চিত্র-১. ঢাকা শহরে হিজরাদের খপ্পরে পড়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় নাই এমন ভদ্রলোকের সংখ্যা বোধকরি হয় খুবই কম। আমি ছাত্র জীবন থেকেই হিজরাদের প্রতি যথেষ্ট সহমর্মী ছিলাম। ইতিবাচক ধারণা পোষণ করতাম। এপর্যন্ত কোন হিজরাকে টাকা না দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছি এমন কোন ঘটনার কথা মনে পড়েনা। বর্তমানে ঢাকা শহরে হিজরাদের উৎপাত, কখনও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে হার মানাচ্ছে।
বিছানায় শুয়েছিলাম। শুনতে পেলাম, বাসার দরজা খোলার জন্য কেউ জন্য কেউ যেন দরজায় হাতুড়ী দিয়ে আঘাত করছে। পুলিশ আসামী ধরতে আসলে, দরজায় যে ধরনের ভূমিকা রাখে এটা ঠিক তার মতই। ধর-ফরিয়ে লাফ দিয়ে উঠলাম! দরজা খোলারও সময় দিচ্ছে না। দরজা খোলা মাত্রই অধৈর্য এক নারী একপ্রকার ধাক্কা দিয়েই ঘরে ঢুকে গেল! শোবার ঘর, টয়লেট, রান্নাঘর, ব্যালকনি সহ, কক্ষের সবই এক মুহূর্তে দেখার পরে জিজ্ঞাসা করল ‘তোদের শিশু কই?’ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু ছেলেকে দেখিয়ে গিন্নী বলল এটাই আমাদের শিশু। তারা আগেই বুঝে গিয়েছিল ঘরে কোন শিশু নাই। ততক্ষণে গিন্নী হাতে কিছু টাকা গছিয়ে ঘর থেকে বিদায় করিয়ে দিল।
দরজার বাহিরে উঁকি দিয়ে দেখলাম প্রতিটি ঘরেই তারা শিশু তল্লাশি করছে! উপর থেকেও নামছে এবং নিচেও শোরগোল শোনা যাচ্ছে। ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালাম! চক্ষু চড়কগাছ! হিজরারা দলবেঁধে এই এলাকায় কোন এক শিশুর সন্ধানে যৌথ অভিযানে নেমেছে। যাকে পাচ্ছে তাকেই প্রশ্ন করছে এই এলাকায় একটি শিশুর জন্ম হয়েছে। তার ঘর কোথায়? ঘণ্টা দুয়েক এভাবে তল্লাশি চালিয়ে তারা পাশের মহল্লায় চলে যায়। যাবার আগে হুমকি দিয়ে যায়, কোন অবস্থাতেই নবজাতক শিশুকে লুকিয়ে রাখতে পারবে না। যখন পাবে তখন দেখাবে মজা, শিশু লুকানোর কি অপরাধ!
বিকাল বেলা জানতে পারলাম, গতরাত্রে পাশের ভবনের এক ভদ্রলোকের একটি শিশুর জন্ম হয়েছে। মেডিক্যালে জন্ম নেওয়া শিশুটি বেশী সময় বাঁচেনি। বিকালেই মারা গেছে।
তখনই বুঝতে পারলাম। হিজরাদের অভিযান কেন হয়েছিল। মাথায় একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। মহল্লায় তখনও কেউ জানেনা এলাকায় একটি শিশুর জন্ম হয়েছে। কেননা প্রসূতি তখনও মেডিক্যালে, মহল্লার মানুষ জানার আগে হিজরারা কিভাবে জেনে গেল এই তথ্য! বুঝাই গেল, মেডিক্যাল থেকে কোনভাবে তড়িৎ তথ্য সংগ্রহ করার জন্য তাদের রয়েছে বড় মাধ্যম।
চিত্র-২. নতুন ভাড়াটিয়া হিসেবে এলাকায় এসে ভদ্র মহিলা জানতে পারলেন, তার শিশু সন্তানটিকে হিজরা গ্রুপ নতুন শিশু হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। সেই ভয়ে তিনি ঘর থেকেই বের হন না। ব্যলকনিতে শিশুর কাপড় শুকাতে দিয়েছিল মা, ঠিকই দেখে ফেলেছিল হিজরাদের কেউ একজন। যথাসময়ে তারা হানা দিল সেই ভবনে। দরজায় কষাঘাত করা হল। আতঙ্কিত মহিলা কোন অবস্থাতেই দরজা খুলবেন না। তিনি জানতে পেরেছিলেন, চাহিদা মত টাকা না দিলে শিশুকে কেড়ে নিয়ে যায়। কানাকানি আছে, একদা কাড়াকাড়ি করার সময় একটি শিশু হাত থেকে পড়ে ঘটনাস্থলে মারা গিয়েছিল! সুতরাং কোন মায়ের পক্ষেই এই পরিস্থিতিতে দরজা খোলার কথা নয়। হিজরা গ্রুপ বাহিরে গিয়ে ইট নিয়ে জানালার কাঁচে মারতে থাকে। এতে ভবনের কাঁচ ভেঙ্গে চুরমার। তারা এতই সংঘটিত যে, ভবন মালিক অসহায় নেত্রে তাকিয়ে রইল, কিভাবে তার ভবনের বিভিন্ন ভাড়াটিয়াদের ঘরের কাঁচ ভেঙ্গে চুরমার করা হচ্ছে। ততক্ষণে শিশুর পিতা হাজির, তিনি হিজরাদের চাহিদা মত চাঁদা ও ভবনের ভেঙ্গে ফেলা কাঁচের মূল্য দিতে বাধ্য হন!
চিত্র-৩. অন্য শহর থেকে, বড় ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে এসেছে ছোট বোন। তার আছে একটি ছোট বাচ্চা। সবে মাত্র হামাগুড়ি দিতে শিখেছে। সেই সময় হিজরা দল এলাকায় হাজির। তাদের কাছে খবর পৌঁছেছে যে, একটি নবজাতক এসেছে। তারা বেড়াতে আসা মেহমানের ছোট বাচ্চাটিকেই তাদের তথ্য পাওয়া বাচ্চা বলে গোঁ ধরে বসে। বিশ হাজার টাকা দাবী তাদের! যথারীতি বাচ্চা নিয়ে টানা হেঁচড়া শুরু! মেহমানের কান্না, ঘর ওয়ালীর অনুনয় তারা শুনবেই না। হিজরা গ্রুপ বুঝতেই চায় না যে, এরা শহরে নতুন বেড়াতে এসেছে। তাছাড়া শিশুটি সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া বাচ্চা নয়। তারা এসব বুঝবেই না! ঘরের জিনিষপত্র তছনছ করা শুরু করে। ততক্ষণে গৃহকর্তা হাজির। তার সাথেও ঝগড়া শুরু করে এবং দাবী মত টাকা দিতেই হবে। সাথে আছে বিশ্রী গালাগালি আর ভাঙচুর! অগত্যা তিনি থানায় ফোন করলেন, ওসি সাহেব পরিচিত ছিলেন। তিনি জানালেন একটু ধৈর্য ধরুন কি করা যায় দেখি। পুলিশের সাথে কথোপকথন দেখে হিজরা লিডার হুমকি দিয়ে বললেন, ‘তুই পুলিশকে ফোন করছস! আমি তার উপরে ফোন করে পুলিশের বাপকে আটকাচ্ছি! দেখি তোর ক্ষমতা কতটুকু আর আমাদের ক্ষমতা কত’! পুলিশের দেখা মিলল না। ওদিকে হাঙ্গামা চলতেই রইল। ছোটবোনের হৃদয় ফাটানো কান্নার আঘাতে, গৃহকর্তা হার মেনে নিলেন এবং হাজার পাঁচেক টাকা গছিয়ে দিয়ে সে যাত্রায় রক্ষা পেলেন।
বহু ঘটনা বলা যাবে। হিজরাদের প্রতি সদ্ভাবকে তারা এক ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে পরিণত করেছে। একজন ইউটিউবার ঢাকা শহরে ঢুকার, একটি মাত্র ব্রিজের মাধ্যমে মাসে হিজরাদের কয়েক কোটি টাকা আয় করার ভয়ানক তথ্য দিয়েছে। এ ছাড়া তাদের রয়েছে চাঁদাবাজির করার বড় পৃষ্ঠপোষক। সস্ত্রীক কোন ভদ্রলোককে সন্তান সহ কাছে পেলে শুনিয়ে দেয় পৃথিবীতে কত নোংরা, জঘন্য, কদর্য গালা-গালি আছে। ইজ্জত সম্মান রক্ষার্থে টাকা দিয়ে দেয়। এই সুযোগকে তারা কাজে লাগায় শতভাগ সফলতার সহিত।
অতীতে হিজরা’র দল ভারি করার জন্য, হিজরা গ্রুপ শিশু সন্তানের লিঙ্গ দেখতে যেত। কিছু উপঢৌকন নিয়ে ফিরে আসত এবং সন্তানটি বড় হলে তারা পালন করবে বলে ওয়াদা নিয়ে আসত। এটাই ছিল শিশু দেখার উপলক্ষ। বর্তমানে এটাকে তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে পরিণত করেছে।
আন্তর্জাতিক বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নিজেদের উদ্ভাবনী যন্ত্রপাতি ও ঔষধ পরীক্ষা করতে গরীব দেশগুলোর মানুষকে ব্যবহার করে। অর্থের লোভ লাগিয়ে গরীব ছেলেদের উপর পরীক্ষা করতে গিয়েও বহু যুবককে কৃত্রিম হিজরা বানানো হচ্ছে। তারাও দলে যোগ দেয়। কিছু হিজরাকে দেখলে সন্দেহ হয়, আদৌ সে হিজরা কিনা! নাকি নেতৃত্ব দেবার জন্য তাদের সাথে যোগ দিয়েছে। যাক, দিন দিন এ সমস্যা বেড়েই চলছে।
দেশের সকল হিজরা খারাপ নয়। বহু ভদ্র হিজরাও দেখেছি কিন্তু সংখ্যায় নগণ্য হওয়ায় খারাপদের চরিত্রই মানুষের নজরে পড়ে। ভারতে এক হিজরা তো কলেজের প্রিন্সিপ্যাল হয়েছেন। আরব দেশে হিজরারা লেখাপড়া করার সুযোগ পায়। হিজরাদের পুলিশে নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে করে পুরুষ-মহিলা পুলিশের কাজ একজন ব্যক্তিকে দিয়ে হয়ে যায়। মধ্য প্রাচ্যে পুরুষ ও লেডিস সেলুন গুলোতে হিজরাদের চাহিদা বাড়ছে। আমাদের দেশেও যে ভিন্নতা আছে তা নয়। উপরের তথ্য বিশ্লেষণ করে বুঝা তারা কারো হয়ে গতর খাটছে। তাদের পিছনে শক্তিশালী কেউ নাটাই নাড়ে। নতুবা তারা এত বড় স্পর্ধা কিভাবে পায়। তাই এ নিয়ে সমাজ কর্মীদের ভাবা দরকার।

Discussion about this post