দশ ফিট সামনে দাঁড়ানো পরিচিত একজনকে দূর থেকে সালাম দিয়ে নিকটবর্তী হচ্ছিলাম। কিন্তু তিনি সালাম শুনেও উত্তর দিলেন না। যখন তাকে অতিক্রম করে চলে যাচ্ছিলাম, তিনি আমাকে ইঙ্গিত দিয়ে একটু দাঁড়াতে অনুরোধ করলেন।
মিনিট খানের দাঁড়ানোর পরে, “ছোবাহানাল্লাজিল আজিম ওয়া বিহামদিহী” শব্দটি উচ্চস্বরে পড়ে, তারপর বললেন “ওয়ালাইকুম সালাম”, কেমন আছেন? বহুদিন পরে দেখা! ভদ্রলোক কায়দা করে বুঝিয়ে দিলেন, এতক্ষণ তিনি গুরুত্বপূর্ণ কোন তসবিহ পাঠে মনোনিবেশ করেছিলেন। কিন্তু সালামের উত্তর দিলেন দুই মিনিট পড়ে!
অথচ সালামের উত্তর আগে দেওয়ার কথা, কেননা এটা উত্তম সুন্নাতের অংশ, আর তিনি যে তাসবিহ পড়েছেন সেটা নফল। আমি যদি এক মিনিট বেশী না দাঁড়াতাম, তাহলে সালামের জবাবও পেতাম না।
আমরা দু’জনই অতীত কালের সুন্নি। তাই মন খুলে জানালেন, সুন্নিদের অনেকেই কবিরা গুনাহ শুরু করেছেন, তাই তিনি একজন মশহুর সুন্নি আলেম দ্বারা পরিচালিত একটি তবলিগে যোগ দিয়েছেন।
দৈনিক পড়ার জন্য পীর সাহেব কিছু জিকির ঠিক করে দিয়েছেন। জিকির গুলো নিয়মিত পড়লে, পীরের দোয়ায় জান্নাত না পাবার কোন কারণ নেই। জান্নাতের যাবার জন্য এই আমলই যথেষ্ট!
তাকে শুধু একটি কথাই জিজ্ঞাসা করলাম, এত কষ্ট করে, সালামের উত্তর দিতে অবহেলা করে যে আমল শুরু করেছেন, কোরআন-হাদিসের আলোকে সেটার কোন দলীল পেয়েছেন কি?
তিনি সোজা উত্তর দিলেন সেটা পীর সাহেব দেখবেন। আমাদের কাজ হল মেনে চলা। আসল কথা হল, এক অন্ধ কোনদিন আরেক অন্ধকে সঠিক পথ দেখাতে পারে না।
বাংলাদেশে অনেকগুলো সুন্নি মাদ্রাসা আছে, বিশেষ করে চট্টগ্রামে। যদিও সুন্নি মাদ্রাসা বলতে বিশেষায়িত কোন মাদ্রাসার ধারণা নেই।
যেহেতু ওয়াহাবী মাদ্রাসা আছে তাই পৃথক করে বুঝানোর জন্য সুন্নি হিসেবে উল্লেখ করা হল। তবে আকিদাগত ভাবে এসব মাদ্রাসায় মৌলিক তফাৎ পরিলক্ষিত হয়।
প্রতি বছর হাজার হাজার ছাত্র সুন্নি মাদ্রাসা থেকে পাশ করে বের হয়। কিন্তু এসব মাদ্রাসা থেকে বের হওয়া কোন ছাত্রদের কোনদিনও দেখা যায়নি যে, মাজার পূজার বিরুদ্ধে কোন কথা বলতে।
যেখানে স্তম্ভযুক্ত কবর ধ্বংস করে সমতল করে দেয়াই রাসুল (সা) এর সুন্নত। সেখানে তারা নিজেদের প্রকৃত সুন্নি দাবী করে পরিকল্পিতভাবে করবকেই একটি ব্যবসায়ের মাধ্যমে বানিয়ে ফেলে!
এই কয়েকদিন আগেই সুন্নিদের মহান ঈমাম হিসেবে খ্যাত দেশ বরেণ্য একজন আলেমের মৃত্যু হয়। তিনি বহু লম্বা হায়াত পেয়েছিলেন এবং তাদের দৃষ্টিতে তিনি সুন্নিয়তের মহান খাদেম ছিলেন। একটি মাদ্রাসার গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে অগণিত ছাত্র তৈরি করেছেন। অথচ দাফন করার আগেই তার কবরের আভ্যন্তরীণ দৃশ্য কনক্রিট দিয়ে পাকা করা হয় এবং বাহ্যিক দৃশ্য বিশেষায়িত করে বানানো হয়েছে। পরিস্থিতি যা দেখা যাচ্ছে অচিরেই এটাও তার ছাত্র, শিষ্যদের একটি স্থায়ী আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে। অথচ হাদিস শরীরেই এটা না করতে পরিষ্কার নিষেধ আছে,
জাবির (রাঃ) বলেন, “রাসুলুল্লাহ (সাঃ) কবর পাকা করতে নিষেধ করেছেন।” সহিহ মুসলিম – ২১৩৭
এটাই ছিল সুন্নাত। অথচ সুন্নিয়তের সেরা ইমামের দাফন শুরু হবার আগেই পাকা করার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল। মুখের দাবী আর কাজের মধ্যে তাদের কত বিস্তর পার্থক্য বিদ্যমান। তা বুঝার জন্য এই একটি উদাহরণই যথেষ্ট।
এই চট্টগ্রামেই এ ধরনের বেশ কিছু ঘটনা আছে, কায়দা করে এক জায়গায় কবর দিয়ে, কিছুদিন পরে সুবিধা জনক জায়গায় সেটি স্থানান্তর করে দুটি কবরের জন্ম দিয়ে, দুই জায়গাতেই রমরমা বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়েছে। কোন প্রমাণ নেই বায়েজিদ বোস্তামী বাংলাদেশে এসেছিলেন! তিনি ইরাকেই মারা যান এবং সেখানেই তার কবর এখনও বিদ্যমান। তারপরও তার নামে দারুণ ব্যবসা বানিয়ে নিয়েছে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামীর আস্তানায়। এ সকল কিছুই করা হয় কিন্তু সুন্নিয়তের দোহাই দিয়ে। ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়েও যদি কোরআন-হাদিসের প্রতিটি লাইন বিচরণ করা হয়, তাহলেও এসব কাজের পক্ষে একটি অক্ষরও দলীল হিসেবে বের করা যাবে না। তাহলে এসব মাদ্রাসার ছাত্রদের কি পড়ানো হয়? মাজার-কবরের এসব কর্মকাণ্ডের বিপরীতে যে, অগণিত হাদিস রয়েছে এগুলো কি তাদের না পড়িয়ে কায়দা করে লুকিয়ে ফেলা হয়! পিতা-মাতারাও বা কিসের আশায় এখানে ছাত্র ভর্তি করায়!
মাজার-কবর সংক্রান্ত ব্যাপারে সুন্নিরা ভাইয়েরা, প্রকাশ্যে বিরোধিতা না করলেও তলে তলে তাদের মধ্যে কিছুটা অসন্তোষ ও দূরত্ব থাকে। তাদের মধ্যেও বিভিন্ন দল আছে, সাধারণ মানুষ এসব মৌলিক পার্থক্য বুঝতে পারেনা কেননা তাদের মধ্যে যতই বৈপরীত্য থাকুক, সবাই মাজারের ক্ষেত্রে একই চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত। এখানেই তাদের আয়-রুজির উৎস লুকায়িত। মুখের দাবী একটা কাজে অন্যটা এবং কোরআন-হাদিস, আল্লাহ-রাসুলের প্রতি এত বড় অপমান বাহ্যিক ভাবে সহ্য করা হলেও, ভিতরে ভিতরে তাদের হৃদয়ে কষ্ট পায়। তাই হাশরের ময়দানে আল্লাহর কাছে, রেফারেন্স দেবার জন্য, নিজেরা নিজেদের মধ্যে কবর পূজার সমালোচনা করে। ওদের কথা বার্তার মাধ্যমে বুঝা যায় যে, দায় এড়ানোর জন্যই এ ধরনের আলোচনা করে থাকে। সেই দায় থেকেই সুন্নি তাবলীগের যাত্রা শুরু, যে ঘটনা শুরুতে বলা হয়েছে। এখন সেই পীর বেচে নেই কিন্তু ঠিকই তার কবরেও শামিয়ানা টাঙ্গানো হয়েছে, মরার প্রথম দিনেই। বাকি গুলোও খুব জমাটের সাথে চলে।
সুন্নি আলেমদের ওয়াজ নসিহতের মূল উপকরণ হল, ওলী-আউলিয়াদের কিসসা কাহিনী প্রচার করে, মানুষকে নিজের দিকে ধরে রাখা। ওলী-আউলিয়ার সাথে বেয়াদবি করে কে গজবে পড়েছে আর আর কে বিরাট ব্যবসায়ের মালীক হয়েছে, এ ধরনের কাহিনী মর্জি মত বানিয়ে শ্রোতাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়, আমিও সে ধরণের একজন কামেল ওলী। সুতরাং আমার কথা না শুনলেও কপালে খারাবী আছে। পীর-আউলিয়ার কাহিনী বলে ওয়াজ মাহফিল জমিয়ে তোলা, এমন ব্যক্তিরা কখনও কোনদিন তাদের শ্রোতাদের কোরআন হাদিস পড়তে বলে না। উপরন্তু ইনিয়ে বিনিয়ে না পড়ার জন্যই উৎসাহী করে তুলবে। কেননা কোরআন-হাদিসের জটিল মহত্ব বোঝা শ্রোতাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত মাদ্রাসা গুলোতে কায়দা করে এমন শিক্ষা দেওয়া হয়। যাতে করে পীর গিরিও চলে, মাজার কবরের কারবারও চলে, আর ঘরের চালায় বসে এসবের হালকা সমালোচনা করে কিরামান কাতেবীন কে সাক্ষী বানিয়ে রাখে যাতে করে হাশরের দিন আল্লাহর কাছে দলীল হিসেবে দেওয়া যায়।


Discussion about this post