তিনি একটি রিক্সার উপরে বহু কষ্ট করে বসেছিলেন। রিক্সার পাটাতনের উপরে বিরাট এক বস্তা, পা দু’টো তার উপরে রাখা। এক হাতে রিক্সার হুড ধরা, অন্য হাতে শক্ত করে ধরা বইয়ের আরেকটি বান্ডিল। আমাকে আসতে দেখেই রিকশাওয়ালাকে আগেই থামতে বলেছিলেন, আমিও যাতে তার কাছাকাছি থামি সে কারণে হাত দেখালেন।
রিক্সার কাছাকাছি হতেই নজরে পড়ল, পিছনে দড়ি দিয়ে বাধা আছে সর্ববৃহৎ বইয়ের বস্তাটি! চোখ ছানাবড়া! এত বই দিয়ে বেটা করবে টা কি? কোন মতেই মাথায় ঢুকছিল না। এসব বই দিয়ে ছোটখাটো একটা লাইব্রেরী বানানো যাবে। চট করে মাথায় একটা কথা আসল; নিশ্চয়ই সে বইয়ের দোকান দিবে। বইয়ের সকল বাণ্ডিলে এক পশলা চোখ বুলিয়ে নিলাম। কিছু বই রসি আর বস্তার কঠিন বাধন ঠেলে হাঁস-ফাঁস করে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করে দিচ্ছে। আমি রিক্সা ড্রাইভার, যে প্রেম নীরবে কাঁদে, ট্যাক্সি ড্রাইভারের প্রেম, প্রেমের চিঠি, সমেত নানা বইয়ের নাম দেখে যা বুঝলাম, তা হল, রাস্তার পার্শ্বে হকারেরা জায়গা দখলে নিয়ে মাটিতে পাটি পেতে বই বিক্রি করে। এধরনের কোন এক হকার থেকে পুরো বইয়ের অস্থায়ী দোকানটাই ফজলুর রহমান রিক্সা-বন্ধী করে বয়ে নিয়ে এসেছে!
আমাকে প্রায় ধমকের সূরে বললেন, কি বুঝলেন? আমি সম্বিৎ ফিরে পেলাম এবং অতি কৌতূহলে ফজলুর প্রতি নজর দিলাম। তিনি গরু গম্ভীর চেহারায় জানালেন, আগামীকাল থেকে যেন তার ছাত্রীদের কাছে আর বই না পাঠাই। তারা চাইলেও যেন সোজা বলে দেই, কোন বই-টই নাই! থাকলেও দেওয়া যাবেনা!
মনে মনে হাঁসলাম এবং সেই পুরানো প্রবাদের কথাই মনে করলাম, “বই পড়লেই কাউকে শিক্ষিত বলেনা”।
তিনি আমার সিনিয়র, কয়েকদিন ধরেই তার সাথে ভাব জমানোর চেষ্টা করছিলাম কিন্তু বেজায় মুড নিয়ে চলাফেরা করেন বলে ধরতে পারছিলাম না। তিনি তেমন বড় কোন ব্যক্তি নয়। এলাকার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির ঘরের লজিং মাষ্টার ফজলুর রহমান। থার্ড ইয়ারের ছাত্র। আমি ফাস্ট ইয়ারের ছাত্র হিসেবে সে এলাকায় সবে মাত্র ঢুকেছি। সে হিসেবে তিনি সিনিয়র আমি জুনিয়র। শুরুতেই বুঝার চেষ্টা করেছিলাম ব্যাপারটিতে রেগিং সম্পর্কিত কিছু আছে কিনা!
কাকতালীয় ভাবে বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছিল। আলীয়া মাদ্রাসায় পড়ুয়া আবদুল মালিক আমাকে পেয়ে বেজায় খুশী। দুটো কারণে। প্রথমত, তিনি নতুন বইয়ের জোগান পাবেন, পড়ার সখ সহজে মেটাতে পারবে। দ্বিতীয়ত, এলাকার স্কুল-কলেজের বই পাগল ছাত্র-ছাত্রীরা, সদা মিশুক, হাস্যময় আবদুল মালিকের কাছে নতুন বই পড়তে চায়। অসচ্ছল আবদুল মালিকের পক্ষে তাদের চাহিদানুযায়ী বইয়ের জোগান দেওয়া অনেকটা কঠিন। আমার মাধ্যমে তাদের পাঠের ক্ষুধা অনেকটা মেটানো যাবে এই চিন্তায় তিনি যারপরনাই খুশী ও আনন্দিত।
ছোটকাল থেকেই বই পড়ার প্রবল ঝোঁক ছিল। ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হবার জন্য কলেজে গিয়েছি, সাথে বাছাই করে নিয়ে গিয়েছি প্রায় আড়াই শতাধিক বই। আবদুল মালিক আমার সিনিয়র, এখন তিনি কলেজে পড়েন। মাদ্রাসায় পড়ার সময়ে আমার সংগৃহীত বইয়ের অনেকগুলো পড়েছিলেন। সে জানার সূত্র ধরেই আবদুল মালিক আশান্বিত হয়েছিলেন যে, এবার এই এলাকার ছাত্র ছাত্রীদের বাহ্যিক বই পড়াবার একটা বিরাট সুযোগ সৃষ্টি হল।
এলাকায় আমি একেবারেই নতুন, কারো সাথে পরিচয় হবার সুযোগ পাইনি। আবদুল মালিক আমাকে এলাকার প্রায় সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বিশেষ করে বই পড়ায় অভ্যস্ত বা পড়তে আগ্রহী এমন ছাত্র/ছাত্রীদের সাথে যোগাযোগের ব্যবস্থা করিয়ে দিলেন। পরিচয় পেয়ে এলাকার ধনীর দুলালী দুই সুন্দরী তরুণীও বেজায় আপ্লুত হলেন।
আমার সংগ্রহের সকল বই আমারই পড়া ছিল। তাই পাঠকের বয়স, রুচি, চিন্তা, পরিবেশ অনুযায়ী বই পাইয়ে দেবার দক্ষতা স্কুল জীবন থেকেই সৃষ্টি হয়েছিল। সে হিসেবেই বই দিতাম। ফলে পাঠকেরা গোগ্রাসে বই পড়ত। মাসের শেষে দেখতাম কিছু পাঠক আমাকেও হার মানিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।
বইয়ের জন্য সবাই আমার কাছে আসত না। কারো মাধ্যমে চেয়ে নিত, আমি শুধু বয়স জিজ্ঞাসা করতাম আর কতটুকু লেখাপড়া করেছে সেটা জানতে চাইতাম। সে হিসেবে বই বাছাই করে দিতাম। কেননা তখনকার সময়ে অনেক গৃহবধূরাও বই পড়ত। ক্লাস সিক্স-সেভেন পর্যন্ত পড়েছে এমন গৃহবধূরা বেশী পড়ার আগ্রহ দেখাত। আমার জানা না থাকলেও ফজলুর রহমানের ছাত্রীরাও আমার বই সংগ্রহ করে রীতিমত পড়ে যাচ্ছিলেন। ছাত্রী ও শিক্ষকের মধ্যে কি হয়েছে জানিনা কিন্তু ফজলুর রহমানকে কয়েক বস্তা বই আনতে দেখলাম এবং পথিমধ্যে তিনি আমাকে এভাবেই ধমকিয়ে ছিলেন!
আবদুল মালিক জানিয়েছিলেন, ফজলুর রহমান ধনী লোকের সন্তান। তার ইচ্ছা এই বাড়ীটাকে শ্বশুর বাড়ী বানাবে। তলে তলে এগিয়েছেও অনেক। আমি এখানে আসার পরে তার গ্রহণযোগ্যতায় টান পড়েছে। সে তার ছাত্রীদের বই পড়তে নিরুৎসাহিত করছিল কিন্তু ছাত্রীরা বারে বারে নির্দেশ উপেক্ষা করে আরো বেশী বই পড়ে যাচ্ছিল। সে অবস্থা সামলাতেই ফজলু নিজের গ্যাঁটের টাকা খরচ করে পুরো দোকানের বই কিনে ছাত্রীদের ধরিয়ে দিয়েছিলেন! এতে ফজলুর রহমানের অবস্থা আরো সঙ্গিন হয়ে পড়ে। তার ছাত্রীরা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে বলে বসল, আপনার এসব বই আমরা পড়ব না। এগুলো কি সব বই! ‘যৌবনের ঢেউ’ ‘প্রেমের নীরব কান্না’। এগুলো কি পড়া যায়, না আছে রুচি আর না আছে শিক্ষণীয় কাহিনী। যাই হোক বেচারা ফজলুর পক্ষে আর তাদের জামাই হওয়া সম্ভব হলনা, সে বাড়ী ত্যাগ করতে হয়েছিল। এ ঘটনা আমাকে যথেষ্ট পীড়া দিয়েছিল। যদিও ততদিনে তাদের ঘরে বই বিতরণ বন্ধ করে দিয়েছিলাম।
বই প্রেমের কাছে মানবীর প্রেম যে পরাস্ত হবে সেটা ফজলু বুঝতে পারেনি। ফজলু নিজেও কোনদিন বই পড়েনি তাই তার ছাত্রীদের মনোভাবও বুঝতে পারেনি। একজন বই পড়া মানুষ তলে তলে নিজের অজান্তে অনেক প্রাজ্ঞ ও বিচক্ষণ হয়ে উঠে। কিছুদিন পরেই তার সহযোগী বন্ধুরা বুঝতে পারে তার কথার ওজন বেড়ে যাচ্ছে। মুরুব্বীরা তাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। সে সময়ে ঘরে ঘরে যেভাবে বইয়ের কদর ছিল বর্তমানের তার কানাকড়িও নাই। বিয়েতে উপহার হিসেবে বইয়ের স্তূপ পড়ত। নববধূ স্বামী সংসারের প্রথম দিকে সেই বই পড়েই সময় কাটাতেন।
শুধুমাত্র স্কুল-কলেজের বই পড়ে সত্যিকার অর্থেই কেউ জ্ঞানী হতে পারেনা। তাদের বাস্তব জ্ঞান থাকবে সীমাবদ্ধ এবং প্রজ্ঞায় থাকবে অপরিপক্ব। বই পড়া হয় অন্যের অভিজ্ঞতায় দুনিয়া দেখার জন্য। অন্যের শেখা জ্ঞান আহরণ করার জন্য। যারা এসব থেকে দূরে থাকে, তারা মানুষ ও সমাজের চরিত্র-চাহিদা বুঝতে অক্ষম হয়। ফজলুর রহমানের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল, সে শুধু সিলেবাসের বই পড়েছে, বাহ্যিক সাহিত্য পড়েনি! সে শিক্ষক ছিল বটে কিন্তু কিশোর মনের আকাঙ্ক্ষা পড়তে ব্যর্থ হয়েছে। এ ধরনের মানুষ যদি কখনও স্কুল কিংবা মাদ্রাসার শিক্ষক হয়ে যায়, তাহলে ছাত্রদের বেত্রাঘাত, পদাঘাতের মাধ্যমেই পাঠ দান করতে থাকে। এতে না নিজের উপকার হয় না কাউকে যথাযথ শিক্ষা দিয়ে মানুষ বানাতে পারে।

Discussion about this post