পুঁজিবাদ তথা ধনতন্ত্রবাদ তথা Capitalism. শব্দটি আমরা নিত্যদিন শুনে থাকি কিন্তু খুব কম সংখ্যক মানুষই এই তত্ত্বের সাথে সম্যক পরিচিত! যারা এ সম্পর্কে বলে থাকেন হয়ত আমরা তাদের কথাগুলো বুঝি না; আর যারা গবেষণা করে তাদের প্রতি আমাদের লক্ষ্য কম। এ ব্যাপারে আমাদের ধারণা থাক বা না থাক, বিশ্বের বৃহৎ জনগোষ্ঠী ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় পুঁজিবাদের গ্যাঁড়াকলে আবদ্ধ হয়ে আছে। তাই আসুন সংক্ষিপ্ত ভাবে পুঁজিবাদ সম্পর্কে ধারণা নিয়ে নেই।
পুঁজিবাদের সংজ্ঞা: যে উৎপাদন ব্যবস্থায় সকল উৎপাদন যন্ত্র ব্যক্তি মালিকানাধীন থাকে এবং উৎপাদন পদ্ধতিতে অবাধ মুনাফা অর্জনের সুযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়, তাকেই পুঁজিবাদ বলে।
পুঁজিবাদী পদ্ধতিতে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান সীমাহীন অধিকার লাভ করে। শিল্পপতিদের ধন নিয়ন্ত্রণ কিংবা কারো পরামর্শে তা বণ্টন করার অধিকার; আইনে তো নাই, এমনকি এ ব্যাপারে কি করা যায় সে পরামর্শ দেবার ক্ষমতাও সরকারের থাকেনা! শিল্পপতিদের তৈরি শিল্প উৎপাদন, বাজারী করণ ও মুনাফা অর্জন সম্পূর্ণ তাদের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। এই ব্যবস্থায় ব্যবসায়ের জন্য নিত্য নৈমিত্তিক প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি স্বীয় মালিকানায় রাখার সুযোগ যে আছে তাই নয়; তাতে সকল প্রকার উৎপাদন-উপায় এবং যন্ত্রপাতি ইচ্ছামত ব্যবহার ও প্রয়োগেরও পূর্ণ সুযোগ তাদের হাতোই করায়ত্ব থাকে।
ব্যক্তি নিজের ইচ্ছামত, যে কোন পন্থা ও উপায়ে অর্থোপার্জন করতে পারে এবং স্বাধীনভাবে যে কোন পথে তা ব্যয় এবং ব্যবহার করতে পারে। যেখানে ইচ্ছা সেখানে কারখানা স্থাপন করতে পারে এবং যতদূর ইচ্ছা মুনাফাও লুটতে পারে! শ্রমিক নিয়োগের যেমন সুযোগ রয়েছে, তাদেরকে শোষণ করে একচ্ছত্র মুনাফা লুণ্ঠনের পথেও বাধা থাকেনা। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা গোটা সমাজ মিলিত হয়েও কাউকে কোন প্রকার কাজ হতে বিরত রাখতে পারে না, সে অধিকার কারো থাকেনা!
পুঁজিবাদের এই পদ্ধতিতে গরীব আরো গরীব হয় এবং ধনীদের সম্পদ স্ফীত হতে হতে সকল সম্পদ তাদের হাতে চলে যায়। এভাবে সম্পদ পুঞ্জিভূত হবার কারণে এক পর্যায়ে রাষ্ট্র-যন্ত্রও অর্থের আশায় তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে! পরবর্তীতে এসব ধনীরাই রাষ্ট্রের পরামর্শক দাতা হিসেবে আসন গেড়ে বসে। বস্তুত এধরনের পুঁজিপতিদের পরামর্শ যতটা না জনগণের কল্যাণে তার চেয়েও বেশী কার্যকর হয় তাদের স্বীয় স্বার্থ ও ব্যবসায়িক উন্নতি কল্পে।
পুঁজিবাদী প্রথায় মানুষকে উৎসাহ যোগায়, কিভাবে সহসা সম্পদ আহরণ করা যায়। যুতসই সম্ভাব্য সকল পদ্ধতিতে বুদ্ধি-চালাকি করে, যে ব্যক্তি যত বেশী সম্পদের মালিক হতে পারে, তাকে পুঁজিবাদী সমাজে সফল ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়। এখানে মানব-দরদী হওয়া বেমানান! একটি শিল্প-প্রতিষ্ঠানে কতজন মানুষ কাজ করে, কতটি পরিবার পালনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারল; সে হিসেব বিবেচ্য নয়। বরং আধুনিক নিত্যনৈমিত্তিক যন্ত্রপাতি সৃষ্টি করে, কত কম মানুষ খাটিয়ে, অল্প সময়ে বেশী অধিক মুনাফা অর্জন করা গেল; সেটাই প্রধান গুরত্বের বিষয়। এখানে দক্ষ জনশক্তির মূল্যের চেয়ে, অধিক মুনাফা অর্জনকে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পুঁজিবাদী সমাজে ধর্ম, কৃষ্টি, সমাজ ও সংস্কৃতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বহু সংস্কৃতির মিলন-মিশ্রণকে এ সমাজে উৎসাহ প্রদান করা হয়। মানুষের চাহিদা, ইচ্ছা, অভিলাষ গুলো তারা গবেষণা করে। মানুষের চাহিদা গুলো গবেষণার মধ্য দিয়েই, ব্যবসায়ীক কোন উপাদান পাওয়া যায় কিনা সেটা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা চলে। মূলতঃ ধর্মকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, ব্যবসায়ীক ধান্ধা-বাজির লক্ষ্যেই! আবার নিজেদের ব্যবসায়ীক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কারণে এক ধর্মের উপরে অন্য ধর্মকে প্রাধান্য দিতে হলেও বিনা দ্বিধায় তা করে, তাতে যত বাধা ও নিন্দাবাদ আসুক। এখানে নীতি ও নৈতিকতা বড় বেমানান, হাস্যকর বিষয়।
পুঁজিবাদী সমাজে গরীবের কোন মূল্য নাই। এ সমাজে তকদির-ভাগ্য বলতে কিছুর বিশ্বাস নেই। তাই গরীবদের ভাগ্য বদলানোর জন্য কোন কর্মসূচীও থাকেনা। পুঁজিবাদী দর্শনের ভিত্তিই হল, বুদ্ধি-চালাকিতে এসব মানুষ অলস বলেই তারা গরীব হয়েছে। গরীব হওয়া ও গরীব থাকাটাই তাদের প্রাপ্য। তাছাড়া, সমাজের একটা বৃহৎ অংশ গরীব আছে বলেই তো, তাদেরকে ধনী হিসেবে আলাদা করা যায়। বিনা বিজ্ঞাপনের এই খ্যাতি তারা হারাতে চায়না! পুঁজিবাদী সমাজে হাজার হাজার কর্মহীন মানুষের বিপরীতে একজন চৌকশ-ধান্ধাবাজ মানুষের গুরুত্ব অনেক বেশী। আইন, ব্যবসা, বাণিজ্য, উদ্ভাবনী ক্ষমতার একজন ব্যক্তির কদর লাখো মানুষের চাইতে বেশী মূল্যবান। তাদের ধান্ধাবাজির ব্যবসায়ে নৈতিক-অনৈতিক, হারাম-হালালের বিবেচনা না করার স্বাধীনতা রয়েছে। এ নিয়ে কোন আপত্তি, মামলাবাজি সদা অগ্রাহ্য বলে বিবেচিত।
নিজেদের উৎপাদিত পণ্য নিজের দেশ ছড়িয়ে, বিশ্ববাজার দখল করার জন্য পুঁজিপতিদের চোখে ঘুম থাকেনা। এজন্য প্রতি দেশের যুবক শ্রেণি তাদের প্রথম পছন্দ। যুব শ্রেণির পছন্দকে তারা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে এবং মোক্ষম সময়ে কাজে লাগায়। দেশের উঠতি নায়িকা, গায়িকা, খেলোয়াড়, কবি, সাহিত্যিক এবং কোন বিষয়ে হঠাৎ করে জন-নন্দিত হয়ে উঠা ব্যক্তিকে তাদের প্রোডাক্ট এম্বাসেডর বানায়। তারা প্রয়োজনে একজনের পিছনেই সমুদয় অর্থ ব্যয় করে তাকে হিরো বানিয়ে ফেলে, অতঃপর নিজেদের পণ্য ব্যবহারে হিরো হওয়া ব্যক্তির পছন্দের তালিকাটি জনসমাজে ছেড়ে দেয়। আর যুবক শ্রেণী নিজেকে স্মার্ট বানাতে একপ্রকার অন্ধ হয়েই, অন্যের অল্প-দামী পণ্য চড়া দামে ক্রয় করে।
পুঁজিপতি সমাজের বিত্তশালীরা রাষ্ট্রের উপকারার্থে যত না অর্থনৈতিক ভূমিকা রাখে; ব্যবসায়ীক স্বার্থে তার চেয়েও অঢেল অর্থ বিজ্ঞাপনে ব্যয় করে। খেলাধুলার খ্যাতি প্রসারে, চিত্ত-বিনোদনে, নিত্য-নতুন বিনোদন সৃষ্টিতে, সিনেমা তৈরিতে ব্যাপক অর্থ ঢালে। যাতে করে উঠতি তরুণ-তরুণীরা তাদের পণ্য নিয়ে গর্ব করে এবং তাদের পণ্যের জগত নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কদাচিৎ তাদের কাছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীর গুরুত্বের তুলনায় একজন সেরা সুন্দরীর মূল্য অনেক বেশী হয়ে উঠে। আবার তাদের হাতে নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও, দেখা যাবে সেটার পিছনেও ব্যবসায়ীক ধান্ধাটাই প্রবল!
অঢেল-অলস অর্থ নতুন করে কোথায় বিনিয়োগ হতে পারে, এটাই পুঁজিপতিদের একমাত্র দুঃচিন্তার কারণ। ফলে তারা নিজের দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বাহিরের দেশের প্রতি নজর দেয়। বাজার সম্প্রসারণে ভিন দেশের রাষ্ট্র, বিরোধী দল, সরকারী দল, এনজিও, সেনাবাহিনী সহ রাষ্ট্র পরিচালনায় যত সহায়ক শক্তি আছে সবাইকে প্রলুব্ধ করে। মোটা অংকের মাসহারা দেয়। জনগণের যতই অপছন্দ হউক, প্রয়োজনে অগণিত অর্থ ঢেলে, কোন দেশের সরকার পর্যন্ত পরিবর্তন করে ফেলে! পুঁজিপতি লুণ্ঠনে অতিষ্ঠ হয়েই হিটলার চরম ইহুদী বিদ্বেষী হয়ে উঠেছিল। আজো মার্কিন মুল্লুকে ইহুদীরা সেই ভূমিকায় লিপ্ত যার কারণে তাদেরকে জার্মানি থেকে বিতাড়িত হতে হয়েছিল।
ইউরোপে শিল্প-বিপ্লবের পরে সৃষ্টি হওয়া এই পুঁজিবাদী প্রথার কারণে, বহু সমৃদ্ধ জাতি ফকির হয়েছে, জনপদ বিধ্বস্ত হয়েছে। দুটি বিশ্বযুদ্ধ ছাড়াও আরো অনেক বড় যুদ্ধে জগত ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সকল নরপতিরা খেই হারিয়ে নিজেদের হারিয়ে ফেলছে এই টাকার গোলচক্করে। বড় বড় পুঁজিবাদী দেশে উত্তরাধিকারী আইন কার্যকর নাই। তাই মৃত্যুর পর সম্পদ, মৃত ব্যক্তির সন্তানেরা পায় না; যদি না ‘উইল’ করে না যায়। তাদের অর্জিত এ সব সম্পদ পরিত্যক্ত হিসেবে রাষ্ট্র হস্তগত করে; এটাই রাষ্ট্রের লাভ! পুঁজিপতির চরিত্র অনেকটা সুদী মহাজনের মত। নিজের সম্পদ সে ভোগ করতে পারেনা, শুধু কাজে লাগাতে থাকে। গরীবকে সর্বস্বান্ত করে যে সম্পদ তারা যোগাড় করে, কখনও দেখা যায় এসব সম্পদ তারা উইল করে রেখে যায়, কুকুর বিড়ালের! যাতে করে মৃত্যুর পরে, কোন অবস্থাতেই রাষ্ট্র কিংবা অন্য কেউ তার পুঞ্জিভূত সম্পদে হাত লাগাতে না পারে! সেজন্য সমাজ বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন ‘পুঁজিবাদ মানেই অভিশাপ’।

Discussion about this post