পৃথিবীতে যত ফুল আছে তাদের নামগুলো সুন্দর ও অর্থবহ। সে জন্য পিতা-মাতা ফুলের নামে তার কন্যার নাম দেয়। যতগুলো মৌসুম আছে তাদের নাম সুন্দর। মানুষ তার প্রিয় জিনিষটির সুন্দর নাম দেয়। সেভাবে খাদ্য সামগ্রীর বাহারি নামও সুন্দর হয়। খাবার যত লোভনীয় হউক একটি অসুন্দর কিংবা বিশ্রী নামের কারণে তার আকর্ষণ হারাবে। ঠিক সেভাবে মানুষের নামের মাঝেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিদ্যমান। গুনের তারতম্য ঘটিয়ে হয়ত জিনিষ পত্রের নাম বদলানো যায় কিন্তু মানুষের নাম বদলালেও অতীতের স্মৃতিপট মানুষের মন থেকে মুছে ফেলা যায় না। তাই শিশুর জীবনের শুরুতেই একটি সুন্দর, অর্থবোধক, উচ্চারণে সাবলীল, বানানে সরল প্রকৃতির নাম পছন্দ করতে হয়। অথবা অতীত ইতিহাসের বীর, মহানায়ক, মর্যাদাবান, শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী কোন ব্যক্তির নামে সন্তানের নাম রাখা যায়।
যার নামের সাথে মিলিয়ে সন্তানের নাম রাখা হল। অভিভাবকদের উচিত সেই খ্যাতিমান ব্যক্তির জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার পূর্ণা-ঙ্গ ইতিহাস জানা। এক্ষেত্রে এটাই গুরুত্বপূর্ণ। কোন সন্তানের নাম যদি ‘শাহজালাল‘ রাখা হয়। শিশুর বুঝার বয়স থেকে তার চিন্তায় ধারণা দিতে হবে এই বলে যে, “শাহজালাল পৃথিবীর ইতিহাসে একজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি যেভাবে ছিলেন সাহসী, তেমনি ছিলেন দ্বিকবিজয়ী। কোনদিন অন্যায়ের নিকট মাথা নত করেন নি, ফলে বাদশাহের দেওয়া চাকুরী ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ধার্মিক এবং পরোপকারী। অত্যাচারীর বিরুদ্ধে দুর্জয় এবং একজন ধর্মভীরু ব্যক্তি হিসেবে খুবই সহনশীল। মানুষের মুক্তির জন্য আজীবন তরবারি হাতে লড়াই করেছেন। সে জন্য নিজের দেশের মায়া ত্যাগ করে ঘুরে ফিরেছেন পৃথিবীর বঞ্চিত মানুষের জনপদে”। আমি চাই বাবা, তুমিও তার মত হবে। তার মত জেগে উঠবে এবং অসহায় মানুষের প্রতি সহানুভূতির হাত বাড়াবে। তুমি বীর হবে, তোমাকে শাহজালালের মত দায়িত্ব নিতে হবে।
একটি শিশুর বয়সের ভাঁজে ভাঁজে নতুন নতুন চিন্তার উন্মেষ ঘটে। সে চিন্তা করতে চায়, বড় হলে সে কি হবে? কার মত হবে। সে একসময় প্রেসিডেন্ট হতে চাইল তো ছয়মাস পরে সিদ্ধান্ত বদলিয়ে সেনাপতি হতে চাইবে। কিছুদিন পরে সিদ্ধান্তে আবারো পরিবর্তন এনে পুলিশ অফিসার হতে চাইবে। চলতে চলতে একদা ফাইনাল সিদ্ধান্তে থামবে যে, সে পাইলটই হবে! বছরে বছরে তার এ ধরনের চিন্তা ও সিদ্ধান্তে পরিবর্তন চলতেই থাকবে। জীবনের এই সময়েই তাকে উপরে বর্ণিত কথাগুলো শুনাতে হবে। প্রতিটি শিশুই জীবনের শুরুতে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয় এবং তার জীবনে এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যদিও গুরুজনেরা তার শিশুমন পড়তে পারেনা কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর মিলাতে তার অশান্ত মনে চলে প্রবল ঝড়।
এই ঝড়কে কাজে লাগতে প্রথম ঔষধ হল তার নামের অর্থ ও গুরুত্ব যথাযথভাবে তাকে বুঝানো। যথা সময়ে এই ঔষধ শিশুমনে পড়লে, তাহলে সে সিদ্ধান্ত নিতে শিখবে এবং সে নিজেই জানতে চাইবে আমাকে যদি ঐ ব্যক্তির মত হতে হয়, তাহলে কি করা লাগবে? শিশু কি করবে? তার কি করা লাগবে এই প্রশ্ন প্রথমেই সে তার মাতা-পিতাকে করে থাকে। সুতরাং সুযোগ এখানেই কাজে লাগাতে হয়। শিশু জীবনের সন্ধিকালে এসব প্রশ্নের যদি কোন উত্তর না পায়; তাহলে সে তার মত একটি চরিত্র গ্রহণ করবে। অধিকন্তু সমাজ ও পরিবেশে যদি ছায়াছবির প্রভাব থাকে শিশু হয়ত ছায়াছবির নায়কের মত হতে চাইবে নয়ত খল নায়ক হবে। প্রিয় খেলোয়াড় কিংবা গায়কের মত হবে।
শিশুর প্রতি যথাযথ নজর না থাকলে, শিশুরা যে ‘প্লে স্টেশনে‘ গেম খেলে সে গেমের নায়কের মত মারাত্মক রিস্ক নেবার কাজও করে ফেলতে পারে। সমাজ জীবনের মূল সমস্যাটা এখান থেকেই শুরু হয়। শিশু যখন দোদুল্যমান ছিল তখন তার মনের নায়ক কেমন হবে সে ব্যাপারে তাকে যথাযথ খোরাক দেওয়া হয় নাই! এটা অভিভাবকদের অদূরদর্শিতার জন্যই হয়ে থাকে। শিশুর এই বয়সে যদি তার বন্ধুরা ইতিবাচক হয় তাহলে তার ভবিষ্যৎ এক ধরনের হবে, আর বন্ধুরা যদি নেতিবাচক হয় তাহলে তার জীবনে দুনিয়ার সব কিছুতেই সমস্যা দেখতে থাকবে। সে আর সামনে আগাতে পারে না। কিশোর বয়সে আত্মহত্যার প্রবণতাও এই কারণে ঘটে থাকে।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নামের ব্যাপক প্রভাবের কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। দুনিয়াবি জীবনেও একটি সুন্দর অর্থবোধক নাম সন্তানের কল্যাণে অনেক কার্যকর। একটি সুন্দর নাম মানুষের জন্য বহুবিধ উপকারে আসে। যেমন,
স্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে: একটি সুন্দর নামের কারণে তার প্রতি অন্যের আত্মবিশ্বাসের জন্ম হবে। এতে শুরুতেই সম্পর্ক স্থিতিশীল হবার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। যাদের সুন্দর নাম রয়েছে তাদের সাথে বন্ধুত্ব হয় গভীর এবং হিতাকাঙ্ক্ষীকে যতই পরামর্শ দেওয়া হয় সে তা ইতিবাচক ভাবেই গ্রহণ করে। বন্ধু মনে করে এবং ভাবতে থাকে তার হাতে ক্ষতি হবার সম্ভাবনা কম।
শ্রদ্ধা থাকে আমরণ:: মানুষ মারা গেলে ধন সম্পদ সাথে নিয়ে যেতে পারেনা কিন্তু তার নাম কিংবা নামের কিছু প্রভাব দুনিয়াতে রেখে যেতে পারে। মৃত্যুর পরে সকল ধনীদের কথা সবাই স্মরণ করেনা তবে যার নাম সুন্দর অন্তত তার কথা মানুষ কিছুটা হলেও মনে রাখে। একই ভাবে, একটি বংশের সকল গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে যার নাম সুন্দর ও মাহাত্ম্য আছে তাকেই মানুষ মনে রাখে।
সৎ ভাবার মানসিকতা: কারো অনুপস্থিতিতে ব্যক্তির আলোচনা হলে এবং তার নাম যদি সুন্দর হয়, তাহলে অদেখা ব্যক্তিও অজ্ঞাতে তার সম্পর্কে ভাল ধারণা পোষণ করবে। তাকে সৎ ভাবতে চেষ্টা করবে। কোন কারণে যদি তার কাছে ভিন্ন ধরনের আচরণ পায় তাহলে সে এই বলে ক্রোধান্বিত হবে, নাম শুনে তো ভাল মানুষই মনে করেছিলাম। দুনিয়ার জীবনে একটি ভাল নাম ব্যক্তিকে গ্রহণযোগ্য মাত্রায় পৌছাতে বড় ভূমিকা রাখে।
এক ব্যক্তি রাসুল (সাঃ) কে প্রশ্ন করেছেন, ‘কাউকে দেখলে কিভাবে বুঝব সে কেমন মানুষ‘? রাসুল (সাঃ) উত্তরে জানালেন, তাকে দেখলে প্রথমে যার কথা মনে পড়বে (নামে ও কাজে) তিনিও তার মত। একই ভাবে কারো সন্তানের নাম হিটলার রাখলে, মানবিয় চরিত্রে প্রথমেই হিটলারের নৃশংসতার কথা মনে পড়বে। আর ওমর নাম থাকলে মানুষ একজন দয়ালু, নীতিবান চরিত্রের কথা মনে করবে। পৃথিবী থেকে গত হওয়া বহু ভাল ও মন্দ মানুষ এভাবেই বেঁচে থাকে। সুন্দর নামের উপস্থিতি মানুষকে স্বস্তি দেয়, চিন্তা চেতনায় ছেদ আনে না। মন্দ নামের উপস্থিতি মানুষকে বিরক্ত করে, কটু ইতিহাস স্মরণ করতে বাধ্য করে। বেহুদা অপমানিত হবার ভয়ে কারো নাম ‘মীর জাফর‘ রাখা হয়না। যদিও ‘জাফর‘ শব্দটি সম্মানিত নামের অন্তর্ভুক্ত। তাই সুন্দর নামকে গুরুত্ব দেওয়া বাঞ্ছনীয়। তার ভাল অর্থ, ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট জেনে সন্তানের চিন্তার খোরাক দিতে হবে। তবেই সন্তান দৃঢ়-স্বাবলম্বী হবে। জীবনে সর্বদা কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

Discussion about this post