মুসলমানের অধস্তন বংশধরেরা আজ করোনার ভয়ে নিজের মাকে জঙ্গলে ফেলে যাচ্ছে! নিজের পিতার লাশকে ডাস্টবিনে ফেলে পালাচ্ছে। হার্ট এটাকে আক্রান্ত ধড়ফড় করে মরতে যাওয়া মানুষের করুণ মৃত্যুর দৃশ্য দাঁড়িয়ে দেখছে! ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তির অসহায় ছটফটানি দাড়িয়ে অবলোকন করছে, জবাই করা মুরগীর দৃশ্য যেভাবে অন্য মুরগীরা দেখে থাকে, হুবহু সেভাবেই! পৃথিবীতে মুসলমানদের জন্ম এ জন্য হয়নি যে, সে বিশ্বাস করবে অসহায় কে সাহায্য করলে নিজের বিপদ বাড়বে। মুসলমান হিসেবে চলুন ইতিহাসের একটি ঘটনার দিকে তাকাই।
আবু জেহেল মুহাম্মদ (সা) এর চরম দুষমন। ইসলামকে শক্তি প্রয়োগে ধ্বংস করে দেবার প্রথম ভয়ানক সংঘাত; বদরের যুদ্ধে মুহাম্মদ (সা) এর প্রতিপক্ষের তিনি অন্যতম সেনাপতি। সে যুদ্ধে তিনি পরাজিত ও নিহত হন। তার ছেলে ইকরিমা ইবনে আবু জাহেল ও পিতার মতই যুদ্ধবাজ ও ইসলামকে নিস্তব্ধ করে দেয়ার অগ্রনায়ক। ইসলামকে মদিনার মাটিতে নিঃশেষ করার জন্য, নিজের স্ত্রীকে সাথে নিয়ে গায়ে পড়ে এগিয়ে এসেছিলেন যুদ্ধ করতে! মক্কা বিজয়ের দিনে সবাই আত্মসমর্পণ করে ফেললেও ইকরামা ক্ষুদ্র একটি দল নিয়ে জীবনের অন্তিম বাজি ধরেছিলেন মুহাম্মদ (সা) এর কাফেলার বিরুদ্ধে! এই কিছুদিন আগেও যে খালিদ তার ছোটকালের বন্ধু ছিল, আজ সে তার চরম প্রতিপক্ষ। তারই মোকাবেলা করতে হচ্ছে! বেশির ভাগ সহযোদ্ধার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তিনি চরমভাবে পরাজিত হলেন ও প্রাণ বাঁচাতে ইয়েমেনের দিকে পালিয়ে গেলেন!
তার স্ত্রী উম্মে হাকিম, তারই চাচাত বোন। তার চরম ঘৃণা ছিল ইসলামের বিরুদ্ধে। আমরণ লড়তে শেখা আরব কবিলার এই মহিলা কিছুদিন আগেই ওহুদের যুদ্ধে রাসুল (সা) এর প্রাণঘাতী দুষমন হিসেবে নিজেও যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। রাসুল (সা) প্রিয় চাচা হামজা (রা) এর কলিজা চিবিয়ে খেয়েছিলেন আবু সুফিয়ানের স্ত্রী “হিন্দা”! গোস্বায় তাঁর ফুসফুসের টুকরো কানে লটকিয়ে ঝুমকার মত পড়েছিলেনে! তিনিও স্বামীর সাথে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং তার স্বামীও যুদ্ধে ইসলামের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। হিন্দার অন্যতম উৎসাহ দান ও সাহায্য কারিণী হিসেবে ছিলেন এই উম্মে হাকিম। মক্কা বিজয়ের দিন রাসুল (সা) কয়েকজন ব্যতীত সবাইকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। ক্ষমার আওতার মধ্যে হিন্দার স্বামী আবু সুফিয়ানের পরিবার পরিজন ও তার কাছে আশ্রয় নেওয়া সকলেই ছিল। এই বাড়ীতে উম্মে হাকিমও আশ্রয় নিয়েছিল। এই সুবর্ণ সুযোগ হিন্দা কাজে লাগিয়েছিল। তিনি সরাসরি রাসুল (সা) কাছে গিয়ে তার অতীত কাজের জন্য অনুতপ্ত হন এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ কেরন। কোন জিঘাংসা, হিংসা ও প্রতিশোধ নেবার প্রবণতা ছাড়াই, চরম শত্রুকে মুহাম্মদ (সা) এভাবে ক্ষমা করতে পারেন! এই দৃশ্যে উম্মে হাকিম চরম আবেগ তাড়িত হয়ে নিজেও তার পরিচয় প্রকাশ করে বললেন, তিনিও তার কাজে অনুতপ্ত। রাসুল (সা) ঘটনাস্থলেই তাকে ক্ষমা করেন। এ ধরনের নিঃস্বার্থ ক্ষমায় উম্মে হাকিম নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না! তার মনে পড়ল প্রাণ ভয়ে পালিয়ে যাওয়া স্বামীর কথা! তিনি স্বামীর পক্ষে সাফাই গেয়ে রাসুল (সা) এর কাছে তার নিরাপত্তার জন্য আবেদন করেন। রাসুল (সা) সাথে সাথেই স্ত্রীর জিম্মায় তার স্বামীকে অগ্রিম নিরাপত্তা দেন। অর্থাৎ তার স্বামী স্ত্রীর সাথে থাকলেই নিরাপদ। কিন্তু তার স্বামী তো ইয়েমেনের পথে নিরুদ্দেশ। এই মহিলা স্বামীর সন্ধানে একজন মাত্র ভৃত্য নিয়ে অজানার পথে বেরিয়ে পড়লেন। সে এক চিত্তাকর্ষক ভিন্ন ঘটনা, কিছুদিনের মধ্যেই তিনি আত্মগোপনের যাওয়া স্বামীকে নিয়ে রাসুল (সা) এর কাছে ফিরে আসেন।
রাসুল (সা) কে ইকরামা প্রশ্ন করেন, আমাকে আপনি নিরাপত্তা দিয়েছেন, আমার করণীয় কি? রাসুল (সা) জানালেন “আমি তোমাকে আহ্বান জানাচ্ছি আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ নাই এবং আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসুল এ কথার সাক্ষ্য দেবার জন্য, সালাত কায়েম করার জন্য, যাকাত আদায় করার জন্য এবং ইসলামের অন্যান্য বিধিনিষেধগুলো মেনে চলার জন্য।” এই কথা শুনে ইকরামা বললেন, আপনি ব্যক্তিগত মতে দিকে ডাকেন নি বরং আল্লাহর দিকে আহবান করেছেন, আমার আগেই এটা শোনা উচিত ছিল। আমি সানন্দে ইসলাম গ্রহণ করলাম। খুশীর আতিশয্যে ইকরিমার মুখ গভীর আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। তিনি বললেন, “আল্লাহর শপথ ইয়া রাসুলুল্লাহ্, আমি শপথ করছি, যা কিছু আমি আল্লাহর পথের শত্রুতার জন্য অতীতে ব্যয় করেছি, তার দ্বিগুণ আমি ব্যয় করব আল্লাহর পথে; এবং ইসলামের বিরুদ্ধে আমি যত যুদ্ধ আমি করেছি তার দ্বিগুণ যুদ্ধ করব আল্লাহর পথে।”
ইকরামা ইবনে আবু জাহেল (রা) পরবর্তী প্রতিটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন এবং ইসলামের জন্য যথাসম্ভব খেদমত করেছেন। আবু বকর (রা) পুরো শাসন কাল তিনি যুদ্ধের ময়দানেই ছিলেন। ওমর (রা) সময়ে, দেড়লক্ষ রোমান বাহিনীর মোকাবেলায় তেত্রিশ হাজার মুসলিম ফৌজ দাড়িয়ে ইয়ামামার যুদ্ধের ময়দানে। প্রতিপক্ষ সামরিক শক্তিতে প্রবল ও মজবুত। পরাজিত করা দুঃসাধ্য তবে অসম্ভব নয়। বন্ধু খালিদ ইবনে ওলীদ আজও সেনাপতি, ইকরামা (রা) তাঁর অনুসারী। চৌকশ, সমরে নিপুণ, সাহসী ব্যক্তিদের নিয়ে একটি স্পেশাল টিম বানাতে তিনি খালিদ (রা) কে প্রায় বাধ্য করলেন এবং স্বল্প সংখ্যক সদস্যের সেই টিমের প্রধান হয়ে তিনি নিজেই রোমান শিবিরে হানা দিলেন। গুটি কতেক জীবন উৎসর্গকারী ব্যক্তির মরণ-পণ আঘাতে রোমান শিবিরে তুমুল হট্টগোল লেগে যায়। দিক্বিদিক তাদের অনেকেই পালাতে থাকে। রোমান সেনাপতি অবস্থা বেগতিক দেখে, সৈন্যদের নির্দেশ দিলেন শিবিরের সৈন্যদের সকল তীর একযোগে এই এক ব্যক্তির দিকেই ছুঁড়ে মার। তারপরও সে যুদ্ধে রোমান বাহিনী শোচনীয় পরাজিত হয়।
মুসলমানদের মৃত দেহ সন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায়, একজন পানি পানি বলে গোঙাচ্ছে। তাঁর কাছে পানি আনা মাত্রই, তিনি তাঁর পাশের আরেক আহত ব্যক্তির পানি পানি বলে গোঙ্গানির শব্দ শুনলেন। তিনি ভাবলেন তার চেয়েও ওনার তেষ্টা অনেক বেশী। তাই তিনি নিজে পানি পান না করে, পানি টুকু ওই ভাইকে দেবার জন্য বললেন! যখন তাঁর কাছে পানি নেওয়া হল তখন তিনি শুনলেন তৃতীয় আরেক জন পানির জন্য গোঙাচ্ছে! মৃত্যুর পূর্বক্ষণেই বুক ফাটা তেষ্টাতেও অন্যের প্রতি সহমর্মিতার কথা মনে উদয় হল! তিনি সেই পানি নিজে পান না করে অপর ভাইকে দেবার জন্য অনুরোধ করলেন। পানি ওয়ালা পানি নিয়ে বারে বারে আহতদের কাছে ঘুরতে রইলেন কিন্তু মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ানো মানুষগুলো তখনও একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ও আন্তরিকতার হাত বাড়াতে থাকলেন। কারো পক্ষে আর পানি পান করা সম্ভব হলো না, এভাবেই তাঁরা দুনিয়ার জীবনকে বিদায় দিলেন! মৃত্যু-ক্ষণেও যারা অন্যের প্রতি ভালবাসা-মমত্ব দেখায় তারা মানুষের হৃদয় থেকে কোনদিন মুছে যায় না। দুনিয়ার মানুষদের জন্য ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই ব্যক্তি আর কেউ নন, তিনি ইকরামা ইবনে আবু জাহেল (রা)! যিনি জীবনের শেষ নিঃশ্বাস দিয়ে পরোপকার করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। নিজের মৃত্যুর ভয়াবহ কষ্টকে হৃদয়ে ধারণ করে অন্যজন যাতে একটি নিঃশ্বাস বেশী নিয়ে আরেকটু বেশী সময় বাঁচতে পারে সে লক্ষ্যে মৃত্যুর সাথে লড়েছেন। এটাই মুসলমানের চরিত্র, এটাই প্রকৃত মুসলমানের দায়িত্ব। তারা অন্যের দুঃখ দেখে নিশ্চল দাড়িয়ে থাকতে পারে না। সে কোনদিন মুসলিম দাবী করতে পারে না।
তাই কার ভাগ্যে মৃত্যু কিভাবে আসবে তা কেউ জানেনা। অবশ্যই নিজেকে সচেতনতার সহিত চালাতে হবে। এটাই প্রকৃত দাবী। কিন্তু যখন চোখের সামনে অসহায় মানুষের জীবনাবসানের ঘটনা ঘটবে তখন উপস্থিত মুহূর্তে নিজেকে বাঁচিয়ে চলার, এড়িয়ে যাবার কোন সুযোগ নেই! এটা আল্লাহর পক্ষ হতে দু’জনের জন্যই পরীক্ষা। যিনি বেঁচে যাবেন তিনি, এই মুহূর্তে ছটফট করে মরতে যাওয়া ব্যক্তির চেয়ে ভাল মৃত্যুর সুযোগ পাবেন! সে গ্যারান্টি কোথায়? আল্লাহ বলেছেন, একজন মানুষকে বাঁচানো সারা বিশ্ববাসীকে বাঁচানোর সমান। একজনের মৃত্যু ঘটানো সারা বিশ্ববাসীকে মারার সমান। সুতরাং এই ধরনের দৃশ্য যদি আমার-আপনার সম্মুখে ঘটে করণীয় কি হতে পারে? আল্লাহ যদি তাকেও হত্যাকারীর মধ্যে গণ্য করে ফেলেন তাহলে উপায় কি হবে? তিনি কি ভাবছেন তার সম্মুখে যিনি অসহায় ভাবে এভাবে মরে গেলেন! কোন সাহায্য করলেন না! তাকে আল্লাহ এমনিতেই ছেড়ে দিবেন! তাই মরার বন্যা যখন বইছেই, তখন নিজের সবটুকু সচেতনতা দিয়েই যেন মরি, দৃষ্টান্ত দেখিয়ে মরি। অন্তত নিজের উপমা দেখে অন্যরা সাহসী হবে, প্রত্যয়ী হয়ে উঠবে। এটা কিভাবে করতে হবে সেটা ইকরামা ইবনে আবু জাহেলের সাথীরা একে অপরের সাথে করিয়েই দেখিয়েছে। যারা আজীবন ইসলামের বিরোধিতা করেছে কিন্তু যখন বুঝ এসেছে অন্তঃকরণের সমস্ত অনুভূতি দিয়েই জীবিত থেকেছে। আমরাও যেন সে লক্ষ্যে জীবিত থাকি। শুধু দাবী করার জন্য যেন, আমাদের মুসলিম জীবন না হয়। প্রকৃতই যেন সমাজ হিতৈষী ব্যক্তি হয়ে বেড়ে উঠতে পারি। তাহলে মুসলিম দাবী সার্থক হবে, নতুবা জীবন বাঁচিয়ে রাখার এই মৃত্যু সারা জনপদের জন্যই চরম অকল্যাণ ঢেকে আনবে।
আবু জেহেল মুহাম্মদ (সা) এর চরম দুষমন। ইসলামকে শক্তি প্রয়োগে ধ্বংস করে দেবার প্রথম ভয়ানক সংঘাত; বদরের যুদ্ধে মুহাম্মদ (সা) এর প্রতিপক্ষের তিনি অন্যতম সেনাপতি। সে যুদ্ধে তিনি পরাজিত ও নিহত হন। তার ছেলে ইকরিমা ইবনে আবু জাহেল ও পিতার মতই যুদ্ধবাজ ও ইসলামকে নিস্তব্ধ করে দেয়ার অগ্রনায়ক। ইসলামকে মদিনার মাটিতে নিঃশেষ করার জন্য, নিজের স্ত্রীকে সাথে নিয়ে গায়ে পড়ে এগিয়ে এসেছিলেন যুদ্ধ করতে! মক্কা বিজয়ের দিনে সবাই আত্মসমর্পণ করে ফেললেও ইকরামা ক্ষুদ্র একটি দল নিয়ে জীবনের অন্তিম বাজি ধরেছিলেন মুহাম্মদ (সা) এর কাফেলার বিরুদ্ধে! এই কিছুদিন আগেও যে খালিদ তার ছোটকালের বন্ধু ছিল, আজ সে তার চরম প্রতিপক্ষ। তারই মোকাবেলা করতে হচ্ছে! বেশির ভাগ সহযোদ্ধার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তিনি চরমভাবে পরাজিত হলেন ও প্রাণ বাঁচাতে ইয়েমেনের দিকে পালিয়ে গেলেন!
তার স্ত্রী উম্মে হাকিম, তারই চাচাত বোন। তার চরম ঘৃণা ছিল ইসলামের বিরুদ্ধে। আমরণ লড়তে শেখা আরব কবিলার এই মহিলা কিছুদিন আগেই ওহুদের যুদ্ধে রাসুল (সা) এর প্রাণঘাতী দুষমন হিসেবে নিজেও যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। রাসুল (সা) প্রিয় চাচা হামজা (রা) এর কলিজা চিবিয়ে খেয়েছিলেন আবু সুফিয়ানের স্ত্রী “হিন্দা”! গোস্বায় তাঁর ফুসফুসের টুকরো কানে লটকিয়ে ঝুমকার মত পড়েছিলেনে! তিনিও স্বামীর সাথে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং তার স্বামীও যুদ্ধে ইসলামের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। হিন্দার অন্যতম উৎসাহ দান ও সাহায্য কারিণী হিসেবে ছিলেন এই উম্মে হাকিম। মক্কা বিজয়ের দিন রাসুল (সা) কয়েকজন ব্যতীত সবাইকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। ক্ষমার আওতার মধ্যে হিন্দার স্বামী আবু সুফিয়ানের পরিবার পরিজন ও তার কাছে আশ্রয় নেওয়া সকলেই ছিল। এই বাড়ীতে উম্মে হাকিমও আশ্রয় নিয়েছিল। এই সুবর্ণ সুযোগ হিন্দা কাজে লাগিয়েছিল। তিনি সরাসরি রাসুল (সা) কাছে গিয়ে তার অতীত কাজের জন্য অনুতপ্ত হন এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ কেরন। কোন জিঘাংসা, হিংসা ও প্রতিশোধ নেবার প্রবণতা ছাড়াই, চরম শত্রুকে মুহাম্মদ (সা) এভাবে ক্ষমা করতে পারেন! এই দৃশ্যে উম্মে হাকিম চরম আবেগ তাড়িত হয়ে নিজেও তার পরিচয় প্রকাশ করে বললেন, তিনিও তার কাজে অনুতপ্ত। রাসুল (সা) ঘটনাস্থলেই তাকে ক্ষমা করেন। এ ধরনের নিঃস্বার্থ ক্ষমায় উম্মে হাকিম নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না! তার মনে পড়ল প্রাণ ভয়ে পালিয়ে যাওয়া স্বামীর কথা! তিনি স্বামীর পক্ষে সাফাই গেয়ে রাসুল (সা) এর কাছে তার নিরাপত্তার জন্য আবেদন করেন। রাসুল (সা) সাথে সাথেই স্ত্রীর জিম্মায় তার স্বামীকে অগ্রিম নিরাপত্তা দেন। অর্থাৎ তার স্বামী স্ত্রীর সাথে থাকলেই নিরাপদ। কিন্তু তার স্বামী তো ইয়েমেনের পথে নিরুদ্দেশ। এই মহিলা স্বামীর সন্ধানে একজন মাত্র ভৃত্য নিয়ে অজানার পথে বেরিয়ে পড়লেন। সে এক চিত্তাকর্ষক ভিন্ন ঘটনা, কিছুদিনের মধ্যেই তিনি আত্মগোপনের যাওয়া স্বামীকে নিয়ে রাসুল (সা) এর কাছে ফিরে আসেন।
রাসুল (সা) কে ইকরামা প্রশ্ন করেন, আমাকে আপনি নিরাপত্তা দিয়েছেন, আমার করণীয় কি? রাসুল (সা) জানালেন “আমি তোমাকে আহ্বান জানাচ্ছি আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ নাই এবং আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসুল এ কথার সাক্ষ্য দেবার জন্য, সালাত কায়েম করার জন্য, যাকাত আদায় করার জন্য এবং ইসলামের অন্যান্য বিধিনিষেধগুলো মেনে চলার জন্য।” এই কথা শুনে ইকরামা বললেন, আপনি ব্যক্তিগত মতে দিকে ডাকেন নি বরং আল্লাহর দিকে আহবান করেছেন, আমার আগেই এটা শোনা উচিত ছিল। আমি সানন্দে ইসলাম গ্রহণ করলাম। খুশীর আতিশয্যে ইকরিমার মুখ গভীর আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। তিনি বললেন, “আল্লাহর শপথ ইয়া রাসুলুল্লাহ্, আমি শপথ করছি, যা কিছু আমি আল্লাহর পথের শত্রুতার জন্য অতীতে ব্যয় করেছি, তার দ্বিগুণ আমি ব্যয় করব আল্লাহর পথে; এবং ইসলামের বিরুদ্ধে আমি যত যুদ্ধ আমি করেছি তার দ্বিগুণ যুদ্ধ করব আল্লাহর পথে।”
ইকরামা ইবনে আবু জাহেল (রা) পরবর্তী প্রতিটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন এবং ইসলামের জন্য যথাসম্ভব খেদমত করেছেন। আবু বকর (রা) পুরো শাসন কাল তিনি যুদ্ধের ময়দানেই ছিলেন। ওমর (রা) সময়ে, দেড়লক্ষ রোমান বাহিনীর মোকাবেলায় তেত্রিশ হাজার মুসলিম ফৌজ দাড়িয়ে ইয়ামামার যুদ্ধের ময়দানে। প্রতিপক্ষ সামরিক শক্তিতে প্রবল ও মজবুত। পরাজিত করা দুঃসাধ্য তবে অসম্ভব নয়। বন্ধু খালিদ ইবনে ওলীদ আজও সেনাপতি, ইকরামা (রা) তাঁর অনুসারী। চৌকশ, সমরে নিপুণ, সাহসী ব্যক্তিদের নিয়ে একটি স্পেশাল টিম বানাতে তিনি খালিদ (রা) কে প্রায় বাধ্য করলেন এবং স্বল্প সংখ্যক সদস্যের সেই টিমের প্রধান হয়ে তিনি নিজেই রোমান শিবিরে হানা দিলেন। গুটি কতেক জীবন উৎসর্গকারী ব্যক্তির মরণ-পণ আঘাতে রোমান শিবিরে তুমুল হট্টগোল লেগে যায়। দিক্বিদিক তাদের অনেকেই পালাতে থাকে। রোমান সেনাপতি অবস্থা বেগতিক দেখে, সৈন্যদের নির্দেশ দিলেন শিবিরের সৈন্যদের সকল তীর একযোগে এই এক ব্যক্তির দিকেই ছুঁড়ে মার। তারপরও সে যুদ্ধে রোমান বাহিনী শোচনীয় পরাজিত হয়।
মুসলমানদের মৃত দেহ সন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায়, একজন পানি পানি বলে গোঙাচ্ছে। তাঁর কাছে পানি আনা মাত্রই, তিনি তাঁর পাশের আরেক আহত ব্যক্তির পানি পানি বলে গোঙ্গানির শব্দ শুনলেন। তিনি ভাবলেন তার চেয়েও ওনার তেষ্টা অনেক বেশী। তাই তিনি নিজে পানি পান না করে, পানি টুকু ওই ভাইকে দেবার জন্য বললেন! যখন তাঁর কাছে পানি নেওয়া হল তখন তিনি শুনলেন তৃতীয় আরেক জন পানির জন্য গোঙাচ্ছে! মৃত্যুর পূর্বক্ষণেই বুক ফাটা তেষ্টাতেও অন্যের প্রতি সহমর্মিতার কথা মনে উদয় হল! তিনি সেই পানি নিজে পান না করে অপর ভাইকে দেবার জন্য অনুরোধ করলেন। পানি ওয়ালা পানি নিয়ে বারে বারে আহতদের কাছে ঘুরতে রইলেন কিন্তু মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ানো মানুষগুলো তখনও একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ও আন্তরিকতার হাত বাড়াতে থাকলেন। কারো পক্ষে আর পানি পান করা সম্ভব হলো না, এভাবেই তাঁরা দুনিয়ার জীবনকে বিদায় দিলেন! মৃত্যু-ক্ষণেও যারা অন্যের প্রতি ভালবাসা-মমত্ব দেখায় তারা মানুষের হৃদয় থেকে কোনদিন মুছে যায় না। দুনিয়ার মানুষদের জন্য ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই ব্যক্তি আর কেউ নন, তিনি ইকরামা ইবনে আবু জাহেল (রা)! যিনি জীবনের শেষ নিঃশ্বাস দিয়ে পরোপকার করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। নিজের মৃত্যুর ভয়াবহ কষ্টকে হৃদয়ে ধারণ করে অন্যজন যাতে একটি নিঃশ্বাস বেশী নিয়ে আরেকটু বেশী সময় বাঁচতে পারে সে লক্ষ্যে মৃত্যুর সাথে লড়েছেন। এটাই মুসলমানের চরিত্র, এটাই প্রকৃত মুসলমানের দায়িত্ব। তারা অন্যের দুঃখ দেখে নিশ্চল দাড়িয়ে থাকতে পারে না। সে কোনদিন মুসলিম দাবী করতে পারে না।
তাই কার ভাগ্যে মৃত্যু কিভাবে আসবে তা কেউ জানেনা। অবশ্যই নিজেকে সচেতনতার সহিত চালাতে হবে। এটাই প্রকৃত দাবী। কিন্তু যখন চোখের সামনে অসহায় মানুষের জীবনাবসানের ঘটনা ঘটবে তখন উপস্থিত মুহূর্তে নিজেকে বাঁচিয়ে চলার, এড়িয়ে যাবার কোন সুযোগ নেই! এটা আল্লাহর পক্ষ হতে দু’জনের জন্যই পরীক্ষা। যিনি বেঁচে যাবেন তিনি, এই মুহূর্তে ছটফট করে মরতে যাওয়া ব্যক্তির চেয়ে ভাল মৃত্যুর সুযোগ পাবেন! সে গ্যারান্টি কোথায়? আল্লাহ বলেছেন, একজন মানুষকে বাঁচানো সারা বিশ্ববাসীকে বাঁচানোর সমান। একজনের মৃত্যু ঘটানো সারা বিশ্ববাসীকে মারার সমান। সুতরাং এই ধরনের দৃশ্য যদি আমার-আপনার সম্মুখে ঘটে করণীয় কি হতে পারে? আল্লাহ যদি তাকেও হত্যাকারীর মধ্যে গণ্য করে ফেলেন তাহলে উপায় কি হবে? তিনি কি ভাবছেন তার সম্মুখে যিনি অসহায় ভাবে এভাবে মরে গেলেন! কোন সাহায্য করলেন না! তাকে আল্লাহ এমনিতেই ছেড়ে দিবেন! তাই মরার বন্যা যখন বইছেই, তখন নিজের সবটুকু সচেতনতা দিয়েই যেন মরি, দৃষ্টান্ত দেখিয়ে মরি। অন্তত নিজের উপমা দেখে অন্যরা সাহসী হবে, প্রত্যয়ী হয়ে উঠবে। এটা কিভাবে করতে হবে সেটা ইকরামা ইবনে আবু জাহেলের সাথীরা একে অপরের সাথে করিয়েই দেখিয়েছে। যারা আজীবন ইসলামের বিরোধিতা করেছে কিন্তু যখন বুঝ এসেছে অন্তঃকরণের সমস্ত অনুভূতি দিয়েই জীবিত থেকেছে। আমরাও যেন সে লক্ষ্যে জীবিত থাকি। শুধু দাবী করার জন্য যেন, আমাদের মুসলিম জীবন না হয়। প্রকৃতই যেন সমাজ হিতৈষী ব্যক্তি হয়ে বেড়ে উঠতে পারি। তাহলে মুসলিম দাবী সার্থক হবে, নতুবা জীবন বাঁচিয়ে রাখার এই মৃত্যু সারা জনপদের জন্যই চরম অকল্যাণ ঢেকে আনবে।

Discussion about this post