লঙ লঙ্গ, রঙ্গ রঙ্গ, শুঙ্কার হুঙ্কারে; ছা-আ পরীর ছাঈ। দোহাই মহাকালের দোহাই, দোহাই মগদ ঈশ্বরীর দোহাই, দোহাই ত্রি-শুঙ্কলপতির দোহাই………। বৈদ্য মানবেন্দ্র ত্রিপুরা ওরফে মণি বৈদ্য এই দুর্বোধ্য রাজমোহনী মন্ত্র এক নিঃশ্বাসে পড়ে যাচ্ছেন আর একটি করে তাবিজ জমির কোণায় মাটিতে পুঁতে দিচ্ছেন!
এ অঞ্চলের মানুষের বিশ্বাস, মণি বৈদ্য মন্ত্র পড়ে এভাবে জমির কোনায় তাবিজ পুতে দিলে, সে জমিতে আর ক্ষতিকর পোকা-মাকড় পড়বে না।
বৈদ্য মানবেন্দ্র ত্রিপুরা পার্বত্য এলাকার মানুষ, তাঁর জনবসতির সকল লোকজন তাঁকে সুধী মণি তথা সম্মানিত মণি বৈদ্য হিসেবে চিনে।
বৈদ্য মানবেন্দ্র ত্রিপুরা পার্বত্য এলাকার মানুষ, তাঁর জনবসতির সকল লোকজন তাঁকে সুধী মণি তথা সম্মানিত মণি বৈদ্য হিসেবে চিনে।
বিচার-আচারে, বিপদে-আপদে, সাহায্য-সহযোগিতায় তাঁকে সব সময় কাছে পাওয়া যায়। তিনি একাধারে যোগী, তান্ত্রিক ও বৈদ্য।
তার কাছে কৌতূহলোদ্দীপক একটি বিশেষায়িত জ্ঞান রয়েছে! এ কারণে তিনি বেশ আলোচিত। মন্ত্র পড়ে, যার জমি তাবিজ দিয়ে বন্ধ করে দেন, তার জমি চুঙ্গা পোকা, মাজরা পোকা, পামরি পোকা, গান্ধী পোকা সহ সকল ধরনের ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ থেকে মুক্ত থাকে!
এ কাজের জন্য ইনভেষ্ট খুবই সামান্য। বৈদ্যকে চারজন পেশাদারি সুদি ব্যক্তির নাম দিতে হয়। বাকিটা তিনি নিজেই করবেন। কিন্তু এটি কঠিন কাজ! কোথায় পাওয়া যাবে পেশাদারি সুদি ব্যক্তির নাম? যাই হোক, এ কাজে তিনি পারিশ্রমিক নেন না! যেহেতু কাজটি ফ্রি করতে হয় সেহেতু একেবারে কাছের মানুষের আবদারই রক্ষা করেন।
আমাদের দেশে ত্রিশ বছর আগেও একমাত্র দুঃসাহসী মানুষ ছাড়া প্রকাশ্যে কেউ দাবী করত না যে, তিনি সুদের কারবার করেন! চোর-ডাকাতদের চিনা যেত; তারা সমাজের মানুষের সাথে মিশে থাকত, তাদের কারো নামে চোর-ডাকাত উপাধি থাকত না।
আমাদের দেশে ত্রিশ বছর আগেও একমাত্র দুঃসাহসী মানুষ ছাড়া প্রকাশ্যে কেউ দাবী করত না যে, তিনি সুদের কারবার করেন! চোর-ডাকাতদের চিনা যেত; তারা সমাজের মানুষের সাথে মিশে থাকত, তাদের কারো নামে চোর-ডাকাত উপাধি থাকত না।
কিন্তু সুদী মানুষদের নামের সাথে সুদী ফণী, সুদী মনি কিংবা সুদী গনি বলে উপাধি যোগ হয়ে যেত। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ সকল সমাজে সুদ কে ঘৃণা করা হত।
মুসলমানেরা সুদ খেত না। জানতে পারলে, জীবনেও কেউ তার সাথে আত্মীয়তা করবে না। একজন তোয়াঙ্গর ব্যক্তিও, সুদি ব্যক্তির কন্যা নিতে চাইত না! তবে, অনেকে নিজের পরিচয় গোপন রেখে এজেন্ট নিয়োগ করত।
তার মাধ্যমে সুদের কারবার চালাত। স্বর্ণ বন্ধক রেখে স্বর্ণকার সুদের কাজ করত। আর কিছু ছিল মহাজন! তারাও এ কাজ করত। নামে মহাজন হলেও, সকল বর্ণের মানুষের চোখের দুষমন ছিল এরা।
স্বর্ণ বন্ধক রাখলে বেশীর ভাগ স্বর্ণ হাওয়া হয়ে যেত। তাই গৃহ বধূরা গালি দিয়ে ক্ষোভ মিঠাত, মুন্ডুপাত করত। হিন্দুরা নাপিতের পেশাকে কম পছন্দ করে। এক নাপিতের ছেলে, দোকান না করে, সুদী কারবারে মন দিয়েছে।
তার বাবা প্রতিদিন, সারাজীবন এই সন্তানকে প্রকাশ্যে অভিশাপ দিত। তিনি গরীব হওয়া সত্ত্বেও ছেলে সুদীর কারবারে যোগ দিয়েছে এই অপমানে কোনদিন ছেলের হাতে পানি পর্যন্ত পান করেন নি।
এই ছিল হিন্দু সমাজের দশা। মুসলিম সমাজের কথা তো আগেই বলেছি! সুদী পেশাকে মানুষ কতটা ঘৃণা করত, এই উদাহরণ থেকে তা কিছুটা হলেও আঁচ করা যায়।
মণি বৈদ্য খোলামেলা বলতেন, “এখানে তন্ত্র-মন্ত্রের সাধনা বলে কোন কথা নয়। তার বাপ-দাদারা মন্ত্র শিখিয়েছেন বলে তিনিও তা অব্যাহত রেখেছেন কিন্তু মুল ব্যাপার অন্য খানে।
মণি বৈদ্য খোলামেলা বলতেন, “এখানে তন্ত্র-মন্ত্রের সাধনা বলে কোন কথা নয়। তার বাপ-দাদারা মন্ত্র শিখিয়েছেন বলে তিনিও তা অব্যাহত রেখেছেন কিন্তু মুল ব্যাপার অন্য খানে।
মুলত, সুদখোর মানুষের কোন কিছুই পোকা-মাকড়ে খায়না! তাদের সম্পদকে পোকা-মাকড়েও এড়িয়ে চলে। মন্ত্র দিয়ে বন্ধ না করলেও, সুদখোরের বাগানের ফলও নাকি বানর-হনুমান খায়না! এই তত্ত্ব ও তথ্য পাহাড়ি মানুষেরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে।
তাদের জীবন যেহেতু ফসলের উপর নির্ভরশীল, তাই তারাও সুদখোরকে এড়িয়ে চলে। এদেরকে ঘৃণা করে এবং আত্মীয়তা করেনা। যার কারণে মন্ত্রের এক জায়গায় বলতে হয়, “হে এই জমির ক্ষতিকারক শত্রুরা, তোমরা জেনে রাখ, এই জমির মালিক সুদখোর ফনি মহাজন, সাবধান তোমরা এর ধারে কাছেও আসবেনা।”
মণি বৈদ্য সাত সকালে বাড়ীতে এসে চারজন সুদখোর ব্যক্তির নাম যোগাড় করে, তাদের নাম পড়তে পড়তে তাবিজ পেঁচাতে থাকে। কথা হল, চার জন মানুষের নাম জোগাড় করাও তখনকার দিনে কঠিন ছিল।
মণি বৈদ্য সাত সকালে বাড়ীতে এসে চারজন সুদখোর ব্যক্তির নাম যোগাড় করে, তাদের নাম পড়তে পড়তে তাবিজ পেঁচাতে থাকে। কথা হল, চার জন মানুষের নাম জোগাড় করাও তখনকার দিনে কঠিন ছিল।
কেননা কেউ স্বীকার করত না যে, তিনি সুদ খায়! তারপরও ভুক্তভোগী কাউকে ধরে, নাম উদ্ধার করা লাগত। স্কুল জীবনে একদা ছয়জন সুদী ব্যক্তির নামের তালিকা পেয়ে যাই! দুর্দিনে কারে বিপদে লাগতে পারে। কোনদিন যাতে না হারাই, তাই তাদের নাম আমার বাংলা বইয়ের পিছনে স্থায়ী ভাবে লিখে রেখেছিলাম! যাতে চাওয়া মাত্র দিতে পারি!
এখন ভাবী, পরম শ্রদ্ধেয় মনি বৈদ্য যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে তিনি লাখো-কোটি সুদি ব্যক্তির নাম পেয়ে যেতেন। তিনি স্বীয় চোখ বড় করে দেখতে পেতেন, দেশে এখন আর ধানের পোকা নেই।
এখন ভাবী, পরম শ্রদ্ধেয় মনি বৈদ্য যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে তিনি লাখো-কোটি সুদি ব্যক্তির নাম পেয়ে যেতেন। তিনি স্বীয় চোখ বড় করে দেখতে পেতেন, দেশে এখন আর ধানের পোকা নেই।
বরং পোকার যায়গা সুদী ব্যক্তিরা দখল করে ফেলেছে। কেননা সারা দেশে পোকার চেয়ে সুদী ব্যক্তির সংখ্যাই বেশী হয়ে গিয়েছে! আমাদের দেশ এখন, এমন বিশ্ব সেরা সুদি মহাজনদের সৃষ্টি করেছে, যাদের চারজনের নাম নিয়ে যদি সমগ্র বাংলাদেশের চারদিকে চারটি তাবিজ গেড়ে দিতেন, তাহলে সারা বাংলা থেকে দুর্গন্ধযুক্ত গান্ধী পোকা, মাজরা পোকাও চিরতরে নির্মূল হয়ে যেত।
তখনো ফসলী জমিতে বিষ ব্যবহার হতোনা। মানুষ এন্ড্রিন ব্যবহারে উৎসাহী ছিলনা। তাই প্রাকৃতিক উপায়ে পোকা মারার চেষ্টা করত। বাঁশের ছিপি দিয়ে ধানের গোছায় ঝাড়া দিয়ে, জমিতে ছাই ছিটিয়ে; ব্যাঙ ও টাকি মাছের বিস্তার ঘটিয়ে পোকা নিয়ন্ত্রণ করা হত।
তখনো ফসলী জমিতে বিষ ব্যবহার হতোনা। মানুষ এন্ড্রিন ব্যবহারে উৎসাহী ছিলনা। তাই প্রাকৃতিক উপায়ে পোকা মারার চেষ্টা করত। বাঁশের ছিপি দিয়ে ধানের গোছায় ঝাড়া দিয়ে, জমিতে ছাই ছিটিয়ে; ব্যাঙ ও টাকি মাছের বিস্তার ঘটিয়ে পোকা নিয়ন্ত্রণ করা হত।
এসব প্রাচীন পন্থায় মানুষ নিজের ক্ষেতকে পোকা মুক্ত রাখার চেষ্টা করত। তার মধ্যে অধিকতর সতর্কতার জন্য জমি বন্ধের জন্য ছিল মন্ত্র পড়ে বন্ধের ব্যবস্থা। বিষ মারার মাধ্যমে উপকারী পোকা, মাছ, ব্যঙ মরে যেত।
ফলে মশার পরিমান বেড়েছে ব্যাপক আকারে। তখন জলাশয়, জঙ্গলের পরিমান বর্তমানের চেয়েও বেশী ছিল। উপকারী প্রাণী মরে যাওয়ার পরিণতি আজ আমরা তিলে তিলে ভোগ করছি।
মণি বৈদ্য একদা একটা ভয়ঙ্কর এক ভুল করে বসেন, যেটা তার জীবনকে পুরোপুরি উলট-পালট করে দিয়েছিল। পরিতোষ মজুমদার জমি বন্ধ করতে মণি বৈদ্যকে নিয়ে যায়।
মণি বৈদ্য একদা একটা ভয়ঙ্কর এক ভুল করে বসেন, যেটা তার জীবনকে পুরোপুরি উলট-পালট করে দিয়েছিল। পরিতোষ মজুমদার জমি বন্ধ করতে মণি বৈদ্যকে নিয়ে যায়।
যথারীতি বৈদ্য চারজন সুদখোরের নাম চান। পরিতোষ চিন্তা করে কোনমতে দু’জন সুদী ব্যক্তির নাম বের করতে পেরেছিলেন। মণি বৈদ্য নিজে থেকেই বাকি দু’জন সুদখোর তথা ফণীভূষণ মজুমদার তথা ফণী মহাজন ও আতহার গনী দফাদার তথা গনী দফাদারের নাম জুড়ে দিয়ে তাঁর মন্ত্র-কর্ম শেষ করে।
পরিতোষ আরো জানতে পারে যে, মণি বৈদ্য বহুবছর যাবত এই দুই সুদখোরের নাম ব্যবহার করে এলাকার বহু মানুষের ক্ষেতের পোকা তাড়িয়ে, জনগণকে সুফলও পাইয়ে দিয়েছে!
মণি বৈদ্য জানতেন না, পরিতোষ ফণী মহাজনের বড় মেয়ের জামাই। মেয়ের মাধ্যমে এই ঘটনা ফণী মহাজনের কানে যায়। ফণী মহাজন কথাটি তার সুহৃদ আতহার গনী দফাদারকে জানায়।
মণি বৈদ্য জানতেন না, পরিতোষ ফণী মহাজনের বড় মেয়ের জামাই। মেয়ের মাধ্যমে এই ঘটনা ফণী মহাজনের কানে যায়। ফণী মহাজন কথাটি তার সুহৃদ আতহার গনী দফাদারকে জানায়।
ফণী আর গনী বাজারের দুই সেরা মোড়ল। বাজারের এক পার্শ্ব ফণীর তো অন্য পার্শ্ব গনীর। বাজার, গরুর হাট ও নদীর ঘাটে ইজারাতে সর্বদা হয় গণী, নয় ফণী।
এলাকায় ফণী-গণী কিংবা গণী-ফণীর দাপটে মানুষ এমনিতেই বেজায় ক্ষুব্ধ। ফণীরাও গণ মানুষের উপর বেজায় বিরক্ত। বাজারে টাকার দাপট থাকলেও, নির্বাচনে শত চেষ্টা করেও কোনবার মেম্বার হতে পারেন নি! তাদের দু’জনের গোস্বা গিয়ে পড়ে মণির উপর।
তাদের সোজা কথা, এই মণি বৈদ্য ভিতরে ভিতরে মানুষের ধানের পোকা তাড়াতে গিয়ে; ঘরে ঘরে তাদের নামে কুৎসা রটিয়েছেন! সে একাই গণী-ফণীর চরম সর্বনাশ করেছে। যার ফল গিয়ে পড়ে স্থানীয় নির্বাচনে। সুতরাং মণি বৈদ্য আর ইহজন্মে বাজারে উঠতে পারবে না।
তার চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি হল। সাধারণ মানুষ এসবের একটা সমাধান করার আগেই মানবেন্দ্র ত্রিপুরা ওরফে মণি বৈদ্য মনের দুঃখে সংসার সহ এলাকা ত্যাগ করে চলে যান।
পবিত্র কোরানের সুরা বাকারার ২৭৯ আয়াতে সুদকে পরিষ্কার হারাম ঘোষণা করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এটা ফৌজদারি অপরাধের মত শাস্তিমূলক।
পবিত্র কোরানের সুরা বাকারার ২৭৯ আয়াতে সুদকে পরিষ্কার হারাম ঘোষণা করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এটা ফৌজদারি অপরাধের মত শাস্তিমূলক।
ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে নাজরানের খৃষ্টানদের স্বায়ত্তশাসন দেবার সময় চুক্তিতে এ কথাটি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, “যদি তোমরা সুদি কারবার কর, তাহলে এই চুক্তি বাতিল বলে গণ্য হবে এবং আমাদের ও তোমাদের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি হয়ে যাবে”।
মূলত যে সমাজে সুদের প্রভাব ব্যাপক হয়, সে সমাজ থেকে কল্যাণ, মায়া, মততা, দান, দয়াশীলতা, উপকার চিরতরে নিভে যায়। সুদি বান্ধব প্রতিষ্ঠান বেড়ে গেলে, সমাজে জিঘাংসা, হানাহানি, কেড়ে খাওয়ার মানসিকতা বাড়ে। এসব প্রতিষ্ঠান মেকি উপকারের ভান ধরে।
যৎসামান্য যাও বা করে, তাও তাদের বিজ্ঞাপনের জন্যই করে থাকে। সুদী সমাজ প্রতিষ্ঠাকারী মানুষ যত উচ্চ শিক্ষিত ও মহান ব্যক্তি হউন না কেন। আল্লাহর অপদস্থতা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে না।
যে যত বড় সম্মানী দাবী করে, তাকে দুনিয়াতে আল্লাহ তত বেশীগুণ অসম্মানিত করেন। আল্লাহ চান না যে, তার প্রিয় বান্দারা কোন অবস্থাতেই অসম্মানিত না হউক, তাই তিনি সুদের পরিণতির বেলায়ও কঠোর।
যাতে কেউ এ পথে পা না বাড়ায়। যিনি সুদ খান, তিনি সজ্ঞানেই ইসলাম থেকে বেরিয়ে যান।


Discussion about this post