ধর্মীয় চিন্তার ধন্ধ চলছিল, সেটা এ সময়ে চরমে পৌঁছে। গির্জা আর রাষ্ট্র মুখোমুখি হয় এতে গির্জার আধিপত্য খর্ব হয়, খৃষ্ট বিশ্বের মানুষ নিজেদের খেয়াল খুশী মত চলতে শুরু করে এবং নিজেদের খেয়াল-খুশী মত চলাটাকে ধর্মীয় চাদরে আবৃত করতে মনস্থ হয়। ফলে নিজেদের ইচ্ছাটাকেই বাইবেলের মত বলে চালিয়ে দিতে সচেষ্ট হয় এবং বারবার নিজেদের খেয়াল খুশী মত বাইবেলে পরিবর্তন আনতে থাকে!
ম্যাকিয়াভেলীর খাও-দাও-ফুর্তি করার ধর্মনিরপেক্ষ দর্শন এবং ডারউইনের বিবর্তন বাদের প্রভাবে ইউরোপের শিল্প সমৃদ্ধ মানুষ মাতাল হয়ে উঠে! চিত্ত পূজা, বিত্ত পূজা, বস্তু পূজার কালগ্রাসে নিমজ্জিত হল মানুষ। অনৈতিকতা, বেহায়াপনা, বেলেল্লাপনা, বখাটেপনা, উলঙ্গ-পনা, উচ্ছন্নে যাওয়া, পাপাচার ও অজাচারের নতুন সংস্কৃতির বন্যা বইতে শুরু করে। অনৈতিকতার এই প্লাবনে পাদ্রী-পুরোহিত, গির্জাধিপতি তো দূরের কথা এমনকি পোপ পর্যন্ত নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে পারেনি! ৭ম পোপ ‘ইনোসেন্ট‘ পোপদের জন্য নির্ধারিত মহা-সম্মানিত মুকুট সুদী ব্যক্তিদের হাতে বন্ধক রাখেন! ১০ম পোপ ‘লিউ‘ তার পূর্বের তিন জন পোপের ধর্মীয় কল্যাণের জন্য জমানো সমুদয় অর্থ-কড়ি চিত্ত-বিনোদনে উড়িয়ে দেন।
এক পর্যায়ে ভোগে মত্ত মানুষদের হাতে এক বিরাট ভোগবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা হয়। আর ভোগের প্রধান উপাদান হল নারী সঙ্গ! তাই নারীদেরকে প্রকাশ্য ময়দানে টেনে আনা হল! তাদের উদোম দেহ প্রদর্শনীর ব্যবস্থা হল! লাখো পুরুষের সম্মীলন স্থলে নারীর উলঙ্গ নৃত্য প্রদর্শিত হতে থাকুল! নৈতিকতা প্রচারের স্থলে সাহিত্যিকেরা মানুষের মন চাঙ্গা করতে নারী শরীরের বিভিন্ন স্থানের রসাত্মক বর্ণনায় মশগুল হল! চিত্রশিল্পীরা নারী দেহের মনোহর ছবি এঁকে যুবকদের মনে আগুন জ্বালিয়ে চলল। সে আগুন পাশ্চাত্যে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। নীতি-নৈতিকতার গুরুত্ব হারিয়ে মাদকাসক্তির ন্যায় সুস্থ-বিবেক বোধ সম্পন্ন মানুষ পর্যন্ত অনৈতিকতার অতল গহ্বরে পতিত হলো।
ইউরোপে নিজেদের বানানো সমাজে, নারীদের অধিকার স্বীকৃত ছিলনা! নারীদের একমাত্র জরায়ুর অধিকার ছাড়া, ভোটের অধিকার, ভাতের অধিকার এমনকি স্বর্গে যাবার অধিকার পর্যন্ত নারী জাতির ছিলনা! প্রশ্ন আসতে পারে, নৈতিকতার কিবা দরকার আছে পাশ্চাত্য তো উলঙ্গ-অনৈতিক হয়েই দেশে সমৃদ্ধি এনেছে! তার জবাব হল, ‘ইউরোপে সমৃদ্ধি এসেছিল নারীদের রাস্তার নামানো কিংবা নারী প্রগতির জন্য হয়নি! এটা হয়েছিল তাদের নাগরিক জীবনে দায়িত্বশীলতা এবং রাজনৈতিক চেতনা বোধের কারণে। তাদের মাঝে এমন মানুষ পাওয়া খুবই মুশকিল, যারা আত্মসাতের দায়ে অভিযুক্ত কিংবা লোভের বশে সস্তায় দেশ বিক্রি করে কিংবা ক্ষমতার লোভে অন্য জাতির আনুগত্যের দাসখত দেয়! তাদের সবার হৃদয়ে যে পরিমাণ দেশপ্রেম বোধ আছে আমাদের হৃদয়ে সে পরিমাণ নাই‘।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীতে সমগ্র ইউরোপে কর্মক্ষম পুরুষ মানুষের অকাল দেখা দেয়। এন্টিবায়োটিকের অভাবে, যুদ্ধাহত কোটি কোটি মানুষ মারা যায়! বুড়ো এবং শিশু ছাড়া তাদের জন্য পুরুষ মানুষের নির্ভরতা হারিয়ে যায়! চারিদিকে নারীর সয়লাব অথচ পুরুষের অকাল দেখা দেয়। ফলে কল-কারখানা, শিল্প-প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নের চাকা স্থবির হয়ে পড়ে। ব্যাপক যুদ্ধ বিধ্বস্ত জনপদকে কার্যোপযোগী করার জন্য সর্বত্র শ্রমিকের অভাব দেখা দেয়। ফ্রান্সে এই সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করে, সরকার ঘোষণা করে আমাদের মানুষ চাই, কর্মী চাই, শ্রমিক চাই! তাই নারীদের বলা হল, যেভাবেই পার, যেমনিতে পার, মানব সন্তান উৎপাদন কর, সবাইকে বৈধতা দেয়া হবে, সকল মায়েদের পুরস্কৃত করা হবে।
যেভাবেই পারা যায়, সেভাবেই মানব সন্তান উৎপাদনের লক্ষ্যে সারা ইউরোপে এক আজীব যৌন বিপ্লব সাধিত হল। দেখা দেখি সকল রাষ্ট্রেই তা অনুমোদন করল। নারীরা শিল্প-কারখানায় পুরুষের কাজ করল, সর্বত্র পুরুষের অভাব মেঠাতে নারীরাই এগিয়ে এল। মানব সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে, পুরুষের কাজ মেঠাতে যেভাবে নারীদের মাঠে নামানো হল, সেভাবে কল-কারখানার কঠোর কাজ, দিন-রাত পরিশ্রমের ধকল থেকে নারীরা মুক্ত থাকেনি। নারীদের মাসিক ঋতু হয়, গর্ভধারণ করতে হয়, যা পুরুষের নাই। নারীদের শরীরের গঠন ও কাজ করা ক্ষমতা পুরুষের মত না হবার পরও, তাদের দিয়ে পুরুষের মত কাজ করানো শুরু হয়েছে। বর্তমানে পুরুষের কাজ নিয়ে নারীদের টানাটানি করার প্রবণতাটাকেই নারী অধিকার বলা হচ্ছে!
খৃষ্ট সমাজে নারীরা ক্ষেত্রে বঞ্চিত ছিল, স্বর্গে যাবার অধিকার তাদের ছিলনা। ফলে নারী আন্দোলন হল এতে নারীবাদীরা বিজয়ী হয়। তাদের দাবীর প্রয়োজনে পবিত্র বাইবেলে সংস্করণ আনা হয় যে, এখন থেকে নারীরাও স্বর্গে যাবে! নারীরা আন্দোলন করে স্বর্গে যাবে নাকি নৈতিকতার উন্মেষ ঘটিয়ে একজন সৎ-বিবেক, পবিত্র-পরিছন্ন মানুষ হিসেবে স্বর্গে যাবে সে প্রশ্নের উত্তর নাইবা মিলল তবে ইউরোপের ভোগবাদী সে সমাজের চিত্র এই প্রজন্ম ভাবছে; উলঙ্গ হলেই বোধহয় মর্যাদাবান হওয়া যাবে! নারীরাও আয়-রোজগার করলে সুখী হওয়া যাবে! নারীদের চাকুরী করালে সম্মান ও ব্যক্তিত্ব বাড়বে। পাশ্চাত্য নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে নিজেদের হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে, স্মৃতি হাতড়ায়ে বেড়াচ্ছে আর প্রাচ্য তাদের ফেলে দেওয়া সংস্কৃতির আঁকড়ে ধরতে চাচ্ছে, আর ইউরোপের নিপীড়ন-নির্যাতনের কঠিন দিন গুলোকে মধ্যযুগীর বর্বরতা বলে প্রাচ্যের মানুষদের কাঁধে তুলে দিচ্ছে।
আধুনিকতার কথা বলে, নারীর দেহের প্রদর্শনী, পণ্যের বিজ্ঞাপনের নামে নারী শরীরের কুৎসিত অঙ্গ-ভঙ্গি প্রচার, বিশেষ অঙ্গে ফটোগ্রাফারের চটকদার ছবি সৃষ্টি, সুন্দর মানুষের সন্ধানে নেমে শুধুমাত্র সুন্দরী চেহারার নারী জোগাড়, গায়িকা বানানোর নামে নারীদের পরিবার থেকে পৃথক করার পদ্ধতি আবিষ্কার, আবার সেই গায়িকা দিয়ে নর্তকীর কাজ সারানোর মত এক শ্রেণীর মতলবি মানুষের কাজ কিন্তু নারীর উন্নয়নের নামেই করা হয়! বিশ্ববাসী দেখেছে, এই ধরনের সাংস্কৃতিক জোয়ারে গা ভাষাতে গিয়ে ফিলিপাইন আজ সাড়া দুনিয়ার জন্য পতিতা নির্ভর জাতিতে পরিণত হয়েছে! মূলত এসব বিপদজনক, ঘৃণিত, অপ্রকৃতস্থ মস্তিষ্কের শয়তানি আবিষ্কার। নারী স্বাধীনতা নারী উন্নয়নের নামে নারীকে নির্দয়-ভাবে ভোগ করার একটা মোক্ষম হাতিয়ার। নারীরা আগেও যেভাবে নির্যাতিত হয়েছে এখনও হচ্ছে, শুধুমাত্র পদ্ধতি বদলিয়েছে। পৃথিবীর প্রতিটি জাতি ও সম্প্রদায়ের নিকটি নারী সর্বদা নির্যাতিত হয়েছে শুধুমাত্র ইসলাম এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম! ইসলাম নারী জাতিকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছে, যা লেখক ইতি-পূর্বেকার পর্ব গুলোতে তুলনা মূলক ভাবে তুলে ধরেছে।


Discussion about this post