রাসুল (সা) নূরের সৃষ্টি নয়, এই কথার সাথে দ্বিমত পোষণ করলেই, আমাদের সম্মানিত সুন্নি আলেমেরা তাদেরকে ইসলাম থেকেই বের করে দেন। সুন্নি আলেমদের ওয়াজ-নসিহতের একটি বিরাট অংশ জুড়েই থাকে, এ কথা প্রমাণের পিছনে যে, রাসুল (সা) নূরের সৃষ্টি।
শীতকালে আমাদের দেশে ওয়াজ-নসিহতের ধুম পড়ে পড়ে যায়। রাতের এসব ওয়াজ থেকে সম্মানিত আলেমদের বহু কথা শুনেছি। প্রায় সব বক্তাদের কথার সূত্রগুলো একই ধাঁচের, একই প্রকারের। অর্থাৎ একজনের লেখাপড়ার উপর দিয়ে বাকিরা একই কথামালার তথ্য জোগাড় করেছেন। এই কথাটি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে, তারা কোরআন-হাদিসের বাহিরে গিয়েও, ইসলামী পণ্ডিতদের বহু উদ্ধৃতি দলিল হিসেবে হাজির করেন।
অথচ এসব কথাগুলোর উত্তর কোরআন হাদিসেই রয়েছে। আজ আমরা শুধু কোরআন-হাদিসের উদ্ধৃতিগুলো তালাশ করে বুঝতে চেষ্টা করব। মূলত আল্লাহ, নূর বলতে কি বুঝিয়েছেন। এই লিখাটা শুরুর করার আগে, আমি সুন্নি ভাইয়ের ওয়েব সাইট ও সম্ভাব্য বিষয়বস্তু তথ্য তালাশ করে আমার জ্ঞানকেও হাল নাগাদ করে নিয়েছি।
আল্লাহ আমায় ক্ষমা করুন এবং সঠিক বিষয়টি উপস্থাপন করার যোগ্যতা দিন। যেহেতু আমার এসব লিখার উদ্দেশ্য কারো বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রচার নয় বরং দুদ্যোল্যমান মুসলিম ও জ্ঞান পিপাসী মানুষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই এই পোষ্টের লক্ষ্য।
আলোচিত শব্দটা নূর, যার অর্থ হল আলো। দুনিয়ার জাগতিক আলো নিয়ে কথা বলতে গেলে পাতার পর পাতা লিখা যাবে কিন্তু আমাদের আলোচিত আলো একেবারেই ভিন্ন। আলোর বিপরীত হল ‘আধার’। আলোর অনেক ব্যাখ্যা আছে কিন্তু আঁধারের কোন পরিচিতি নেই।
অনেকে ভেবে থাকেন কিছু দেখা না যাওয়ার মানেই হল আঁধার। এটা সঠিক অর্থ নয়, কেননা অন্ধ ব্যক্তি আজীবন আঁধার দেখে। কিন্তু তাদের আত্মা, মন, বিবেক বিনা-চোখেও অনেক কিছু দেখতে পায়। মূলত আঁধার বলতে বুঝায়, আলোর যথাযথ অনুপস্থিতি। আর আলো বলতে এমন কিছুকে বুঝায়, যার উপস্থিতিতে অন্য দ্রব্যাদির প্রকাশ ঘটে যায়।
আরো পরিষ্কার করে বলতে গেলে আলো হল এমন জিনিষ, যে নিজে প্রকাশিত হলে, অন্য জিনিষকেও প্রকাশ করে দেয়। আবার সেই আলোর অনুপস্থিতে সবকিছুই লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায়।
পবিত্র কোরআনের নূর তথা আলো সংক্রান্ত কথাগুলো এই গুণাবলীর দিকেই ইঙ্গিত করে। কোথাও এমন ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি যার মাধ্যমে বুঝা যায় যে, রাসুল (সা) কে মাটির স্থলে আলো দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে।
ওজু করার সময় আমাদের কে একটি দোয়া শিখানো হয়েছিল, যার শেষ কথাগুলো হল,
“আল ইসলামু নুরুন, ওয়াল কুফরু জুলমাতুন” অর্থ হল “ইসলামই হল একমাত্র আলো এবং কুফুর হল জুলুমাত তথা আঁধার”।
এবাদতে মগ্ন হবার শুরুতেই এখানে আমরা এ কথারই স্বীকৃতি দিয়ে থাকি যে, আমরা সেই ইসলামকেই আঁকড়ে ধরলাম, যার উপস্থিতিতে দুনিয়ার যাবতীয় বস্তুর দুর্বলতা প্রকাশ হয়ে যায়।
এই ভাবার্থে নূর শব্দের অর্থ দাড়ায়, এটি আল্লাহ প্রদত্ত সেই আলো, যার উপস্থিতিতে মানুষের আত্মা আলোকিত হয়। সঠিক পথে দিশা পায়। মানুষ তার সৃষ্টি ও তাকে যিনি সৃষ্টি করেছেন তার সম্পর্কে জানা যায়। বস্তুত কোরআনে যত জায়গাই আমরা নূরের কথা পড়ব সব জায়গতেই এই কথারই ভাবার্থ বের হয়। যেমন দেখুন,
“তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে এসে গেছে এক নূর (জ্যোতি) এবং একখানি সত্য দিশারী কিতাব।” আল মায়েদা-১৫।
অন্য তাফসিরে কথাটির অর্থ করেছে এভাবে, “তোমাদের কাছে আল্লাহর নিকট থেকে নূর (আলোকময় বস্তু) এসেছে এবং তা একটি স্পষ্ট কিতাব (কোরআন)।” আমাদের সুন্নি ভাইয়েরা রাসুল (সা) যে নূরের সৃষ্টি, তারা এই আয়াতকেই দলিল হিসেবে প্রমাণ করে।
এখানে মহান আল্লাহ মুহাম্মদ (সা) এর নাম না নিয়ে নূর (আলো) দিয়ে নবী ও পবিত্র কোরআনকে সন্নিবদ্ধ করে দিয়েছেন। কেউ তফসিরের ব্যাখ্যা করে এখানে নূর বলতে কোরআনকে বুঝিয়েছে, কেউ বলছেন এর দ্বারা রাসুল (সা) কে বুঝিয়েছেন।
পবিত্র কোরআনের সুরা আহযাবের-৪৬ আয়াতে রাসুল (সা) কে “সিরাজাম মুনিরা” তথা প্রজ্বলিত প্রদীপ হিসেব পরিচিত করিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহর দেওয়া এসব উদাহরণ অনেক বৈজ্ঞানিক। প্রজ্বলিত আলোরও একটা সীমাবদ্ধতা থাকে, কেননা মানুষ মরণশীল।
এখন আমাদের মাঝে রাসুল (সা) নেই কিন্তু যথারীতি কোরআনের আলো ঠিকই জ্যোতি ছড়াচ্ছে! ঠিক এভাবেই রাসুলের অনুপস্থিতিতেও যে বা যারা কোরআনকে ধারণ করবে, তিনিও সেই নূরের প্রভাবে থাকবেন। যা কেয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। সে হিসেবে পবিত্র কোরআনই সুস্পষ্ট নূর।
মূলত পবিত্র কোরআনের আহবান, এটার বানী ও উপদেশই হল সেই নূর। মোহাম্মাদ (সা) এই নূরের ধারক ও বাহক। সে দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি এই দায়িত্ব যথাযথ পালন করতে পারার কারণেই “সিরাজাম মুনিরা” স্বীকৃতি পেয়েছেন।
তিনি নূর দ্বারা আচ্ছাদিত ছিলেন কিন্তু নূর দ্বারা সৃষ্ট নন! হাদিস শরীফে আছে, পুণ্যবান মানুষ পুল সিরাত পার হবার সময়ই একটি নূর তাকে পথ দেখাবে। যে নূর দুনিয়ার জীবনে কোরআন অনুসরণেই মাধ্যমেই আহরণ করতে হয়।
হাদিস শরীফে আরো আছে, সে সময় কারো নূর এমন আলোকিত থাকবে যার আলো দ্বারা সানা থেকে হাদরা মাউত পর্যন্ত আলোকিত হয়ে যাবে! দুনিয়ার জীবনে ব্যক্তির আমলের উপর নির্ভর করে এই নূরের আকার বড়-ছোট হবে। অর্থাৎ প্রতিটি রহম-প্রাপ্ত মানুষই কম-বেশী নূরের সহযোগিতা পাবে।
রাসুল (সা) এর জীবনে নূরের প্রভাব কেমন ছিল সেটা আমরা ইতিহাসে দেখেছি। পবিত্র কোরআনের নূর যখন আসা শুরু হল, এর দ্বারা শুধুমাত্র তদানীন্তন আরবের অমানিশার আঁধার কেটে যায়নি। সারা বিশ্বের সকল জাতির দুর্বলতা, কদর্যতা সবই প্রকাশিত হয়ে পড়েছিল।
কোরআন হয়ে উঠেছে সত্য আর মিথ্যাকে পৃথক করার মানদণ্ড। কোরআন যেখানে দাড়িয়ে যায়, সেখানেই সমাজের খারাপ, নোংরা, পাপীদের চরিত্র প্রকাশিত হয়ে পড়ে।
আজ আমাদের মাঝে মোহাম্মদ (সা) নেই কিন্তু কোরআনের নূরের প্রভাব আজো পৃথিবীর সর্বত্র বিরাজমান। তাছাড়া এই চিন্তার স্বপক্ষে পবিত্র কোরআনেই বহু দলীল রয়েছে। যেমন,
তাওরাত সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন,
“আমি তাওরাত নাযিল করেছি, তাতে ছিল পথ নির্দেশ ও নুর (আলো)।” আল মায়েদা-৪৪।
আল্লাহর কালাম কোরআন যেভাবে নূর সেভাবে পরিবর্তন হওয়ার আগ পর্যন্ত আসমানি কিতাব তাওরাতও নূর হিসেবে চিত্রিত ছিল।
একই ভাবে ইঞ্জিল সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে, স্বয়ং আল্লাহ বলেছেন,
“…আর তাকে ইঞ্জিল দিয়েছি, তাতে ছিল পথনির্দেশ ও নূর (আলো)…” আল মায়েদা-৪৬।
কোরআনকে যেভাবে নূর হিসেব বর্ণনা করা হয়েছে সেভাবে অতীতের এসব আসমানি কিতাব গুলোকেও নূর হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। কেননা এসব কিতাব যারা পড়ে ও মানে, তাদের জীবনে বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়। সকল মানুষই তাদের আমূল পরিবর্তন দেখে বিস্ময় হতে হয়।
এমনকি আজকাল কার দিনেও কোরআনের প্রভাব সে একই ধরণের আছে। এটাই নূর, যার উপস্থিতিতে আত্মা আলোকিত হয় আর দুরাত্মার চরিত্র প্রকাশিত হয়। যার নিয়ন্ত্রণ ও বণ্টন একমাত্র আল্লাহর হাতেই সীমাবদ্ধ।
কোরআনে বর্ণিত এই নূর দিয়ে অন্তত রাসুল (সা) সৃষ্ট হয়নি, এ কথা এমনিতেই প্রমাণ হয়। তাছাড়া এই কথার পক্ষে শক্ত দলীল এই পবিত্র কোরআনেই রয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে,
“আল্লাহ, আকাশ মণ্ডলী ও পৃথিবীর নূর (আলো)…” সুরা নূর-৩৫।
এই আয়াতে স্বয়ং আল্লাহ নিজের একটি গুণাবলীকে নূর হিসেবে বলেছেন। আমরা যেভাবে সূর্যের মাধ্যমে সবাইকে আলোকিত হতে দেখি এটা সে ধরণের আলো নয়, ওভাবে চিন্তা করলে চলবে না। কেননা এসব আলোর উৎসও আল্লাহর গোলামী করে, অন্যরাও আল্লাহর গোলাম।
এগুলোরও একটা সীমাবদ্ধতা আছে। এরাও একদিন নিভে যাবে। কিন্তু আল্লাহর কুদরতি নূর কখনও নিভে না। আল্লাহর নূরের বদৌলতে কেবল দুনিয়ার দিকে কেন্দ্রীভূত নয় বরং নভোমণ্ডল, ভূ-মণ্ডল সহ সবই প্রকাশিত হয়ে পড়েছে এবং তারই নির্দেশে সব পরিচালিত হয়ে আসছে। এখানেও আমরা নূরের বৈশিষ্ট্য তাই পেলাম যা ইতিপূর্বে বলা হয়েছিল।
ইবনে আব্বাস (রা) সূত্র হতে বর্ণিত আছে যে,
“রাসুলুল্লাহ (সা) যখন তাহাজ্জুদের নামাজে পড়তেন, তখন তিনি পড়তেন, আল্লাহুম্মা লাকাল হামদু আনতা নূরুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি… (হে আল্লাহ, সকল প্রশংসা তোমারই, আসমান জমিনে যা কিছু আছে, তুমিই তাদের সকলের নূর (জ্যোতি)… মুসলিম ১/৫৩২, ফতহুল বারী ৫/৩। প্রতিনিয়ত রাসুল (সা) এই ঘোষণার মাধ্যমে বুঝা যায়, প্রকৃত নূর হল আল্লাহর বাণী ও তাঁর কার্যক্রম।
বোখারীর আরেকটি হাদিস হতে আমরা দেখতে পাই রাসুল (সাঃ) নিজের জন্য নূর চেয়ে দোয়া করতেন
“হে আল্লাহ! আপনি আমার অন্তরে, আমার চোখে, আমার কানে, আমার ডানে-বামে, আমার উপর-নীচে, আমার সামনে-পেছনে, আমার জন্য নূর দান করুন।” বুখারী – ৬৩১৬।
তিনি যদি নূরের সৃষ্ট হবেন তাহলে এই দোয়ার গুরুত্ব কি?
যারা আল্লাহর রাসুল (সা) কে নূরের তৈরি বলে না, সুন্নি আলেমেরা চোখ বন্ধ করেই তাদেরকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। মুসলমানদের মধ্যে দূরত্ব বৃদ্ধি করে দেয়। তাদের কাছে উপরোক্ত এসব দলীলের বিপক্ষে আরো শক্ত দলীল কি আছে? তাই সকল মুসলমানের উচিত, নিজে কোরআন পড়া এবং তা বুঝে পড়া। নিজের দায়িত্বে হাদিস পড়া।
কারো নিকট থেকে ওয়াজ শুনলেও যাচাই করা। শুনলাম আর বিশ্বাস করলাম, এটা নবী-রাসুল ব্যতীত কারো জন্যই প্রযোজ্য নয়, তিনি যত বড় আলেমই হোক না কেন। তাছাড়া রাসুল (সা) নিজেই বলেছেন, তোমরা যখন এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পথহারা হয়ে যাবে, তখন কোরআন ও হাদিসের কাছেই ফিরে আসবে।
তাই আমিও শুধুমাত্র কোরআন-হাদিস থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছি এবং এসব তথ্যই যথেষ্ট। আমার দুর্বলতা আল্লাহর কাছে অর্পণ করলাম, আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমাদের সঠিক জ্ঞান দিন। আমিন
Discussion about this post