ভারত আমাদেরকে পিয়াজ দিচ্ছেনা! এটা নিয়ে সারা বাংলা খুব সরগরম কেননা ভারত তার চিরাচরিত নরম দিলের পরিচয় দিতে কার্পণ্য করেছে! বস্তুত আমাদের তো আলহামদুলিল্লাহ পড়া উচিত! কেননা, ভারত এখনও অনেক কিছুর সরবরাহ তো বন্ধ করেনি। আদা, রসুন, হলুদ, মরিচ, গরম মসল্লা, জিরা, ধনিয়া, তুঁত, শাড়ী-কাপড়, সুঁই, সুতা, বরশী, জোতার রং সহ যাবতীয় অনেক জিনিসের আমদানি বন্ধ করেনি! টাটার গাড়ী আসছে, টনে টনে সিএনজি গাড়ী ঢুকছে, এমন কি সাথে করে দলে দলে ভারতীয় এক্সপার্ট আদমের চালানীও অব্যাহত আছে! ইনশায়াল্লাহ আগামীকাল থেকে হাজার হাজার কিউসেক পানিও আসবে।
পানি হল রহমতের অন্যতম উপাদান! সেই পানিও ভারত ছেড়ে দিচ্ছে! বন্ধ তো করছে না! পৃথিবীর বহু দেশে জনশক্তির হাহাকার! মাশায়াল্লাহ, আগামী কয়েক বছর পরেই আসাম থেকে আসার অপেক্ষায় লক্ষ লক্ষ বনী আদমকে জড়ো করা হচ্ছে। তারা সহ বাংলাদেশের সবাই মিলে, বাংলার মাটিকে যদি ময়দার কাইয়ের মত পিষতে থাকে; আমার দেশের মলিন মাটি এমন মিহি নরম হবে, যার উপরে সোনালী ফসল তর তর করে লাফিয়ে উঠবে। আচ্ছা, এ সবই কি ভারতের অবদান নয়! শুধুমাত্র একটি আইটেম পিয়াজ! এর জন্যই প্রতিবেশী বন্ধুদের উপর এত নাখোশ! অকৃতজ্ঞতা আর কারে কয়?
ভারতের পররাষ্ট্র নীতি চাণক্যের চিন্তার দ্বারা যথেষ্ট প্রভাবিত। চাণক্য বলেছেন, ‘প্রতিবেশীকে শত্রু জ্ঞান করো’। ধরে নিলাম ভারত সেটাই করছে। সে তার নিজের ভালোর জন্য যা করার তাই করবে। প্রশ্ন হল আমরা করছি টা কি? দুনিয়ার হাবিজাবি জিনিষ থেকে শুরু করে গোবর সার, অকেজো পণ্য থেকে শুরু করে কানের ময়লা পরিষ্কার করার ক্ষুদ্র কোদাল পর্যন্ত কোন জিনিষটা আমরা ভারত আমদানি করছিনা? মদ খোর মদের নেশায় যেমন নিজেকে দেশের রাষ্ট্রপতি মনে করে; সেভাবে আজ পুরো জাতির তরুণেরা নিজেদেরকে রাষ্ট্রের ভগ্নীপতি মনে করে বসে আছে। ভাই যেমন বোনের চেহারার দিকে তাকিয়ে অকর্মা ভগ্নীপতিকে তোষামোদ করে, আজ অকর্মা হয়ে আমরাও তাই ভাবছি। সিএনজির মত ট্যাক্সি বানানোর যোগ্যতা কি আমাদের নাই? আমরা করছি না কিংবা করানো হচ্ছে না। কোরবানির সময় গরু বন্ধ করেছিল ভারত। আমরা গর্জে উঠেছিলাম, এখন মানুষ দেশীয় গরু দিয়ে কোরবানি করতে পারছে। পিয়াজ-রসুন, মরিচ-হলুদ এসব তো আমাদের জলবায়ুর জন্য দারুণ কার্যকরী শস্য। কেন আমরা উৎপাদনে হাত না লাগিয়ে অন্য দেশ থেকে আনছি? স্বভাবতই কোন জিনিষের জন্য অন্যের উপর শতভাগ নির্ভর করলে বিপদ যে কোন মুহূর্তে আসতে পারে। তারা যদি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, যদিও সেটা করার অধিকার তাদের রয়েছে। তাহলে তাদের বিরুদ্ধে গোস্বা দেখাই কোন মুখে। সংসারে ঝাঁজ বাড়ানোর একমাত্র উপাদান এই পিঁয়াজের অভাবে আজ সারা জাতি গোস্বায় নিজেদের বংশ দণ্ড ধরে স্তম্ভিত হয়ে দাড়িয়ে আছে!
প্রতিবেশীদের পক্ষ হতে, এসব ছোট খাট ইঙ্গিত দেখেও কি আমাদের ঘুম ভাঙ্গবে না। যত বড় শিক্ষিত ও জ্ঞানীই হই না কেন খাদ্যের কাছে সবাই অসহায়। ধনীর টাকা ব্যাংকে থাকবে, চালাকের টাকা পকেটে থাকবে আর সৈন্যের অস্ত্র তার হাতে থাকবে কিন্তু খাদ্য না থাকলে সবই মূল্যহীন! এখনও সময় যায়নি, ইচ্ছে করলে, সামনের মৌসুমে সারা বাংলাদেশের মাটিকে শস্য দিয়ে সাজানো যায়। প্রয়োজন মাত্র একটি ক্যাসিনোর টাকা আর জাতীয় স্বদিচ্ছা।
আমাদের ছোটকালেই চারিদিকে শস্য শোভা পেত। রাস্তার দুপাশে মাইলের পর মাইল ক্ষেত-খামারে ভড়ে যেত। যেখানে চাষাবাদ করার মানুষ পাওয়া যেত না সেটাকে বলা হত ‘খিল’। চামারী খিল, ধোপার খিল বলে জমির একটা বদনাম জুটে যেত। কখনও এই নাম প্রসিদ্ধি পেত। নাম শুনেই চলমান কৃষক প্রশ্ন করত, কেন এই জায়গা খিল থাকে? আজ যেন সারা বাংলাদেশ একটি বিশালকায় খিল!
চল্লিশ বছর আগেও হলুদ, মরিচ, পিয়াজ, রসুন, তৈল এসব বাজার থেকে কিনতে হত না। সব কিছুই স্থানীয় ভাবে উৎপাদিত হত। স্কুলের আশি শতাংশ ছাত্ররাই লেখা-পড়ার পাশাপাশি কৃষি ও পারিবারিক কাজে পিতা-মাতাকে সাহায্য করতেই হত। একমাত্র মেধাবী ও পরিশ্রমী ছাত্ররাই উচ্চ শিক্ষা অর্জনে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখী হত। বর্তমানে লাখে লাখো-কোটি তরুণ লিখতে জানছে, পড়তে পারছে, আর নিজেদের ভাবছে মহাজ্ঞানী ও বিরাট সম্মানী ব্যক্তি হিসেবে। এদের বেশীরভাগই চাকর হতে চায়! তাই তাদের চাকুরী দরকার অধিকন্তু এরা চাকর হতে না পেরে, মাদক সেবী হচ্ছে। এসব আত্ম-সম্মানহীন তরুণ কাজও করছে না, দেশের উৎপাদনে ভূমিকাও রাখছে না। দেশের বেকারত্ব বাড়া ও উৎপাদন শ্লথ হয়ে পড়ার মুল কারণ এটাই।
বেশী বিশ্ববিদ্যালয় বাড়লেই যে, বেশী বেশী কাজের মানুষ ও জ্ঞানী-গুণী বের হবে এই চিন্তা ঠিক নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত না মানুষের ও সমাজের মানসিক পরিবর্তন না আসবে ততদিন আমাদেরকে ফকির-তোয়াঙ্গের মত জীবন যাপন করতে হবে। আর এভাবে কখনও, পিয়াজের, কখনও রসুনের জাত উদ্ধারে মিছিল মিটিংয়ে লিপ্ত হতে হবে।

Discussion about this post