ফারুক তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে; তার ছোট বোন সামিয়া দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী। ফারুক প্রতিদিন যথাসময়ে ঘুম থেকে উঠে। ঘুম থেকে উঠেই প্রথমে ফারুক দোয়া পড়ে এবং তার বাবা-মাকে সালাম জানায়। ফারুক নিজে নিজেই টয়লেটের কাজ সেরে নেয়। টুথ পেস্টে দাঁত মেজে, মুখ ধুয়ে ফজরের নামাজের জন্য ওজু করে নেয়। ফারুক তাড়াতাড়ি টয়লেটের কাজ সেরে ছোট বোন সামিয়াকে ঘুম থেকে তুলে। ব্রাশে টুথ পেস্ট লাগিয়ে তা সামিয়াকে ধরিয়ে দেয়। ফারুক খুব ভাল ছেলে, সে জন্য তার বাবা মা তাকে খুব স্নেহ করে। ফারুক সামিয়াকে সর্বদা দেখাশোনা করে, বিপদজনক জিনিষ চিনিয়ে দেয়। সামিয়া কখনও কথা না শুনলে ফারুক তার উপর রাগ করেনা, বকাবকি করেনা। ফারুক জানে সামিয়া ছোট, অনেক কিছু সে বুঝে না।
সামিয়া প্রজাপতি ধরতে পছন্দ করে। ফারুক ওসব অসহায় পতঙ্গ ধরতে-মারতে নিষেধ। ফারুক মনে করিয়ে দেয়, কিছু কিছু পোকা-মাকড় বিষাক্ত, তাই না চিনে কখনও কোথাও হাত দিতে নেই। ফারুকের বাবা চাকুরীজীবী। সকালেই তাকে অফিসের কাজে বের হতে হয়। তাই তার মায়ের অনেক ব্যস্ততা। ফারুক স্কুলে যাবার সময় নিজের বই নিজে গোছায় এবং সামিয়ার গুলো গোছাতে সহযোগিতা করে। সে নিজের পোশাক নিজে পরে, সবকিছু ঠিক হয়েছে কিনা জানতে, মাকে দেখায়। সামিয়া খেলাচ্ছলে দেরী করলে, তাড়াতাড়ি তাকে তৈরি হতে সহযোগিতা করে। স্কুলে গেলেও ফারুক সামিয়াকে দেখাশোনা করে। ফারুক প্রতিদিন বাবার জোতা, স্যান্ডেল, কাপড়, তসবিহ নির্দিষ্ট জায়গায় গুছিয়ে রাখে। বাবার সাথে কখনও বাজারে গেলে সামিয়া ও তার আম্মুকে কে ছাড়া কিছু খায়না। বাড়ীতে মেহমান আসলে, তাদের শিশুদের জন্য ফারুক ও সামিয়া সকল খেলনা গুলো দিয়ে দেয়। মেহমানেরা তাদের বাড়ীতে এলে খুশী হয়। চারিদিকে সবাই ফারুকের প্রশংসা করে এটা ফারুকের খুবই ভাল লাগে…..
ফাতিমা চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী আর ছোট ভাই মনসুর তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। সকালে নিজে থেকেই ঘুম থেকে উঠে প্রথমে ফাতিমা তার মাকে রান্না ঘরে দেখতে যায়। মাকে জরুরী কাজে সহযোগিতা করে, ফাতিমা ওয়াশরুমে গিয়ে তৈরি হয়ে নেয়। মনসুরকে ঘুম থেকে তুলে আম্মুকে গিয়ে সালাম দিতে শিক্ষা দেয়। ফাতিমা মনসুরকে খুব ভালবাসে, সে কারণে মনসুর ফাতিমার কথা মত চলে। ফাতিমা রান্নাঘরে যেভাবে মায়ের পাশে দাঁড়ায়, সেভাবে বাবার পোশাক পরিচ্ছদ পরিষ্কার ও গুছিয়ে রাখতে সাহায্য করে। ফাতিমা নিজের পড়া নিজে পড়ে এবং যথাসময়ে মনসুরকে পড়তে, খেলতে ও ঘুমাতে উপদেশ দেয়।
মনসুর খেলার মাঠে, বাগানে গেলে ফুল ছিঁড়তে চায়, বাগানের পানির ট্যাব খুলে দিতে চায়। ওসব না করতে ফাতিমা তাকে বারণ করে। সে বুঝায় ওসব সরকারী জিনিষ। ফুল আছে বলে আমরা বাগানে এসেছি, পানি ফুরিয়ে গেলে সকল গাছ মরে যাবে। তখন বাগান মরুভূমি হয়ে যাবে, এতে ছোটরা বাগানে আসলে আনন্দ পাবে না। মনসুর শপিং ম‘লে গিয়েছিল! এত সুন্দর ম‘ল দেখে সে আনন্দিত, উত্তেজিত এবং চিল্লাচিল্লি করছিল! সবকিছুতে হাত দিচ্ছিল! ফাতিমা তাকে বুঝিয়ে দিল, নোংরা আচরণ করলে প্রহরী তোমাকে বের করে দিবে আর কখনও ঢুকতে দিবে না। সাথে আমরাও আর আসতে পারব না। তাই সব কিছুতেই হাত দেওয়া যাবেনা। কিছু পছন্দ হলে বাড়ীতে গিয়ে আম্মুকে চুপি চুপি বলবে, তিনি সেটা কিনে দিবেন। রাস্তার পাশে লাল বর্ণের বাক্স দেখে ফারুক জানতে চেয়েছিল জিনিষটা কি? ফাতিমা তাকে পোষ্ট অফিসে নিয়ে গিয়েছিল এবং লাল বাক্সের মাধ্যমে কিভাবে চিঠি আসা যাওয়া করে তাকে তা শিখিয়ে দিয়েছে। তারা কোথাও বেড়াতে গেলে ফাতিমা খুব ভদ্রভাবে চলাফেরা করে এবং মনসুরকে বুঝাতে থাকে, যেন কিছুর জন্য বায়না না ধরে। শান্তশিষ্ট, ভদ্র, সভ্য বাচ্চা হিসেবে তারা গোটা গ্রামে ও আত্মীয়দের কাছে অতুলনীয়। সবাই ফাতিমার মত মেয়ের প্রশংসা করে।
উপরের লিখাগুলো আমার কথা নয়, আরব আমিরাতের স্কুলের দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির সমাজ বই থেকে তুলে আনা একটি খণ্ড চিত্র। এই বইগুলোতে এক শ্রেণিতে ছেলেকে বড় বানায়, তার পরবর্তী বছরে মেয়েকে বড় দেখায়। সুকৌশলে তাদের দায়িত্ব অনুভূতি শিক্ষা দেয়। একজন ছাত্রকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সর্বাঙ্গীণ দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে এই সিলেবাসে।
ঘর থেকে শহর, স্কুল থেকে সমাজ, মসজিদে, বাজারে, বাগানে, আত্মীয়ের বাড়ীতে, সরকারী অফিসে, পুলিশ কার্যালয়ে, ব্যাংক, বীমা সহ যাবতীয় জীবন সম্পর্কিত কাজে কিভাবে আচরণ করতে হবে সবই সুন্দর ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে পাঠ্য বইয়ের সিলেবাসে। এভাবে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীর মগজ ধোলাই চলতে থাকে। যাতে করে নিজের অজান্তেই সমাজ বিজ্ঞানে পড়ানো চরিত্রটি শিক্ষার্থীর জীবনে স্থায়ীভাবে আসন গেড়ে যায়। এই শিক্ষায় পিতা-মাতাকে আদর্শ উদাহরণ দেবার জন্য ভাবতে হয়না। শুধু ক্লাস বইয়ের সেই হিরো ফারুক আর ফাতিমার উদাহরণ টেনে বললেই হল, বাবা, তুমি তোমার ক্লাস বইয়ের ফারুক কিংবা ফাতিমার মত হও। এতে শিশু সন্তানের তেজও উঠে না আবার বইয়ের চরিত্রর প্রতিও মনোনিবেশ করে।
এদেশের স্কুলের ইসলাম বইটি এমনভাবে সাজানো, ক্লাসের পড়াটি যথাযথ পড়লে, কোরআন, নামাজ ও ইসলাম শিক্ষার জন্য আলাদা করে, ঘরে মৌলভী রাখার দরকার পড়েনা। দশম শ্রেণীতেই তারা কোরআনের অনেক গুলো সুরা মুখস্থ করে ফেলতে পারে, পাঠ্যসূচি এমনভাবে সাজানো। এদেশের ছেলেরা দুর্দান্ত সাহসী, তাই দুষ্টামিতে আমাদের দেশের ছেলেদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। তথাপি, তাদের হাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়না। বস্তুত এটা সমাজ বিজ্ঞান ও ধর্মীয় বইয়ের প্রভাব!
আমরা প্রায়ই কিছু ভিডিও দেখতে পাই যে, রাস্তার পার্শ্বে বৃদ্ধ লোক দাড়িয়ে আছে আর স্কুল ছাত্ররা তার কাজ বন্ধ রেখে বৃদ্ধকে রাস্তা পাড় করে দিচ্ছে। বাস যাত্রায় ইউরোপীয় সংস্কৃতিতে দেখা গেছে পথিমধ্যে কোন শিশু বাসে উঠলে, বয়স্করা শিশুদেরকে গাড়ির সিট ছেড়ে দেয়। একই ভাবে প্রবীণদের জন্যও সিট ছেড়ে দেওয়া হয়। এটা নবীন ও প্রবীণদের প্রতি স্নেহ ও শ্রদ্ধামূলক সংস্কৃতি। এর ফলে দেখা যায়, কখনও বৃদ্ধ লোক বাসে উঠলে, তাদের সম্মানার্থে শিশুরা নিজের সিট ছেড়ে দেয়! সামাজিক সুন্দর শিষ্টাচার পালনে এসব মানুষ দীর্ঘদিন প্র্যাকটিস করতে করতে জাতিকে অভ্যস্ত করিয়েছে। এই প্র্যাকটিসের মূল শিক্ষাটা প্রাপ্ত হয় দুটো মাধ্যম থেকে একটা হল পাঠ্য বইয়ের সমাজ বিজ্ঞান আর একটা হল ধর্ম শিক্ষা। পৃথিবীর প্রায় সকল ধর্মই মানুষকে নৈতিক শিক্ষা দেয়। আর নৈতিক শিক্ষা তাই যা মানুষের অভ্যাসকে বদলে দেয়।
অনেকেই সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ের গুরুত্ব দিতে চায়না। গণিত, বিজ্ঞান, ইংরেজি এসব বিষয়ের সেরা ছাত্রদেরকেই খুবই মেধাবী হিসেবে বিবেচনা করে। প্রচলিত সমাজ সম্পর্কে যদি ধারনা না থাকে একজন শিক্ষার্থী যতই মেধাবী হউক না কেন, সে একাকী হয়ে পড়বে। সে জানবে না, সমাজে তাকে নিয়ে আদৌ কারো আগ্রহ আছে কিনা কিংবা সে যা জানে সেটার প্রয়োজন সমাজে দরকার কিনা। সমাজে মানুষের চরিত্র, চাহিদা, অভাব, পর্যাপ্ততা, পরিবেশের সাথে বন্ধন, বন্ধুত্বের সেতুবন্ধনি সব বিষয়েই জানতে হয়। সমাজ ও রাষ্ট্রে নেতৃত্ব দেবার জন্য পরিবেশের সকল দিক ও বিভাগ সম্পর্কে জানা থাকা জরুরী। একজন বক্তা, একজন ঈমাম, একজন আলেম, রাজনৈতিক, প্রকৌশলী, ডাক্তার, ব্যাংকার, শিক্ষক, আইটি বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা সবার জন্য এ বিষয় জানাটা অপরিহার্য। এ বিষটির গুরুত্ব বিবেচনায় প্রকৌশলী, ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ভাষাবিজ্ঞানী সহ সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চ শিক্ষা নিতে গেলে সমাজ বিজ্ঞান পড়াটা বাধ্যতামূলক। পরিণত বয়সে সমাজবিজ্ঞান পড়ে সামাজিক হওয়া অনেক কঠিন ও দূরহ। তাই অভিভাবকদের উচিত, সন্তানকে উচ্চ ধ্যান ধারনায় মানুষ করতে হলে, তাদেরকে যেন শিশুকাল থেকেই সামাজিক বানায় এবং নিজেরাও সামাজিক হয়।

Discussion about this post