ভদ্রলোক অবশেষে হতাশ হয়ে বললেন, আমি আর রাস্তা দেখছি না। ভাইয়েরা কোন মতেই সহযোগিতা করছে না। এই যুদ্ধ তো এক কঠিন যুদ্ধ। আগে কোনদিন এমন করে ভাবিনি। আমার কাছে অনেক টাকা কিন্তু সামান্য হালাল টাকার অভাবে মাকে হজে পাঠাতে পারবনা! তিলে তিলে জমাচ্ছি কিন্তু টার্গেট পুরো করতে পারছিনা। আচ্ছা ভাই, আমাকে খুশী করার জন্য যে টাকাটা আমার বাড়ীতে কেউ নিজ গরজে পৌছিয়ে দেয়। যেটা আমি কোনদিন নিজ হাতে ধরি নি, শুধু আমার মেডামই ওসব গ্রহণ করে, সে টাকাটাও কি হালাল নয়?
ভদ্রলোক এমন এক চাকুরী করেন, প্রতিমাসের শুরুতে তার ঘরে ব্যাগ ভর্তি নির্দিষ্ট অংকের টাকা পৌঁছে যায়……। তিনি ধমক দিলে এই অংক অনেকগুণ বেড়ে যেতে পারে। তবুও তিনি এটাতেই খুশী। আবার এসব না নিলেও গোত্রের সবাই সন্দেহ করতে পারে! পরিণতি লেজে গোবরে হতে পারে। টাকার এই ব্যাগে তিনি হাত লাগান না। তার স্ত্রী গ্রহণ করেন এবং সংসার গৃহস্থির অতিরিক্ত প্রয়োজনীয়তা মুছন করে।
তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এবার মা’কে হজে পাঠাবেন। সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। আসন্ন হজ উপলক্ষে তার মা আত্মীয় অনাত্মীয় সবার বাড়ীতে গিয়ে দাওয়াত পর্ব সেরে ছেলের বাসায় উঠেছে। ছেলে মা’কে হজে পাঠাচ্ছে এই কাহিনী সাড়া তল্লাটে প্রশংসিত হয়েছে। হজ কাফেলা থেকে সর্বশেষ ডকুমেন্ট আনার সময় এজেন্সি মালিক জানালেন, ভাইয়েরা, আপনাদের তো বহু ধরনের টাকার উৎস থাকে কিন্তু হজের সমুদয় খরচ হালাল টাকা দিয়ে করবেন। নতুবা এত কষ্ট করে হজ করা না করার মাঝে কোন তফাৎ নেই। হারাম টাকা ব্যবহার করে দোয়া করলে সে দোয়া কবুল হবেনা।
এই ঘোষণাটি ভদ্রলোককে ভাবিয়ে তুলে। তিনি হিসেবে করে দেখলেন, মাকে হজে পাঠানোর টাকার একটিও হালাল নয়। তিনি মাকে ভালবাসেন বলে, জীবনের শুরুতে এই কাজটিতে প্রথম হাত দিয়েছিলেন। মাকে দশবার হজে পাঠালেও, পয়সার ভাণ্ডারে টান পড়বে না কিন্তু তিনি যে চাকুরী করেন, না খেয়ে, না পড়েও যদি টাকা জমানো শুরু করা হয়, তাহলেও পাঁচ বছর লাগবে। এসব চিন্তায় মাথায় যেন বজ্রপাত পড়ল।
পাঁচ ভাই সবাই নাম করা পদে চাকুরী করে। কারো পিছুটান নাই। তাই কিছু হালাল টাকা হাওলাতের জন্য একে একে সকল ভাইয়ের দরজায় কড়া নাড়ে। কেউ সাড়া দেয়নি অর্থাৎ তাদের কাছেও হালাল টাকার সংগ্রহ খুবই অপ্রতুল। তাছাড়া নিজেরাই জানেনা তাদের পকেটের টাকার কোন অংশটি হালাল। অবশেষে পিতার রেখে যাওয়া জমি বিক্রয় করতে চিন্তা করল। সেটা নির্ঘাত হালাল। যদিও তিনি এতদিন ধরে নিজের নামেই বেশ কিছু জমি খরিদ করেছিলেন। মৃত পিতার সম্পত্তি নামজারি হয়নি, তাই বিক্রয় করা যাচ্ছেনা। ওদিকে হজে যাবার সময় দ্রুত গতিতে সামনে এগুচ্ছে। তিনি নিজেও কর্মকর্তা, টাকার অভাবে কারো কাছে হাত পাততে হবে এমন পদবি নয়। অধীনস্থরা নিজেরাই সিন্দুক ভরিয়ে তুলবে। সেই তিনি সামান্য হালাল টাকার জন্য সারা শহরে পাগলের মত ঘুরতে লাগলেন। অবশেষে বুঝতে পারলেন, সত্য পথের জগত অনেক কঠিন। হালাল টাকা যে এত বড় মহারত্ন হয়ে তার কাছে হাজির হবে, ভাবি কালে স্বপ্নেও চিন্তা করেনি।
তিনি চিন্তা করলেন, মায়ের কাছে অকপটে সত্য কথাটাই তুলে ধরবেন। এবারে এভাবেই হজে যাবেন, আগামী বারে হালাল টাকায় আবারো হজে পাঠানো হবে। ছেলের মুখে একথা শুনে, মা চিল্লায়ে বললেন, এসব আমাকে আগে বলোনি কেন! জেনে শুনে সজ্ঞানে হারাম টাকা দিয়ে আমি আমি যাব না। একথা বলেই তিনি বেহুশ হয়ে পড়েন। এই পর্যায়ে এসে হজে যেতে না পারার মনঃকষ্ট, সকল আত্মীয় স্বজনদের কাছে হেয় ও তামাশার পাত্র হওয়া সহ নানাবিধ চিন্তায় তিনি দু’দিন ধরে একাধারে কেঁদেছেন। এই ছেলেটি মাকে বেশী পছন্দ করে, তাই মা তার সাথেই বেশী থাকে। তিনি ছেলের চাকুরীর উৎস নিয়ে ভাবেন নি। এখন ভেবে বললেন, তুমি এই চাকুরী পরিবর্তন করার চেষ্টা কর। মাস্টার্স পরীক্ষাটা দাও। আরো যোগ্য হয়ে গড়ে উঠ। ভাল চাকুরীর সন্ধান করো। প্রয়োজনে আমি আরো দশ বছর অপেক্ষা করব, তার পর তোমার অর্জিত হালাল টাকা দিয়েই হজে যাব। যদি দেখতে পাই, তুমি হালাল অর্থ কামাই করছ কিন্তু হজে যাবার মত অর্থ তোমার যোগাড় হয়নি, এমতাবস্থায় যদি আমার মৃত্যু চলে আসে, তারপরও আমি তোমার উপর খুশী থাকব। এই সফলতার জন্য প্রতিদিন আমি তোমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করব।
অর্থের উৎসের মুখে বসে থাকার মত, একটি গুরুত্বপূর্ণ চাকুরী থাকার পরও তিনি আরো ভাল চাকুরীর জন্য রাতদিন পড়তে থাকলেন। তার এমন একটি চাকুরী চাই, যেখানে বেতন কম হলেও, প্রতিটা পাই যেন হালাল, নিরেট ও নির্ভেজাল থাকে। তার মা প্রতি ওয়াক্ত নামাজে দোয়া করতে থাকে। তিনি দীর্ঘদিনের কি এক রোগে কষ্ট পান। সন্তানের কল্যাণার্থে নামাজে এত বেশী সময় ব্যয় করেন, যার ফলে তার সকল রোগও কোথায় যেন চলে যায়! অবশেষে তিনি একটি ভাল চাকুরী পেয়ে যান। যেটা আরো সম্মানিত কিন্তু দুই নম্বরি অর্থের উৎস মুক্ত। নয় বছর পরে থাকার জন্য শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একটি বড় বাসাও পেয়ে যান।
চিন্তা করলেন, এই বাসায় এক কক্ষে দীন-হীন ভাবে থেকে বাকী দুটি কক্ষ ভাড়া দিলে, বছরান্তে তার যে টাকাটা জমা হবে সেটা দিয়ে তিনি মাকে হজে পাঠাতে পারবেন। সে সময়েই তার সাথে পরিচয়। তার জন্য যেন, দুজন সৎ প্রতিবেশী ভাড়াটিয়া যোগাড় করে দেই। তাহলে তার দশ বছরের হাজার হাজার কদমের যাত্রার পরিপূর্ণতা পাবে আগামী বছরেই। হজে যাবার আগে তার মাকে দেখলাম। তিনি দশ বছর ধরে প্রতি নিঃশ্বাসে সবর আর ধৈর্য ধরেছেন এই শুভক্ষণটির জন্য। আর ছেলের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য কাজ করে গেছেন অবিরত আর সর্বশেষে তিনি সফল ভাবে, সন্তুষ্টি সহকারে লক্ষ্যে পৌছতে পেরেছেন। মায়ের দোয়া আর মানুষের ইচ্ছাশক্তি যদি সবল হয়, তাহলে যে কোন বাধা অতিক্রম করা সম্ভব হয়। তা এই ঘটনা থেকে বুঝা যায়।
তাই আসুন গরীব মেহনতি মানুষের হালাল টাকা গুলোকে সম্মান করি। তাদের অর্জনকে শ্রদ্ধা করি। তাদের একদিনের হালাল আয়, দুই নম্বরি ধান্ধায় অর্জিত কোটি টাকার চেয়েও বেশী মূল্যবান। হালাল উপার্জনের মানুষগুলোকে উল্লু বানিয়ে, তাদের অর্থ ছিনতাই, চাঁদাবাজি, হয়রানীর মাধ্যমে আত্মসাৎ করে অনেকে নিজেদের বুদ্ধিমান ভাবে। মানুষের প্রতারণা মূলক এই আশা খুবই ক্ষণস্থায়ী। হালাল অর্থ হজম করা লোহা হজমের চেয়েও বেশী কঠিন। যে সুখের আশায় অন্যের ক্ষুন্নি বৃত্তি দখল করে, দুনিয়ার জীবন ত্যাগ করার আগে, তাকে তিলে তিলে এর পরিণাম উপভোগ করেই মরতে হয়। আর মৃত্যুর পরে জীবন আরো কঠিন আরো ভয়াবহ। যার কোন ইতি নেই।

Discussion about this post