আমাদের দিনে ছোটদের ঈদের সময় টাকা পয়সা খরচ করার কোন রাস্তা ছিলনা। বর্তমান যুগের মত প্লাস্টিক সামগ্রীর নানা খেলনা সামগ্রীও তখনকার দিনে ছিলনা। বয়সে যারা বড়, তারা শহরে গিয়ে সিনেমা দেখে আসত। ছোটরা আত্মীয় স্বজনের বাড়ী ঘুরে আনন্দ করত। তখনকার দিনে ছাত্ররা কলেজে যাওয়া মাত্রই হাতে সিগারেট নিত। কলেজ ছাত্র সিগারেট না খেলে কাপুরুষ ভাবা হত! কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সিগারেট হাতে যথেষ্ট ব্যক্তিত্ব-বোধ নিয়ে চলতে দেখতাম!
অতি বুদ্ধিমান ছাত্ররা দামী সিগারেটের একটি খালি প্যাকেটে স্টার, রমনা, আবুল বিড়ি, তারা বিড়ি ও রোথম্যান্স সহ বিভিন্ন কোম্পানির মিশ্রিত বিড়ি শলাকা রাখতেন। পরিস্থিতি অনুসারে ব্যক্তিত্ব বাড়ানোর তাগিদে, যুতসই কোম্পানির একটি সিগারেট বের করে আগুন ধরাতেন! কলেজ পড়ুয়া এসব ছাত্রদের অভিব্যক্তি নিম্ন বিদ্যালয়ের ছাত্রদের উপর প্রভাব পড়ত। ফলে তারাও কদাচিৎ গোপনে নদীর তীরে, ঝোপ-ঝাড়ে, বাঁশ বাগানে গিয়ে বিড়ি কর্ম সারতেন। এভাবে লুকিয়ে বিড়ি টানার খসরত মুরুব্বীরা দেখে ফেললে তো মুসিবত হতই, তবে ঈদের দিনে এরকম ঘটলে, মুরুব্বীরা দেখেও না দেখার ভান করতেন।
সিগারেট পান করা, বর্তমানে একটি বদ অভ্যাস কিংবা বিশ্রী স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত হলেও; আমাদের সময়ে সেটা তখনও হয়ে উঠেনি। স্কুলের প্রায় শিক্ষকেরা প্রকাশ্যে বিড়ি টানতেন! আমাদের হেড মাষ্টার মহোদয় পড়ানেরা ফাঁকে ফাঁকে শ্রেণীকক্ষেই হুক্কায় টান মারতেন! ছাত্রদেরকে কখনও সারের হুকোর কলকিতে আগুন ধরানো লাগত।
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গোল্ড ম্যাডালিষ্ট পাশ করা, আমাদের কলেজ প্যান্সিপ্যাল রীতিমত হুঁকো আর চুরুট সমান তালেই টানতেন! (অবশ্য তিনি আমার শিক্ষক ছিলেন না, আমার বড় ভাইয়ের শিক্ষক ছিলেন এবং আমাদের পাশের গাঁয়ের মানুষ ছিলেন) যাক, বড়দের বদনাম করার উদ্দেশ্যে এই লিখা নয়, লিখাটি শুরু হয়েছে বিড়ির আগুন হাওলাতের ঘটনা নিয়ে।
কয়েক বন্ধুর প্রভাবে সামনের ঈদে বিড়ি জ্বালিয়ে আনন্দ করার সিদ্ধান্ত হল। তারা আমাকে নিয়ে সন্দেহের ঘোরে ছিল, পাছে যদি ব্যাপার খানা বড়দের কাছে প্রকাশ করে দিই! পর পর কয়েকদিনের প্রশিক্ষণের পর তারা নিশ্চিত হল যে, এই কথা আমি কাউকে তো বলবই না বরং আমি নিজেও আবুল বিড়িতে আগুন ধরিয়ে ধূমপান পর্ব উদ্বোধন করব! বিড়ি-দেয়াশলাই কেনার দায়িত্ব একজন নিয়ে নিলেন। ঈদের দুপুরে সবাই একত্রিত হলাম, বাছাই করলাম হালদা নদীর তীরে ঝোপ-ঝাড়ের বনে ঢুকেই বিড়িতে আগুন জ্বালানোর শুভ উদ্বোধন পর্ব শুরু হবে।
একদা সময় পেলে, এই বনে কত লুকোচুরি খেলেছি তার ইয়ত্তা নেই, আজ সবাইকে ফাঁকি দিয়ে বিড়ি টানতে হবে, কেন জানি বুক ধড়পড় করছে। ‘আসলে অন্যায় কাজে মানুষ প্রকৃতিগত ভাবেই ভয়-ভীতি অনুভব করে’। কোথাও জন মানুষের সাড়া নেই, তারপরও সতর্ক হতে শতভাগ চেষ্টিত হলাম। একপর্যায়ে টুপ করে বনের ভিতরে ঢুকে পড়লাম।
কোথায় বসে বিড়ি টানা হবে, সে স্থান আগেই থেকেই, আমাদের সবার প্রিয় ইঁচড়ে পাকা বন্ধু ঠিক করে রেখেছিল! ইতিমধ্যে সবাই যার যার মত বিড়ি ধরিয়েছেন, আমিও আগুন জ্বালাতে প্যাকটিস শুরু করলাম।
কথা নেই, বলা নেই, মুহূর্তেই কে একজন হুড়মুড় করে বনের ভিতরে ঢুকে পড়লেন! আমরা কি করব, কি করা উচিত, কিছু বুঝে উঠার আগেই, তিনি আমাদের ঠিক তিন হাত দূরে, সবার নাকের সামনে পুরোপুরি দিগম্বর হয়ে বসে গেলেন!
বুঝতে পারলাম ঈদের খানাটি তিনি একটু বেশী পরিমাণেই বেশী গিলে ফেলেছেন! তাই পথিমধ্যে পায়খানার উপদ্রব হওয়াতে, হঠাৎ সিদ্ধান্তে বনে ঢুকে পড়েছেন! তার উপায় ছিলনা কিন্তু আমরা যে উপায়ান্তর পাচ্ছিনা সেটা বুঝাই কেমন করে! আগন্তুকের তাজা মলের উৎকট গন্ধে আমাদের যায় যায় দশা। আবুল বিড়ির ঝাঁঝালো তীব্র গন্ধের প্রতি আক্রমণে মলের গন্ধ কিছুটা হলেও ভাটা পড়ছিল। ভাগ্যিস! বিড়ির কল্যাণে চিল্লিয়ে বমি করার ইচ্ছেটা কিছু হলেও রোধ করতে পারলাম।
ওদিকে আগন্তুক প্রথম মিনিট একটু বে-ঘোড়ে ছিলেন। শরীর একটু বিপদমুক্ত হবার পর চিন্তা করা শুরু করলেন, তিনি কোথায় বসেছেন? জায়গাটা সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিতে চেষ্টা করলেন। বিড়ির গন্ধের কারণে তার কিছুটা সন্দেহ তৈরি হয়েছিল! তাই স্থানটি ভাল ভাবে জরিপ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
জরীপ কাজের শুরুতেই তার চক্ষু যেন বিস্ফারিত হতে চাচ্ছিল। তিনি চোখ বড় করেই দেখতে পেলেন, তার একেবারে সামনেই কয়েকজন কিশোর ওঁৎপেতে বসে আছে এবং সবাই তার দিগম্বর শরীর দেখে ফেলেছে! মুহূর্তেই তিনি লাফ দিয়ে উঠলেন! চিৎকার করে বলে উঠলেন, তোমরা এখানে কি করছ? তোমাদের হাতে বিড়ি কেন? তোমরা চুরি করে জঙ্গলে বিড়ি পান করছ এসব কথা তোমাদের পিতা-মাতা ও স্কুলের স্যারদের কাছে বলে দিব!
মলের গন্ধ আর বিড়ির গন্ধের তীব্র উৎকট পরিবেশে আমরা সবাই তার কাছে মাফ চাইলাম ভবিষ্যতে কখনও এই দুষ্কর্ম করব না! আজকে যাতে আমাদের ক্ষমা করে দেন! তিনি আমাদের বিড়ি গুলো হাতিয়ে নিলেন, সবার পকেটে যত টাকা আছে তা বের করে তার হাতে দিয়ে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকার নির্দেশ দিলেন! যার যত টাকা, বিড়ি, দেয়াশলাই ছিল সবই তার হাতে গছিয়ে, জঙ্গলি বিচারকের কোমরের নিচের দিকে তাকিয়ে, কান ধরে দাড়িয়ে রইল। অন্যায় কাজের, অন্যার্য বিচার করতে, যিনি জঙ্গলকে বানিয়েছে বিচারালয়; সেই বিচারপতির কিন্তু খবর নাই যে, তিনি পরিপূর্ণ উলঙ্গ হয়েই আসামীদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। সেই পরিস্থিতিতে একজন আসামীর পকেটে টাকা না থাকায়, তিনি অতি ভয়ে বললেন আমি তো বিড়ি খাইনি, আপনি আমার বাবাকে বলবেন না!
তখনই আগন্তুকের মনে হল, আরে তিনি তো পুরোটাই উলঙ্গ! আমাদের সামনে উলঙ্গ দাঁড়িয়েই তিনি বিড়ির আদালতের বিচার করছেন! কিংকর্তব্য বিমুঢ় আগন্তুক একটু সময় নিলেন এবং লজ্জায় পড়ে ভৌঁ দৌড় দিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই সেখান থেকে পালালেন! আমাদের বিড়ি, টাকা, পয়সা সবই তার সাথে চলে গেল! আমাদের কেউ চিল্লাতে পারল না! প্রতিবাদ করতে পারল না! এমনটি ঘটনাটি কোন মুরুব্বীর কানে তোলা গেলনা! কেননা জঙ্গলের সেই বিচারক আর কেউ নয়, তিনি আমাদের স্কুলের দপ্তরি মানিক!
দুই মাস ধরে পরিকল্পনা এঁটেছিলাম, ঈদের দিন বিড়ি পান করব। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় ঈদের পুরো আনন্দটাই মাটি হয়ে গেল। বিকেল বেলায় বন্ধুরা যে যার মত চলে যেতে থাকল, সন্ধ্যে অবধি তিন বন্ধু একত্রিত ছিলাম। ইঁচড়ে পাকা বন্ধুটির কাছে আরো এক প্যাকেট বিড়ি রক্ষিত ছিল, সেখান থেকে তিনটি বিড়ি আনা হল। দরকার একটি যায়গা এবং একটু আগুন।
সিদ্ধান্ত হল রাতের অন্ধকারেই বিড়ি পান করা হবে, কেউ কাউকে চিনবে না, পরিপূর্ণ স্বাধীনতার মাধ্যমেই বিড়ি পান করা যাবে। দরকার শুধু সময়মত একটু আগুন। সন্ধ্যা নেমেছে অনেক আগেই, রাতের আঁধার ঘন হয়েছে। বাজার থেকে কোথাও আগুন সংগ্রহ করা গেল না। কি করা যায় চিন্তা চলল। গ্রামের বাজার গুলোতে সিগারেটে আগুন জ্বালানোর জন্য, দোকানের সামনে একটি রসি লটকানো থাকে, তার এক প্রান্তে চলমান আগুন পাওয়া যায়। ধূমপায়ীদের পকেটে দেয়াশলাই থাকলে সমস্যা নেই, না থাকলে অভ্যস্ত ধূমপায়ীরা রসির আগুন থেকে সিগারেট ধরিয়ে কর্মমূখো হন।
সিগারেট জ্বালানোর আরেকটি পথ আছে, রাস্তায় ধূমপান রত কাউকে পেলে, তার সিগারেটের আগুন হাওলাত করে, নিজের বিড়িটি জ্বালিয়ে নেওয়া যায়।
‘আবহমান কাল ধরে বাংলার মানুষকে, বিড়ির আগুন হাওলাত দেবার ক্ষেত্রে, সকল ধূমপায়ীকে উদার অবস্থায় পাওয়া গেছে’
দোকানের রসি থেকে বিড়ি জ্বালানোর পদ্ধতি আমাদের জন্য বিপদজনক হতে পারে বলে সবাই মত দিল। কেননা আমাদের সবাই চেনে তাই মুহূর্তেই সে খবর দশ কান হয়ে পিতা কিংবা স্কুল শিক্ষকের কাছে চলে যেতে পারে। তাই এই বিপদজনক সিদ্ধান্তটি অগ্রহণযোগ্য হল। অন্য আরেকটি বাকি থাকল, রাস্তায় কারো নিকট থেকে আগুন হাওলাত করেই বিড়ি জ্বালানো! এই নির্ভরতায় তিন বন্ধু বাড়ির উদ্দেশ্যে অন্ধকারে পা বাড়ালাম।
দুর্ভাগ্য আমাদের! অন্ধকার জনশূন্য রাস্তায় একজন ধূমপায়ী পথিকেরও সন্ধান পাওয়া গেলনা! ওদিকে বাড়ীর দূরত্বও কমে আসছিল। একটু পরেই রাস্তার তিন মোহনা। সেখান থেকে তিন বন্ধুকে তিন-দিকে বাড়ির উদ্দেশ্যে পৃথক হয়ে যেতে হবে।
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘুটঘুটে অন্ধকারে দেখা গেল, সামনেই অনতিদূরে একটি আগুন কণিকা উঠা-নামা করছে। নিশ্চিত হলাম কেউ একজন সিগারেট টেনে এদিকে আসছে। আমরা তিন রাস্তায় মাথায় দাঁড়ালাম। অন্ধকারের অদেখা-অচেনা আগত ধূমপায়ী একটু দূরে থাকতেই, একজন অগ্রিম বলে বসল, ‘ভাই একটু আগুন দিয়ে যাবেন’।
আগন্তুক অন্ধকারে আমাদের সামনে দাঁড়ালেন, আগুন হাওলাত দেবার ইচ্ছা আছে বলে বুঝা গেল কেননা আগন্তুক নিজেও পথিমধ্যে বহুবার এ সুযোগ অন্যদের থেকে গ্রহণ করেছেন। সিগারেট যাতে ভাল ভাবে জ্বলে উঠে সে জন্য পুরো সিগারেট আমাদের দিকে বাড়িয়ে দেয়ার আগ মুহূর্তে আগন্তুক আরেকটি সুখ টান দেবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। সিগারেটে ঠোঁটে লাগিয়ে কষে একটি সুখ টান দিলেন! আগুন অতিমাত্রায় জ্বলে উঠল, হালকা আগুনের আলোকচ্ছটায় পথিকের চেহারার একটি অবয়ব ফুটে উঠল। ‘চেহারাটা চেনা চেনা মনে হল’!
চেহারাটা কার সিদ্ধান্ত নেবার জন্য তিন সেকেন্ড সময় নেওয়া হল। হায়-হায়-রে! সর্বনাশ! ইনি তো আমাদের স্কুলের গণিতের শিক্ষক! যেমনি কড়া, তেমনি বদমেজাজি!
উপস্থিত সিদ্ধান্তে আমাদের একজন বলে উঠল, ভাগ! সম্বিৎ ফিরে পেয়ে, এক মুহূর্তের মধ্যে তিন জন রাস্তার তিন দিকে গভীর অন্ধকারে ভৌঁ-দৌড়! ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতের অসম্ভব নিস্তব্ধতার মাঝে হঠাৎ কি হল, শিক্ষক মহোদয় ব্যাপারটি বুঝতে চেষ্টা করলেন!
অতঃপর তিনি অন্ধকার লক্ষ্য করে বললেন, ভাই আগুন নিবেন না? আপনারা কোথায় গেলেন? নিঝুম নিস্তব্ধতায় তাঁর আহবান অন্ধকারে হারিয়ে গেল। তিনি পুনরায় ডাকলেন! ভাই আগুন নেন! কোন সাড়া-শব্দ নাই, হবার কথাও নয়। কিছুক্ষণ থামলেন, আবারো ডাকলেন, কি যেন ভাবলেন, অতঃপর আগুন কণিকা আবারো উঠা-নামা শুরু করলেন।


Discussion about this post