পাশ্চাত্যের দেশগুলোর গ্রিন হাউজে যখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পুরো-দমে ব্যাঙের ছাতা মাশরুম এর চাষ চলছে তখন ব্যাঙের ছাতা বাংলাদেশের কৃষকদের নির্দয় ব্যবহারের সাথে লড়াই করে জানান দিচ্ছে, আমরা আজো বেঁচে আছি! পতিত, অবহেলিত জলাশয়ের পাড়ে, পঁচা গাছের ঘারে, যত্রতত্রই ব্যাঙের ছাতার জন্ম হয়, তাই সহজলভ্য জনহিতকর এই সবজির কোনই গুরুত্ব নেই।
গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির প্রাক্কালে ক্ষুদ্র পোকা মাকড় নিজেদের বাঁচাতে গাছের পাতার নিচে আশ্রয় নেয়। চতুর ব্যাঙ বুঝে নেয়, প্রাণ বাঁচাতে তাদের অনেকেই এই ছাতার নিচেও এসে যাবে। তাই ব্যাঙ আর কষ্ট না করে, নিজের মাথাটি এই ছাতা উদ্ভিদের নিচে লুকিয়ে রাখে আর মশা-মাছি কাছে আসলে উল্টো জিহবার অস্ত্র ব্যবহারে গিলতে থাকে। মানুষ পানিতে ভিজলে জ্বর-সর্দি হয়, তাই তার ছাতার দরকার হয় কিন্তু ব্যাঙ পানিতে ভিজলে জ্বর-সর্দি কোনটাই হয়না তারপরও এই অবহেলিত মাশরুমের নাম হয়েছে ব্যাঙের ছাতা। এই নামের কারণেই বহু মানুষ উপকারী, উপাদেয়, জীবন রক্ষাকারী মূল্যবান সবজিটি খায় না।
আর পড়ুন…
- বহেড়া মানব কল্যাণে এক অত্যাশ্চর্য উপকারী গাছ
- হরিতকী- দেশের আশ্চর্যতম মহৌষধ
ক্ষুদ্র, বড়, মাঝারী বহু ধরণের মাশরুম দেখা যায়। কিছু আছে যা খালি চোখেও নজরে আসেনা। এগুলো ছত্রাক হিসেবে পরিচিত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বাতাসে হাজার হাজার টন সীসা ছড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধাহত তো বটেই অন্য কোনভাবে মানুষ আহত হলেই কাটা ঘায়ে পচন ধরে মারা যাচ্ছিল লাখ লাখ মানুষ। পঁচন সারানোর কোন ঔষধ তখনও সৃষ্টি হয় নাই। বহু পুরুষ মারা পড়ছিল, ফলে সারা ইউরোপে পুরুষ মানুষের অভাব দেখা দেয়। মানব সভ্যতার ঘোর দুর্দিনে এগিয়ে এসেছিল ব্যাঙের ছাতা! তার থেকে পাওয়া পেনিসিলিনের মাধ্যমেই শত কোটি মানুষ নতুন করে জীবন পায়। এটাই পৃথিবীর প্রথম এন্টিবায়োটিক। উল্লেখ্য সব ধরনের মাশরুম খাওয়া যায় না এদের কোনটি বিষাক্ত কিন্তু সকল ধরনের মাশরুমেই কম-বেশী এন্টিবায়োটিকের উপাদান রয়েছে। যার ফলে মাশরুমকে যারা সবজি হিসেবে খায় তাদের রক্তে-মাংসে, দেহাভ্যন্তরে ক্ষত কিংবা টিউমার সুবিধা করতে পারেনা। ফলে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে যায়। একটি ক্ষুদ্র অবহেলিত উদ্ভিদের কাছে মানবজাতি আর কি আশা করতে পারে?
তারপরও মাশরুমের আরো বহুবিধ উপকারিতার কথা লিখে শেষ করা যাবেনা। মাশরুম দেহকোষকে সজীব, সতেজ ও কর্মক্ষম রাখে। মাশরুমের প্রোটিনে-ফ্যাট এবং কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ খুবই কম তাই অধিকন্তু কোলেস্টেরল ভাঙার উপাদান-লোভস্ট্রাটিন, অ্যান্টাডেনিন, ইরিটাডেনিন ও নায়াসিন থাকায় শরীরের কোলেস্টেরল জমতে পারে না বরং মাশরুম খেলে শরীরে বহু দিনের জমানো কোলেস্টেরল ধীরে ধীরে বিনষ্ট হয়ে যায়। মাশরুমে উচ্চমাত্রার আঁশ থাকে, সোডিয়ামের পরিমাণ কম থাকে এবং প্রচুর পরিমাণে পটাসিয়াম থাকে যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এছাড়া মাশরুমে কোলেস্টেরল কমানোর অন্যতম উপাদান ইরিটাডেনিন, লোভাস্টটিন, এ টাডেনিন, কিটিন এবং ভিটামিন বি, সি ও ডি থাকায় নিয়মিত মাশরুম খেলে উচ্চ রক্তচাপও হৃদরোগ নিরাময় হয়। মাশরুমের ফাইবার বা আঁশ পাকস্থলী দীর্ঘক্ষণ ভরা রাখতে সাহায্য করে।
ব্যক্তিগত ভাবে মাশরুম আমার খুবই পছন্দের সবজি। যার কারণে প্রতি মাসেই এটির ব্যবহার আমাদের ঘরেই রয়েছে। সালাদ, সুপ, ভাজি, সবজি সহ নানাবিধ জায়গায় এর ব্যবহার আছে। বাটন মাশরুম কাটলে কিডনির আকার ধারণ করে, আবার এটা মানব কিডনিরও উপকার করে। খেতে মাংসের মত দারুণ অনুভূতি সম্পন্ন। আমাদের দেশের জলবায়ু মাশরুমের জন্য খুবই উত্তম। নিজেরাই কৃষকের সাথে লড়াই করে বড় হয় কিন্তু এটিকে এখনও সবজি হিসেবে ব্যাপক ব্যবহার করা হয়না। বিদেশের শপিং মল গুলোতে মাশরুমের চাহিদা বরাবরই বেশী। কখনও মূল্যহ্রাস ঘটলে সংগ্রহ করতে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ফাস্টফুডের অন্যতম সবজি হল এই মাশরুম। গুগলে গিয়ে মাশরুমের উপকারিতা সম্পর্কে জানতে চাইলে অনেক সময় ব্যয় করতে হবে ব্যাঙের ছাতার নানাবিধ সুনাম শুনতে গিয়েই। তাই যে জিনিষটি আল্লাহ নিতান্ত দয়া করে আমাদের জাতির জন্য উপহার হিসেবে দিয়েছেন। চলুন সেটাকে গুরুত্ব দিতে শিখি, মূল্যায়ন করি এবং জাতিকে সবল, সুস্থ ও অটুট রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখি।


Discussion about this post