ভাবলাম দিল্লীতেই যেহেতু আমাকে বেশ কয়েকদিন থাকতে হবে, তাহলে দিল্লীর নামকরা সুফি, মহান আল্লাহর প্রসিদ্ধ অলি হযরত নিযামুদ্দীন (রহ) দরগাহে যাব এবং জেয়ারত করব। জীবনে বারে বারে এমন সুযোগ পাওয়া যায় না।
নিযামুদ্দীন আউলিয়া (রহ) ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত আল্লাহর অলীর নাম। [জন্ম ১২৩৮ মৃত্যু ১৩২৫] তার নাম অনুসরারেই পুরানা দিল্লীর এই বিশাল এলাকার নামও ‘নিযামুদ্দীন’।
এটি একটি ঐতিহাসিক স্থান, ইতিহাসের বহু ঘটনার সাক্ষী। তাবলীগ জামায়াতের উৎপত্তি হয়েছিল এখান থেকেই। আল্লামা মও-দূদী (রহ) শিক্ষা জীবন গড়ে উঠেছিল এখানেই।
সম্রাট শাহজাহানের বড় কন্যা ‘জাহানারার’ কবরও এখানে। তিনি ভাইয়ের মধ্যে লড়াই থামাতে বহু চেষ্টা করেছিলেন। অগত্যা মনের কষ্টে নিযামুদ্দীন আউলিয়ার মাজার এলাকায় বসতি করে, এবাদতের মাধ্যমে বাকী জীবনে এখানেই কাটিয়ে দিয়েছিলেন।
যা’হোক আমি বলছিলাম মহান আল্লাহর বিখ্যাত অলি নিযামুদ্দীনের মাজার জেয়ারতের কথা।
মাজার এলাকার চারিদিকে সবই মুসলিম এলাকা। এখানকার জীবনযাত্রার ধরণ দেখে প্রথমেই মনে পড়বে, এদের সকলেরই আয় রুজি হয় মাজারকে কেন্দ্র করেই। মাজার এলাকায় যেতে হবে লম্বা পথ হেটে।
রাস্তার দু’ধারে সাড়ি সাড়ি দোকান। আগর বাতি, মোমবাতি, গোলাপ জলের দোকান। আরো আছে আতর, সুরমা, ধুপের বাহারি দোকানপাট। নানা জাতির বোরকা, কামিজ, সালোয়ারের সমাহার।
তসবিহ, জায়নামাজ, টুপি, গোলাপের শুকনো পাপড়ি ও মরিয়ম ফুলের সমাহার। হোটেল রেস্টুরেন্ট সহ পর্যটক নির্ভর ব্যবসা।
ব্যবসায়ীরা দোকানে বসে, রাস্তায় চলাচল রত প্রতিটি আগন্তুককে মনের চোখ দিয়ে স্ক্যান করে চলছে। না জানি তিনি কোন দেশের আগন্তুক।
একটা শিশু দৌড়ে এসে আমার জুতো জোড়া খুলে নিতে চাইল। হঠাৎ এমন আচরণে আমি অপস্তুত হলাম। মুরুব্বী গোছের একজন হেসে জানাল, পায়ে জুতো পরে এমন পবিত্র দরবারে যেতে মানা।
এগুলো আমানত খানায় রেখে যেতে হবে। ফিরার পথে সম্মানী দিয়ে নিয়ে যাবেন। দুপাশের এমন দোকানগুলোকে প্রথমে জুতোর মেরামত-খানা মনে হয়েছিল! এখন বুঝলাম, না ভুল!
ওগুলো একপ্রকার আমানত খানা। কিন্তু গুরুত্বহীন এমন আমানত খানায় যত মালামাল আছে আমার জুতোর দাম তার চেয়েও বেশী। এখানে আমানত রাখতে ভয় হল।
ইউরোপের বৃষ্টির দিনের জলবায়ু ও দীর্ঘদিন থাকার উপযোগী, এই জুতো জোড়া বহু দামে দুবাইয়ের বাজার থেকে কেনা হয়েছিল। দিল্লী শহরে জুতো হারালে ইউরোপ পৌছতে খবর আছে।
তাই সযত্নে জুতো জোড়া কাঁধের ব্যাগের ঢুকিয়ে আবারো দরগাহের পথে চললাম।
দু’পাশে বেচা বিক্রির হাঁক-ডাক। আমাকে নিয়েই সবার যেন কৌতূহল। একজন বলল, কিছু একটা না কিনেই আপনি আল্লাহর অলির দরগাহে যাচ্ছেন, কেমন কৃপণ ব্যক্তি আপনি?
শিশুকাল থেকেই আমরা মাজার-দরগাহ, পীর-মুরিদের পরিবেশে বড় হয়েছি। বুঝলাম, আমার একেবারেই খালি হাতে যাওয়াতে দোকানীরা ভাল চোখে দেখছে না।
ঝামেলা এড়াতে আগর বাতির দুটো বাণ্ডিল কিনেই পথ চলতে রইলাম কেননা জিনিষটা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্যও খুব উপযোগী।
যে যায়গা ভ্রমণে যাওয়া হয়, সে সম্পর্কে আগে লেখা পড়া করে গেলে ভ্রমণ খুবই ফলপ্রসূ ও আনন্দদায়ক হয়। অলি আউলিয়াদের জীবন কাহিনী পড়তে বরাবরই আমি খুব আগ্রহী ছিলাম।
হযরত নিযামুদ্দীন আউলিয়া সম্পর্কিত একটি বই বাজারে ছিল। স্কুল জীবনেই সে বই পড়া হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে বুঝেছি ইতিহাসের নামে সেখানে যথেষ্ট গোঁজামিল ঢুকানো ছিল।
দিল্লীতে হঠাত তাঁর মাজার জেয়ারতে সুযোগ পেলেও, অতিরিক্ত কিছু জানার জন্য কারো শরণাপন্ন হবার দরকার পড়েনি।
কিন্তু এমন একজন ব্যক্তির মাজারে গিয়ে যা দেখেছি, তাতে চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠেছিল। ইসলাম ও মুসলমানদের ঐতিহ্য বলতে কিছুই ছিলনা।
হিন্দু, মুসলিম, শিখ সহ বহু ধর্ম-বর্ণের যেন এক মিলন মেলা। পুরুষ-নারী আগন্তুক সমান সমান। অধিকাংশই তাদের নিয়ত পুরণার্থে এখানে ভিড় করেছে। চলছে গান-বাজনা।
কারো মাথায় টুপি দেখা গেলেই মনে হচ্ছিল তিনি মুসলিম। বিস্তারিত বর্ণনা দিলে নিন্দুকেরা বলবে যে, আমি অলি-আল্লাহ বিরোধী।
তবে এখানের দৃশ্য দেখলে, যে কারো বুঝতে বাকি থাকবে না যে, মতলববাজ মানুষেরা এই মহান ব্যক্তির কবরটিকে ব্যবসায়ের কেন্দ্রস্থলে পরিণত করেছে। এই একটি কবরকে কেন্দ্র করে এখানকার মানুষের রুটি-রুজির ব্যবস্থা হয়।
পাশের মসজিদে আছরের আজান হল, হাজারো মানুষের পদচারণায় উজ্জীবিত তীর্থভূমির বরকতপূর্ন মসজিদে পাঁচজন মুসল্লি নিয়ে আসরের জামাত শেষ করে নিজের পথ ধরলাম! পথিমধ্যে একজন জুতো আমানতদারের মনে হল, আমার কাঁধের ব্যাগে জুতো জোড়া লুকিয়ে আছে!
তিনি আমার উপর বেজায় চটে গিয়ে বদ দোয়া দিলেন, যে ব্যক্তি নিযামুদ্দীন আউলিয়াকে বেইজ্জত করেছে, সে যেন বাড়ী অবধি ফিরতে না পারে। গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যায়। অতঃপর তিনি হাতে রক্ষিত সিগারেটের উপরে সুখটান দিয়ে যথারিতী চিৎকার করে বলতে রইলেন,
ভাই লোগ! দিল্লীকা মশহুর আউলীয়াও কো সাত মিলনে লিয়ে আয়ে। মোবারক হো! বহুত খোশনসিব হো! আপলোগ, জুতো খানামে জুতো রাখ জাইয়ে, জেয়ারতমে বেয়াদবি মাত কিযিয়ে….
উল্লেখ্য: ওলি বা অলি আরবী শব্দ। যার অর্থ বন্ধু। আওলীয়া তার বহুবছন যার অর্থ হবে বন্ধুগন বা বন্ধুসমূহ।


Discussion about this post