকে নিয়ে, সুন্দর শাহের সিলায় হাজির হলেন! হালদা নদীর বাঁকের এক তীরে ইস্পাহানী গ্রুপ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘নেপচুন চা বাগান’ অন্য তীরে সুন্দর শাহের সিলার অবস্থান।
সিলার সামনে দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম যাবার অতীব সুন্দর কাঁচা রাস্তা রয়েছে। দারুণ মনোমুগ্ধকর স্বাস্থ্যকর স্থান! গরম কালে উষ্ণতা থাকেনা, শীত কালেও আবহাওয়া সুখকর।
পিকনিকের জন্য অতীব উৎকৃষ্ট স্থান হতে পারে। হালদা নদীর উজান-ভাটিতে প্রায় ৬০ কিলোমিটারের মত রাস্তা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রয়েছে আমার, তবে হালদার অববাহিকায় এত সুন্দর স্থান দ্বিতীয়টি দেখিনি!
সুন্দর শাহ! নাম শুনেই বুঝা যায় তিনি সুন্দর আকৃতির মানুষ ছিলেন এবং স্থান নির্বাচনেও সুন্দর রুচি-বোধের পরিচয় দিয়েছেন। তবে তাঁর পবিত্র নামের শেষে একটি শব্দ ‘সিলা’ রয়েছে শব্দটির অর্থ বুঝলাম না!
আমার স্বভাবগত মনের লুকানো কৌতূহল বোধ থেকেই মুরুব্বীদের প্রশ্ন করলাম, সব কিছুতো বুঝলাম কিন্তু ‘সিলা’ কি জিনিষ? সেটাতো বুঝলাম না এমন প্রশ্নে শুরুতেই জ্যাঠাই মায়ের ধমক খেলাম!
তিনি সোজা বলে দিলেন এখানে আজে বাজে প্রশ্ন করা চলবে না! চোখ আছে দেখবে আর কান আছে শুনবে, মুরুব্বীরা যা বলে সেটা হুবহু মেনে চলবে। কোথায় কিভাবে চলতে হবে, কি বলতে হবে সবকিছু তোমাকে যথাসময়ে বলা হবে।
তিনি আরো হুশিয়ার করে বললেন যে, ‘আমার অতিরিক্ত কৌতূহলের কারণেই আজকে আমাদের পরিবারটির যায় যায় দশা’।
জেঠাইমা আমার অতি প্রিয় ব্যক্তিদের একজন, তিনি সর্বদা আমাকে আদর করতেন, তবে আজ তাঁর এমন কঠোর রুদ্র-মূর্তি দেখলাম যা আগে কোনদিন দেখিনি! তাই ভয়ে বোবার মত অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
সিলার অন্যতম নিয়ম-রীতির মাঝে আছে; এখানে কোন অনিয়ম কিংবা রীতি প্রথায় ভুল করা যাবেনা। ভুল হলে, প্রথম বার যত হাঁস-মুরগী জবাই হয়েছে দ্বিতীয় বার তার দ্বিগুণ দিতে হবে, তবে তৃতীয়বার ত্রিগুণ না হয়ে হাঁস-মুরগীর যায়গায় ছাগলের শর্ত যোগ হয়েছে এবং চতুর্থ বারে গরু দিয়ে ভুলে খেসারত দিতে হবে!
এভাবে মানত পুরো না হওয়া পর্যন্ত রীতির ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। এ ব্যাপারে কিছু বোধগম্য না হলে, খাদেম সাহেব থেকে বিস্তারিত জেনে নিতে বলা হয়েছে।
আমাকে পুনরায় মনে করিয়ে দেয়া হল; মানত পূরণ করতে গিয়ে যদি রীতি-নীতির বিরুদ্ধে কিছু করে বসি, তাহলে মানত তো পুরা হবেই না অগত্যা মানতের জরিমানা গুনতে হবে। উপরোক্ত নিয়ম-রীতি মুরুব্বীরা আগে থেকেই জানলেও তখনও আমার পক্ষে জানা সম্ভব হয়নি কিংবা জানানো হয়নি!
তবে, একটি খোলা যায়গায় পরিত্যক্ত লেবু গাছ থেকে লেবু তুলতে গিয়ে মুরুব্বীদের কঠোর শাসনের মুখোমুখি হলাম! তাঁরা আমাকে শেষবারের মত সাবধান করে দিলেন, এসব কাজ করা চলবেনা।
সিলার অল্পভাষী খাদেম মুচকি হেঁসে জানালেন, আমার অপরাধ এখনও মানত ভঙ্গের পর্যায়ে যায়নি! তবে মুরুব্বীদের সাবধানতার অভাব থাকলে, এই ছেলের হাতে মানত ভাঙ্গতেও বা কতক্ষণ!
খাদেমের হাতে হাঁস-মুরগী জবাই হল, জঙ্গল থেকে লাকড়ি সংগ্রহ পূর্বক রান্না হল। খাদেম ফাতেহা দিলেন, তাঁকে বখশিশ প্রদান পূর্বক, আমাদের রান্না করা খাবার আমাদেরকে খাবার অনুমতি দিলেন!
খাদ্য পর্ব শেষ হবার পরেই সিলার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হল! তখনই বুঝতে পারলাম এখনও আসল জায়গায় যাওয়া হয়নি। হালদা নদীর ধার ঘেঁষে খাড়া পাহাড়ের দেওয়াল, সেটার একস্থানে প্রায় ৩০ ফুট উপরে একটি গুহা!
সেখানে উঠার জন্য মাটি কেটে অমসৃণ ও হালকা পিচ্ছিল সিঁড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই গুহাটিই মূলত সুন্দর শাহের সিলা!
একদা এই গুহার ভিতর দিয়েই, পাহাড়ের পেট ছিঁড়ে, সুন্দর শাহ ১০ মাইল দূরের আরেকটি গুহামুখ দিয়ে বের হয়ে পালিয়ে ছিলেন!
প্রশ্ন করলাম, সুন্দর শাহ কেন পালিয়েছিলেন? কারাই বা তাঁকে দৌঁড়াল? কথা শেষ হবার আগেই মায়ের কান মলা সহ চপেটাঘাত খেলাম!
পুনরায় মনে করিয়ে দেয়া হল কোন কৌতূহল নয়, কোন প্রশ্ন নয়, নতুবা পুরো যাত্রাই বরবাদ হবে।
পিচ্ছিল অমশৃণ সিঁড়ি বেয়ে সোজা উপরে উঠে গুহায় ঢুকতে হবে; বের হবার সময় পিছনে না তাকিয়ে উল্টো পায়ে হেঁটে ধাপে ধাপে নীচে নামতে হবে! ভয় পাওয়া যাবেনা, চিৎকার করা যাবেনা।
গুহার উচ্চতা খুবই কম তাই মাথায় আঘাত খাওয়া যাবেনা, সন্তর্পণে এক জোড়া মোমবাতি ও এক জোড়া আগর বাতি জ্বালিয়ে, গুহা মুখের একটু মাটি জিহ্বায় লাগিয়ে, পিছনের দিকে না তাকিয়ে উল্টো নামতে পারলেই কর্ম সাবাড়! তাই যত বিপদ আসুক, কোন অবস্থাতেই গুহা মুখকে পিছন দেওয়া যাবেনা।
গুহামুখে যাতে করে সুচারুরূপে উঠতে পারি এবং সফলতার সহিত ফিরে আসতে পারি সে ব্যাপারে ঘটনাস্থলে বাস্তব প্রশিক্ষণ দেবার জন্য আমাদের এই তীর্থ যাত্রায় সাথে ছিলেন সুদক্ষ দুলাভাই মহোদয়।
কিভাবে সিলার আদব রক্ষা করে, সিড়ির প্রতিটি ধাপ বেয়ে উপরে উঠতে হবে, সেটার প্রশিক্ষণ শুরু করলেন। তিনি অতি সন্তর্পণে চার ধাপ উঠলেন! পঞ্চম ধাপে গিয়ে থামলেন! ষষ্ঠ ধাপে যখন কদম রাখতে যাবেন, তখনই তিনি টাল হারিয়ে ফেললেন!
কোমর কাঁপিয়ে যথাসম্ভব নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইলেন! কিন্তু পারলেন না! টাল-মাটাল পরিস্থিতিতে ভদ্র-মহোদয় এমন ভাবে পলট খেলেন, সোজা গিয়ে হালদা নদীর পানিতে!
স্বামীর এই ধরনের অধঃপতনে বুবু ঘটনাস্থলেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন! তিনি বলতে থাকলেন, তুমি এত বড় মানুষ! চাচী মায়ের জিন তাড়ানোর পুরো ব্যবস্থাটিকে শুরুতেই শেষ করে দিলে!
কি কাণ্ড-জ্ঞান হীন মানুষ তুমি! তরতর করে সুপারি গাছ বাইতে পার আর এখানে ছয়টি সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পারলে না! এতগুলো শাশুড়ির সামনে মাত্র পাঁচ হাত উপর থেকে হাস্যকর পতনে দুলাভাইয়ের মুখ থেকে একটি কথাও বের হল না।
বেচারা বেজায় শরমিন্দা হয়ে ঘোষণা দিলেন, বাকী জীবনে আর কাউকে তিনি কিছু শেখাতে যাবেন না।
বুবু বললেন, ‘তাই ভাল, অযোগ্য হিসেবে প্রমাণিত হবার চেয়ে, যোগ্যতার বাহাদুরি না দেখানোই উত্তম’। নাহ্! দুলা ভাইয়ের এই পতনে তেমন কোন সমস্যা হয় নাই, কেননা তিনি তো আর মানত করেন নি!
মানত করেছেন আমার মা আর পরীক্ষা দিতে হবে আমাকে! যাক, ঠিক ঠাক মত সবাই উপরে উঠে গেলাম। বহু কষ্টে মুখে ক্লিপ মেরেছি, গুহা সম্পর্কিত অনেক গুলো প্রশ্ন জমে ইতিমধ্যেই পেট টই-টম্বুর হয়ে আছে, শুধু পটাশ করে ফাটার বাকি!
পুরো গুহা অন্ধকার, দিয়াশলাই জ্বালানো শুরু হয়েছে, যে যার মত করে মোমবাতি-আগরবাতিতে আগুন লাগাচ্ছে। আর সেই মুহূর্তে দেখলাম মাথার উপরে কি যেন ধুপধাপ করছে। এ
কজন বলল ‘ওগুলো বাদুর, হয়ত ভয় পেয়েছে’। আমি উপরে তাকাতেই দেখি কয়েকটা বাদুর গুহার ছাদে উল্টো ভাবে লটকে আছে। নিজের অজান্তে মুহূর্তেই মুখের ক্লিপ ভেঙ্গে গেল। বাদুর! বাদুর! বলে চিৎকার করে উঠলাম।
আমার চিৎকারে ভীত-সন্ত্রস্ত বাদুরেরা হল্লা করে চিল্লানো শুরু করল; আতঙ্কিত বাদুরের কয়েকটি উড়ন্ত অবস্থায় সবার গায়ে তরল কিছু ঢেলে দিয়ে পালিয়ে গেল!
উষ্ণ, আঠালো, ঝাঁঝালো তরলের স্পর্শে সবাই নিজেদের অপবিত্র মনে করল। কেউ নাক ধরল, কেউ মুখে হাত দিল। এক চরম হট্টগোল বেধে গেল!
যথানিয়মে কারো কার্য সম্পাদন সম্ভব হল না, ফলে পুরো মিশনটিই বরবাদ হয়ে গেল। মা, চাচী, জেঠি সবাই আমাকে বকাবকি করতে থাকল। তিনি আফসোস করলেন! এক অকর্মা দল নিয়ে এখানে আসাটাই ভুল হয়েছে।
আমাকে লক্ষ্য করে মুরুব্বীদের বকাবকির পরিবেশ বেশ ভারী হয়ে উঠল, এক পর্যায়ে তা উপদেশের পরিবেশে রূপান্তরিত হল। আমার চেয়ে কম বয়সী, আমাদের ঘরের বেয়াড়া চাকরানী টি পর্যন্ত আমাকে উপদেশ খয়রাতের সুযোগ হাতছাড়া করল না।
মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে উঠল, ভুল তো একটা করেছি, তাই বহু কষ্টে নিজের ঠোট দাঁত দিয়ে কামড়িয়ে পরিবেশ ঠিক রাখলাম! নিজে নিজে চিন্তা করলাম, ‘পৃথিবীতে মনে হয় শুধুমাত্র একা আমিই দোষ করি, অন্যরা যেন কোন দোষ-ত্রুটি করতেই জানে না’!
যেহেতু মানত ভঙ্গ হয়ে গিয়েছে সেহেতু সামনের বারে দ্বিগুণ জরিমানা নিয়ে আবারো সিলায় আসতে হবে, তাই এভাবেই সুন্দর শাহের সিলা দর্শনের প্রথম দফা শেষ হল।
পরের বারে সিলায় মানত পালন যথাযথ হয়েছিল। কেননা ইতি পূর্বেকার ভুলে আমার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। কয়েকদিন ধরে সবাই আমাকে অনুশীলনে সহযোগিতা করেছেন।
তারপরও একটি ছোট্ট ভুল আমি করেছিলাম, যার কারণে মায়ের সন্দেহ ছিল এই ছোট্ট ভুলের অজুহাতে জিন আমার পিছু ছাড়বে না।
যথারীতি শিন্নী বণ্টন, হাস-মুরগী জবাই, ফাতেহা ও খাওয়া পর্ব শেষে সিলার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। সিলার গুহাতে যখন ঢুকতে যাই, তখন গুহায় ঘুটঘুটে অন্ধকার।
বাতি জ্বালানোর পরে আধার কিছুটা কাটলেও অন্ধকার কাটেনি। মোম আর আগর বাতির গন্ধে পুরো গুহায় এক প্রকার আবেগী পরিবেশ বিরাজ করছিল। আমার মনে তখনও হালকা ভীতি-যুক্ত কৌতূহল কাজ করছিল।
আমার মূল লক্ষ্য ছিল, যতটুকু পারা যায় গুহার শেষ পর্যন্ত দেখা! যে সুরঙ্গ দিয়ে সুন্দর শাহ পালিয়ে যেতে পারল, সে সুরঙ্গ দিয়ে আমার পক্ষেও অনায়াসে যাওয়া সম্ভব হবে!
যত ভিতরে যাই ততই দম করে আসার উপক্রম হল। আলো-বাতাস নাই, শ্বাস নেওয়া কষ্টকর, ভ্যাপসা গরম, ঘামে একাকার, বিদঘুটে ধরনের দুর্গন্ধ! হয়ত বাদুরের উচ্ছিষ্টের গন্ধ হবে!
হামাগুড়ি দিয়ে আরেকটু এগিয়ে গেলাম, বাম হাতের চাপে কিছু একটা চ্যাপ্টা হয়ে যেন গলে গেল! দুর্গন্ধটা বাড়তে থাকল! অনুভব করালাম হাত বেয়ে কিছু যেন উপরের দিকে উঠে আসছে। লেদা পোকার মত কিছু পেঁচিয়ে উঠার অনুভূতি!
ভাবলাম মরা ইঁদুর কিংবা মরা বাদুরের পচা লাশ হবে হয়ত! আগেও অন্যত্র প্রায় একই ধরনের আরেকটি ঘটনার অভিজ্ঞতা ছিল।
ঘেন্নায় পুরো শরীর রি রি করে উঠল, মুহূর্তেই হ্যাঁচকা টান মেরে হাত ঝেড়ে নিলাম। ডান হাত দিয়ে পকেটে লুকানো ক্ষুদ্র টর্চ লাইট বের করে বাটনে চাপ মারলাম।
ঠিকই তো! মরা ইঁদুর! হাতের এক চাপে পুরো লাশটি একবারে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে! চারিদিকে পোকা কিলবিল করছে!
মনে হলো নাড়ি ভুঁড়ি সব এখুনি বের হয়ে আসবে। মুহূর্তেই পিছনে আসলাম, বহু কষ্টে জিহ্বা আয়ত্তে রাখলাম। চিৎকার দিলাম না, জানি আমার একটি মাত্র চিৎকারে আবার নতুন করে ইতিহাস রচিত হবে।
কষ্ট হলেও টর্চ লাইটের আলো সামনে নিক্ষেপ করলাম, পুরো গুহার শেষ পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। মনের অজান্তে বললাম, ঐ ক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়ে সুন্দর শাহ কিভাবে পালিয়ে গেলেন! যেখান দিয়ে একটি ইঁদুর পালানো সম্ভব না!
গতবারে বাদুরের মল-মূত্রে সবার পুরো শরীর আঠালো ও পুতি-গন্ধময় হয়েছিল, আজও বাদুরের চিৎকার শোনা যাচ্ছে। তাই সবাই যার যার মত করে আনুষ্ঠানিক সওয়াবের কাজ সেরে বের হয়ে গেলেন।
আমিই সবার পিছনের রয়ে গেলাম, আমার পিছনেই মা। শেষ ব্যক্তি হিসেবে আমি আস্তে আস্তে গুহা থেকে বের হয়ে গেলাম। সবার চেহারা দেখে বুঝা গেল আমার উঠা নামা সহ সকল কিছু যথাযথ হয়েছে।
আমি ভয় পাইনি, চিৎকার করিনি বলে প্রশংসা শুনলাম। অধিকন্তু গুহার অভ্যন্তরে আমার সামনে হালকা উজ্জ্বল কুদরতি আলো দেখতে পেয়েছিলেন বলে, অনেকে বলাবলি করতে থাকল।
আপনজনের মুখে এত প্রশংসা আগে কোনদিন শুনিনি, তাই ভাবতে রইলাম আমিতো প্রসংশার যোগ্য। আরো প্রশংসা শুনে আমি খুশিতে গদগদ ও ফুলে-ফেঁপে আছি।
তখনই হঠাৎ মুখ ফসকে বলে বসি, ‘এই গুহা কি আগে থেকেই ছিল? যার ছিদ্র দিয়ে সুন্দর শাহ পালিয়েছে! নাকি সুন্দর শাহ নিজেই নিজের হাতে গুহা বানিয়ে, সেটার ছিদ্র দিয়ে প্রাণ ভয়ে পালিয়েছেন’?
মুহূর্তেই পুরো পরিবেশ আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহাত্মক হয়ে গেল! মায়ের কান মলা, অন্যদের হা-হুতাশের মাধ্যমে পরিবেশটাই বিদঘুটে হয়ে গেল।
একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে, সুন্দর শাহের সিলার মুখে দাঁড়িয়ে, তাচ্ছিল্য বাক্য, সুন্দর শাহ সম্পর্কে এভাবে অসুন্দর, আপত্তিকর মন্তব্যে সবাই বিরক্ত হয়ে গেল। সবাই বলাবলি করতে লাগল এই ছেলেকে জিন মুক্ত করতে আরো শক্ত চিকিৎসা দরকার।
মায়ের মুখ যেন, আসমানের কালো মেঘে ছেয়ে গেল, পরিতাপ বেড়ে গেল, তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছেন, বাবাকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে ‘হাঁট’ বসিয়েই অপঃ জিনকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে হবে। চলবে…………


Discussion about this post