এই মুহূর্তের তুমুল জনপ্রিয় এক ছাত্রনেতার সাথে টক শোতে বসেছিলেন আমাদের দেশের প্রতিথযসা সিনিয়র সাংবাদিক। একই ভাবে তিনি একটি পত্রিকার সম্পাদক ও বটে। সঙ্গত কারণে তাদের আলোচনায় উঠে আসে আমাদের পঞ্চাশতম স্বাধীনতা উত্তরকালেও আমরা স্বাবলম্বী হয়নি। সেই আফসোসের কথা। একই সাথে দেশের কল্পিত উন্নয়ন ও দুর্নীতি সম্পর্কে কথা উঠে আসে। দৈন্যতা ও পঞ্চাশ বছরের ব্যর্থতা
আরো পড়তে পারেন…
- ফেসবুকের বন্ধু সমাচার
- ইসলামী চেতনায় ভাস্কর্যের অবস্থান
- Broken Chair ভাঙ্গা বেদি ভাস্কর্য
সিনিয়র সাংবাদিক মহোদয় দুটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বললেন,
– প্রথমটি হল, একটি জাতিকে শ্রেষ্ঠ হতে হলে, মাহাথিরের মত একটি দল কিংবা ব্যক্তিকে দীর্ঘ বছর নিরবচ্ছিন্ন একক নেতৃত্বের দরকার পড়ে!
– দ্বিতীয়টি হল, একটি জাতিকে নিজের দণ্ডের উপরে দাঁড়াতে পঞ্চাশ বছর যথেষ্ট সময় নয়!
তিনি আরো আগ বাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে বললেন, “এমন একটি প্রমাণ দেখান, যেখানে বাংলাদেশের সমসাময়িক সময়ে স্বাধীনতা লাভ করে দুনিয়ার বুকে গর্বের সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।” অন্য পক্ষে চুপ থাকতে দেখে, তিনি কথাটিকে গুরুত্ব দিতে বার কয়েক তাগিদ দিয়েছেন।
বড় করুণা হল, অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ও অতিথিবৃন্দের উপর। তারা কেউ এমন একটি দেশের নাম বলতে পারলেন না, যেটা আমাদের সমসাময়িক সময়ে স্বাধীনতা পেয়ে শুধু স্বাবলম্বী নয়, বরং সকল ক্ষেত্রে দ্রুত এগিয়ে গেছে। অথচ এই ধরনের কয়েকটি দেশের নাম বলা যেত কিন্তু উপস্থিত ক্ষেত্রে তাদের কারো মাথায় সেগুলো এলো না! উপস্থিত মুহূর্তে অনেক জানা তথ্য মানুষের মগজ থেকে সাময়িক হাওয়া হয়ে যেতে পারে। এটা একটা মানবিক দুর্বলতা মাত্র। এটা কোন দোষের নয়। তবে দর্শক হিসেবে আমার মনকে নাড়া দিয়েছে কেননা এই ধরনের কথায় আমরা জাতি হিসেবে যে গরীব আছি, তার পক্ষে সাফাই গাওয়া হয়। আমার জাতি এ কারণেই গরীব নয়, সেটা নিতান্তই ভিন্ন কারণ। একজন ক্ষুদ্র নাগরিক হিসেবে তার প্রমাণ উপস্থাপন করা, দায়িত্ব মনে করছি।
কৌতূহলের ব্যাপার হল ১৯৭১ সালে শুধুমাত্র বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। একই বছর পৃথিবীর মানচিত্রে আরো দুটো দেশের নাম যোগ হয়েছিল! একটি হল ‘সংযুক্ত আরব আমিরাত’ অন্যটি হল ‘কাতার’। পাঠক নিজেই ভাবুন এই দেশ দুটো কি অভাবনীয় সফল হয়নি? হয়ত কেউ বলবেন তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল, তাই তারা পেরেছে। এটি কিন্তু সঠিক উত্তর নয় কেননা সম্পদ ও সুযোগ আমাদেরও কম ছিলোনা। প্রাকৃতিক সম্পদের দিক দিয়েও বাংলাদেশ কখনও পিছিয়ে ছিল না। মূলত শুধু সম্পদ থাকলেই হয়না সে সবকে কাজে লাগানোর মত জ্ঞান ও যোগ্যতাও লাগে। আমরা সে জায়গাতেই মূলত ব্যর্থ। চলুন আরেকটি পরিসংখ্যান দেখি।
বাংলাদেশ সরকার যে দেশটাকে সিঙ্গাপুর বানানোর স্বপ্নে বিভোর সেই সিঙ্গাপুরের জন্ম হয়েছে ১৯৬৫ সালে এবং যে মালয়েশিয়াতে গতর খাটুনীর জন্য বাংলাদেশীরা দলে দলে ভিড় জমাচ্ছে তার জন্ম ১৯৫৭ সালে। লক্ষণীয় বিষয় হল বাংলাদেশের যখন স্বাধীন হয়, তখন বাংলাদেশের অবস্থা থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের চেয়ে অগ্রগামী ছিল। এমনকি অর্থনৈতিক অবস্থা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের চেয়েও ভাল ছিল।
যুদ্ধপরবর্তী বাংলাদেশের অবস্থা গাজা, সিরিয়া, ইরাকের ধ্বংস্তুপের চেয়ে অনেক উত্তম ছিল। ব্রিজ, কালভার্ট, রাস্তা, খাদ্য গুদাম গুলো প্রায় অক্ষত ছিল। এসব গুদামে খাদ্য মজুত ছিল। তার উপর মিলেছিল ব্যাপক আন্তর্জাতিক সাহায্য। এ ধরনের সহযোগিতার অর্ধেক পরিমাণ দিয়ে জার্মানি বিশ্বযুদ্ধের ধকল সামলিয়েছিল কিন্তু আমরা তলাহীন ঝুড়িতে পরিণত হয়েছিলাম!
স্বাধীনতা পরবর্তী আমাদের দেশীয় পাঠ্য বইয়ের, কোন এক ক্লাসের গণিত বইয়ের একটি ঐকিক নিয়ম অঙ্ক দেখেছিলাম। যেখানে লিখা হয়েছিল “১ ডলার সমান যদি বাংলাদেশী ২.৭৭ টাকা হয়, তাহলে অত ডলার সমান কত?” আজকে চোখ বন্ধ করে দেখুন ডলারের অবস্থান কোথায়? আর আমরা কোথায়?
একটি জাতির প্রায় সকলেই, যে যেখানে অবস্থান করছেন, সেখানেই যদি চুরি-ডাকাতির বুৎপত্তি অর্জন করে। তাদের জন্য পঞ্চাশ বছর সময় অবশ্যই কম সময় এমনকি পাঁচশত বছর সময় দিলেও তারা স্বীয় দণ্ডের উপরে দাঁড়াতে পারবে না। কেননা চোর কোনদিন স্বাবলম্বী হতে পারে না। তাই এই জাতিকে আগে নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়াটা বেশী জরুরী হয়ে পড়েছে।


Discussion about this post