মানুষের উপস্থাপনা জ্ঞানের পিছনের রহস্য

উপস্থাপনা জ্ঞান

পবিত্র কোরআনে মানুষের সৃষ্টি সম্পর্কে যে বর্ণনা দেওয়া আছে, সেখান থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, দুনিয়াতে আসার পূর্বেই মানুষের বুদ্ধি উপস্থাপনা জ্ঞান ছিল। এমনকি তাদেরকে জ্ঞানের উপাদান দিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছে।

দুনিয়াতে এসে, জীবনের প্রয়োজনে মানুষ জ্ঞানী ও শিক্ষিত হয়ে উঠেনি! এমনকি দুনিয়াতে যত সৃষ্টি-জীব ও উপকরণ রয়েছে সবকিছু সম্পর্কে সম্যক ধারণা মানুষের মগজে ও জ্ঞানে ছিল। পবিত্র কোরআনে এমনই দাবী করা হয়েছে, সেখানে আমরা সে কথারই স্বীকৃতি পাই,

“অতঃপর আল্লাহ আদমকে সমস্ত জিনিষের নাম শেখালেন তারপর তা ফেরেশতাদের সামনে পেশ করলেন…” [১-১৫]

নাম শিখানোর অর্থ, সাদামাটা জিনিষ পত্রের নাম বুঝানো হয়নি। জিনিষের নাম, পরিচয়, ব্যবহার বিধি, কার্যাবলী সবই বিস্তারিত মানুষকে শেখানো হয়েছে। দুনিয়ার বস্তুগত জীবনেও কারো নামের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া মানে, সেই ব্যক্তির বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়া বুঝায়। কোরআনের এই আয়াত দুটোর মধ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত রয়েছে।

যেমন দুনিয়াতে চলার জন্য, পৃথিবীর অন্য প্রাণীদের মগজেও কিছু নির্দিষ্ট মাত্রার জ্ঞান রয়েছে কিন্তু তারা সে জ্ঞানকে উপস্থাপন করতে পারে না। তারা তাদের জমাকৃত জ্ঞান দিয়েই জীবন চালায়।

একটি বিড়াল ছানা কখনও সাপ দেখেনি তবে দেখা মাত্রই তার সাথে কিভাবে আচরণ করা হবে সেটা সে আলবৎ জানে। মুরগীর বাচ্চা ঈগল চিনেনা কিন্তু বাঁচতে হলে আত্মগোপন করতে হবে, এই জ্ঞান তার আছে। ফলে এসব জ্ঞান প্রাণীদের বর্ণনা কিংবা উপস্থাপনা করতে হয়না!

মানুষের সৃষ্টি প্রাণীদের মত নয়। মানুষকে কেবল জ্ঞান দিয়েই বিষয়টি শেষ করা হয়নি, মানুষকে তা উপস্থাপনের দক্ষতাও দেওয়া হয়েছে। সে কথাটাই মহান আল্লাহ বলেছেন এভাবে,

‘তারপর তা ফেরেশতাদের সামনে পেশ করলেন’।

এর ফলে উপস্থিত ফেরেশতারা এক সাথে মানুষের দুটো গুনের সাক্ষাত প্রমাণ পেলেন। উপস্থাপনা জ্ঞান

একটি হল, দুনিয়ার সৃষ্ট বস্তু বিবেচনা জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ চিনতে পারে।
অন্যটি হল, এসব বস্তুর নাম, গুনাগুণ ও কাজের নিপুণ বর্ণনা দিতে পারে।

দৃশ্যত পৃথিবীতে নেতৃত্ব দিতে হলে, কারো এমন যোগ্যতা-দক্ষতা অবশ্যম্ভাবী দরকার। মানুষ অদেখা বাতাসের উপাদান সম্পর্কে যেমন ওয়াকিবহাল, তেমনি দেখা বস্তুর পরিচয় সম্পর্কেও সম্যক অবহিত।

এমনকি মাটির তলে লুকায়িত নিত্য নতুন আবিষ্কৃত আকরিক সম্পর্কেও পরিষ্কার ধারণা রাখে। মানুষের এমন মেধা-জ্ঞান ও অভিনব যোগ্যতা দেখে ফেরেশতারা পর্যন্ত মানুষের এমন জ্ঞানের কাছে অবনত হলো। “যখন ফেরেশতাদের হুকুম দিলাম, আদমের সামনে নত হও, তারা অবনত হল” বাকারা-৩৪।

কেননা ফেরেশতারাও দুনিয়ার জীব-জন্তু, জড়-অনড় এসব দেখে বুঝে উঠতে পারে না। কেন এসব সৃষ্টি হয়েছে এবং এগুলোর কাজই বা কি? কিন্তু আদম তথা মানুষ এসবের বিস্তারিত পরিচয় ও ব্যাখ্যা জানে এবং সুচারুরূপে এসবের উপস্থাপনা ও ব্যাখ্যা জানে।

সে কারণেই ফেরেশতা নত মস্তকে স্বীকার করল জানে এবং একথা বলতে বাধ্য হল, “আমরা তো ততটুকু জানি, যতটুকু আপনি আমাদের দিয়েছেন” বাকারা-৩২

এতে বুঝা যায়, পৃথিবীর জীবনের শুরুতেও মানুষ ভদ্র ভাবে জীবন শুরু করেছেন। আদম ও হাওয়া (আ) দুজন মাত্র মানুষ থাকলেও তারা দুনিয়ার উপকরণ চিনতেন ও সে সবের ব্যবহার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন।

তারা যেভাবে হাঁস-মুরগী চিনতেন, সেভাবে তাদের পালন পদ্ধতি সম্পর্কেও জানতেন। তারা স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে বুঝতেন ফলে চিকিৎসা সম্পর্কেও জানতেন। যা দেখতেন, তাই চিনতেন।

আবার মানুষ কোন কিছুর ব্যবহার বিধি সম্পর্কে না জানলেও, চেষ্টা করলে সফল হয়। এটা সেই চিনা যা নাম শেখার কল্যাণেই হয়ে থাকে। এভাবে পরবর্তীতে সৃষ্ট হওয়া বিষয়ের মধ্যে যা মানুষেরা জানতেন না, তা শেখানোর জন্য আল্লাহ দুনিয়াতে নবী-রাসুল প্রেরণ করতেন।

নবীগণ শুধুমাত্র দ্বীন শেখানোর দায়িত্বই পালন করতেন না। তারা দুনিয়াবি, বৈষয়িক, জীবন যাপন পদ্ধতি ও কারিগরি জ্ঞানও বিতরণ করতেন।

সুতরাং বিজ্ঞানীদের দাবী মতে নিয়ান্ডারথাল যে মানুষের পূর্ব পুরুষ সেটি অবাস্তব অগ্রহণযোগ্য। বিজ্ঞানীদের ভাসা ভাসা ধারণা বিপক্ষে পবিত্র কোরআনের ধারণা সুস্পষ্ট, যুক্তিসঙ্গত ও গ্রহণযোগ্য।