ভদ্রলোকের ছয় মেয়ে। দুই মেয়ে হবার পরে দীর্ঘদিন থমকে দাঁড়িয়েছিলেন। একটি পুত্র সন্তানের আশায় দীর্ঘ দিন চিকিৎসার পর আবারো বংশ উৎপাদন ধারা শুরু হয়। ছয় মেয়ে হবার পর চিন্তায় পরে যায়, পরের বারেও যদি মেয়ে হয়! কেননা ততদিনে মেয়ে হবার এক ভিন্ন ধরনের জ্বালার মুখোমুখি তিনি পড়ে যান। না, খারাপ ভাবার কোন কারণ নাই। মেয়েরা যেমনি সুন্দরী, তেমনি গুণবতী। তিনি জানালেন, যদি তার এক ডজন মেয়েও হয়, চিন্তা ছাড়াই সবার বিয়ে হয়ে যাবে। কিন্তু সমস্যা ভিন্ন জায়গায়। বছর দু’য়েক আগে তার চতুর্থ মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব আসার সময় তার চিন্তিত মুখচ্ছবি দেখেছিলাম। পঞ্চম মেয়ের বিয়ের সংবাদ আসাতে তিনি মাথায় হাত মারলেন। আর আফসোস করলেন, হায়! প্রথম দুই বাচ্চা হবার পর যদি থামতাম তাহলে উপকার হত। একটি ছেলের আশায় যদি স্ত্রীর চিকিৎসা না করাতাম কতই না ভাল হত!
মেয়েরা সুন্দরী, গুণবতী, বিদ্বান, চতুর হলেও খাসিয়তে বেজায় লোভী! পিতা কত কষ্ট করে, কত শ্রমের মাধ্যমে তাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন, অতঃপর ভাল স্বামী পাইয়ে দিতে কি ভূমিকা রেখেছেন! মেয়েরা এসব চিন্তাতে অভ্যস্ত নয়। মেয়েরা বাপের বাড়ীতে বেড়াতে এলে, যা পায় তাই শ্বশুর বাড়ীতে নিয়ে যায়। না চুরি করে নয়! একেবারে ঘোষণা দিয়ে। তারা ভাবতেও চায়না কিছু জিনিষ এমন আছে যা নিয়ে গেলে তার বাপ-মা কষ্টে পড়ে যাবে। প্রথম মেয়ে বাপের বাড়ির জিনিষ নেয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা সহনীয় থাকলেও দ্বিতীয় মেয়ে আরেকটু বাড়ালেন। তৃতীয় মেয়েকে বিয়ে দেবার পরে, যেদিন বাপের বাড়ী আসলেন সে খেদোক্তি করে বলল, সবই তো বড় আপুরা নিয়ে গেছে! এ সংসারে তার জন্য তো কিছুই রইল না। ফলে সে ছোট বোনদের জন্য আনা নানা প্রয়োজনীয় জিনিষ নিয়ে চলে গেল এবং মাকে বলেও গেল যেন, ওসব তাদের কিনে দেয়।
চতুর্থ মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব যেদিন আসে, সেদিন পিতাকে যথেষ্ট বিমর্ষ দেখাচ্ছিল! তিনি খবরটি কিভাবে গোপন রাখবেন সে চিন্তায় ব্যস্ত। তার বিবাহিত তিন মেয়েকে দাওয়াত দেওয়া থেকে বিরত থাকতে চাইলেন! না পারেন নি! সবাই ছেলে-মেয়ে নিয়ে হাজির। যতজন মেহমান আসার কথা ছিল, তার দেড়গুণ নাস্তা বানিয়েও তিনি নাস্তা সংকটে চরম লজ্জায় পড়েছিলেন। কন্যারা তাদের সন্তানদের লেলিয়ে দিয়েছিলেন, এই সুযোগে যা পার তাই খেতে থাক। এটাই তোমাদের বিরাট সুযোগ, মহা অধিকার! বড় খালার ছেলে এক গ্লাস কোকাকোলা পান করলে, তুমি নিবে দুই গ্লাস। একটি মিষ্টির বদলে দুটি! এই যখন ঘরের দেওয়ালের দশা, তাহলে বাহিরে তো লজ্জায় মাথা কাটা পড়বেই। ঘরে আরো দুটো মেয়ে বাকি, এ ধরনের কথা লজ্জায় না যায় বলা আর অপমান না যায় সহ্য করা।
মাস ছয়েক আগে পঞ্চম মেয়ের বিয়ে হয়েছে। তার জন্য ঘরে আর কোন বস্তু নাই। তাই মাছ-গোশত, মসল্লা, চা-পাতা যা হাতের কাছে যা পেয়েছে সবই তুলে নিয়েছে। বড় মেয়ের সংসারে বউ শাশুড়ি আগুন জ্বলছে। তাই কি সব হাবিজাবি কিছুদিনের জন্য মায়ের কাছে বস্তা বেধে আমানত হিসেবে রেখে যায়। পঞ্চম মেয়ে যাবার সময় কান্না করতে করতে সেই বস্তাটিও হাওয়া করে দেয়! পিতার বাড়ীর অধিকার হিসেবে! কেননা তার জন্য তো এই বাড়ীতে আর কিছুই রইল না! পিতা-মাতার প্রতি মেয়েদের এ ধরণের অবিচার সরাসরি ডাকাতি ছাড়া আর কিছু নয়।
এই ধরনের একটি পরিবারের কথা কল্পনা করুন তো! নিশ্চয়ই অনেকে আঁতকে উঠবে। হলফ করে বলতে পারি পিতার সকল মেয়েরা এমন নয়, সকল সংসারে এ পরিস্থিতি নেই। কিন্তু বহু পরিবার এই ধরনের আগুনে জ্বলছে অবিরত। উপরের ঘটনায় দেখা যায়, সবাই মেয়ে বলে কষ্টে আছে তাদের পিতা-মাতা। অনেক পরিবারে তো ভাই আছে, তার স্ত্রী আছে। সে পরিবারে এমন কন্যাও আছে, যারা পিতার বাড়ীতে বেড়াতে এসে, পৈত্রিক অধিকার মনে করে! ভাবীর জিনিষও তুলে নিয়ে যায়! ফলে ভাবী তার সকল ননদদেরকে একটি সাক্ষাত উপদ্রব মনে করে। তাদের কেউ বেড়াতে আসা মানে, নিজের কিছু জিনিষ হাওয়া হয়ে যাওয়া। এটা একটা অনিরাপদ সংসারের দৃশ্য! এ ধরনের সংসারে যিনি বাবা বা বড় ভাই, তিনিই জানেন দুনিয়াতেও জাহান্নাম আছে এবং তার আঁচ কত কঠিন।
চার ভাইয়ের ঘরে একজন আদরণীয় ননদ! পিতা-মাতার অতি আদরে বেড়ে উঠা এই ননদের চাহিদার অভাব নেই। মা এতে নীরবে সায় দেয়। সচ্ছল এই পরিবারে শুধু মায়ের আশকারার কারণেই, তুষের আগুনের মত বাড়ছে জ্বালা। ভাবীরা চায় তাদের ননদ আবদার করুক, এতে আন্তরিকতা বাড়বে, ঘনিষ্ঠতা বাড়বে। আবদারের মাধ্যমে উপহার পেলে কৃতজ্ঞতা বোধ সৃষ্টি হবে। কিন্তু মা তার আদরণীয় কন্যার অন্যায্য আবদার পূরণে বারে বারে ছেলেদের বিরক্ত করে এবং এটা আদায়ে তিনি নিজেও কঠোর ভূমিকা পালন করে। ফলে সে সংসারে ভিলেন হয়েছে শাশুড়ি আর ননদ হয়েছে উপদ্রব।
যে সংসারে শাশুড়ি তার পুত্রবধূদের মেয়ে বানাতে ব্যর্থ হয়েছে সে সংসারের আগুন কোনদিন নিভে না। আবার বিয়ে দেবার পরেও যখন মা, তার মেয়েদের মুরুব্বী সেজে থাকে সেখানেও জ্বলে আগুন। আগের দিনে মেয়েদের বিয়ে দেবার পরে, বাবা বলে দিত, এখন থেকে ওটাই তোমার বাড়ী। বাপের বাড়িতে শুধু বেড়াতে আসবে, এর বাহিরে কিছু নয়। ফলে মেয়েরা মেহমান হিসেবেই বাপের বাড়ীতে আসত এবং তাদের সমুদয় চাওয়া পাওয়া একজন মেহমানের মতই থাকত। যার কারণে উপরে বর্ণিত সমস্যা সৃষ্টি হত না।
অন্যায্য সম্পদ কারো জীবনকে সুখী করেনা হউক তা বাপের বাড়ীর জিনিষ। পিতা-মাতা অখুশি হলে নিজের আপন কন্যা হওয়া স্বত্বেও তার জীবনে কোনদিন শান্তি আসবে না। রাসুল (সা) বলেছেন, “মেহমান হবার সর্বোচ্চ সময় হল তিন দিন”। মুসলিম। তাই পিতার বাড়ীতে গিয়ে ভাইয়ের পরিবারে মেহমান হলেও, এই নীতি অনুসরণ করলে অনেক অসুবিধা কমে যাবে।

Discussion about this post