চিকিৎসা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে বিপরীত ধর্মী কিছু খেয়াল দেখা যায়। কিছু লোক চিকিৎসা না নিয়ে ঝাঁড়-ফুঁক কে উপকারী ও যথেষ্ট মনে করে। সুফি বাদী কিছু মানুষ এমন আছে যারা ডাক্তার দেখানো কিংবা ঔষধের উপর নির্ভর করাকে তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী মনে করে! বেশী সংখ্যক লোক রোগ নিরাময়ের ব্যাপারটিকে শুধু মাত্র ঔষধ-পত্র ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ মনে করে।
ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে এর কোনটাকেই সঠিক পদ্ধতি মনে করা হয় না। ইসলামী ধ্যান ধারনায় ঔষধ-পথ্য, ডাক্তারের সহযোগিতা নেওয়ার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক সেবা নেওয়াকে অতীব গুরুত্ব দিয়ে থাকে। রোগ দু’ভাবে মানুষকে কাহিল করে। এক. শারীরিক কষ্টের মাধ্যমে, দুই. আধ্যাত্মিক তথা আত্মা ও মনো কষ্টের দ্বারা। পাশ্চাত্যে চিকিৎসায় আধ্যাত্মিকতার উপস্থিতিকেই অপ্রয়োজন মনে করে। কিন্তু ইসলাম এটাকে মুমিনের মৌলিক বিশ্বাসের সাথেই সম্পৃক্ত করেছে। আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি কুরআনে এমন জিনিষ নাজিল করেছি যা ইমানদারদের জন্য শেফা ও রহমত’ -সুরা বনী ইসরাইল। রাসুল (সাঃ) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজে শেফা ও আরোগ্য রয়েছে’ -ইবনে মাজাহ। নামাজের মাধ্যমে যতটুকু না দৈহিক শেফা তারচেয়েও বেশী আধ্যাত্মিক শেফা হাজির রয়েছে।
ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, রাসুল (সাঃ) বলেছেন, একদা ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রশ্ন করলেন, “হে আমার প্রতিপালক! রোগ কার পক্ষ হতে আসে? আল্লাহ বললেন, আমার পক্ষ হতে। আবার প্রশ্ন করলেন, ঔষধ কার পক্ষ হতে? জবাব এল, ঔষধও আমার পক্ষ হতে। উত্তর শুনে ইবরাহীম (আঃ) আবারো প্রশ্ন করলেন, তাহলে চিকিৎসকের প্রয়োজন কি? আল্লাহ তা’আলা উত্তর দিলেন, চিকিৎসকের মাধ্যমে ঔষধ পাঠানো হয়”।
উপরোক্ত বর্ণনা থেকে আমরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কথা পেয়ে যাই। একটি হল রোগ আল্লাহ দেন, ঔষধ ও আল্লাহ দেন এবং মানুষদের মধ্য থেকে তিনি কাউকে ডাক্তার বানান, যিনি মানুষের রোগ দূর করার ওয়াসিলা হয়। সে হিসেবে কারো ডাক্তার হওয়াও আল্লাহর বিশেষ রহমত। অতীতে ডাক্তার প্রেসক্রিপশন লিখার সময় উপরে লিখতেন ‘হুয়াশ শাফি’ আল্লাহই রোগ মুক্তি দেন। এতে ডাক্তার ও রোগী দুজনেই বুঝে নিতেন যে, ঔষধ রোগ সারানোর মাধ্যম হতে পারে কিন্তু রোগ ভাল হবার জন্য ঔষধ যথেষ্ট নয় সেখানে আল্লাহর ইচ্ছাই মূলত সব।
রাসুল (সাঃ) বলেছেন, ‘তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ কর, আল্লাহ একটা রোগ ব্যতীত এমন কোন দুরারোগ্য ব্যাধি সৃষ্টি করেন নাই, যার প্রতিষেধক সৃষ্টি করেন নাই’। সাহাবীরা প্রশ্ন করল কোন রোগের ঔষধ নাই? নবীজি (সাঃ) বললেন, সেটা হল বার্ধক্য! -তিরমিজি, নাসায়ী। এক সাহাবী বিচ্ছু কর্তৃক আক্রান্ত হলে, রাসুল (সাঃ) লবণ পানি ঢালার সাথে দোয়া পড়ার নির্দেশ দিলেন। বহু হাদিসে তিনি উপদেশ দিয়েছেন চিকিৎসার সাথে সাথে যেন অবশ্যই দোয়া পড়া হয়। স্বয়ং রাসুল (সাঃ) মাথায় ব্যথা হলে, তিনি মেহদী লাগিয়ে বলতেন, ‘এটা আল্লাহর হুকুমে উপকারী হবে’। এসব উপাত্ত থেকে বুঝতে পারি, ঔষধ গ্রহণের সাথে দোয়া পড়াটা অপরিহার্য; রাসুল (সাঃ) বহু দোয়া উম্মতের জন্য রেখে গেছেন।
সকল রোগের ঔষধ থাকলেও কিছু রোগে মানুষ মনো-বৈকল্য হারিয়ে ফেলে। যেমন, কেউ দুর্ঘটনায় পা হারিয়ে ফেলল। চিকিৎসা নেওয়াতে তার ক্ষতস্থানের ব্যথা-ভাব হয়ত জলদি চলে যাবে কিন্তু অনাগত ভবিষ্যতের অজানা আশঙ্কায় তার আত্মা আতঙ্কিত থাকবেই। এই ক্ষেত্রে দোয়ার মাধ্যমে শান্তি ও সামর্থ্য অর্জন করা যায়। রাসুল (সাঃ) এর অগণিত সাহাবী নিজেদের বহু অঙ্গ হারিয়ে, অসুস্থতায় দুর্বল হয়েও, প্রচণ্ড মানসিক শক্তি দ্বারা বলিয়ান ছিলেন, এটা আধ্যাত্মিকতারই ফল! আজো এমন দৃষ্টান্ত কদাচিৎ দেখা যায়। একজন পঙ্গু মানুষ, এমন ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন, যা একজন পরিপূর্ণ মানুষ রাখতে পারছেন না! ইসলাম দোয়ার মাধ্যমে ত্যাগ, শোকরিয়া ও ধৈর্যের গুন অর্জন করতে শেখায়। একচোখ হারা মানুষ আল্লাহর শুকরিয়া করে, যার দুই চোখ নাই তার সাথে তুলনা করে। যে, তার চেয়ে সে কত ভাল! এক পা হারা মানুষ শান্তনা পায় যার দুই পা নাই এমন জনকে দেখে। এই শান্তনা, এই শক্তি, এই বিপুল প্রাণ-বল একমাত্র দোয়ার মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে। যারা পারে না, তারা আত্মহত্যা করে, উন্মাদ হয়, কখনও পাগল হয়, অন্যকে কষ্ট দেয়, আপনজনের দুঃচিন্তা বাড়ায়। অনিচ্ছা স্বত্বতেও সকলের জন্য মুসিবত বাড়ায় এবং কাছের মানুষেরও আন্তরিকতা হারায়।
আপনি অসুস্থ হয়েছেন হয়ত আবার সুস্থ হতে পারবেন! একটি অঙ্গ হারিয়েছেন, যা কখনও পাবেন না। দোয়া করলেও হারানো অঙ্গ পাওয়া যায়না! হয়ত ভাবছেন তাহলে কেন দোয়া করব! হ্যাঁ দোয়া এই কারণেই করবেন, এতে আপনার মনোজগৎ আপনার নিয়ন্ত্রণে আসবে, একাকীত্বে আপনাকে সঙ্গ দিবে, অসহায়ত্ব কাবু করতে পারবে না। অনেক সময় সেটি হারানো অঙ্গের চেয়েও বেশী শক্তিশালী প্রমাণিত হবে।