প্রবাসে এক উচ্চশিক্ষিত দম্পতির দেখা পেয়েছিলাম। যারা একেবারেই কানাডা চলে গিয়ে সেখানে স্থায়ী হবার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে কাগজ পত্র তৈরিতে ব্যস্ত জীবন পার করছিলেন। তারা ছিলেন সরকারী চাকুরীজীবী, উচ্চশিক্ষিত। ব্যাংকে ছিল টাকা আর সাথে ছিল যোগ্যতা এবং বৈশিষ্ট্য-গত ভাবে ধার্মিক। কোন কনসালটেন্টের পরামর্শ ব্যতিরেকে নিজেরাই এমব্যাসিতে পরীক্ষা দিয়ে কাগজপত্র যোগাড় করেছিলেন।
কেন সেখানে যাচ্ছেন এই প্রশ্নে তিনি সহাস্যে উত্তর দিলেন। সন্তানদের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে। কিছু আকর্ষণীয় সুযোগের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে বললেন, কানাডার শিক্ষা ফ্রি এবং উচ্চ শিক্ষা অর্জনে যথেষ্ট সুযোগ সুবিধা বিদ্যমান। তাই তিনি সপরিবারে কানাডায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ভদ্রলোক দামী সরকারী চাকুরী ছেড়ে, সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে স্থায়ীভাবে কানাডায় পাড়ি জমান।
তাদের সন্তানেরা কানাডায় পৌছার দিন কয়েক পরই স্কুলে ভর্তি হয়ে গেল কেননা আগেই এসব প্রায় ঠিক ছিল। তিনি যে এলাকায় পৌঁছেছিলেন, সেখানের অনেকেই সন্তানদেরকে মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন! এই পরামর্শ ওনার নিকট বিদঘুটে লেগেছিল কেননা, তিনি তো কানাডায় গিয়েছেন, সে দেশের শিক্ষায় সন্তানদের উচ্চ শিক্ষিত করানোর জন্যই। সেখানে অনেক মাদ্রাসার উপস্থিতি দেখতে পেয়ে তাজ্জবও হয়েছিলেন এই ভেবে যে, আসলে একটি ভাল পরিবেশে তিনি সন্তান মানুষ করার জন্য পৌছতে পেরেছেন।
বিপত্তিটা তখনই বাধে, যখন স্কুলের পাঠক্রম মা-বাবাকে ব্যাখ্যা করার দরকার পড়েছিল। ক্লাসের একটি পাঠক্রম বুঝতে না পেরে ছেলে মায়ের সাহায্য নিয়েছিল। যে পাঠক্রমের কথা ছাত্র তো দূরের কথা পিতা-মাতাও কোনদিন চিন্তা করেনি। পাঠক্রমটা ছিল যৌনতা বিষয়ক! ওদিকে ছেলের ছিল বুদ্ধি কম। সে উচ্চস্বরেই যৌনতা বিষয়ক প্রশ্নগুলো মাকে এমন খোলামেলা শুরু করল মা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তিনি ভেবে পাচ্ছিলেন না, নিজের কানের আঙ্গুল দিবে, নাকি ছেলের মুখে হাত দিবে। ছেলের সোজা সাপটা কথা, এই ক্লাস না বুঝলে সে আগামীকাল থেকে স্কুলে যাবেনা। ক্লাসের সবাই হাসাহাসি করে। অপ্রাপ্ত বয়স্ক একটি শিশুকে যৌনতা বিষয়ক পড়াশোনা ও পরামর্শ; আমাদের দেশে অতীব কঠিন হলেও সেখানে এটা বহু সহজ। সে দেশে যারা লেখাপড়া করে, তারা এসব বিষয় লিখে, পড়ে ও ভাবার্থ অনুধাবন করেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। ভদ্রলোক এভাবেই বিষয়টি ব্যাখ্যা করলেন।
অনেক পিতা-মাতা সন্তানের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে সেখানে স্থায়ীভাবে থেকে যান! কেউ সে দেশের শিক্ষাকে হারাম ও গুরুত্বহীন ঘোষণা দিয়ে সন্তানকে হাফেজি মাদ্রাসায় ভর্তি করে দেন। এই দম্পতি কোটি টাকার লোকসানকে পিছনে ফেলে দেশে ফিরে আসার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন! ভদ্রলোক কানাডায় স্থায়ী হবার জন্য, তার সম্ভাব্য সকল পাওনা, প্রাপ্তি চুকিয়েই সেখানে চলে গিয়েছিলেন। অনেকের সাথে চিরবিদায় নিয়েছিলেন। আমার থেকেও কথা নিয়েছিলেন যে, কানাডায় যদি কোনদিন যাই, তাহলে তার সাথে দেখা হবে। কিন্তু তিনি ধর্ম, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সাথে আপোষ করতে পারেননি। প্রচুর টাকা লোকসানি দিয়েই তিনি ফিরে আসেন ও হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। অবশেষে অনেকের কাছে তিনিও অন্ধ, গোঁয়ার ও মহাবেকুব হিসেবে চিত্রিত হলেন; কেউ কি কানাডার নাগরিকত্ব প্রায় হাতে পেয়েই ফিরে আসে! সে বেকুব নয়তো কে হবে?
অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ইউনিভার্সিটির সিনিয়র অধ্যাপক ও ডিপার্টমেন্টের প্রধান ড. আতাউর রহমান অতিথি শিক্ষক হিসেবে আবুধাবির মাজদার ভার্সিটিতে এসেছিলেন। আমি নিজেই তাঁর একটি সাক্ষাত নিয়েছিলাম, তিনি বলেছেন, ‘আমি অষ্টেলিয়ার সম্মানিত নাগরিক ও নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তারপরও সন্তান মানুষ করার ব্যাপারে সর্বদা উদ্বিগ্ন থাকি। একজন মুসলিম হিসেবে এর সাথে মানিয়ে উঠা ভয়ঙ্কর কঠিন। শুরুর দিকে এখানের শিক্ষা ব্যবস্থায় জড়িত হলে, হয়ত ধর্ম ছাড়তে হবে, নয়ত শিক্ষা ছাড়তে হবে। তবে মাস্টার্স লেভেলের উচ্চ শিক্ষার জন্য এসব দেশ উত্তম এবং এইচ, এস, সি’র পরে এসব দেশে ছাত্র পাঠানো মোটেও শুভবুদ্ধির কাজ নয়।
সুপ্রিয় পাঠক, আমি ঢালাও ভাবে দাবি করছিনা সেখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা খারাপ। কেননা অনেকে মিলিয়ন টাকা খরচ করে সেখানে যাচ্ছে এবং শিক্ষা নিয়ে গৌরবের সাথে বসবাস করছে। বাংলাদেশের নাগরিক কেমন সন্তান আশা করেন এবং বিদেশের শিক্ষা পদ্ধতির ধরন কেমন তার প্রতি ইঙ্গিত দেবার জন্যই এই উদাহরণ টানার চেষ্টা করছি। যারা নৈতিকতাকে গুরুত্ব দেয়, তাদের কাছে এই দৃশ্য খুবই ভয়ঙ্কর আর যারা এসব কে দোষনীয় মনে করেনা তাদের কাছে আমার পোষ্টটি বিরক্তির কারণ হবে। বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জীবন চরিত এমনও আছে যার সন্তান নষ্ট হয়েছে, তিনি নেতিবাচক পরিবেশের সমর্থক বনে যান, যাতে করে অন্যের সন্তানেরাও তা গ্রহণ করে। তিনি এটা সুচিন্তিত ভাবে করেন বলে, তার কাছে অনুশোচনা, বিরক্তি অনুভব হয়না; এমনকি এটার কোন খারাপ দিক দেখার যোগ্যতাও হারিয়ে ফেলেন।

Discussion about this post