জীবনের শুরুতে প্রাইমারী স্কুলে প্রথমে যে রচনাটি শিখানো হয় সেটা হল গরু’র রচনা। আমাদের দেশের রাষ্ট্রপতি, বিচারপতি, সেনাপতি সহ সকল জ্ঞানী মানুষদের ছোটকালে গরু রচনা লিখে্ই বিদ্যা অর্জন করতে হয়েছে। আজকে বড়দের গরু রচনার কথা শুনে হয়ত অনেকে ভাবতে পারে, লিখকের ভিমরতী ধরেছে কিনা। চিন্তাটি আসলেই সত্য নয়। গরু এমন এক প্রাণী তার উপকার সম্পর্কে লিখতে গেলে বালাম-দিস্তা কাগজ শেষ হবে, তবুও গুরুত্ব লেখা শেষ করা যাবেনা। আমরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে গরুর রচনা পড়েছি, সেটা শিশুমনে বুঝার উপযোগী করেই লিখা। আজকের রচনাটি শুধুমাত্র বড়দের উপযোগী করে লেখা।
ভূমিকা:
গরু মানবজাতির জন্য এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী। আল্লাহ আটটি প্রাণীকে মানবজাতির জন্য নেয়ামত বলেছেন, তার মধ্যে গরু অন্যতম। গরুর সবকিছুই মানুষের উপকারে আসে। হাড়, চামড়া, লোম, গোবর, নাড়ী-ভূরি, শিং, গোশত ও দুধ। এই তালিকায় গরুর কিছুই বাদ যায়নি। আবার দুধ থেকে আসে ঘি, পনির, মাখন, দই ইত্যাদি। হাড় থেকে আসে গুরুত্বপূর্ণ জিলেটিন, ক্যাপসুলের কভার সহ নানাবিধ উপাদান। গোশত-চামড়ার কাহিনী নাই বা বললাম! বিস্তারিত গরুর রচনা লিখতে গেলে বড় বই তো হবেই আবার এত তথ্য দেখে বিজ্ঞ-জনের চোখ কপালে উঠবে এই ভেবে যে, প্রাণীটি আমাদের এত আপন সেটা তো কখনও চিন্তা করে দেখি নাই!
মানব জীবনের জন্য দুধ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমরা তো দেখেই থাকি একটি শিশু শুধুমাত্র মায়ের দুধ পান করেই বড় হতে থাকে। দুধের শিশু ভাত, গোশত, সবজি, পানি কোনটারই অভাব বোধ করেনা। মানবজীবন সুরক্ষায় দুধের রয়েছে বিরাট ভূমিকা। রাসুল (সাঃ) তো বলেই দিলেন তোমরা দুধকে নিজের জীবনের জন্য অপরিহার্য করে নাও। বয়স্ক মানুষের স্বাভাবিক জীবন পরিচালনায় বিজ্ঞানীরা দুধের মধ্যে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আবিষ্কার করেছেন। বয়স বাড়ার সাথে সাথেই হাড় ও দাঁতের ক্ষয়রোগ দেখা দেয়। হাড়ের সন্ধিস্থলে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব হয়। হাটতে, বসতে, উঠতে কষ্ট অনুভব হয়। মানুষ এটাকে বাত-ব্যধী মনে করে ব্যথার ঔষধ খায়। কেউ ভাবে ইউরিক এসিড বেড়েছে, কেউ বলেন প্রোটিন বেড়েছে, কেউ ভাবেন মাংসপেশি ঢিলা হয়েছে। মূলত উপরোক্ত সব রোগের লক্ষণ একই কিন্তু ভুলেও কেউ ভাবে না যে, কিছুদিন নিয়মিত দুধ পান করলে এটা থেকে মুক্তি পেতে পারে! আরব দেশে দুধের চাহিদা ব্যাপক, কেননা এদেশে বৃদ্ধরাও দুধ পান করে।
এর গুনের কথা বলে শেষ করা যাবেনা কিন্তু স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের দৃষ্টিতে ঘি হল ভিলেন তুল্য। ঘি মানুষের ওজন বাড়ায় এই বদনাম থাকলেও চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরীক্ষায় প্রমাণিত, ঘিতে ওজন কমে! ঘি কখনও পচে না, শতবর্ষ পরেও তা ব্যবহার করা যায়। ২৫০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপে সকল ধরনের ভোজ্য তৈলের গুন নষ্ট হয়ে যায় কিন্তু ঘিয়ের মান কমে না। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় ঘি অবিকল থাকে। ঘি সহজে হজম যোগ্য। অনেকে ঘি খেতে ভয় পায়! তারা বহু দামে পরিশোধিত তৈল খায়! আসল কথা হল সকল তৈলের চাইতেই ‘ঘি’ হল সবচেয়ে বেশী নিরাপদ! ঘি এর ঘ্রাণ মানুষকে বিমোহিত করে, প্রাণশক্তিকে করে তরতাজা। ঘি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিহীন, এলার্জি মুক্ত। মানবজীবনের জন্য খুবই দরকারি ভিটামিন এ ও ই ঘিয়ের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। ঘি হজম ক্ষমতা বাড়ায়, দৌড়াতে ক্লান্তি কমায়, প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ইউনানি-আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ঘি এর ব্যবহার প্রচুর। ঘি ত্বকের শুষ্কতা দূর করে তাকে মসৃণ রাখে, চোখের গ্লুকোমা রোগে সাড়ায়। নিয়মিত এক চামচ ঘি একজন মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। ইদানীং বাজারে ভেজিটেবল ঘি, ডালডা ঘি পাওয়া যায়। এগুলো মূলত কোন ঘি নয়! কৃত্রিম ঘ্রাণ, কৃত্রিম বর্ণ, কৃত্রিম ঘনত্ব সবই কৃত্রিমের সমাহার! রান্নায় ঘিয়ের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করার জন্য ব্যবসায়িক ভাবে এটি তৈরি হয়েছে। এটি কিন্তু বিপদজনক!
গরুর গোশত তুলনামূলক বেশী স্বাদ কিন্তু এতে রয়েছে মানব জীবনের জন্য ক্ষতিকর উপাদান। চর্বি এবং কোলেস্টেরলের উপাদানের কথা বর্তমান যুগের সকল মানুষই জানে। গরুর গোশত হৃদরোগ বাড়ায়, রক্তে ঘনত্ব সৃষ্টি করে। রক্তে অধিক পরিমাণ ইউরিক এসিড যোগ করে। রক্তচাপ বৃদ্ধিতে গরুর গোশতের ভূমিকা থাকে। মজাদার ও সহজলভ্য হওয়াতে মানুষ তৃপ্তির সাথে, পরিমাণের বেশী খায়। ফলে নিজের অজান্তে দেহে রোগ বাসা বাধে। রাসুল (সাঃ) গরু গোশত একেবারেই খেতে নিষেধ করেনি। পরিমাণ মত খাওয়ায় বাধা নাই। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ গন বলেছেন, যে পরিমাণ খাওয়া হয়েছে, সে পরিমাণ জ্বালানো হয়েছে কিনা দেখা দরকার।
স্বাস্থ্য সকল সুখের মূল। স্বাস্থ্যরে প্রতি নজর রাখা এবং তাকে ভাল রাখা মুমিনের দায়িত্ব। হাশরের ময়দানে নেয়ামত সম্পর্কিত প্রথম প্রশ্নটি করা হবে স্বাস্থ্য নিয়ে। বিড়ি-সিগারেট সহ নানাবিধ নেশাজাতীয় দ্রব্য গলাকরণ করে যারা স্বাস্থ্যকে বরবাদ করেছেন, কেয়ামতের দিন তাদের রেহাই নেই। সে হিসেবে অসচেতন ভাবে গোশত খেয়েও যারা দেহে রোগ বাধিয়েছে তারাও সেদিন প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে পারবেনা। আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত তথা স্বাস্থ্যের প্রতি কেন অবহেলা করা হয়েছে, এই প্রশ্নের উত্তর সবাইকে দিতে হবে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন মানুষ যদি খাদ্যের বেলায় হুশিয়ার থাকত, তাহলে সাধারণ শরীর দিয়েই মানুষ চারশত বছরের বেশী বাঁচত! মানুষের শরীরকে সেই ধরনের গাঁথুনি দিয়েই তৈরি করা হয়েছে।

Discussion about this post