মানব সৃষ্টি নৈপুণ্যের মধ্যে অন্যতম একটি গুণাবলী হল কৌতূহল। এই গুনটি একমাত্র মানুষকেই দেওয়া হয়েছে। পৃথিবীর অন্য কোন প্রাণীর কাছে এটা নেই। কিছু প্রাণীরা নিজেদের বাঁচাতে কিংবা আত্মরক্ষার ধরণ বুঝতে অজানা কিছুর প্রতি খুব সতর্কতার সাথে দৃষ্টিকে নিবদ্ধ করে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এটাকে কৌতূহলের মত লাগলেও, সেটি কিন্তু কৌতূহল নয়। সেটার নাম ‘সন্দিহান’ আর কৌতূহলের সাথে আবিষ্কার কিংবা রহস্যের উন্মোচনের একটি সম্পর্ক রয়েছে। প্রাণীরা সন্দেহ-সংশয়ের দোলাচলে পড়লে সন্দিহান চরিত্রে এমন আচরণ করে থাকে। যেমন, বিড়াল তার সন্দেহ দূর করতে গৃহস্থের অনেক জিনিষ নষ্ট করে ফেলে। এই আচরণ মানুষের কাছেও আছে, তবে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে অন্য ভাবে।
কৌতূহল পুরোপুরিই একটি ভিন্ন বিষয়। একটি মানব জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। কৌতূহলকে উৎসুক্য বলা হয় এবং ইংরেজিতে Curiosity বলে। পৃথিবীর সকল মানুষের কাছেই কৌতূহলের অভ্যাস রয়েছে তবে খুব নগণ্য সংখ্যক মানুষই কৌতূহলকে কাজে লাগাতে পারে। ইংরেজি প্রবাদে বলা হয়, “Curiosity is the Mother of Invention.” অর্থাৎ কৌতূহল হল আবিষ্কারের জননী। শিশুদের জীবন শুরু হয়, কৌতূহল দিয়েই। সে হিসেবে প্রতিটি মানুষই কমবেশি কৌতূহলে অভ্যস্ত। শিশুদের কৌতূহলের চাহিদাকে যখন গল্প-কিসসা কাহিনী দিয়ে মিটিয়ে দেওয়া হয়, তারা হয়ে উঠে কল্পনাবিলাসী। সাহিত্য, কবিতা, গান, রম্যে তারা জীবনের উপাদান খুঁজে নেয়। এই বিষয়গুলো তাদের জন্য সহজ হয়ে উঠে। আবার অংক, বিজ্ঞান, ভূগোল তারা প্রয়োজনের খাতিরে শিখে নিজের চলার পথ রচনা করে। এটা অপেক্ষাকৃত কঠিন, তাই এটার পিছনে অধ্যবসায়কে কাজে লাগাতে হয়। পৃথিবীর বেশীর ভাগ মানুষের জীবনের ধাপ শুরু হয়ে এভাবেই।
অন্তরে কৌতূহল সৃষ্টি হলেই কোন কিছুর সমাধান হয়ে যায় না; সিদ্ধান্ত নেবার জন্য এটা যথেষ্ট নয়, তার জন্য চাই ধৈর্য আর বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা এবং পর্যাপ্ত কারিগরি জ্ঞান। ইংরেজিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে যে, “Necessity is the Mother of Invention.” অর্থাৎ প্রয়োজনীয়তাই আবিষ্কারের জনক। ব্যাখ্যা করে বলতে গেলে, মানুষের জীবন চলার পথে, বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে কখনও পথচলা মন্থর হয়ে পড়ে। তখনই এসব সমাধানে কিছু মানুষের উপর দায়িত্ব পরে আবার কিছু মন কৌতূহলী হয়ে উঠে। ফলে তাদেরই কেউ একজন এর সমাধান দিতে পারে এবং তিনি দুনিয়াতে খ্যাতিমান ও প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেন। যে জাতির কাছে এই জাতীয় মানুষ বেশী সে জাতি পৃথিবীতে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী হয়।
পৃথিবীতে মানুষের হাতে যত উদ্ভাবন হয়েছে তার শুরু হয়েছিল কারো না কারো কৌতূহলের কারণে। আবার কোন আবিষ্কারই ক্ষুদ্র নয়। নখ কাটার যন্ত্র থকে শুরু করে ইঁদুর ধরার কল পর্যন্ত সকল আবিষ্কারের পিছনেই লুকিয়ে আছে একজন মানুষের কৌতূহল ও তার নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার ফল। মনে কৌতূহল জন্মালেই সফল হওয়া সম্ভব নয়, যতক্ষণ না কৌতূহল সমাধানের জন্য এ সম্পর্কিত প্রযুক্তি সহায়তা না থাকে। নিজের কৌতূহল শক্তিকে যাচাই করার জন্য একটি কাজ করা যেতে পারে। একটি মামুলি ইঁদুর ধরার কল নিয়ে ভেবে দেখুন তো, এটা না দেখার আগে, শুরুতে এটা বানানোর মত বিদ্যা-বুদ্ধি, চিন্তা-আবিষ্কারে কথা মাথায় কি ঢুকত?
গণচীনের দিকে তাকালে আমরা একটি কথার সত্যতা নিরূপণ করতে পারব। তাদের রয়েছে কিছু দল। যাদের প্রথম দলটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি বিষয় থেকে শুরু করে যাবতীয় চাহিদার তালিকা হালনাগাদ করতে থাকে। এসব চাহিদার ফর্দ কৌতূহলী ও সৃষ্টিশীল মানুষদের নজরে আনা হয়। যার কাছে যেটা সহজ মনে হয়, সেটা নিয়েই তারা কাজে লেগে যায়। ফলে মানব কল্যাণে গৃহস্থালি সামগ্রী থেকে শুরু করে জটিল ইলেকট্রনিক সামগ্রী পর্যন্ত তারা সৃষ্টি করে যাচ্ছে। মানুষ দেখলেই বলছে, আরে! এমন একটি জিনিষের কথা তো আমি মনে মনে ভেবে যাচ্ছিলাম। এটা আমি চাইই। একজন ব্যক্তি যে জিনিষ মনে ভাবে তারা সেটা আগেই বানিয়ে ফেলে এবং মানুষের কৌতূহল সৃষ্টির সুযোগকে কাবু করে রাখে। সৃষ্টিশীল কৌতূহলী আবিষ্কার মনস্থ জাতিকে কোনদিন কোন অবস্থাতেই কাবু করা যায় না।

Discussion about this post