আল্লাহর রাসুল (সা) নূরের তৈরি বনাম মাটির তৈরি, বিষয়টি নিয়ে সুন্নি ভাইয়েরা খুবই সিরিয়াস। এই বিষয়ে কারো দ্বিমত থাকলে, সে ব্যক্তি সারা জনমের নামাজী, বহু হজের হাজি হলেও, তিনি কাফের হয়ে যান। ভাণ্ডারীদের কাণ্ডারি যখন রমেশ শীল
আমার কোন দ্বিমত নেই যে, এই জগতে নূরের তৈরি মানুষ শুধু একজনই আছেন। তিনি মোহাম্মাদ (সা)। কিন্তু আজকের বিষয় সেটি নয়, অন্য আরেকদিন না হয় কথা বলা হবে। তবে কথাটি এসেছে কবিয়াল রমেশ শীল কে নিয়ে। তিনি যখন ভাণ্ডারীদের নূরের তৈরি পুতলা (পুতুল) বানিয়ে গান গায় তখন কিন্তু আমাদের সুন্নি ভাইদের চেহারায় সন্তুষ্টি থাকে, কোন প্রতিক্রিয়াই তারা দেখায় না।
রমেশ শীলের (১৮৭৭-১৯৬৭) প্রতি ব্যক্তিগত ভাবে আমার কোন ক্ষোভ নেই। তিনি কবিয়াল ও গায়ক হিসেবে চট্টগ্রামের এক বিস্ময়কর কিংবদন্তি। মাত্র তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়ুয়া একটি ব্যক্তি কিভাবে শত শত গানের রূপ ও সুর দিয়েছেন, এটা ভাবতেও আশ্চর্য লাগে। একটি কথা চালু আছে যে, মূলত মাইজ পাড়াকে ভাণ্ডারী হিসেবে নূতন নামে চিত্রিত করার মূল কারিগর ছিলেন এই রমেশ শীল! ভাণ্ডারীদের কাণ্ডারি যখন রমেশ শীল
সাইয়্যেদ আহমেদ উল্লাহকে (রহ) তিনি কাছে থেকে দেখেছেন। রমেশ শীলের অন্যতম অবদানের মধ্যে অন্যতম যে, তিনি মাইজ ভাণ্ডারী গান নিয়ে, গানের জগতে স্বতন্ত্র একটি ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছেন। সারা দুনিয়ায় বাংলা ভাষী মানুষেরা মাইজভাণ্ডারী গান সম্পর্কে এক বাক্যে অবহিত। জিকির কারীদের সুবিধার্থে তিনি অগণিত শ্যামা সংগীত রচনা করেছেন। অনেকেই সওয়াবের আশায় এসব গেয়ে থাকেন, পারিবারিক অনুষ্ঠানের বহু টাকা ব্যয়ে শ্যামা মাহফিল করেন! অনেক অবদান রমেশ শীলের! সে হিসেবে রমেশ শীলকে নিয়ে চট্টগ্রাম বাসী গৌরব করতে পারে কিন্তু তিনি তো ইসলাম ধর্মের পণ্ডিত নন! তবুও তিনি মুসলিম নাম ধারী ব্যক্তিদের পথ দেখাতে বহু ধর্মীয় গান রচনা করেছেন। এসব গান ভাণ্ডারীরা তাদের অনুসারীদের মাধ্যমে সারা দেশে বিস্তার করেছে। চলুন, রমেশ শীলের খুবই জনপ্রিয় একটি গানের কিছুটা দেখে আসি।
এই ভুবনে দিতে নাইরে তুলনা,দ্বীন দুনিয়ার মালিক বাবা মাওলানা।মাওলানা মাওলানা মাওলানারে,নূরের পুতলা বাবা মাওলানা…
মুসলমানেরা দ্বীন দুনিয়ার মালিক কথাটি কোথায় ব্যবহার করে মনে পড়ে কি? একটু চিন্তা করুন তো? নিশ্চয়ই এতক্ষণে মনে পড়ে গেছে। সুরা ফাতিহার শুরুতেই আমরা বলে থাকি “মালিকি ইয়াওমিদ্দীন” হিসেবে। আর আলহামদুলিল্লাহের যায়গায় কায়দা করে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে, “মাওলানা” শব্দটি। ভুল বুঝবেন না, এই মাওলা কিন্তু আল্লাহ নয়! আহমেদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী। মোহাম্মদ (সা) পরে তিনিই আবার নূরের তৈরি পুতুল! এবার বুঝুন যে এই গান গায়, গায়কদের অর্থ দেয় কিংবা পৃষ্ঠপোষকতা দেখায়, তাদের ঈমানের গতি কি হবে? নিশ্চয়ই কুকুরী-শিরক দুটোই একসাথে হবে। আমাদের সুন্নি আলেমেরা কিন্তু প্রতি নিয়ত এসব শুনে থাকেন কিন্তু তারা কোনদিন এসব নিয়ে কথা বলেন না। অধিকন্তু একেবারেই চুপ থাকে!
এস সময় এসব গানকে ধর্মীয় কথা মনে করে আমিও গলা ফাটিয়ে গাইতাম। কোন মাহফিলে এসব গান গাওয়ার জন্য সুযোগ খুঁজতাম। ওয়াজ মাহফিলের শুরুতে মানুষ জমানোর জন্য ইমান বিধংসী বহু গান গাওয়া হত। স্রোতা, গায়ক কেউ জানত না এই গানের মূল রহস্য কোথায় লুকিয়ে। উদাহরণের জন্য আরেকটি গান দেখুন,
তোমার পাক নামে ভরসা ক’রে দিয়াছি সাঁতার,পার করো ডুবাইয়া মার মহিমা তোমার।।বাবা তোমার নুরী চরণ, নিত্য যারা করে স্মরণ,ঘুচাইয়েছে জন্ম মরণ এ ভবের মাঝার।।তোমার নুরী চরণখানি, পাতকী পরের তরণী,আদম রূপে, কাদের গনি, এলে মাইজভাণ্ডার।।পার করো ডুবাইয়া মার মহিমা তোমার…
মাইজভাণ্ডারের এই বাবা যেমন তেমন ব্যক্তি নন। তিনি আদম রূপে কাদের গনি (আবদুল কাদের জিলানী) হয়ে দুনিয়ায় এসেছিলেন, সেই কাদের গনি আবার রূপ বদলিয়ে আহমদ উল্লাহ হয়ে মাইজ ভাণ্ডারে এসেছেন। যার হাতে বিপদ হতে পার করা কিংবা ডুবাইয়া মারার ক্ষমতা বিদ্যমান।
অন্য আরেকটি গানে, চৌদ্দশ বছর আগে যিনি মদিনায় এসেছিলেন, সেই তিনি আবদুল কাদের হয়ে বাগদাদে এসেছিলেন আবার তিনি নতুন রূপে মাইজভাণ্ডারের বাবা হয়ে ফিরে এসেছেন। এমন ধরনের গান বানানো আছে। এসব গানের সুর ও কথার ছন্দ এতই সুন্দর যে, মানুষের কানে গেলে শুনতে বাধ্য হবেই! তাইতো মানুষ কোন বিবেচনা ছাড়াই এসব গাইতে থাকে।
রমেশ শীল হিন্দু ধর্ম-বিশ্বাসী মানুষ ছিলেন। তাদের ধর্ম বিশ্বাসে আছে ভগবান বিষ্ণু একবার রামের অবতার হয়ে, আবার কৃষ্ণের অবতার হয়ে জগতে আসেন এবং সবশেষে কল্কি হিসেবে দুনিয়ায় ফিরে আসবেন। এই চিন্তার প্রতিফলন তিনি আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর জীবনেও ঢুকিয়ে দিয়েছেন। ভাণ্ডারীকে একদিকে আল্লাহর প্রতিভূ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন আবার অন্যদিকে ভগবান বিষ্ণুর চরিত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এসব গান মুসলমানেরা গাইছে প্রাণ খুলে, মন উজাড় করে, আর জমকালো ধর্মীয় মাহফিলেরে শোভা বর্ধন করা হচ্ছে। কবি নজরুল জীবনের শুরুতে বহু হিন্দুয়ানী গান লিখেও যা করতে পারেন নি, রমেশ শীল তার চেয়েও বহুগুণ বেশী করতে পেরেছেন মুসলিম সমাজে। এক ভাণ্ডারীদের কাঁধে চরে লাখ-কোটি মানুষের ইমানকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছেন। এটা রমেশ শীলের দোষ নয়, তিনি একজন কবিয়াল মাত্র তাছাড়া তিনি এসব গাইতে কারো উপর জোড় জবরদস্তি করেন নি। পুরো দোষ সেসব মাজার ব্যবসায়ী আর অর্থের লোভে চুপ মেরে থাকা এক শ্রেণীর আলেমদের। যারা নিজেদেরকে নবীর প্রকৃত অনুসারী বলে চিল্লায় কিন্তু আল্লাহ-রাসুলের অপমানে তাদের কোন হুশ ফিরে আসে না।


Discussion about this post