শয়তান মুসা (আঃ) এর নিকটে এসে বললেন: ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমি তো অতীতে বিরাট ভুল করেছি, যার কারণে আমি জান্নাত থেকে বিতাড়িত হয়েছি। আমি এটার জন্য লজ্জিত এবং সঠিক পথে ফিরে আসতে ইচ্ছুক। আপনার সাথে তো তুর পাহাড়ে আল্লাহর কথা-বার্তা হয়। আপনি কি আমার ক্ষমা ও ফিরে আসার ব্যাপারে কোন সংবাদ দিতে পারবেন কি?
শয়তানের এই ধরনের অনুশোচনা মূলক ইচ্ছায়, মুসা (আঃ) অনেক আশান্বিত ও খুশী হন।
তিনি ভাবলেন শয়তান যদি একবার ক্ষমা পেয়ে সঠিক রাস্তায় ফিরে আসে, তাহলে আদম সন্তান পৃথিবীতে ভাল থাকবে। মুসা (আঃ) এই ভরসায় তুর পাহাড়ে গিয়ে, আল্লাহর নিকট বিষয়টি উপস্থাপন করে শয়তানকে ক্ষমা করে দেবার জন্য সুপারিশ পেশ করলেন।
আল্লাহ মুসা (আঃ) সুপারিশ শুনে উত্তরে বললেন, ‘এই ব্যাপারটি তো বহু আগেই সমাধান হয়ে আছে। তুমি তাকে বল, সে যেন আদমের কবরে গিয়ে সিজদা করে এবং তওবা করে’!
এ কথা শুনে শয়তান লাফ দিয়ে উঠে বসল! সে অহংকার দেখিয়ে বলল মুসা (আঃ) কে বলল, ‘যে আদমকে আমি জীবিত অবস্থায় সেজদা করে তার তার শ্রেষ্ঠত্বকে স্বীকার করিনি, ফলে আমি জান্নাত থেকে বিতাড়িত হয়েছি। সে অবস্থায় আমার পক্ষে মৃত আদমের কবরে সেজদা করা কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়! আর এটা কোন যুক্তিতেই খাটে না’।
আল্লাহর উত্তর পাবার পর শয়তান মুসা (আঃ) কে বলল, ‘আপনি অতিশয় ভাল মানুষ,আপনি আমার জন্য খবর এনেছেন এবং উপকার করতে চেয়েছেন। সে হিসেবে আপনি আমার উপর কিছু হক তথা প্রাপ্য অধিকার সৃষ্টি হয়েছে। এর বিনিময়ে আমি আপনাকে তিনটি বিষয়ের উপর উপদেশ দিব, যেগুলো দিয়ে আমি আদম সন্তানদের পথভ্রষ্ট করি। এগুলো জানিয়ে আপনি আপনার উম্মতদের সতর্ক করতে পারবেন।
সে বিষয় গুলো নিম্নরূপ:
১. যখন রাগ হবে, মনে করবেন, ওটা আমার প্রভাবেই হয়েছে, যা আপনার অন্তরে প্রভাবিত হয়েছে। আর সেই সময় আমার চোখ আপনার চোখের মধ্যে বসানো থাকে এবং আমি সেই সময় আপনার রক্তের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকি।২. যখন দু’দল সৈন্য পরস্পর যুদ্ধ করতে থাকে, সেই সময় আমি আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রামে রত মুজাহিদদের কাছে আসি এবং তাকে তার স্ত্রী-সন্তানদের কথা অবিরত মনে করিয়ে দিতে থাকি, যতক্ষণ না সে পিছনে ফিরে পালায়।৩. যার সঙ্গে বিয়ে বৈধ এমন মহিলার সঙ্গে বসা থেকে বেঁচে থাকবেন। কেননা সেই সময় আমি পরস্পরের মনে দূত হিসেবে কাজ করতে থাকি। প্রথমে আমি একজনের অন্তরে প্রবেশ করে কু-কথা মনে করিয়ে দেই। পরক্ষণে অন্যজনের অন্তরে ঢুকে সেই কথাটি তাকেও মনে করিয়ে দেই। যতক্ষণ না তারা দুজন একই বিষয়ে ভাবা-ভাবি শুরু না করে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তাদের অন্তরে ঢুকে, একই বিষয়ে দু’জনের মাঝে ওকালতি করতে থাকি।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘বলবান ব্যক্তি সে নয় যে, যে কুস্তিতে অন্যকে হারিয়ে দেয়। প্রকৃত বলবান হল সেই ব্যক্তি, যার রাগ আসলে তা দমন করতে পারে’। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) শুধু উপদেশ দিয়ে ক্ষান্ত হন নি, তিনি রাগ দমনের উপায়ও উম্মতকে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের রাগ আসলে, তোমরা বসে পড়বে; তাতেও রাগ দমন না হলে, তাহলে শুয়ে পড়বে; তাতেও কাজ না হলে গোসল করবে’। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে এই পদ্ধতিতে রাগ দ্রুত গতিতে কমতে থাকে। (এই প্যারাটি হল লেখকের নিজস্ব সংযুক্তি)
তথ্য সূত্র: ‘লাক্বতুল মারজ্বানি ফী আহ্কামিল জ্বান্ন‘। লেখক ‘আল্লামা জালালুদ্দীন সূয়তী (রহঃ) ‘ বইটি লিখা হয়েছে ৯১১ হিজরি সনে। বইটির বাংলা অনুবাদ হয়েছে, ‘জ্বিন জাতির বিস্ময়কর ইতিহাস‘ শিরোনামে।
পুনশ্চ: বস্তুত শয়তানের মূল মতলব হল, সে কেয়ামতের আগ পর্যন্ত মানুষকে পথভ্রষ্ট করতে থাকবে এবং শেষে গিয়ে সেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে বসবে, তওবা করবে এবং জান্নাতে চলে যাবার রাস্তা করে নেবে। আল্লার ক্ষমা করার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার কথা শয়তানের জানা আছে। শয়তান দৃঢ় বিশ্বাস করে যে, ‘সে যে ঠুনকো অপরাধে জান্নাত থেকে বিতাড়িত হয়েছে, মানব জাতি তার চেয়েও জঘন্য অপরাধ করে ক্ষমা পেয়েছে’। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে শয়তানও মাফ পেয়ে যাবে, এই চিন্তাটি সে সর্বদা অন্তরে পোষণ করে। তার এই ভবিষ্যৎ চিন্তাটি কতটুকু টেকসই হবে, সেটা যাচাই করতেই মুসা (আঃ) সাথে আল্লাহর কথোপকথনের সুযোগ টিকে কাজে লাগিয়েছে।


Discussion about this post