জিন শয়তানের সংখ্যাও বেশী, হায়াতও লম্বা, তাদের মৃত্যুও আছে, তবে ইবলিশ ব্যতীত। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, ‘বেশ কিছুকাল কেটে যাবার পর ইবলিস একেবারেই বুড়ো হয়ে যায়, তারপর ফের ত্রিশ বছরের যুবকের বয়সে আবার ফিরে আসে’। এভাবে একটি জাতির পতনের অভিজ্ঞতায় সে বুড়ো হয়, আবার নবীন সমাজে নবতর ফেতনা সৃষ্টির লক্ষ্যে নবজীবন লাভ করে। কেয়ামতের আগ পর্যন্ত তার জীবন চরিত এভাবেই চলবে। বেঁচে থাকার এই পদ্ধতি সে মহান আল্লাহ থেকেই আদায় করেছিল।
দুনিয়ায় মানুষের জীবনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত শয়তান অগণিত মানুষকে পথভ্রষ্ট করে আসছে। মানুষকে পথভ্রষ্ট করার যত অভিজ্ঞতা শয়তানের আছে, এ থেকে বেঁচে থাকার তত দক্ষতা মানুষের নাই। যারা আল্লাহর সাহায্য চায় শুধু তারাই নিরাপদ থাকে। আল্লাহর পথে বাধাদানের জন্য কোন এক শক্তি যে প্রতিবন্ধকতা ও বাধা তৈরি করে; সে একই পদ্ধতি অন্যান্য জাতি গোষ্ঠীও ব্যবহার করে। বাধা দান ও শক্তি প্রয়োগের পদ্ধতি হুবহু একই কিংবা কাছাকাছি। অতীত কাল থেকে আজ অবধি পদ্ধতির একই ধরণ দেখা যাওয়ার অন্যতম কারণ হল; এই সব পদ্ধতি, চিন্তা-চেতনা, গবেষণা একজনের দেমাগ থেকেই উৎসারিত। তিনি হলেন ইবলিশ! আমেরিকা থেকে জাপান, উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু, আদি থেকে আজ পর্যন্ত সবই তার পরামর্শের আলোকেই চালিত হয়ে এসেছে। ইবলিশের একটিই অস্ত্র, প্রথমে নৈতিকতাকে ধূলিসাৎ করে তার স্থলে চরিত্রহীনতাকে স্থলাভিষিক্ত করে। যারা আল্লাহর একত্বে বিশ্বাসী, তাদের চিন্তায় দোদুল্যমানতা তৈরি করে।
‘প্রত্যুৎপন্নমতি’ বলে বাংলায় একটি শব্দ আছে। যার অর্থ উপস্থিত ক্ষেত্রে বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতাকে কাজে লাগানোর দক্ষতা। এই যোগ্যতা দুভাবে কাজে লাগানো যায়। প্রথমটি হল চালাকির (cleverness) মাধ্যমে, দ্বিতীয়টি হল বুদ্ধিমত্তার (intelligence) মাধ্যমে। এই দুটি মৌলিক উপাদানের উৎসস্থল ভিন্ন। চালাকির উৎপত্তি হয় ‘চিত্ত’ থেকে আর বুদ্ধিমত্তার উৎপত্তি হয় ‘রূহ বা আত্মা’ থেকে। মানুষ আর জিন ব্যতীত আর কারো কাছে বুদ্ধিমত্তা নেই! অর্থাৎ প্রাণীকুলের সবাই চালাকির উপর নির্ভর করে। কিন্তু মানুষের সাহচর্য্য থাকলে কিছু ইতর প্রাণী সামান্য বুদ্ধিমত্তা দেখাতে পারে, ফলে তার কদর একটু বেশী হয়। কিন্তু এই বুদ্ধিমত্তা সেই প্রাণীর সন্তানের নিকট থাকেনা কেননা তাদের বংশে বুদ্ধি বিকাশের সুযোগ নাই। শয়তান আগাগোড়া এই চালাকি দিয়েই মানব জাতিকে চালাক হবার ধারণা দেয়। মানুষের চিত্ত এটা পছন্দও করে। সে জন্য মানুষ কুট-নামী, বদনামী, কিলিগ লাগানো সহ নানাবিধ চিত্ত মনোহরী কাজ খুবই ভালবাসে। সিনেমা-নাটক বেজায় পছন্দ হবার অন্যতম কারণও এটাই।
দৃশ্যত একজন চালাক ও বুদ্ধিমান মানুষের বাহ্যিক আচরণের প্রকাশ দেখতে কিন্তু প্রায় একই! আরো গভীরে গেলে জ্ঞানী মানুষ দুটোর মাঝে ব্যাপক তফাৎ দেখতে পাবে। যেমন; একজন চালাক ব্যক্তি- শঠতা, ঠগ-বাজি, ফাঁকি-গোঁজামিল, মিথ্যা ও প্রলোভনের আশ্রয় নিতে কসুর করবে না। একজন বুদ্ধিমান মানুষ- সততা, একনিষ্ঠতা, বিশ্বস্ততা, দূরদর্শিতা ও সত্যবাদিতাতে লালন করবে। ফলে, বুদ্ধিমান মানুষ হয় বিচক্ষণ, প্রজ্ঞাবান, ধৈর্যশীল ও শান্ত।
ইবলিস ও আদম (আঃ) দুই জনেই ভুল করে জান্নাত থেকে বহিষ্কার হয়েছিলেন। আদম (আঃ) কথা না বাড়িয়ে, বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে নেয়। তিনি শর্তসাপেক্ষে ক্ষমাও পেয়ে যান। ইবলিশ এখানে চালাকির আশ্রয় নেয়। তার মাথায় আসে কেয়ামতের আগে সুযোগ বুঝে সেও আল্লাহর নিকট ক্ষমা চেয়ে মাপ করিয়ে নিবে। এই বিষয়ে তার বিশ্বাস খুবই দৃঢ় যে; মৃত্যুর আগে মাফ চাইলে অপরাধ যত কঠিনই হোক আল্লাহ মাফ করবেন। এই ফাঁকে, যে মানুষের জন্য তার এত অপমান তাদের বেশীর ভাগ সংখ্যক কে জাহান্নামের স্বাদ চাখাবে। ফলে সে আল্লাহর নিকট কেয়ামত অবধি মৃত্যু থেকে অব্যাহতি চায়।
তাই আসুন, ইতর প্রাণী ও ইবলিশের মত বিবেকহীন হয়ে চালাকিকে জীবন চলার মাধ্যম না বানাই। আমরা বুদ্ধিমান হই, বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেই। আল্লাহ মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এই বুদ্ধিমত্তার জন্যই। যে বুদ্ধিমান সে চিন্তাশীলও বটে, ধৈর্যশীলও হয়। তাদের দৃষ্টি হয় প্রসারিত, চিন্তা হয় গভীর, আত্মা হয় আলোকিত, হৃদয় হয় তৃপ্তি-ময়। আল্লাহ বলেছেন এই পৃথিবীর সফলতা একমাত্র ধৈর্যশীলের জন্যই।

Discussion about this post