সবুজের দাদা মরহুম নরুল কবির সাহেব ব্রিটিশ আমলের উচ্চশিক্ষিত মানুষ। বই পড়ুয়া মানুষ ছিলেন। তাদের পুরো গোষ্ঠীর মধ্যে সম্ভবত সবুজই দাদার উত্তম হকদার ছিলেন। তাই তার দাদাকে দিয়েই লিখাটি শুরু করেছি। পাঠ্য বইয়ের চেয়েও বাহ্যিক বইয়ের প্রতি সে ছিল অনেক অনুরক্ত। সরকারী মুসলিম হাই স্কুলের প্রতিভাবান এই ছাত্রের সাথে আমার পরিচয় হয় যখন সে ষষ্ট শ্রেণীতে পড়ে। খেলাধুলার প্রতি তেমন আগ্রহী ছিলনা, তবে ভিডিও গেম তার প্রিয় ছিল। ষষ্ট শ্রেণীতে পড়ুয়া সবুজ এমন ধরনের বই পড়ত, যা কোনদিন প্রবীণ মানুষদেরও আকৃষ্ট করবে না!
অতিরিক্ত বই পড়ার কু-অভ্যাস ছড়াবে এবং লেখাপড়ায় আরো মনোনিবেশ করাবে, এমন একজন শিক্ষকের জন্য তার বাবা তদানীন্তন কলেজিয়েট স্কুলের গণিতের প্রবীণ শিক্ষক জনাব আবদুল মতিন সাহেবকে বলে রেখেছিলেন। জানিনা কেন মতিন সাহেব আমাকে সবুজের জন্য শিক্ষক হিসেবে বাছাই করেছিলেন।
প্রথম যেদিন সবুজের সাথে আমার পরিচয় হয়, সে আমাকে সোজা প্রশ্ন করেছিল,
স্যার, স্ক্রু-ড্রাইভারের বাংলা কি? বিদঘুটে প্রশ্নের উত্তর আমার জান ছিলনা। প্রস্তুতও ছিলাম না। বললাম, কালকে জানাব। দেয়ালের ওপাশে তার বাবা এটা শুনেছিলেন, তিনি ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে বললেন। স্যার, আমার ছেলের এটা বদ অভ্যাস। আপনি বইয়ের বাহিরের কোন উত্তর দেবেন না। সে সাধারণ প্রশ্ন বেশী করে এতে করে শিক্ষকেরা বিব্রত হয়। তাই শিক্ষকদের বিরক্ত বেড়ে যায় কেউ পড়াতে চায় না।
তখনকার দিনে দশ হাজার শব্দের একটিই ইংরেজি ডিকশনারি ছিল। গভীর রাত অবধি তল্লাশি করে স্ক্রু-ড্রাইভারের বাংলা পাইনি! তবে আমরা যে মেসে থাকতাম, সেখানে প্রায় সব ব্যক্তিই বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য প্রাকটিস করত। অর্থাৎ বেশীর ভাগই চৌকশ ছাত্র। কারো একজনের গাইড বই থেকে পেয়ে যাই, স্ক্রু-ড্রাইভার অর্থ ‘প্যাঁচ কষা’। এভাবে সে প্রতিদিন আমাকে অদ্ভুত ও কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিত। আমি বলতাম, একজন মানুষ সকল প্রশ্নের উত্তর জানেনা, কেউ পারেনা। প্রশ্নটি তুমি কোথায় পেয়েছ বল, আমি পড়ে এসে তোমাকে জানাব। আমার সরল, সহজ স্বীকারোক্তিতে সে মজা পেত। অতঃপর বইয়ের নাম জেনে আমিও সে সব পড়ে নিতাম। মূলত, বে রসিক মানুষের পক্ষে সবুজের মত ছাত্র পড়ানো বেজায় কঠিন কাজ ছিল।
তার বড় ভাই, চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের কীর্তিমান ছাত্র। এস এস সি পরীক্ষার্থী। পানি পথে কতটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, কার সাথে কার, কি কি কারণ ও ফলাফল। এ সংক্রান্ত বিতর্কে সে জড়িয়ে পড়ে। যদিও সে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। পরে দেখলাম তার পয়েন্টগুলোই সঠিক ও যথার্থ। এভাবে বড়দের, বুড়োদের এবং ছোটদের সব বিষয়েই নাক গলাত।
তার বাবাকে প্রশ্ন করেছিলাম সে এসব কোত্থেকে জানে? তিনি আমাকে তালাবদ্ধ একটি ঘরে নিয়ে গেলেন। সারি সারি বহু বই। অবিন্যস্ত। শহুরে জীবনে একটি খালি ঘরের মূল্যও অনেক। তারপরও বই গুলো ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সবুজ স্কুল ছুটির পরে চুপিচুপি এখানে ঢুকে পড়ে এবং বইগুলো গিলতে থাকে। তার বাবা গোস্বা করে এখানে তালা লাগিয়েছে। তাই সে উপায়হীন হয়ে, তার বাবার রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বই গুলো পড়া শুরু করেছে! কখনও ঘরে শিক্ষার্থীদের নোট দেবার সময়, সেই বই থেকে তার বাবার ভুল ধরে বসত! বই পাগল কিশোর সবুজকে নিয়ে তার বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তার অন্ত ছিলনা। সব কিছুতেই তার একটু হেঁয়ালী ভাব ছিল কিন্তু বই পেলে সে শান্ত হয়ে যেত!
আমিও বই পাগল মানুষ ছিলাম। নানা রুচির, নানা মতের বই পড়তে গিয়ে আমিও কি চরম সমস্যায় পড়েছিলাম তা দীর্ঘ ধারাবাহিক ভাবে ‘এ পিকুলিয়ার ম্যান’ নামে সিরিজ আকারে ব্লগ ও পাঠশালায় প্রকাশ করেছিলাম। যা আজো শেষ হয়নি। আমার সংগ্রহ শালায় প্রচুর বই যোগাড় হয়েছিল, যা আমার হাতেই সংগৃহীত। আরো একজন কীর্তিমান ব্যক্তি ছিল, তার কথা পরে আসবে। কিন্তু সবুজের বই গুলো ছিল আরো পুরানো। তাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক। তার দাদা মরহুম নুরুল কবিরের সংগ্রহ শালা। পরে সবুজকে বললাম, তুমি পড়ায় মন দাও তাহলে সপ্তাহে অন্তত একটি বই তোমাকে পড়তে দিব। যা পড়লে তোমার ভাল লাগবে। সেবা প্রকাশনীর তিন গোয়েন্দা সিরিজের একটি করে বই দিতাম। এতে সাময়িক কাজ হয়েছিল বটে কিন্তু পরবর্তীতে, তার লেখা থেকে জানতে পেরেছিলাম যে, সেবা প্রকাশনীর কোন বই তার স্বাদ থেকে বাদ যায়নি। আসলে বই পড়া এমন এক মহামারী রোগ, যার ব্যথা আরেকজন পড়ুয়া ব্যতীত কেউ অনুধাবন করতে পারে না।
সপ্তম শ্রেণীতে তাকে প্রশ্ন করেছিলাম তুমি কার লিখা পড়তে পছন্দ কর? সে জানাল খুশওয়ান্ত সিংয়ের কলাম পড়তে ভাল লাগে! সে আবার কে? তার মাধ্যমেই জানলাম ভারতীয় বংশোদ্ভূত শিখ কলামিস্ট খুশওয়ান্ত সিংয়ের পরিচয়। আমিও তার ভক্ত হয়ে গেলাম। তদানীন্তন ঢাকা ডাইজেস্ট এই আন্তর্জাতিক গুণী ব্যক্তির লেখা রীতিমত প্রকাশ করত।
সবুজের পোষ্ট ও লিখার মধ্যে একটা ভিন্নতা কাজ করত। নতুন ধরনের তথ্য থাকত। এমন জায়গা থেকে উপমা দিত যা সচরাচর মানুষ পড়ে না। সে তথ্য ভুল নাকি অসত্য এ ধরনের কথা সহজে কেউ তুলতে পারত না! ঐতিহাসিক বিষয়গুলো খুব সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করতে পারত। আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তার, ঐতিহাসিক তথ্য সে ভুলত না! খুশওয়ান্ত সিংয়ের কলামে সে ভিন্নতা পেত। যার কারণে পরম শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক বুলবুল সরওয়ার সাহেবের লিখাতেও সে খুশওয়ান্তের ছাপ খুঁজে পেত। কালক্রমে অনন্য সাহিত্যিক বুলবুল সরওয়ার তাঁর খুব প্রিয় ব্যক্তি হয়ে উঠে। সম্ভবত সাহিত্যিক বুলবুল সরওয়ারও তাঁর একটি বই রিদওয়ান কবির সবুজকে উৎসর্গ করেছিলেন।
১৯৯২ সালে চট্টগ্রাম ইপিজেড এ একটি আমেরিকান কোম্পানিতে কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে আমার আকর্ষণীয় চাকুরী হয়ে যায়। তাকে পড়াবার দায়িত্ব ছাড়তে হবে। তার বাবা-মা আমাকে অনুরোধ করে, যেভাবেই হউক যাতে করে তাকে পড়াই। আমি পারিনি। জানিনা এটা সবুজের ভাগ্যের বিষয় ছিল কিনা। আরেকজন এমন চৌকশ ব্যক্তিকে পেয়ে যাই। যিনি আমার ছোটকালের বন্ধু, তুখোড় পড়ুয়া, উচ্চ শিক্ষিত, প্রখর মেধাবী ব্যক্তি। বিএ, বিএড ফাষ্ট ক্লাস, এমএ এমএড ফাষ্ট ক্লাস ব্যক্তিটি সবুজের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পায়। যার সাথে আমার বই পড়া ও সংগ্রহের ব্যাপারে সর্বদা অলিখিত প্রতিযোগিতা চলত। তিনি ‘নাজিম উদ্দিন’ বর্তমানে একটি কলেজের প্যান্সীপ্যাল। সবুজের মত শিক্ষার্থীর জ্ঞান সুধা নিবারণে এই ধরনের একজন শিক্ষকই যথেষ্ট। জানিনা তাঁকে কোনদিন ব্লগ জগতে তেমন একটা সক্রিয় দেখিনা। অথচ তিনিও বিরাট ভূমিকা রাখতে পারতেন। পরবর্তীতে প্রবাসে চলে গেলে সবার সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ব্লগ, তথা ‘সোনার বাংলাদেশ ব্লগ’ এ এক তরুণের লিখা আমার নজর কাড়ে। আটার বছর পরে ২০১০ সালে সবুজ কে আমি একজন প্রতিভাবান লেখক হিসেবে পেয়ে যাই।
সবুজের পিতা-মাতা কেমন অমায়িক ও বিনয়ী ছিলেন সেটা না বললে একটু অবিচার হয়। তাঁরা উভয়েই চট্টগ্রামের ধনী ও বনেদী পরিবারের সন্তান ছিলেন। দেয়ালের একপাশে আমি সবুজকে পড়াতাম, ওপাশে সবুজের বাবা তার ছাত্র/ছাত্রীদের নোট করাতেন। প্রতিদিন ভাল নাস্তা দিতেন, যাতে করে কয়েক ঘণ্টা খিদে না লাগে। আমি লজ্জায় মুখ লুকিয়ে রাখতাম, যখন দেখতাম সবুজের বাবা আমার জন্য নিজ হাতে চা এবং নাস্তা বহন করে আনছেন। বাবা না থাকলে স্বয়ং সবুজের মা নিজেই কাজটি করতেন। ঘরে আরো বিকল্প মানুষ থাকা স্বত্বেও কখনও অন্যকে দিয়ে এ কাজ করাতেন না! নিজে সরকারী কলেজের প্রবীণ শিক্ষক হয়েও সন্তানের জন্য রাখা একজন গুরুত্বহীন ব্যক্তিকেও এ ধরনের মর্যাদা দিতে লজ্জাবোধ করতেন না!
আমার ছেলের কাছে সবুজের কিছুটা প্রতিচ্ছবি দেখতে পেতাম। সেও নানাবিধ বিষয় নিয়ে পড়তে অভ্যস্ত। একাডেমিক পড়া ক্ষতিগ্রস্ত হবার ভয় সৃষ্টি হল। সবুজের পড়ুয়া চরিত্রে ইতিবাচক, নেতিবাচক দুটো দিক ছিল। দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণে তা আমি অনেক বেশী বুঝতে শিখেছি। সে জন্য আমাদের ঘরে সবুজের নাম এতবার তোলা হয়েছে যার কারণে আমার ছেলে জুশান আবদুল্লাহ, মনের অজান্তেই সবুজের ফ্যান হয়ে যায়। সবুজও তাকে খুব পছন্দ করে। সে নিজেই পরামর্শের জন্য সবুজের শরণাপন্ন হত। অসুস্থ শরীর নিয়ে সবুজ ও তার একমাত্র মেয়ে আমাদের বাসায় এসেছিল। সেদিন ছবিটি ফ্রেম বন্ধী করা হয়। চলতি আগস্ট মাসের ৮ তারিখ সবুজের সাথে কথা হয়েছিল যে, ২০ তারিখে গ্রামের বাড়ী থেকে ঈদ করে ফিরার পরে বিকাল বেলা তার সাথে আমাদের সবার দেখা হবে। কিন্তু সেই বিকেলে তার লাশের সাথে দেখা হয়েছে। জীবিত সবুজের দেখা পাইনি।
তাদের পরিবার সচ্ছল হলেও, চলমান রোগে কাহিল হয়ে পড়া সবুজ প্রতিদিনের চিকিৎসা খরচ চালাতে হিমসিম খাচ্ছিল। কারো কাছে সাহায্য চাইতে লজ্জিত হত কিন্তু তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছিল। ব্লগার বাহার ও মাসুদ জানাল এভাবে থাকলে সবুজ অকালে মৃত্যুমুখে পতিত হবে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে সবুজের ঘনিষ্ঠ সহচর ব্লগার বাহার, মাসুদ, টিপু, লোকমান, ওসমান গনি ভাই সহ অনেক ক্লোজ বন্ধুরা মিলে, ফেসবুকে তার জন্য সহযোগিতা চেয়ে পোষ্ট দিয়েছিলেন। সাড়া পড়েছিল। বাহার ভাইয়ের সহযোগিতায় তাকে ভারতে পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তীতে এভাবে টাকা সংগ্রহের খবর জানতে পেরে সে খুব লজ্জিত হয়েছিল। ব্যস আর ও পথে পা বাড়ানো হয়নি। তার ভিতরে এত ভয়ঙ্কর রোগে বাসা বেধেছে, মানুষকে বুঝতে দিত না।
বাহার ভাই আমাকে জানিয়েছে। ভারতে যখন ডাক্তারের চেম্বার যেত, তখন তাকে ডাক্তারের কাছে যেতে নিষেধ করত, বাহিরে বসিয়ে রাখত! ডাক্তারেরা সবুজকে জানিয়ে দিয়েছিল তোমার কিডনির দুটো ভাল্বই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। হয় পরিবর্তন নয়ত আজীবন ডায়ালোসিস। এই কথা সে কাউকে জানায়নি, বুঝতে দিত না! তার স্ত্রী তার সাথে থাকত না; দাম্পত্য এই কষ্টের বিষয়টি সবুজ অতি ঘনিষ্ঠ কারো সাথেও শেয়ার করে নি। জানতে চেয়েছিলাম, জানায়নি। আরেকটা মেয়ে ঠিক করব কিনা প্রশ্ন ছিল, রাজি হয়নি। সে নিশ্চিত হয়েছিল, নশ্বর পৃথিবীতে তার সময় খুবই কম। তাই নতুন কাউকে ঝামেলায় জড়াতে চায় নি। হাজারো কষ্ট নিয়েও সে পোষ্ট লিখত, মন্তব্য করত কিন্তু মন্তব্যের ভাষায় ক্ষীণ কণ্ঠেও সবুজ পাঠকদের বুঝতে দিত না, সবুজের দেহে আর সেই প্রাণশক্তি নাই। সুস্থ সবল মনের মানুষদের পোষ্টে সুন্দর আহবান রেখেছে অবিরত। সবুজের মন আজিবন সবুজ ও তরুণ্যময় ছিল। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সদা হাস্য ময়, আমুদে প্রকৃতির সবুজ বুঝিয়ে দিয়েছে। সবার মৃত্যুই সুনিশ্চিত! তবুও যতক্ষণ দেহে প্রাণ আছে ততক্ষণ প্রভুর কৃতজ্ঞতা করো, দুনিয়ার সময়কে কাজে লাগাও।


Discussion about this post