কিছু পিতা, তার সন্তানদের মন আকর্ষণ কিংবা সচেতন হবার জন্য, তার অতীত জীবনের ত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরেন। তাদের লক্ষ্য থাকে, পিতা-মাতার মুখে এই ধরনের কষ্টকর কথা শুনলে হয়ত সন্তান তাদের প্রতি অনেক দয়াশীল হবে, স্বাবলম্বী কিংবা মিতব্যয়ী হতে দীক্ষা পাবে। অনেক পিতারা সন্তানকে লক্ষ্য করে বলে থাকেন, সন্তান-হতে-উত্তম-ব্যবহার
১.
বাবা তোমাদের চেয়ে আমাদের জীবন অনেক কঠিন ছিল। একটি শার্ট পরে পুরো বছর ক্লাস করেছি। পোশাক বলতে দুটি লুঙ্গি, একটি গেঞ্জি, একটি শাটই ছিল আমার জীবনের সম্পদ। কোন ঈদেই কাপড় সেলাই করতে পারিনি। তোমার দাদা-দাদী দেয়নি কিংবা দিতে পারেনি। খালি পায়েই স্কুলে যেতাম। বেড়াতে গেলেই স্যান্ডেল পড়তাম।
২.
বাবা, আমরা দৈনিক আসা যাওয়ায় তিন মাইল পথে হেটে স্কুলে যেতাম। সেই সাত সকালে পান্তা ভাত খেয়ে রওয়ানা হতাম আর সন্ধ্যায় বাড়ী ফিরতাম। সারা পথে পেটে কোন দানা পানি পড়ত না। এভাবে কষ্ট করে লেখাপড়া করেছি। টিউশনির জন্য আমাদের কোন মাষ্টার লাগেনি। দশ মাইল দুরের কলেজেও হেটে যাওয়া লাগত। দৈনিক আসা যাওয়া কষ্টকর বিধায় আমাদের কারো বাড়িতে লজিং থেকে লেখা পড়া করতে হয়েছে।
৩. আমরা কৃষক পরিবারের সন্তান। সকাল সন্ধ্যায় বাবাকে কৃষি কাজের সহযোগিতা করেই স্কুলে যাবার মওকা মিলত। তিনি শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতেন না, সর্বদা অর্থকড়ি কামানোকেই জীবনের লক্ষ্য বুঝতেন। তাই পিতাকে রাজি করে হাড় ভাঙ্গা খাটুনি দিয়েই স্কুলে যেতাম। আজ আমি প্রতিষ্ঠিত। তোমাদের জীবনে এই ধরনের কোন কষ্ট করতে হয় না। তাই সময়কে কাজে লাগাও, ভাল করে লেখাপড়া কর, মানুষের মত মানুষ হও। ইত্যাদি….
উপরের কথাগুলো জীবন থেকে নেওয়া। অতীতের কারো না কারো সাথে মিলে যাবে। বাংলাদেশর সকল রাষ্ট্রপতি, সেনাপতি ও বিচারপতির জীবন ঘাঁটলে, প্রায় আশি শতাংশ ঘটনার সাথে কিংবা কাছাকাছি, উপরে বর্ণিত ঘটনার সাথে মিলে যাবে।
বড় আশ্চর্যের কথা হল, এই জাতীয় কথা গুলো সন্তানেরা মন দিয়ে শুনবে কিন্তু তার ব্যক্তি চরিত্র বদলানো কিংবা গা ঝারা দিয়ে নব উদোমে নতুন করে কাজে লেগে যাবার কোন ঘটনা ঘটবে না! এই সমস্ত কথা যখন সন্তানেরা শুনে তখন তাদের চিন্তায় ভিন্ন আরেকটি বিষয় ঘুরপাক খেতে থাকে।
সে যখন শুনবে কিশোর কালে পিতা পোশাকের কষ্টে ছিলেন, তখন সে মিলাবে এই বয়সেও তো বাবা কৃপণ। কই এখনও তো নিজে কিনে না আমাদেরও দেয় না। এখন তো তিরি আর অভাবী নন! যখন শুনবে, সারা রাস্তা হেটে স্কুলে যেত, তখন সে ভাববে বাবা সাইকেলটা কিনে না দেবার জন্য এই বাহানা করছে। না খেয়ে স্কুলে যাবার কথা শুনে সে বলবে, ক্যান্টিন থেকে বন্ধুদের সাথে নিয়ে কিছু যে, কিনে খাই এটা বাবার পছন্দ নয়। তিনি অর্থকড়ি কমিয়ে দেবার চিন্তা করছেন হয়ত। টকার অভাবে তিনি আমাদের কষ্ট করতে বলছেন, কিন্তু চাচা-ফুফুদের জন্য ঠিকই তো টাকা পাঠিয়ে দেন। এই কষ্ট করার আমার দরকার নেই।
শিশুদের এই মনস্তাস্তিক সমস্যার মূল কারণ হল, শিশুদের জীবনে উপদেশের চেয়ে দৃষ্টান্ত থেকে শিক্ষা নেবার প্রবণতা প্রবল। পিতা-মাতা যে কাজটি নিজেরা করেই সন্তানদের দেখান, তারাও সেটা সহজে গ্রহণ করে। একটি ছোট্ট মেয়ে শিশু সে মায়ের সাথে ঘর ঝাড়ু দেয়, ডেকচি-পাতিল নিয়ে খেলে, সাজতে চেষ্টা করে কেননা সে এসব মা থেকে দেখে। সেভাবে ছেলে শিশু, গাড়ী চালাবে, জিনিষ বানাবে কিংবা ঘরের ক্ষুদ্র বস্তুকে ছাত্র বানিয়ে ধমক দিবে, পিটাবে। সে এসব তার পিতার চরিত্র থেকে শিখে। দাদা-দাদী থেকে ও শিখে। কমবেশি অনেকের ঘরেই কাজের বুয়া আছে, তারাও দৈনিক ঘরেই কাজ করে। কোন শিশুকে কখনও দেখা যাবেনা যে, সে বুয়ার মত কাজ করছে। কেননা সে বুয়ার জীবন অনুসরণ করেনি।
গরীবের দুঃখের প্রতি মায়াশীল হতে, সারা বছর উপদেশ দিলেও কোন কাজ হবেনা। সে জন্য আগে সন্তানকে উপোষ রাখুন, রোজা রাখান তাহলে বুঝবে খিদের জ্বালা কেমন। দ্বীন-হীন গরীব, বাস্তুহীনকে ঘরে এনে খাওয়ান, সন্তানকে সেখানে রাখুন। তাকে দেখান এই সামান্য ভাত খেতে পেরে সে কিভাবে আল্লাহ প্রশংসা করছে কিভাবে খাদ্য দাতার কৃতজ্ঞতা করছে। এতে করে তাদের মনে স্ট্রাইক করবে। চিন্তা করতে শিখাবে।
যদি আশা করেন বৃদ্ধ বয়সে সন্তান আপনার দিকে অনেক যত্নশীল হউক তাহলে আজ থেকে তার প্রতিও যত্নশীল হউন। না, না, না, এই যত্ন আপ্যায়ন কিংবা কাপড়ে চোপড়ে নয়। তার চরিত্রের উপরে। তাহলে নিজের পিতার প্রতি অধিক দায়িত্ববান হউন, এই কাজটিই সন্তান অনুসরণ করবে। বৃদ্ধ পিতা ঘর থেকে বেরুবোর সময়, নিজের সন্তানের সামনে, স্বীয় পিতার জুতা জোড়া জোগাড় করে দিন। পিতাকে মসজিদে নিয়ে যান, সেখানে অনেক মানুষের সামনে পিতাকে স্পেশাল ইজ্জত দিন। এই কাজে বরকত বেশী, সন্তান হুবহু অনুসরণ করবে। পিতা নেই, তাহলে কি! তাহলে চাচার সাথে সে আচরণ করুন। তিনি নেই, গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ মুরুব্বীকে করুন। তাও নেই বৃদ্ধ শিক্ষককে সম্মান দিন, তাকে বাড়ীতে দাওয়াত দিন। লক্ষ্য একটাই যাতে এই ইজ্জত সম্মান কিভাবে দেখাতে হয় তা যেন নিজের সন্তান দেখতে পায়।
নিজের কন্যা সন্তানটিকে সাথে নিয়ে, কৃত্রিম ভাবে হলেও শাশুড়ির খেদমতে লেগে যান। এক সময় খেয়াল করে দেখবেন আপনার কন্যা তার দাদীকে খেদমত না করে বরং আপনাকেই খেদমত করার কাজে মনোনিবেশ করবে। শাশুড়ির বান্ধবী মহলের সবাইকে আন্তরিক গুরুত্ব দিন। তাহলে আপনার সম্মান-মর্যাদা কয়েক গ্রাম পেরিয়ে বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। এটা আপনার কন্যা শিখবে, হাতে কলমে।
আবারো সেই পুরানো কথাতেই ফিরে আসি। যেখানে বাবা নিজেই একটি কাপড় পড়ত, যেখানে বাবা নিজ পায়ে হেটেই দূরের বাজরে যেত, যেখানে বাবা নিজ হাতে কৃষি কাজ করত, যেখানে বাবা সারাদিন কষ্ট করে নিজেও উপোষ থাকত। যেখানে মা তার বৃদ্ধা শাশুড়িকে মুরগীর সেরা মাংসটি খাইয়ে দিত। সে কারণে তার সন্তানও একটি শার্ট পড়ার অভ্যাস পেয়েছিল। খালি পেটে নিজের পায়ে হেটেই স্কুলে যাবার সাহস পেয়েছিল কিংবা দূরের কলেজে গিয়ে অধ্যয়ন করতে পেরেছিল। তার কন্যাও তার শ্বশুর বাড়ীতে গিয়ে সুনাম অর্জন করতে পেরেছিল।
এই পৃথিবীর সকল কর্মের প্রতিফল নিজের দিকেই ফিরে আসে। মৃত্যুর আগে সবাই ভাল-মন্দ সকল কাজের হিস্যা পেয়ে যায়। এই কাজটি করার জন্য মানুষ যে একটি ভাল নিয়ত বা লক্ষ্য ঠিক করেছিল তার ফল শেষ কালে পাওয়া যাবে। তাই জীবনের নিয়ত বা লক্ষ্য কি হওয়া উচিত তা আজই ঠিক করে নিতে হবে। সে হিসেবে কাজের মাধ্যমেই সন্তানদের দিক নির্দেশনা দিতে হবে। তাহলে ফল পাওয়া যাবে যথাযথ। যদি পিতা-মাতার কার্যকরণ শুধু উপদেশ নির্ভর হয়ে পড়ে কিন্তু দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সবাই বৃথা যাবে।


Discussion about this post