সেরা স্কুলের ধারণাটি আপেক্ষিক, দেশ ভেদে ভিন্ন। সাদামাটা করে বলতে বুঝায়, আনাড়ি, আনকোরা, চালাক, চাতুর যে মানেরই শিক্ষার্থী হউক না কেন, এ ধরনের স্কুলে ভর্তি হলে, মোটামুটি সবাই চৌকশ হয়ে বের হতে পারে। সেটাই সেরা স্কুল। দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে এর কিঞ্চিত নমুনা দেখা যায়। প্রায় সব মানের ছাত্র ভর্তি হয় এখানে কিন্তু সবাইকে চৌকশ বানাতে পারেনা দেশের প্রাইমারী স্কুল গুলো। শিক্ষা-সেরা-স্কুল
আজকাল সেরা স্কুলে পড়ানো, সন্তানকে সেরা বানানোর দুঃচিন্তায় পিতা-মাতার আরামের ঘুম হারাম হয়ে যাচ্ছে। দেখা গেছে, একটি সেরা স্কুলে ভর্তি করাতে এবং সন্তানের মেধার ঘনত্ব বাড়াতে শিক্ষার্থীকে একই শ্রেণীতে বার বার ধরে রেখে, তাদেরকে বুড়ীয়ে করা হচ্ছে! ভাল স্কুলে সুযোগ নেবার জন্য, চার বছর ধরে এক ক্লাসে দুবার পড়িয়ে শিক্ষার্থীকে বুড়ো বানানো হয়েছে। পিতা মাতার ধারণা, নামকরা স্কুলে পড়ালেই বুঝি তাদের সন্তান সেরা সন্তান হিসেবে সমাজে গড়ে উঠবে। আর চার বছরে ইজা সহজে পূরণ করে দিবে। আবার সেরা স্কুলে ভর্তি করাতে না পেরে, অনেক মর্যাদা শীল ব্যক্তিকেও হীনমন্যতায় ভুগতে দেখেছি। সন্তানের ব্যর্থতায় স্ত্রীর গোস্বা গিয়ে পড়ে স্বামীর উপরে। সংসারের বেহাল দশা। অনেক পরিবারে এটা প্রেস্টিজ ইস্যু মত কারবার।
বিদ্যালয়ের অন্যতম কাজ হল, শিক্ষার্থীরা সেখানে গিয়ে পড়া দিবে, নতুন পড়া নিবে এবং তৈরিকৃত পড়া আদায় করবে। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, সুন্দর চরিত্র প্রদর্শন, আনুগত্য দেখানো ও শৃঙ্খলা মেনে চলার অভ্যাস বানানো বিদ্যালয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শিক্ষকেরা এসব বিষয় কড়ায় গণ্ডায় আদায় করবে। কথা হল উপরের এসব বিষয় গুলো তো নিজের ঘরে থেকেই তৈরি করে দিতে হয়! একটি স্কুলে বহু সমাজের শিক্ষার্থী আসে, ফলে নিজেদের দুর্বলতা গুলো অন্যের সাথে মাপার সুযোগ পায় এবং নিজেকে সংশোধনের ক্ষেত্র তৈরি হয়। এটাই বিদ্যালয়ের যাবার অন্যতম সুফল।
আচ্ছা, আসুন তো একবার আমরা আমাদের নিজেদের অতীত জীবন দিয়ে একটু চিন্তাভাবনা করি। আমাদের মধ্য থেকে এমন একজন ব্যক্তিকে আমরা বের করি, যিনি স্কুল থেকেই সকল পড়া শিখে এসেছে; ঘরে বসে তাকে কখনও পড়তে হয়নি! কিংবা সকল অংক গুলো স্কুলেই শিখে ফেলেছে, বাড়ীতে এসে তাকে কোনদিন অংক নিয়ে বসতে হয়নি। নিশ্চয়ই এমন একজনকেও পাওয়া যাবে না। এ কথা দ্বারা বুঝা যায় যে, সকল পড়া স্কুলে পড়ানো হয় না। শিক্ষার্থী নিজের পড়া নিজের ঘর থেকেই পড়ে আসে এবং আস্তে-ধীরে স্বীয় মেধার বিকাশ বাড়ায়। তাহলে নিজেদের এই কষ্টকে কেন স্কুলের নামে চালিয়ে দেব!
সেরা স্কুলে পড়িয়ে পিতা-মাতা কি মহাসুখে থাকতে পারে? মোটেও না! তাদের পিছনে ব্যয় করতে হয় যথেষ্ট সময়। তাদের পিছনেও টিউশনির জন্য বিরাট অংকের টাকা ধার্য করতে হয়। এত কিছুর পরও পেরেশানি তাদের ছেড়ে যায়না। পরীক্ষায় ৯০% শতাংশের উপরে নম্বর তুলতে না পারলে ভর্তি বাতিল হয়ে যেতে পারে! এভাবে স্কুলগুলো অন্যের মেধাবী সন্তানদেরকে মাইক্রোস্কোপিক চিন্তা দিয়ে খুঁজে ফিরছে। সেই সাত সকালে, স্বামী সংসার ফেলে মায়েদের দৌড়াতে হচ্ছে স্কুলের পিছনে। স্কুল যেন সন্তানের নয়, এটা মায়েদেরও। কেননা ছুটি না হওয়া অবধি জননীকেও স্কুলের বারান্দায় তীর্থের কাকের মত পাহারাদারের মত বসে থাকতে হয়। এ কারণে অনেক মা সংসার ধর্ম পালন করতে পারে না। অহর্নিশি শারীরিক ও মানসিক টেনশনে মায়েরাও অকালে বুড়িয়ে যাচ্ছে। এই যাতনায় অনেক অভিভাবক সন্তানের ভবিষ্যৎ বলতে হতাশা আর অন্ধকারকেই বুঝে থাকে।
কয়েক বছর গচ্চা দিয়ে, সেরা স্কুলে পড়িয়ে , শিক্ষার্থীকে বুড়ো বানিয়ে আহামরি কিছু করতে পারে এমন নয়। অনেক ছাত্রকে প্রচুর টাকা ব্যয় করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে উচ্চ শিক্ষা নিতে হয়। এভাবেই যদি শিক্ষার্থীদের গতি বানানো হবে তাহলে শুরুতেই সেরা স্কুলের না পিছনের না ঘুরে, জীবনকে ত্যক্ত না করে যুগোপযোগী সাধারণ স্কুলেই পড়ানোতে দোষের কি ছিল! এতে অর্থ, সময়, শ্রম, সাধনা বাঁচানো যেত; হাসি-খুশি থেকে সমাজ-সংসারে বড় ভূমিকা রাখা যেত।
যে সমস্ত অভিভাবক দৃঢ়তার সাথে প্রত্যয়ী হয় যে, তাদের সন্তানকে সেরা কিংবা মোটামুটি ভাল শিক্ষা দিবেন। নিঃসন্দেহে মেই অভিভাবকেরা সাধারণ স্কুলে সন্তানদের পড়িয়েও সেরা ছাত্র বানাতে পারবেন। এটার জন্য অভিভাবকদের দৃঢ় সিদ্ধান্ত ও ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট। আচ্ছা, কোন একটি সেরা স্কুলের পুরো শিক্ষকদের টিমকে যদি কোন অখ্যাত স্কুলে পরীক্ষামূলক ভাবে পাঠানো হয়, তাহলে সে অখ্যাত স্কুলের ছাত্ররা কি বেশীর ভাগ কৃতকার্য হতে পারবে? নিশ্চয়ই তার উত্তর হবে ‘না’ এবং না! তাহলে বুঝা গেলে, সেরা স্কুল, সেরা শিক্ষক হলেই ছাত্ররা সেরা হয়না। বৈশিষ্ঠ্যগত ভাবে মেধাবী ছাত্ররাই কেবল সেরা হয়। এই মেধাবী ছাত্র যদি যথানিয়মে অখ্যাত স্কুলে পড়ে তাহলে সে সে স্কুল-কলেজ থেকেও তারা কৃতকার্য হবে।
তাহলে অভিভাবকেরা নিজের গ্যাঁটের টাকায় কেন স্কুলের নামে ঢোল পেটায়? চোখ বন্ধ সুনাম গেয়ে চলে? নিজের মেধাবী সন্তানের প্রতি এমন কি অবদান সেই স্কুলের, যার কারণে মেধাবী সন্তানের পিতা-মাতাকে স্কুল নিয়ে গৌরব করতে হয়! পিতা-মাতার নিজেদের প্রচেষ্টায় যে সন্তানকে মেধাবী বানাতে পারল তার পক্ষে কোন কথা বলা হয়না। তাই সবার উচিত আগে নিজের ঘরকে ক্ষুদ্র বিদ্যালয় বানিয়ে তোলা। এই বিদ্যালয় থেকেই মেধাবী সৃষ্টি হবে। মেধার বিকাশ ঘর থেকে বাড়তে থাকে। এই পরিবেশ এমন শিক্ষার্থীকে গড়ে তুলবে যার পিতা-মাতার বেশী টেনশন থাকবে না। অনেক অর্থকড়ি খরচ হবেনা। নিদ্দিষ্ঠ বিষয় গুলো সামলানোর জন্য ঘরে একজন টিউটর রাখলেও বিখ্যাত স্কুলের টেনশনের চেয়েও চাপ অনেক কম থাকবে। সর্বোপরি অখ্যাত ছাত্রও বিখ্যাত হয়ে উঠতে পারবে। সাথে সাথে এই আপ্ত বাক্য মুখস্থ করতে হবে যে, “বিদ্যালয়ের কারণে কোন শিক্ষার্থী সেরা হয়না বরং সেরা হয় নিজের অধ্যবসায়ের কারণে। কিছু সেরা ছাত্র সেসব বিদ্যালয়ে পড়ে বলেই, সে স্কুলের সুনাম হয়। এটা ছাত্রদের অবদান, তাদের পিতা-মাতার আন্তরিকতার ফসল।


Discussion about this post