ভদ্রলোকের বেতন বাংলাদেশী আড়াই লাখ টাকার মতন। ঘর-ভাড়া, বাচ্চাদের স্কুল, যাতায়াত, খাদ্যের যোগান মিটিয়ে মাসে মাসে যা জমেছে তাও প্রায় বাংলাদেশী চল্লিশ লাখের সমান। সুখী পরিবার। রোগ-বালাই মুক্ত জীবন। খানা খাওয়ার পরে দাঁতের আয়েশি খিলাল কার্যের সময় ভদ্রলোকের ঝিলিক মারা চেহারা দেখে বুঝা যায়, তিনি কত সুখে দিনাতিপাত করছেন।
এক বন্ধু বুদ্ধি দিল, যত টাকা জমা হয়েছে, তার সাথে আর সামান্য টাকা যোগ করলে অতি স্বত্বর ঢাকা শহরে একটি বাড়ি কিংবা জমির মালিক হওয়া যাবে। কতদিনে ষাট লাখ হবে! সে দিনের জন্য ধৈর্য না ধরে বরং বিশ লাখ টাকা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কর্জ নিন। সুদের পরিমাণও কম। চাকুরী শেষ হবার আগেই প্রিমিয়াম শেষ হয়ে যাবে। ততদিনে চাকুরীও থাকবে আবার জমি-জমার মালিকও হওয়া যাবে। আপনার পদের মানুষ চাওয়া মাত্রই কোটি টাকার কর্জ তিন দিনের মাথায় ঘরে পৌছবে। তাছাড়া ব্যাংকের রিপ্রেজেন্টেটিভ গুলো তো, হর হামেশা সুদি কর্জ ধরিয়ে দেবার জন্য তো, শুধু পায়ে পড়াটা বাকি রেখেছে।
এমন সুখের স্বপ্নে ভদ্রলোক নড়ে চড়ে বসলেন। ভাবলেন, এতদিন তিনি কত বড় বোকাই না ছিলেন। বোকামির দিন শেষ, চালাকি জীবনের শুরু! তাই খুশির খবরটি গায়ে পড়েই জানালেন। আমি তার প্রতিবেশী, পদবীতে নিচে, বয়সে ছোট। সকল কাজে নেতিবাচক কিছু দেখেই থাকি। এ কুট বদনাম আমার আছে। তারপরও বাধা দিলাম তাকে। বুঝালাম, এ কাজে ইহ জনমেও যোগ দিবেন না। ধৈর্যের সাথে শান্তিতে বসে, ঘুমিয়েই তিলে তিলে চল্লিশ লাখ টাকা জমিয়েছেন! একদিন দেখবেন ষাট লাখ টাকা হয়ে গেছে। এ টাকায় বরকত বেশী। এ ধরনের পরিশুদ্ধ টাকার মাধ্যমে যা খাবেন, তাতেই কল্যাণ পাবেন। আপনার পরিবারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের মুলেই হল এই খাটি টাকার প্রভাব। আপনার সহপাঠীদের সকলের বাচ্চারা উচ্ছন্নে গেছে কিন্তু আপনার বাচ্চারা অনুগত। অল্পতেই তৃপ্ত। এ সবই আল্লাহর ইচ্ছা। তিনি বলেছেন, যারা নিরেট নিজের উপার্জিত, হালাল অর্থের মাধ্যমে নিজের পরিবারের ভরন পোষণ চালায়, তাদের তিনি অপদস্থ করেন না।
ভাবছিলাম, জমানো টাকার জাকাত কোনদিন দিয়েছিল কিনা প্রশ্নটা করি। কিন্তু তার আগেই তিনি বলে বসলেন, আমি তো মাঝে মাঝে তবলিগে যাই। বহু বন্ধুরা এভাবে কর্জ নিয়ে আজ সুখী হয়েছে, কই তারা তো এটা নিয়ে এত কথা তুলে নি? অদ্ভুত যুক্তি! তাকে বুঝালাম, দেখুন বাহিরের চেহারা দেখে সুখী মানুষ নির্ণয় করা যায় না। সকল মৃত ব্যক্তির চেহারাই প্রশান্ত, তাই বলে সবাই সুখী ছিলেন এমন ধারণা সঠিক নয়। তাছাড়া, তাবলীগের কেউ বলেনি বলেই যে, এটা আপনার জন্য সঠিক ও সত্য এভাবে বুঝা তো ঠিক না। আপনি নতুন বলে হয়ত বলেনি, সময় হলে বলত। আমি তো বহু তাবলীগের ভাইদের দেখেছি, তারা সুদে কর্জ করেনা। কে শুনে কার কথা! দীর্ঘদিন জাকাত না দেবার প্রভাবে হউক, শয়তানের প্ররোচনায় হউক। তার জমানো টাকাটা কিভাবে খরচ করে ফেলা যায়, সেটার জন্য প্রায় পাগল হয়ে উঠলেন। ঢাকা শহরে জমি আর প্লট বাতাসে উড়ছে। এই মাসে টাকা দিলে আগামী মাসেই তিনি ঢাকার জমিদার হয়ে উঠবেন। এই সুবর্ণ সুযোগ জীবনে একবারই আসে। সুতরাং অপেক্ষা কেন।
মোটা পরিমাণে কর্জ নিলেন। এ দেশের ব্যাংক গুলো মানুষকে সুদি কর্জ ধরিয়ে দেবার জন্য অতিষ্ঠ করে তুলে। আমি তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী। দৈনিক কমপক্ষে দুটো ফোন আসবেই। তাহলে বছরে কত? সকাল নাই, দুপুর নাই, রাত নাই; অসময়ে ফোন বেজে উঠে। জনাব আপনাকে আমরা, সহজ শর্তে, কম ডকুমেন্টে, এত টাকা কর্জ দিতে চাই। কর্জ নেবার পরে প্রথম চার মাস সুদই দিতে হবে না। ইত্যাদি। দ্বিতীয়বার যাতে ফোন না করে, সেজন্য ইচ্ছেমত বকাবকি করলেও এদের শরম লাগেনা! আবারো অন্য ফোন নম্বর থেকে, অন্য কাউকে দিয়ে করাবে। কর্জ নিলে হোটেলে খানার বিল অর্ধেক কম। পাঁচতারা হোটেলের সেলুনে ম্যাসাস ফ্রি। মলে গেলে গাড়ী রাখার সুবিধা। বাকিতে জিনিষ কিনতে সুবিধা, স্বর্ণ কিনতে আরো বেশী অফার। এসব অফারের লম্বা তালিকা সমৃদ্ধ আলাদা একটি বই থাকে। ভুলে যদি তাদের কথা মন দিয়ে একবার শুনেছেন তো, কর্জ পকেটে ঢুকিয়ে দিয়েই ছাড়বে। সুতরাং এ ধরনের দেশে, এত সহজ শর্তের কর্জের লোভ কে ছাড়ে। যখন কেউ রাজধানী শহরের একটি প্লটের মালিক হবার স্বপ্ন দেখছেন, তিনি তো গায়ে পড়ে উষ্ঠা খেয়েই সেই গর্তে পড়বেন।
পরবর্তী ইতিহাস সংক্ষিপ্ত। ছয় মাস কোম্পানির বেতন অনিয়মিত হয়ে পড়ে। মাসের নির্দিষ্ট সময়ের আগেও নয়, সুনির্দিষ্ট সময়ের পরেও নয়। কিস্তি দিতে দেরী হলেই বিরাট অংকের জরিমানা। জরিমানা তো আছেই, আবার সেই জরিমানার সুদ, কিস্তির সুদ, কিস্তির আয়তন বৃদ্ধি, দ্বিতীয় মাসের কিস্তি সমেত দ্বিগুণ চাপ। এভাবে ছয় মাসেই তার উপর মাসিক কিস্তির যে চাপ সৃষ্টি হল তা তার মাসিক বেতনের আয়তনের চেয়েও বড় আকার ধারণ করে। ওদিকে জায়গা নিতে গিয়ে সহনীয় পর্যায়ের চেয়েও একটু বাড়তি টাকার চাপ বানিয়েছিল। মাসে মাসে পরিশোধ করবে বলে। সেটাও হুমকির মধ্যে পড়ল। সুদের কর্জ নিয়ে, মানুষ এই পরিস্থিতির গ্যাঁড়াকলে পড়ুক! সুদি লগ্নি-কারীদের এটাই একমাত্র দোয়া। তাদের কামনা, কর্জ-দার যেন কোনমতেই মূল টাকাটা পরিশোধ করতে না পারে এবং সারাজীবন কিস্তির সুদ দিতেই ব্যস্ত থাকে। ব্যাংকও তার ব্যতিক্রম নয়। তারা কর্জ-দারের সুবিধার্থে, সমুদয় কর্জ, জরিমানা, সুদ যোগ করে নতুন একটি কিস্তি বানিয়ে দেয়। মাসিক কিস্তির টাকাটা কম দিতে চাইলে, কিস্তির পরিমাণ যায় বেড়ে। আবার কিস্তি কমাতে চাইলে টাকাটা হাতির আকার ধারণ করে কাঁধে চেপে বসে। ইচ্ছা থাকলেও পরিশোধ করাটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। সে কারণে ইসলাম সুদের সাথে জড়িত সকল কর্মকাণ্ডকেই হারাম করেছে। পরকালে এসব মানুষ কোন অবস্থাতেই আল্লাহর করুণা পাবেনা, তারা সবাই বিনা দ্বিধায় জাহান্নামে যাবে এবং চিরকাল সেখানেই তার অবস্থান হবে।
এত টাকার বেতন পেয়েও ভদ্রলোক আর নিজেকে সামলে রাখতে পারেনি। অতিরিক্ত আয়ের জন্য রাতে আরেকটি কাজ জুটানো। কখনও অফিসে গড় হাজিরা, হাজির হলেও কাজে ভুল করা, সাধারণ কাজেই রাগান্বিত হওয়া, অধীনস্থদের প্রতি খামখেয়ালী পনা আচরণ সহ নানাবিধ মানসিক যাতনা বেড়ে যায়। পরিবারে শান্তি উড়ে যায়। গোস্বা করে স্ত্রী-পুত্রদের পনের দিনের মধ্যেই দেশে প্রেরণ। বিশ বছরের প্রবাসী সংসারে বিরাট ছন্দপতন কেউ মানতে পারছিল না। সন্তানেরা ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র। বাংলাদেশে তার খরচ আরো বেশী। কোম্পানিতে চাকুরী ইস্তফা দিলে বিশ লাখ টাকার মত গ্রাচুয়িটি পাবে। সেটাই শেষ ভরসা। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে, কোম্পানির কাজে অমনোযোগিতার ফলে তিনি বিরাট ক্ষতি করে বসেন। ফলে কোম্পানিতে তার চাকুরী শেষ। উল্টো মামলা দিয়ে পুলিশী হয়রানী সৃষ্টি হয়। এখন ব্যাংক ও কোম্পানি দু’দিকেই শত্রু। দাড়ি রেখে রবীন্দ্রনাথ বনে গিয়েছিলেন বহু আগেই! হাতে তসবিহ সমেত, মসজিদ থেকে বের হয়ে মানুষকে বোঝাতেন, আল্লাহ নাকি প্রবাসীর দোয়া কবুল করেন! কই, এত দোয়া করলাম কবুল তো হলো না।
অবশেষে দোয়া কবুল হল, তিন বছরের ফেরারি জীবন শেষে রিক্ত হস্তে, কপর্দক হীন হয় খ্যাতিময় এই ব্যক্তি দেশে ফিরে আসেন। স্ত্রীর সাথে দা-কুমড়া সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তিনি নিজের অস্তিত্ব ঠিক রাখতে কোন এক এনজিও থেকে বিনা ডকুমেন্টে কঠিন শর্তে কর্জ নিয়েছেন। সেটাও ফুলে ফেঁপে একাকার। এবার নতুন পরিবেশে সুদের বিরুদ্ধে, তাকে নতুন আরেক যুদ্ধে লিপ্ত হতে হবে। কিন্তু তার চেয়েও বড় দুঃচিন্তা, তখনো রিয়েল এস্টেট কোম্পানি তার জমিটি তাকে বুঝিয়ে দেননি। ভদ্রলোক তসবির দানা গুনে গুনে হিসেব মেলায়, কোথায় তিনি ভুলটি করেছিলেন! বুঝে উঠতে পারেন না। কিভাবে কি করে পুরো জীবনটাই উল্টে পাল্টে গেল। অথচ তার যোগ্যতা, দক্ষতা, শারীরিক ক্ষমতা এখনও ঠিক আগের মতই কিন্তু ভাগ্য তাকে বিড়ম্বিত করেছে। মূলত সে নসিহত শুনেনি, সে তার অতীতের সফলতার মূল কারণ নিয়ে ভাবেনি। যা তাকে সুখী করেছিল। লোভে পড়ে চরম অধৈর্য হয়ে উঠেছিল। আর অধঃপতনের জন্য ধৈর্য-হীনতাই যথেষ্ট। আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, তুমি যদি কৃতজ্ঞ হও তাহলে তোমাকে বাড়িয়ে দেওয়া হবে, আর (কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে) অস্বীকার করলে কঠিন শাস্তির মোকাবেলা করতে হবে (সবই কেড়ে নেওয়া হবে)।


Discussion about this post