একটি অর্থবোধক বস্তুনিষ্ঠ সুন্দর নাম শিশুর জীবনকে দারুণভাবে মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ইংরেজী প্রবাদ আছে A Good Name is Better Than Wealth অর্থাৎ ‘সম্পদের চেয়েও শিশুর জন্য একটি সুন্দর নাম অনেক উত্তম’ একজন শিশু নেতা হতে, বক্তা হতে, গায়ক, নায়ক, সমাজ সংস্কারক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব কিংবা মহামানব হবার পিছনে নামের অর্ন্তঃনিহিত বিরাট ভূমিকা রয়েছে। আবার একটি হাস্য-পদ, গুরুত্বহীন নাম একটি শিশুর সুকুমার বৃত্তিকে তিলে তিলে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ইতিহাসে অগণিত ঘটনা রয়েছে একটি ইতিবাচক নামের সফলতার পিছনে। মধ্য প্রাচ্য কিংবা মধ্য এশিয়ায় মানুষেরা নাম শুনে যদি ভাল লাগে, তাহলে তার নামের অর্থ জিজ্ঞাসা করবে। আরব দেশের মানুষ কারো নাম শুনলে এবং তার নামের তাত্ত্বিক অর্থ বিবেচনা করে মানুষ সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন করতে চেষ্টা করে। আরবের কোরাইশ গোত্রের প্রাচীন এক দুর্ধর্ষ নেতার নাম ছিল ‘খেল্ফ’ তথা কুত্তা! তার পিতাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল কেন তিনি ছেলের নাম কুত্তা রাখলেন? গৌরবের সহিত পিতা বলেছিলেন, নিজ গোত্র রক্ষায় আমার ছেলের দক্ষতা হবে বীরের ন্যায়। শত্রু দল যখন মোকাবেলা করতে আসবে তখন যদি শুনতে পায়, দলপতির নাম ‘কুত্তা’! তখন তাদের চিন্তায় হিংস্র, হার না মানা এক ভয়ানক মানুষ, যার চরিত্রে কুত্তার ছবি ভেসে উঠবে। তাহলে শত্রুপক্ষ হীনবল, ভীত-বিহ্বল হয়ে পড়বে। এই নামের প্রভাবে আমার ছেলে গোত্র ও নেতৃত্ব রক্ষায়, আজীবন কুত্তার মত লড়তে শিখবে। শত্রুকে প্রচণ্ড ঘৃণা করতে শিখবে। আমরণ ,লড়তে ভালবাসবে। ফলে আমার অধস্তন বংশ পাবে নিরাপত্তা এবং টিকে থাকবে দীর্ঘকাল।
ইতিহাসে দেখা যায়, বহু রাজা-বাদশাহ ক্ষমতা দখল করে অর্থবোধক ও নতুন একটি সম্মানী নাম ধারণ করে রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন। আমাদের অতি পরিচিত মোগল সম্রাটদের প্রতি নজর দিলেই তার উদাহরণ দেখতে পাব। সম্রাট বাবরের আগের নাম জহিরুদ্দীন, সম্রাট হুমায়ুনের আগের নাম নাসিরুদ্দিন, সম্রাট আকবরের জালালুদ্দীন জাহাঙ্গীরের নাম নূরউদ্দীন, সম্রাট শাহজাহানের খুররম, সিরাউদ্দৌলার আগের নাম ছিল মির্জা মোহাম্মদ। এ ধরনের প্রচুর উদ্ধৃতি দেয়া যাবে। রাজ্য দখল ও রাজ্য শাসনের সাথে নামের কি প্রভাব ও যাদুকরী ক্ষমতা থাকতে পারে তা উপরোক্ত উদাহরণ থেকে আমরা পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও, রাজ্য শাসনে এর বিরাট গুরুত্ব আছে সেটা তো উপলব্ধি করতে পারি!
ইসলাম ধর্মেও নামের গুরুত্ব অপরিসীম। পবিত্র কোরআনে, আল্লাহ নিজেই বলেছেন তাঁর রয়েছে অনেক সুন্দর নাম। এ সব নামের এত ব্যাপক অর্থ দাড়ায়, যা বিশ্লেষণ করে কোনদিন শেষ করা যায়নি, যাবেনা। হাদিসে আছে, তাঁর এ সকল সুন্দর নামের অর্থ মানুষ যেভাবে বিবেচনা করে; আল্লাহ বলেছেন, আমি আমার বান্দার সাথে সেভাবেই আচরণ করব। একটি সুন্দর নামের এত গুরুত্ব, স্বয়ং আল্লাহ পর্যন্ত তার মূল্য দিয়ে থাকেন। রাসুল (সাঃ)বলেছেন, ‘পিতা-মাতার কাছে ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুর প্রথম মৌলিক অধিকার হল, তার জন্য একটি সুন্দর নাম চয়ন করা’। কেয়ামতের দিন বহু বড় অপরাধীকে ক্ষমা করে দেয়া হবে, একটি সুন্দর নাম রাখার কলানেই। মানুষের কাছে একটি সুন্দর নামের কারণ তুচ্ছ কিন্তু মহাবিশ্বের মালিক আল্লাহর কাছে এটার গুরুত্ব রয়েছে অপরিসীম।
রাসুল (সাঃ) এর কাছে কোন মানুষ আসলে তার নাম জিজ্ঞাসা করা হত। আরবের অন্ধকার যুগে রাখা বহু হিংসাত্মক নাম ওয়ালা কেউ আসলে তিনি তার নাম পরিবর্তন করে নতুন একটি নাম দিতেন। কখনও পিতৃ প্রদত্ত অসুন্দর নাম বদলিয়ে সুন্দর নাম দিতেন। বহু দিনের পুরানো রোগী ছিল ওমর (রাঃ) এক কন্যা। রাসুল (সাঃ) তার নাম পরিবর্তন করে একটি সুন্দর নাম জুটিয়ে দেন, এতে করে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যান! রাসুল (সাঃ) কোন একটি এলাকা অতিক্রম করার সময়ও স্থানের নাম জিজ্ঞাসা করতেন। অসুন্দর ও অর্থবোধক নাম না হলে তিনি সে এলাকা অতিক্রম করতেন না। আগে এলাকার নাম পরিবর্তন করতেন তারপর সে এলাকা পাড়ি দিতেন। এ ধরনের বহু উদাহরণ হাদিসের পাতায় বিদ্যমান। এটা থেকে বুঝতে পারা যায় মানুষের একটি সার্থক জীবন গঠন করার পিছনে নামের প্রভাব বহু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পিতা-মাতা যে নামেই সন্তানকে ডাকে, পুরো দুনিয়া বাসী তাকে সে নামে ডাকবে ও চিনবে।এই নামেই তার কৃতিত্ব ইতিহাসে রচিত হবে। কোন পিতা তার সন্তানের নাম বাদশাহ রাখার পর, দুনিয়ার জীবনে সে হীন, কাঙ্গাল হলেও তাকে মানুষ বাদশাহ হিসেবেই ডাকে। কোন পিতা-মাতা সন্তানকে দস্যু বললে, মানুষ তাকে দস্যু হিসেবেই বিবেচনা করবে। পরিণত বয়সে সে যতই কল্যাণকর কাজে ভূমিকা রাখুক না কেন, মানুষ ভাবতে থাকবে জীবনের কোন এক বাঁকে সে দস্যুবৃত্তি করত। দুনিয়ার জীবনে ভুক্তভোগী বহু মানুষকে দেখে থাকবেন, যিনি অগণিত টাকা খরচ করেন যাতে করে তার পিতৃ প্রদত্ত নামটি ঘুচে যায়! কিংবা একটি সুন্দর নাম ধারণ করার জন্য অকাতরে অর্থ খরচ করে চলেছে।
একদা এক হোমিওপ্যাথি দোকানে বসে ছিলাম। অসুস্থ সন্তানের জন্য ঔষধ নিতে রোগীর পিতা এসেছেন ডাক্তারখানায়। ডাক্তার প্রশ্ন করলেন, কি নাম ছেলের। পিতা অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, নাম দিয়ে ডাক্তারের কাজ কি? রোগের ঔষধ দেন সেটাই তো যথেষ্ট। ডাক্তার বোঝালেন, আপনাকে কি ঔষধ দেব তা আমার রেজিস্ট্রি খাতায় লিপিবদ্ধ করতে হবে। আগামী বারে আসলে যাতে আমি বুঝতে পারি আপনাকে কি ঔষধ দেওয়া হয়েছিল।নতুবা ডাক্তার বারে বারে একই ঔষধ দিতে থাকবে।
ডাক্তারের কথায় যুক্তি থাকায় হার মানলেন, তদুপরি অশিক্ষিত পিতা বিরক্ত হয়ে জানাল, ছেলের নাম ‘টুইস্যা’! ডাক্তার আশ্চর্য হয়ে পিতাকে প্রশ্ন করল, ‘টুইস্যা’ কি কারো নাম হতে পারে? পিতা ছিল অধৈর্য! তিনি গোস্বা করে বললেন, ডাক্তার সাব, আপনি আমার বাড়ীর পাশে গিয়ে টুইস্যা করে চিল্লান, দেখবেন আপনার ডাকে আমার ছেলেই বের হয়ে এসেছে। এটা যদি নাম না হয়, তাহলে সে কেন আসবে?
নামের গুরুত্ব পিতা যেভাবে বুঝেছে, সেভাবেই উত্তর দিয়েছে। বহু নাম আছে যার কোন অর্থই নাই। কিছু নাম উচ্চারণে মোলায়েম বলেই পিতা-মাতা সন্তানের জন্য পছন্দ করেন। আবার কিছু শিক্ষিত উদভ্রান্ত পিতা-মাতা আছে যারা নামের ক্ষেত্রে হেঁয়ালি পনা করেন। কলেজ শিক্ষক, বড় ছেলের নাম নিউটন রেখেছিল বিধায় পরের গুলোর নাম হয়েছে ইলেকট্রন এবং প্রোটন! এটা সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার আন্তরিকতা হীনতা ও দায়িত্বহীনের পরিচয় বহন করে। সুন্দর চরিত্রবান সন্তান বানানোর জন্য একটি সুন্দর ও অর্থবোধক নামের কোন বিকল্প নাই।
চলবে…..

Discussion about this post