বহুবার ভেবেছি এই রিস্কি বিষয় নিয়ে লিখব না। আবার ভাবি লিখাই তো দরকার। এই দোদুল্যমানতার মধ্যে মন বাধ্য করল লিখতে। যাই হোক মূল বক্তব্যে যাবার আগে অতীতের কয়েকটি সমাজ চিত্র তুলে ধরব। পুরুষের চোখে নারী
১. সবেমাত্র ক্লাস টেনে উঠেছি। সিনিয়র ভাইয়েরা কোচিং শুরু করেছে, সামনেই মেট্রিক পরীক্ষা। তারা আমাদের অনুসরণীয়, কেননা অচিরেই আমরা তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করব। তাদের মধ্যে সবাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যে যার মত সুযোগ বুঝে, দল বেঁধে ‘সওদাগর’ নামক ছায়াছবি দেখতে যাবে। কেননা সেই ছবির একটি দৃশ্যে সৈকতে নাচতে গিয়ে, নায়িকা অঞ্জু ঘোষের পরনের কাপড় হাঁটু বরাবর উঠে যায়! মেট্রিক পরীক্ষার আগে, মনকে তাজা করতে, এই বিরল দৃশ্য দেখার জন্য ছেলেদের মাঝে হুলস্তুল পড়ে যায়। স্কুল বিরতির সময় পুকুর পাড়ে গোল চত্বর বানিয়ে বড়দের তাজা অভিজ্ঞতা ছোটরা গিলেছে বেশ কয়েক দিন ধরে। ছবির এই দৃশ্যটাই ততদিন পর্যন্ত অশ্লীল চিত্র হিসেবে বিবেচিত ছিল। দলে দলে ছেলেরা গোপনে বাপের টাকায় চোখের অনুশীলন করে আসল। এই ঘটনায় অংক স্যার দুটো বেত উড়িয়েছিলেন। কেননা পরীক্ষার আগের মুহূর্তে এসব নোংরামিতে মন দিলে, পড়া মাথায় ঢুকবে না অধিকন্তু যা ঢুকেছে তাও যথাসময়ে বের হবেনা।
– সে সময়ে মেয়েরাও লেখাপড়া করত। আমাদের স্কুল ছিল সহ শিক্ষা পরিবেষ্টিত। তবুও এখানে সহজে ছেলে-মেয়েদের কথা বলারও সুযোগ ছিলনা। মেয়েরা ছিল অনেক শালীন এবং পারিবারিক ঐতিহ্যে ও পিতামাতার সম্মানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সেই সময়ের তরুণ-কিশোরদের মনে আগুন জ্বালিয়েছিল চিত্র নায়িকার এই ছবি। কল্পনাতে একটু ভাবুন, একজন নারীর পায়ের নলার ছবি দেখার জন্য যেখানে এত হৈ হুল্লোড়, তাদের মধ্যে একজন নারীর পুরো ছবি দেখার জন্য কত আগ্রহ থাকতে পারে! এটার নাম দুঃচরিত্র নয়, কেননা পুরুষদের সেই উপাদান দিয়ে বানানো হয়েছে। এটা তাদের স্বভাবজাত অভ্যাস। মহাকাল ধরে এই অভ্যাস চলবে। তাদেরকে সামান্য দেখানো হলে, তারা শক্তি প্রয়োগ করে বাকিটা দেখে নিবে।
২. শত বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে, খতমে খাজেগান সহ নানাবিধ দোয়া মাহফিলের মাধ্যমে অবশেষে এলাকার নতুন সিনেমা হল চালু হল। শহর থেকে আসা-যাওয়ার পথে কায়দা করে সিনেমা হলের সামনে গাড়ীর যাত্রা বিরতির ব্যবস্থা করা হয়। এতে যাত্রীরা চলমান ছবির নাম জানতে পারে। দেখতে পারে দেওয়ালে সাঁটানো পোষ্টারের দৃশ্য। এসব দৃশ্যে নায়িকার দেহের নানাবিধ পোজ, হাসি ফুটিয়ে তোলা হয়। এসব ছবি যথেষ্ট যৌন আবেদন ময়ী হয়। নায়িকাদের এসব যৌন আবেদন ময়ী হাসি দেখে স্কুলের ছেলেদের মধ্যে নব পরিবর্তন দেখা দেয়। এসব পোষ্টার দেখে তরুণদের মাঝে স্বপ্নদোষের প্রবণতা বেড়ে যায়। তারা কল্পনার রাজ্যে সে ধরনের একজন নায়িকাকে কল্পনা করে চিন্তার রাজ্যে হারিয়ে যেতে চায়। আর শয়তান ভাল করেই করায় গণ্ডায় সুযোগ উসুল করে।
– আগে শহরের রাস্তায় ইউনানি-হেকিম দাওয়াইয়ের মহড়া বসত। ঘুমের ঘোরে যৌবন নষ্ট-কারী যুবকদের ভগ্ন-স্বাস্থ্য উদ্ধারে, ইউনানি ঔষধের প্রসার বসত। যাতে করে, এসব খাইয়ে, হারানো স্বাস্থ্য, ভগ্ন যৌবন ও ভূলুণ্ঠিত সাহস উদ্ধার করা যায়। বর্তমানে মানুষ বাড়লেও, এসব পণ্য বিক্রি প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে। কেননা এখন যৌবন নষ্ট হবার পদ্ধতি বদলে গেছে। এখন বিক্রি হয় কিভাবে অকালে যৌবন ফিরিয়ে আনা যায় তার ঔষধ। কিংবা ঘুমিয়ে পড়া যৌবনকে ইয়াবা খাইয়ো চাঙ্গা করা। এমনিতেই বেলেল্লাপনার কারণে সমাজ অশান্ত তার উপর যদি ইয়াবা খাইয়ে যৌবনকে বুলেটের গতি দিয়ে ধাবমান করা হয়। তাহলে সাধারণ মানুষ তো বটেই মোল্লা-পুরোহিতও পরাজিত হবে। তাদের হাতে মানুষ তো বটেই জানোয়ার ও ধর্ষিত হবে। “পুরুষের যৌবন তূণে ভরা তীরের মত। যতক্ষণ তুনের মধ্যে তীর থাকে ততক্ষণ তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তীর একবার ছোঁড়া হলে, যেখানেই পড়ুক, ক্ষত সৃষ্টি করেই পড়ে।” বর্তমানে যে সমাজ আমরা বানিয়েছি, তার প্রতিটা তীরই এখন ছোড়া হয়ে গেছে, যা শূন্যের মধ্য ভাসছে। শুধু দেখার পালা কোনটা কোথায় গিয়ে আছড়ে পড়ে।
৩. সপ্তাহের হাটে একবার ব্যবহৃত হয়, এমন ছাউনি ঘরে কিছু বেদে পরিবার ঠাই নিয়েছিল। তারা বানরের মাধ্যমে মানুষের ভাগ্য গণনা করে। ছাউনির দুটো খুঁটিতে দুটো বানর শিকল দিয়ে বাধা। খুঁটির শিকল ঢিলা। বানর দুটো একহাতে খুঁটি বেয়ে উপরে উঠছিল আরেক হাতে, শিকল তুলছিল। এক পর্যায়ে দু’জন ছাউনির চালে উঠে বসে। তারা আলাপ আলোচনায় মশগুল হয়। শিকলের ছোট দূরত্বের কারণে, কেউ কাউকে ধরতে পারছিল না। এ দৃশ্য দেখে বানরের মালিক তার বানরটিকে নির্দয়-ভাবে মারা শুরু করে। বানরের কান্না আর চিৎকারে বাজারের সাধারণ মানুষ বের হয়ে আসে। বানর মালিক কে কৈফিয়ত তলব করে। সে জানাল, ঐ খুঁটির বানরটি মাদি বানর। তার প্রতিবেশী শত্রুতা করে তার পুরুষ বানরের কাছাকাছি রেখেছে! বেদেরা গণক বানরকে সাধু বলে। কেননা নারী সঙ্গ সাধুর জন্য নিষেধ। এখন যে বানর কিছুক্ষণের জন্য নারী সঙ্গ পেয়েছে, তাই তার গণনা পেশার বারোটা বাজবে। তার বানরটি সর্বদা নারী চিন্তায় মশগুল হবে এবং উল্টো পাল্টা ভাবে মানুষের ভাগ্য গণনা করবে। ফলে সেও মানুষের হাতে মার খাবে!
– সঠিক বিদ্যা অর্জন করার পথে নারীর চিন্তা মাথায় ঢুকলে পুরুষকে ধ্বংস করে। ছাত্র যতই মেধাবী হউক একবার নারীর চিন্তা মাথায় ঢুকলে তার মেধা তো নষ্ট হয়, ভবিষ্যতও নষ্ট হয়। আস্তে আস্তে তার গতি চরিত্র হীনতার দিকে ধাবিত হয়। এসব চিন্তা এক সময় তাকে আগ্রাসী সাহসী করে তুলে এবং বিপদ ঘটায়। এই সমস্যাটি মানুষ ও বুদ্ধিমান জানোয়ার দুজনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যা আমরা উপরেই দেখলাম। আমেরিকা বৈষয়িক জ্ঞানের জগতে সেরা। তার পরও তারা যথেষ্ট মেধাবী সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়। তাই তারা গরীব দেশের মেধাবী ছাত্রদের অনেক লোভ দেখিয়ে নিয়ে যায়। কেন নিয়ে যায় চিন্তা করুন তো! নারী ও শরাব প্রাচুর্য যেখানে সেখানকার অনাগত ভবিষ্যৎ অধ্যবসায়ী হয়না। তাই তারা বাহির থেকে বিদ্বান এনে খালি-স্থান পূরণ করে।
৪. ২০০৪ সালের সরকারি ছুটির দিনে এক শপিং মলে সস্ত্রীক বাজার করছিলাম। সামনে থেকে মহিলা কণ্ঠের কেউ একজন বলল ‘অসভ্য’! শব্দটা ভুল শুনেছি বলে মনে হল। বহু দেশের বহু ভাষা এখানে চলে। এ ধরনের কাছাকাছি শব্দ চলার পথে এমনিতেই শোনা যায়। আবারো শুনলাম, ‘অসভ্য’! পরপর আবারো অসভ্য! হ্যাঁ, এটা তো বাংলা শব্দ। নিশ্চয়ই মহিলা বাঙ্গালী। মহিলা কাকে অসভ্য বলছেন? অসভ্য আচরণ করার মত বয়স না হলেও আমার সন্তান ও সাথে আছে। তাকালাম। ভারতীয় পাঞ্জাবী, পাকিস্তানের পাঠান, দু’জন বাংলাদেশী বাজার করার উ-ছিলায় জিনিষ পত্র দেখছে। কিছুক্ষণ আগেই এদের কয়েক জনকে, একটি প্লাস্টিকের নারী মূর্তির সাথে দাড়িয়ে ছবি তুলতে দেখেছিলাম! এখন এখানে বাজার করার ভূমিকায় কিন্তু তাদের সবার নজর অদূরে খালি জায়গায় দাঁড়ানো পাঁচ-ছয় বছর বয়সী একটা ছোট মেয়ের প্রতি! শ্যামলা, নাদুস-নুদুস, আহামরি কিছু নয়। ইসলামের রীতি অনুযায়ী এই শিশুর আরো দু’বছর কোন পাপ লেখা হবেনা। এমনকি সে মারা গেলে নিষ্পাপ হিসেবে জান্নাতে যাবার সুযোগ পাবে। কিন্তু তাকে যে পোশাক টি পড়ানো হয়েছে তা যথেষ্ট আপত্তি জনক। পুরো পোশাকটিতেই যৌন আবেদন ময়ী ভাবধারা ফুটে উঠেছে। বানানো হয়েছেই কায়দা করে। এ কারণে এত সব পুরুষ অসভ্য হয়ে উঠেছে। মূলত মেয়েটির মা এসবের অনুঘটক কিন্তু তিনি অন্যদের অসভ্য বলে মনের ঝাল মেটাচ্ছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না।
– যে মানুষ গুলো কিছুক্ষণ আগে প্লাস্টিক নারীর সাথে ছবি তুলে, দুধের স্বাদ ঘোলে মিঠাচ্ছিল। তাদের জন্য এই শিশু তো স্বর্গীয় হুর তুল্য। সে একটা মানবী। তাদের কাছে এর বয়স কম, এটাই বৈপরীত্য। বাকি সব উপাদান তো তার ভিতরে টই টুম্বুর করছে। অভিভাবক হিসেবে আমার আপনার কাছে সে একটি শিশু। কিন্তু যৌন বিকার গ্রস্থ উন্মাদ মানুষের কাছে সে একটা পরী, যার প্রতি তাকালে মনের সুখ মিটানো যায়। মহিলা যাদেরকে অসভ্য বললেন, তাদের চোখের দৃষ্টি হায়েনার মত একই বৃত্তে আবদ্ধ হয়ে আছে। আমি এসব পুরুষের দিকে দিকে তাকিয়ে আছি, তাদের কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। সুযোগ পেলে যেন তারা শিশুটিকে ছিনিয়ে নিবে।
– এই ক্ষেত্রে কাকে উপদেশ দেয়া যায়? মহিলাকে বললাম আপনি সিকিউরিকে জানান। তারা ব্যবস্থা নিবে। তিনি এই উপদেশ গায়ে মাখলেন না। ততক্ষণে তার বড় মেয়েও হাজির। না, তার দিকে মোটেও তাকানো সম্ভব নয়। সে জমানায় খুবই আপত্তির পোশাক। ইসলাম ধর্মে পরনারী থেকে নিজের চোখ নীচের দিকে রাখা ফরজ। কিন্তু আমার জন্য এক্ষেত্রে এখান থেকে দ্রুত চলে যাওয়াই ফরজ হয়ে দাঁড়াল। এই মহিলার আত্মীয়রা এভাবে মেয়েদেরকে না চালাতে অনুরোধ করলে, প্রতিকার স্বরূপ তিনি নিজেই বগল কাটা আপত্তিকর পোশাক পরিধান শুরু করে! কাকে বুজাবেন, কাকে ঠিক করবেন?
৫. মোগল সম্রাট হুমায়ুন রাজ্য হারিয়ে প্রাণ বাঁচানোর জন্য পালাচ্ছেন কাবুলের দিকে। পথিমধ্যে তার ছোট ভাইয়ের অধীনে একটি এলাকায় দুর্ভেদ্য কেল্লা আছে। সেখানে রাত যাপন করবেন কিন্তু দীর্ঘদিন থাকা অনিরাপদ। সেই ভাইটিও দুষমনের হয়ে কাজ করছিল। হুমায়ুন সেখানে একজন ইরানী মেয়েকে দেখতে পান। সে গোঁ ধরে বসে এই সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করবেন! অনেকেই বুঝল এটা বিয়ে করা কিংবা প্রেমে পড়ার সময় নয়। কিন্তু পলায়ন রত সম্রাট এসব কথা কানে নিতে রাজী নয়। তিনি সে মেয়ের প্রেমে পাগল। অবশেষে জোড় করেই বিয়ে হর! নববধূ সহ পালাতে থাকলেন। এই পালানো অবস্থায় জঙ্গলেই একদা তার ঘরে সম্রাট আকবরের জন্ম হয়। ইতিহাসে আমরা আরও হুমায়ুনদের বিচিত্র ঘটনা দেখেছি।
– এই কথাটি এখানে আনলাম এই জন্য যে, পুরুষের মন কোন সময়ে, কোন মুহূর্তে, কি কাজ করে বসে। তার হিসেব কেউ দিতে পারেনা। তারা মোরগের মত কামুক প্রকৃতির। তাদের অশান্ত মন সময়, কাল, গণ্ডির বাহিরে। একজন ভাল সৎ মানুষ হঠাৎ এমন কাজ করে বসবেন, যা কোনদিন কেউ কল্পনাতেও ভাবেনি। এ অভ্যাস নিবারণের জন্য দরকার, সহায়ক পরিবেশ।
একদা বাংলা চলচ্চিত্র কিংবা নাটকে ধর্ষক, লুইচ্ছা ধরণের কুচরিত্র প্রদর্শনে মুখে দাড়ি ওয়ালা কাউকে হাজির করতেন। দর্শকেরা সেটাকে তামাশা মনে করে আনন্দ পেত। কিন্তু এটার একটা মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব দর্শকের হৃদয়ে আসন গেড়ে বসে। শিশুরা প্রথম দেখাতেই বুঝবে দাড়ি ওয়ালা মানুষেরা বুঝি খুবই নোংরা। মূলত এটাই ছিল মূল লক্ষ্য। আমাদের পরিকল্পিত পরিবর্তিত সমাজ ব্যবস্থা ইসলামের সেই দৃঢ় পন্থাকে যেভাবে তামাশায় পরিণত করেছে সেভাবে সামাজিক চিত্র পাল্টে দিয়ে মানুষ গুলোকে জানোয়ারে পরিণত করেছে। কিছু মানুষ এসব কথা আউড়িয়ে বুদ্ধিজীবী হিসেবে উভয় দলে উপদেশ খয়রাত করে। ইহুদী খৃষ্টান ধর্মেও একদা কঠোর নিয়ম নীতি কার্যকর ছিল। এ ধরনের বুদ্ধি-ভিত্তিক সম্প্রদায় সে সব ধর্মের মৌলিক নীতিমালাকে নষ্ট করে দিয়ে, নারীদের কে বাজারী পণ্যে পরিণত করেছে। আর পুরুষদের চিত্তকে সদা অশান্ত করার মসল্লা মাখায়। “যার ফলে সে ধরনের একটি সমাজের দৃশ্য প্রতিভাত হয়, যেখানে নারীদের বলা হবে উত্তেজনা ছড়াও আর পুরুষদের বারণ করা হবে, খবরদার উত্তেজিত হবেনা”। আমরা সে সমাজের দিকে ধাবিত হচ্ছি।
চলবে…..


Discussion about this post