আমাদের দেশের গ্রামীণ জনপদে ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে অলী-আল্লাহর কেরামতি প্রচার করার চিত্র আমরা দেখতে পাই। কেরামত প্রচারের আড়ালেই সৃষ্টি হয়েছে কতশত মাজার, আর মাজার কেন্দ্রিক ব্যবসা।
সব জায়গাতেই একটি জিনিষের মিল পাওয়া যাবে, তা হল তাদের পীরের কাছে ছিল বড় কেরামতি! প্রকৃত কথা হল একজন সাধারণ মানুষ কিভাবে বুঝবে যে, এটির নাম কেরামতি আর উটার নাম যাদুকরী। কেননা এসব অনুসারীরা কেরামতির যে বর্ণনা দেয়, যাদুকরীর বাহ্যিক চরিত্রটাও ঠিক একই ধরণের! ধর্ম বিস্তারে সুফী সাধকের কারামত
আরো পড়তে পারেন…
- ভারতের ওয়াহাবী মতবাদ ও আজাদী আন্দোলন
- রাসুল (সা) মাটির তৈরি মানুষ, অপবাদ, অপমান না সম্মান?
- মক্কা-মদিনায় তুর্কি ক্ষমতায়ন ও গিয়াস উদ্দিন আজম শাহের অবদান
ঘটনার ভিতরে যাবার আগে অতি-প্রাকৃতিক চরম অনুভূতি সম্পন্ন একটি ঘটনা দিয়ে শুরু করতে চাই, যে ঘটনাটি বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা দিল্লীর বাদশাহ মুহাম্মদ বিন তুঘলুকের দরবারে নিজ চোখে দেখেছিলেন। তিনি বলেছেন,
“আমি দিল্লীতে একদিন সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলুকের সাথে তার গোপন কক্ষে দেখা করি। যেখানে তার কয়েকজন অন্তরঙ্গ বন্ধু ও দু’জন যোগীকে দেখতে পেলাম।
যোগী দু’জনের একজন বসা অবস্থা থেকেই আমাদের মাথার উপরে শূন্যে উঠে গেল। যোগী তখনও শূন্যের উপর বসে আছে। এ অদ্ভুত দৃশ্য আমাকে এতটা ভীত ও বিস্মিত করেছিল যে, আমি তৎক্ষণাৎ জ্ঞান হারালাম।
পরে ঔষধ খাওয়ানোর ফলে প্রকৃতিস্থ হয়ে উঠে বসলাম। তখনও যোগী শূন্যেই বসে আছে! অবশেষে তার সঙ্গী যোগী, ঝোলার ভেতর থেকে একখানা খড়ম বের করে মাটিতে ছুড়ে মারল। মাটিতে পতিত খড়মখানাও শূন্যে উঠে গেল! শূন্যে অবস্থিত যোগীর ঘাড়ে সেটি বারবার আঘাত করতে লাগল।
এতে যোগী ধীরে ধীরে মাটিতে নেমে এলো এবং আমাদের পাশে পূর্ববৎ বসে পড়ল। তখন দিল্লী সুলতান আমাকে বললেন, তুমি ভয় পাবে আমি জানতাম। তা না হলে আরো আশ্চর্যজনক ব্যাপার তোমায় দেখাতাম।” ইবনে বতুতার সফর নামা-১২৪ ধর্ম বিস্তারে সুফী সাধকের কারামত
ইবনে বতুতা তার জীবন কাহিনীতে এ ধরনের আরো ঘটনার উদ্ধৃতি দিয়েছেন। মূল কথা হল, এসব যোগীরা সাদা কাপড় পড়ে, মুখে দাড়ি ও হাতে তাসবিহ নিয়ে এসব যাদু দেখাতেন এবং সেখানে যদি সাধারণ মুসলমানদের ডেকে বলা হত, এটা একটা বিরাট কারামত।
অনেকের পক্ষেই বিষয়টি অস্বীকার করা সম্ভব হতোনা! নির্দ্বিধায় তারা সাদা কাপড়ে আবৃত যাদুকরকে আল্লাহর অলী ভাবত এবং তার কর্মকাণ্ডকেই কারামত মনে করত! সে কারণে ইসলাম এই বিষয়টিকে তেমন একটা গুরুত্ব দেয় না।
সাহাবীদের জীবনেও এ ধরনের মামুলী ঘটনার কোন বর্ণনা দেখতে পাই না। মানুষের প্রবল ইচ্ছে শক্তি ও একাগ্রতা থাকলে, অতিপ্রাকৃত বিষয় সাধনার মাধ্যমে অর্জন করতে পারে। এসব বিষয় কোন মানুষকে শ্রেষ্ঠ বানানোর মানদণ্ডও নয়।
কারামতের পরিচয়
কারামত বা কারিমাত আরবি শব্দ। যার অর্থ উদারতা, উচ্চ-মনের অধিকারী। শব্দটি মুসলিম সুফি, সাধকদের অতিপ্রাকৃত আশ্চর্য জনক যোগ্যতার জন্য ব্যবহৃত হয়।
যে সব মুসলিম সাধক এ ধরনের অতি প্রাকৃত ঘটনা দেখিয়ে থাকেন, ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের একটা অংশ তাদেরকে অলি কিংবা আল্লাহর অলি হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাদের এই কাজটিকে কারামত হিসেবে বিবেচনা করেন।
দিল্লীর শাসকদের অনেকেই যাদু বিদ্যার প্রতি খুবই আগ্রহী ছিলেন। তাই তারা রাষ্ট্রীয় খরচেই যোগীদের পুষতেন। তখনকার দিনে যোগীরাই যাদুবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। সাধারণ মানুষ যোগী কর্মকাণ্ডকে ভয় ও বিশ্বাস করতেন।
তারা এসব কাজের উপরে আস্তা রাখতেন। অনেকে এসব ভেলকি বাজি দেখিয়ে ফায়দা হাসিল করতেন। কেউ ধর্ম প্রচারের কাজে লাগাতেন। মোহাম্মদ বিন তুঘলুক রাজদরবারেই যাদুকরদের পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন।
কোন নতুন যোগী শহরে এলে, সবার আগে তারাই রাজদরবার দর্শনের সুযোগ পেত। মোগল সম্রাট হুমায়ুনের জীবনেও এমনটি হতে দেখা গিয়েছে।
একজন শাসক ও সম্রাট যেখানে এসব বিদ্যার প্রতি এত অনুরক্ত সেখানে সাধারণ মানুষের কি দশা হত ভাবতেই অনুমেয়। সারা দুনিয়ায় ইসলাম প্রচার করার সময় কোথাও কারামতকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না।
কিন্তু ভারতবর্ষের সর্বত্র ইসলাম প্রচার ক্ষেত্রে বহু আলেম কারামতকে প্রাধান্য দেন। কেননা সাধারণ মানুষ এসব কাহিনী মন দিয়ে শোনে ও বিশ্বাস করে।
আজকের দিনেও আমাদের দেশে মৌলভীরা কারামতের কথা বলে স্রোতাদের আকৃষ্ট করেন এবং কবর ও মাজারে অর্থকড়ি দেবার জন্য প্রলোভিত করেন।
এসব মানুষের সামনে সংঘটিত এসব কর্মকাণ্ডের কোনটি কারামত কোনটি যাদু সে পার্থক্য করাই কঠিন।
অলী-আল্লাহ নামে আজগুবি কাহিনী ফেঁদে সেটাকে অলির কারামত বলে প্রচার করতে থাকে। এসব অতিপ্রাকৃত কাজের প্রতি সাধারণ মানুষের প্রবল আকর্ষণ দেখে, তুর্কি-ইরানী আমলে সুফিরাও যোগী বিদ্যায় পারদর্শী হতে ভারতের কামরূপে গমন করতেন!
পরবর্তী কোন এক পর্বে সে বিষয়ে আলোচনার ইচ্ছে রইল।


Discussion about this post