পৃথিবীতে অন্যান্য সকল প্রাণীদের তুলনায় মানুষ বড় অসহায়। একটি মুরগী ছানা জন্ম নেবার দশ মিনিটের মাথায় হাটতে পারে, দশ ঘণ্টার ব্যবধানে খাবারে ঠোকর মারে, তিন দিনের মাথায় আত্মরক্ষার নিয়মাবলী রপ্ত করে। প্রাণীরা এসব জন্ম নেবার সাথে সাথেই কাজে লাগাতে পারে। শারীরিক দুর্বলতার জন্য যতক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়, ততক্ষণই তাদের দেরী।
ক্ষতিকর জানা সত্ত্বেও, মানুষ জেনেশুনেও চর্বি খায়, বিড়ি টানে, মদ গিলে, বেশী ঘুমায়। এই ভুল কাজটি মানুষ ব্যতীত সারা দুনিয়ার কোন প্রাণীই করেনা! প্রয়োজনে উপোষ থাকবে তারপরও প্রাণীরা চর্বি খায় না। এই ক্ষতিকর জ্ঞান তাদের রয়েছে। সেভাবে প্রতিটি প্রাণী তাদের স্বাস্থ্য রক্ষা, শারীরিক ব্যায়াম, অতি ভোজনের ক্ষতি সম্পর্কে আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানে ওয়াকিবহাল। মনুষ্য সৃষ্ট ক্ষতি যেমন, রেডিয়েশন, বায়ুদূষণ, ভেজাল-খাদ্য, দুষিত পানি এ ধরণের সমস্যা থেকে তারা নিজেদের রক্ষা করতে না পারলেও প্রকৃতিগত সমস্যা সমাধান তারা নিজেরাই করতে পারে। কোন রোগের কি পথ্য, স্বাস্থ্য সুঠাম রাখতে কি করণীয়, ব্যথা দুর করতে কেমন ব্যায়াম দরকার, এসব তারা নিজেরাই সেরে নেয়। প্রাণীরা এসব স্কুল কলেজ কিংবা ফিজিও থেরা-পিষ্টের কাছে গিয়ে শিখে না। তাদের মগজে আল্লাহ এই জ্ঞানকে সন্নিবেশ করে দিয়েছেন, তাই তারা পারে। বিপরীতে মানুষকে এসব শিখতে হয়, অর্জন করতে হয়, কারো তত্ত্বাবধানে থেকে আয়ত্ত্ব করতে হয়। তাই যারা প্রকৃতির প্রতি দৃষ্টিকে নিবদ্ধ রাখে তারা অনেক কিছুই জানতে পারে।
সচরাচর দেখে থাকি, বিড়াল-কুকুরের এমন কিছু ব্যায়াম নিয়ে আলোচনা করব। যা অনুসরণ করলে আমরা অনেক বেশী ভাল থাকতে পারব।
– মানব শিশু সহ সকল শিশু প্রাণীরা লাফাতে পছন্দ করে। তাদের পায়ে শিন শিন করে। লাফাতে পারলে ভাল লাগে। ফলে তাদের লাফাতে দেখি। অনেকে এটাকে দুষ্টামি-বেয়াদবি মনে করেন। আসলে তারা লাফাতে পারলে সুখা-নন্দ পায়। এটাতে তাদের খাদ্য তাড়াতাড়ি হজম হয়। আবার খিদে লাগে, বল সৃষ্টি হয়। শিশুদের বড় করে তোলার জন্য এটাও আল্লাহর একটা বড় নেয়ামত যে, তিনি তাদের রক্তে-মাংসে এ ধরনের শিন শিন অনুভূতি তৈরি করেন। ফলে তাদের আর প্রয়োজনীয় ব্যায়ামের দরকার পড়েনা।
– মানুষের বয়স যখন চল্লিশ ছুঁই ছুঁই করে। তখন কোমরের ব্যথা বাড়তে থাকে। দীর্ঘদিন পিটের দিকের মাংসপেশি অচল থাকার কারণে এমনটি ঘটে থাকে। কামার, কুমার, তাতি, জেলে, চাষা, ভারবহনকারীদের এই সমস্যাটা কম দেখা যায়। কেননা তাদের কাজটা এমন, যার দ্বারা পিটের মাংসপেশি নড়াচড়া করে। তারা বুঝতেই পারে না কোমরের ব্যথা আবার কি জিনিষ! কিন্তু যারা চেয়ারে বসে কিংবা ব্যবসায়ের গদিতে বসে তাদের কোমরের সমস্যা অনেকটা আগে থেকেই শুরু হয়ে যায়। বিড়াল-কুকুর দৈনিক বহুবার সামনের পায়ে ভর দিয়ে পিছনের পা যুগল লম্বা করে মেরুদণ্ডকে সটান করে ছেড়ে দেয়। এতে কোমরের মাংস পেশী সচল হয়, মেরুদণ্ডের জয়েন্টগুলো যথাস্থানে নড়ে চড়ে বসে। বসে থেকে সময় কাটানো মানুষকে, এই ব্যথার জালায় অসহায় করে তুলে। ব্যথার উৎপত্তি কোমরে কিন্তু ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে পায়ের দিকে। মানুষ একেবারেই অচল ও সাহসহীন হয়ে পড়ে। কোমরের ব্যথার জন্য ফিজিও থেরা-পিষ্টের কাছে গেলে তারা বিড়াল-কুকুরের এই ব্যায়ামের সাথে সামঞ্জস্য ব্যায়াম অবশ্যই দিবে। যারা নামাজ পড়ে তারা সেজদা দেবার সময় কপালকে একটু লম্বা দূরত্বে রাখলে, এই ব্যায়ামের কাজ হয়ে যায়। শরীরে ছন্দ ফিরে আসে।– সামনের পা দুটো সটান করে টান লাগানো। ঠিক আগের টার বিপরীত। পিটের অচল মাংসপেশির ব্যথা মানুষকে বিভ্রান্ত-আতঙ্কিত করে তুলে। কেউ ভাবেন হার্ট গেছে, কেউ ভাবেন কলিজা! বলীয়ান মানুষ পাঁচ কেজির মাল তুলতে গেলে, মনে হবে পাঁজরের সমুদয় হাড় চিল্লায়ে উঠছে। সমস্যাটা মাংসপেশিতে। গৃহবধূরা এই রোগে বেশী কষ্ট-পায়। ডেকচি, বালতি উল্টাতে গেলে মনে হবে যেন, হাতি ঠেলায় মত্ব আছে। মনে করে ইহজনম এখানেই শেষ, অতঃপর ঘরে কাজের বুয়ার আগমন ঘটে। ঘরে বুয়ার আগমন ও রোগ স্থায়ীভাবে আসন গেড়ে বসার এটাই শুরু। অথচ একটু ব্যায়ামে এই রোগ চলে যায় এবং মন প্রফুল্ল থাকে। সে কারণে কাজের বুয়াদের শরীরে ব্যথার উপদ্রব কম থাকে। যথারীতি বিড়াল-কুকুরকে আমরা এই ব্যায়ামের কসরত করতে দেখি। ফিজিও থেরা-পিষ্ট এই ব্যায়াম করাবেই। যারা নামাজ পড়ে তারা যদি একটি দীর্ঘ যথাযথ রুকু-সিজদা করে তাহলে সুফল পায়। রাসুল (সা) এই রোগের প্রতিষেধক হিসেবে শিঙ্গা তথা হিজামা ব্যবহার করেছেন। রাসুল (সা) ব্যথার জ্বালায় হিজামা নেন নাই। তিনি উম্মতের জন্য ছিলনে মডেল বা আদর্শ। তাই তাদের শিখাতেই এটা নিজে গ্রহণ করে নিয়মটির বৈধতা ও ভিত্তি দিয়েছেন।
– পিটকে ঘোড়ার মত নিচের দিকে চাপানো কিংবা উটের মত উঁচা করা। এর দ্বারা শরীরের অভ্যন্তর ভাগের অঙ্গগুলো সচল হয়। নিঃশ্বাসকে ফুরফুরে, সতেজ করা ও রক্ত চলাচলের গতিকে বাড়িয়ে তোলাই এই ব্যায়ামের লক্ষ্য। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে, মানুষ দীর্ঘক্ষণ সেজদায় থাকলে ব্যাপক মাত্রায় রক্ত সঞ্চালন শুরু হয়। এখানেও প্রাণীদের একই ব্যায়াম কাজ করে থাকে। রক্ত চলাচল সঠিক ভাবে চললেই শরীরে কোন ব্যথা থাকবে না। যে সব মাংসপেশিতে রক্ত চলাচলে বাধাগ্রস্ত কিংবা স্তিমিত হয় সেখানে টক্সিন তথা বিষ জমে উঠে। আমরা আলসে ভাব অনুভব করি। কাজ করতে মন চায়না, কিচ্ছু ভাল লাগেনা। অতঃপর আমরা শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা অনুভব করতে থাকি।
তাই সর্বদা কমবেশি কিছুটা ব্যায়াম করা সকল মানুষের উচিত। প্রাণীরা সর্বদা খেতে না পারলেও, তাদের ব্যায়াম সর্বদা অব্যাহত থাকে। এটা প্রকৃতির নিয়ম, আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানের নির্যাস। প্রাণীরা এভাবেই নিরলস থাকে। মানুষেরাও যদি প্রাণীদের দেখিয়ে দেওয়া পন্থায় চলে, তাহলেও কিছুটা সুস্থ জীবনের আশা করা যায়, মূলত সুস্থ-সবল থাকার জন্য ব্যায়ামের কোন বিকল্প নেই। রাসুল (সা) এর বয়স বাড়ার সাথে সাথে নামাজ পড়ার সময় ও সংখ্যাও বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বয়স্ক মানুষের জন্য ভাল থাকার জন্য এটা একটা বৈজ্ঞানিক ইঙ্গিত। আসুন আমরা নিজেরা সতর্ক হই, সবাইকে সতর্ক করি এবং প্রকৃতির দিকে আন্তরিকতার সহিত নজর দেই। তাহলে জ্ঞানী মানুষের অন্ত-চক্ষু দিনের মত আলোকিত হয়ে উঠবে।





Discussion about this post