১৯৬৩ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরে নির্মিত হয় ৪৩ তলা বিশিষ্ট ‘ডিউইট-চেস্টনাট অ্যাপার্টমেন্ট’ ভবন। ভবনটি গোলাকার ভাবে নির্মিত হয়। পৃথিবীতে এর আগে কেউ গোলাকার ভবন বানাতে পারেনি। কারো স্বপ্নেও ছিলনা। তাই, এ ভবন তৈরি হবার পর সারা দুনিয়ায় হই-চই পরে যায়। দুনিয়া কাঁপানো, যুগান্তর সৃষ্টিকারী তথ্য দিয়ে যিনি এ ভবন তৈরি করেন, তিনি ছিলেন বাংলাদেশেরই এক অমর কৃতি সন্তান ড. এফ, আর, খান। এই ভবন তৈরির শুরুর দিকে ড. ফজলুর রহমান খান বিভিন্ন মহল থেকে, প্রশ্নের মুখোমুখি হতে থাকেন। বিশ্ব নন্দিত বহু প্রকৌশল সংস্থা সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, যুগান্তকারী এই চিন্তাধারা ও নির্মাণ পদ্ধতি আদৌ কার্যকর ও টেকসই হবে কিনা সে সন্দেহ রয়েছেই। দুনিয়ার মিডিয়া গুলো তাঁকে ঘিরে প্রশ্ন করতে থাকেন এই বলে যে, আপনি কোন গবেষণাগারে পরীক্ষা করেননি, তাছাড়া ইতিপূর্বে এ জাতীয় ভবন কোথাও তৈরি হয়নি, যেটা দিয়ে সত্যাসত্য নিরূপণ করা যায়। আপনি কিভাবে নিশ্চিত হলেন যে, এই ভবন ভেঙ্গে পড়বে না, কাৎ হয়ে হেলে যাবেনা এবং ভূমিকম্পে চুরমার হবেনা? নিশ্চয়ই আপনি শুধুমাত্র কল্পনা শক্তি দিয়েই, গোলাকার ভবন তৈরির জন্য ত্রুটিযুক্ত প্রকৌশলে হাত দিয়েছেন?
ড. এফ, আর, খান বললেন, ‘আমি পরীক্ষাগারে পরীক্ষা না করলেও কাজটি হাজার হাজার বছর ধরে সফলভাবে পরীক্ষিত হতে দেখেছি! তিনি বললেন, মূলত উচ্চ ভবন বানানোর বিদ্যা-বুদ্ধি আমি “বাঁশ” এর গঠন কাঠামো থেকে শিখেছি! তিনি আরো বললেন, আমাদের বাড়ীর পাশে বাঁশ বাগান ছিল। ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের প্রচণ্ড ধাক্কায় বাঁশ মাটি বরাবর নুয়ে পড়ত, বাতাস চলে গেলে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেত, কখনও ভেঙ্গে পড়ত না। তা দেখে আমি চিন্তা করতাম, কেন এমনটি হয়? কেন সেটা ভেঙ্গে পড়েনা? কোন ভিত্তি তাকে এমন শক্তভাবে দাঁড়াতে সাহায্য করে? অতঃপর আমি একটি বাঁশ কেটেছি, তার অভ্যন্তরে দেখেছি, প্রতিটি গিরা পর্যবেক্ষণ করেছি, তাতে সর্বোচ্চ কয়টি গিরা গুনেছি, সর্বোপরি বাঁশের নিম্নাংশের গঠন-প্রকৃতি দেখেছি। অবশেষে এ সিদ্ধান্তে এসেছি যে, চারিদিকে শক্ত গাঁথুনি, ভিতরে ফাঁপা, ঘন ফ্লোর, মজবুত গোড়া বানিয়ে, বাঁশের মত উঁচু দালান বানালে সেটাও ধ্বংস হবেনা। বাঁশের এই দক্ষ কারিগরি গাঁথুনি দেখে আমি সর্বোচ্চ দালান বানানোর প্রেরণা পেয়েছি। এই ঘটনা থেকে মানব জাতির জন্য বাঁশের অবদান নতুন মাত্রা যোগ করল, বর্তমান যুগের সকল গোলাকার ভবন হল বাঁশের অমর কীর্তির বাস্তব প্রতিফলন’।
শুধু তাই নয়, গোলাকার ভবন আয়তকার ভবনের চেয়ে, সাশ্রয়ী, মজবুত, দীর্ঘস্থায়ী, প্রবল বাতাসের বিপক্ষে শক্তিশালী, ভূকম্পনে দৃঢ়; এ ধরনের বহু তথ্য উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর বিষয়টিকে সমৃদ্ধ করে দিয়েছেন। যার কারণে তাঁকে ‘কাঠামো প্রকৌশলের আইনস্টাইন’ বলে উপাধি দেওয়া হয়েছিল।
ড. এফ, আর খান এর পরে নির্মাণ করেন যুক্তরাষ্ট্রের হাউসটন শহরে ৫২ তলাবিশিষ্ট ‘শেল প্লাজা ভবন’। এটি ছিল কনক্রিট নির্মিত বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন। শিকাগো শহরে ১০০ তলাবিশিষ্ট জন ‘হ্যানকক অট্টালিকা’ তৈরি করেও তিনি বিশ্বজোড়া খ্যাতি লাভ করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি আমেরিকার শিকাগো শহরে ১১০ তলাবিশিষ্ট ১৪৫৪ ফুট উঁচু ‘সিয়ার্স টাওয়ার’ নির্মাণ করে বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। ১৯৭৩ থেকে ৯০ দশক পর্যন্ত এটিই বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন ছিল। টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পরে বর্তমানে এটিই যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অট্টালিকা। এসব অতি উচ্চ ও মনোরম অট্টালিকা তৈরি করে তিনি প্রমাণ করেন, বাঁশ থেকে প্রাপ্ত বিদ্যা কোন তামাশা-মশকরার বিষয় ছিলনা। অনন্য প্রতিভার অধিকারী ড. এফ, আর, খান সহজেই প্রমাণ করেন তাঁর আবিষ্কৃত গোলাকার ডিজাইনের ভবন সম্পূর্ণরূপে বিজ্ঞান সম্মত ও বাস্তবানুগ। বাঁশ থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি দুনিয়ায় ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যায় বিশাল অবদান এবং সর্বোচ্চ ভবন তৈরির জন্য বহু তথ্য-প্রমাণ রেখে গেছেন। যার কারণে তাঁকে “বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার” বলা হয়।
সেই ফজলুর রহমানের দেশে বর্তমানে বাঁশের ব্যবহার দেখলে মুখ লজ্জায় লাল না হয়ে কুচকুচে কাল হয়ে যায়! পত্রিকার পাতা ভরা কাহিনীতে ঠাসা। বাঁশ দিয়ে ভবন বানানো হয়েছে, ব্রিজের কলামে বাঁশ, ভবনের বিমের ভিতরে বাঁশ, লোহার বদলে বাঁশ, কনক্রিটের গাঁথুনিতে বাঁশ, ভবনের ছাদ ঢালাইয়ে বাঁশ, লটকে থাকা ব্রিজ ঠেলা দিতে বাঁশ, রেলওয়ের স্লিপার ঠিক রাখতে বাঁশ, রেল রাস্তার স্লিপারে লোহার পেরেকের বদলে বাঁশের পেরেক সহ হাজারো কাহিনী দিয়ে দৈনিক পত্রিকার খবরে ঠাসা। যে বাঁশের কাঠামো গবেষণা করে বাংলাদেশের ছেলে হয়েছিল সারা দুনিয়ায় খ্যাতিময়। বাংলাদেশকে সারা বিশ্বে পরিচিত করে তুলেছিল। সেই দেশের বর্তমান প্রজন্ম বাঁশের অভিনব বিপদজ্জনক ব্যবহার দিয়ে পুরো জাতিকে করেছে কুলষিত, জাতির আস্তাকে করেছে ক্ষণভঙ্গুর, বিশ্বের কাছে হচ্ছে হাসির খোরাক! এটার মাধ্যমেই এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, দেশে পরীক্ষা পাশ করা শিক্ষিত মানুষ বেড়েছে কিন্তু সৃষ্টিশীল মেধাবী মানুষ দিন দিন কমছে। তাই তো দেখা যাচ্ছে, বাঁশ বাংলাদেশে জ্বালানী লাকড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মেধাহীন মানুষের কাছে বাঁশের কোন মূল্য নেই।
বাঁশ দিয়ে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, চীন, থাইওয়ানে প্রচুর শিল্প গড়ে উঠেছে। রাজপ্রসাদ, দামী ভিলা, রেস্টুরেন্ট, পাঁচতারা হোটেল গুলোর অভ্যন্তর ভাগ সাজাতে বাঁশের ব্যবহার দিন দিন বেড়ে চলছে। নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রী, ঘর সাজানোর বস্তু, বৈদ্যুতিক বাতি নির্মাণে, ফটো ফ্রেম তৈরিতে বাঁশের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়েছে। থালা, বাটি, চামচ থেকে শুরু করে অভিনব অনেক কিছুই বাঁশের উপাদান দিয়ে বানানো হচ্ছে। এসবের ডিমান্ডও কম নয়! এ সমস্ত সামগ্রী যেমনি মূল্যবান তেমনি আকর্ষণীয়, তেমনি চাহিদা-পূর্ন। লেখকের নিজেরও দেশে-বিদেশের বাঁশ সামগ্রীর কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে। আমাদের দেশে বাঁশের কাঁচামাল যথেষ্ট থাকলেও নিপুণ ব্যবহারে অনেক পিছিয়ে। দেশের বৃহদাংশ ছেলেদের কম্পিউটার বিষয় নিয়ে পড়ার প্রতি ঝোঁক বেশী, এটি একটি বিপদজনক প্রবণতা! তার চেয়ে বরং উপরোক্ত দেশে গিয়ে বাঁশ শিল্পের উপর উচ্চ শিক্ষা তথা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে দেশে কিছু করা অনেক উত্তম। অনেক দেশেই বাঁশ শিল্পের উপর উচ্চতর ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রী দেওয়া হয়। আপাত শুনতে অবহেলার মতো মনে হলেও, দেশ-জাতি গড়তে এটা বড় সহায়ক বিদ্যা হবে সন্দেহ নেই।
আল্লাহ বলেছেন ‘যে জাতি নিজ হাত দিয়ে নিজের ভাগ্যের পরিবর্তন করেনা, তিনিও তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন করান না’। নিজ হাতের বিদ্যার জন্য চাই পর্যাপ্ত কাঁচামাল ও রসদ। বাঁশ-বেত সম্পর্কিত মালামাল আমাদের দেশে প্রচুর। তাই যে কোন শিক্ষিত ব্যক্তি এই শিল্পে হাত দিলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারবে। তাছাড়া কোন টেকনিক্যাল ইনিষ্টিটিউট ইচ্ছে করলে এ বিষয়ের উপর কোর্স চালু করতে পারে। বিদেশ থেকে দক্ষ শিক্ষকদের নিয়ে এসে দেশের ছাত্রদের নিপুণভাবে গড়ে তুলতে পারে। বাংলাদেশের ভোকেশনাল ইনিষ্টিটিউট গুলোতে যা শেখানো হয়, তা পুরানো ও সেকেলে পদ্ধতির। যার বাস্তব ব্যবহার বাহিরের জগতে কোথাও নাই। ভোকেশনাল স্কুল গুলোতেও বাহিরের দুনিয়ার আধুনিক সৃষ্টির কোন সংগ্রহশালা নেই। ফলে এই স্কুলের ছাত্ররা নিজেদের বিদ্যা কাজে লাগাতে পারেনা, অন্যের বিদ্যা দেখারও সুযোগ পায়না।
সরকারী ভাবে চিন্তা করা হলে, বাঁশ সম্পর্কিত শিল্পে প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হবে, প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ ঘটবে। আমাদের ছেলেদের বেকারত্ব দূর হবে। আল্লাহ বলেছেন ‘আমার সৃষ্টি নৈপুণ্যের মধ্যে, ত্রুটি দেখতে পাবেনা, তা নিয়ে তোমরা ভাব, গবেষণা করো, তাহলে তোমরা সফল হবে’। বাংলাদেশের ছেলে যেভাবে ক্ষুদ্র বাঁশ নিয়ে ভাবতে গিয়ে পৃথিবী বিখ্যাত হয়েছেন, বাঁশকে সম্মানিত করতে গিয়ে নিজে সম্মানিত হয়েছেন। এধরনের প্রচুর সম্ভাবনয় সন্তান আমাদের প্রতিটি গ্রামে লুকিয়ে আছে; দরকার শুধু পথ নির্দেশনার আর একজন নকিবের। যিনি তাদের জানিয়ে দেবেন আমরা কিছুই হারাই নি, প্রচুর সম্পদ আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন, দাঁড়াবার জন্য এগুলোই যথেষ্ট।


Discussion about this post