সুখ-শান্তি জীবনের উপাদান হিসেবে দুটোই মূল্যবান। দুটো কিন্তু এক বিষয় নয়। তফাৎ বুঝার জন্য, একজন খ্যাতিমান ডাক্তারের উদাহরণ পেশ করা যায়। তাঁর খ্যাতি ছিল এমন পর্যায়ে, বৃদ্ধাবস্থায়ও তার কাছে রাতদিন রোগী আসত।
সকাল আটটা থেকে অনেক রাত অবধি রোগীর দীর্ঘ লাইন লেগে থাকত। গরীব রোগী বলে, কোন ডিসকাউন্টের বালাই ছিল না। ছেলে-মেয়েরা একই ভবনে থাকত, তারা সহজে বাড়ী ছেড়ে কোথাও বেড় হত না।
ঘরে আসা প্রতিটি মেহমানকেই সন্দেহের চোখে দেখত। সকল সন্তানই ধনী কিন্তু এক একজন অমানুষ। তারা পিতার সাথে বাহিরের জগতকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। রাত বারোটার পরই তাদের ঘরে কদাকার দৃশ্যের অবতারণা হত। হায়েনার মত পিতার আহরিত টাকার বাণ্ডিল নিয়ে ঝগড়ায় মেতে উঠত। এটা প্রতি রাতের চিত্র, সারা জীবনের বেদনা।
তিনি হজ করতে চেয়েছিলেন! সন্তানেরা রাজী হয়নি! হজের একটি মাসে কত লক্ষ টাকার অপচয় হবে। বরং তিনি একটু মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে চেয়েছিলেন কিন্তু সন্তানেরা সেটাতেও বেঁকে বসেন। চেম্বারেই নামাজ পড়বেন। মসজিদে আসা যাওয়ায় যে সময় নষ্ট হবে তাতে নির্ঘাত ছয়জন রোগীর পকেট খালি করা যাবে।
বৃদ্ধ বাপের সকাল আটটার অফিস, সাতটায় চালু করার জন্য পিড়াপিড়ি করছিল! বাহ্যিক-ভাবে ডাক্তারকে ধনী, সুখী মানুষ বলে মনে হলেও, আল্লাহ তার সন্তানগুলোকেই তার জন্যই বিষাক্ত বীজে পরিণত করে দেন। এই কথা না যায় কাউকে বলা না যায় সওয়া। মানুষের এই পেরেশানির নাম অশান্তি।
ডাক্তার সাহেবের নাম, যশ খ্যাতির টাকায়, বাড়ী হয়েছে, গাড়ী হয়েছে, পাহারা দেবার দারোয়ান আছে। স্ত্রী, পুত্র-কন্যা সবাই জীবিত আছে। তাদের বিদেশী নাগরিকত্ব আছে। দেশে খ্যাতি আছে, এক নামে পরিচিতি আছে। সবই তিনি করতে পেরেছেন। এ সবই তার সুখের অংশ।
এই সুখ উপভোগ করতে দেবার জন্য সন্তানেরা বাবাকে বাহিরের কারো সাথে দেখা পর্যন্ত করতে দেন না। তার খাওয়া-পড়া, যত্নের কোন কার্পণ্য নাই। তিনি যাতে সক্ষম অবস্থায় দীর্ঘদিন ডাক্তারি করে যেতে পারেন, সন্তানদের সে চেষ্টার কমতি নেই।
চিন্তাশীল মানুষ দেখতে পায়; সন্তানদের এই সম্মান, ভক্তি আল্লাহর এক দেওয়া এক ধরনের শাস্তি। যে তরবারি শান দিয়েছিল লোভের আশায়, আল্লাহ তাকে একদিন সে তরবারির উপরই কায়দা করে বসিয়ে দেয়।
ফলে তার কাছে এই সকল সুখ একেবারেই তুচ্ছ হয়ে যায়। মানব জীবন যখন এই যায়গায় দাড়িয়ে যায়, তখন প্রতিটি ব্যক্তিই বুঝতে পারে, সুখের চেয়ে শান্তির মূল্য কত কোটি গুন বেশী।
সুখ আর শান্তি, দুটো ভিন্ন জিনিষ! দুটোই মানবজীবনের অন্যতম প্রত্যাশিত উপাদান। সুখের অভাব-উপলব্ধি বোধ সৃষ্টি হয় চিত্ত থেকে। আর শান্তি সৃষ্টি হয় আত্মার সন্তুষ্টি থেকে।
আত্মা এবং শান্তি এই দুটো উপাদান লুকিয়ে থাকে ধার্মিকতার মধ্যে। পৃথিবীতে খুব কম সংখ্যক মানুষই এই ব্যাপারে উৎসাহী।
তবে সুখের জন্য লড়াই করছে সারা বিশ্বের বিপুল সংখ্যক আদম সন্তান। মূলত চিত্তের খোরাকই সুখের অন্যতম উপাদান। ঘর-বাড়ী, দারোয়ান-গাড়ী, আসবাব পত্র, দামী ফার্নিচার, নরম তুলতুলে মেট্রেস কিংবা একটি দোলায়মান খাটিয়া সবই সুখ উপভোগের অন্যতম হাতিয়ার।
তাই অগণিত মানুষ এসব আয়ত্ত করতে অহর্নিশি চিন্তা-ধান্ধায় ব্যস্ত। ফাইনালি, প্রাসাদ্যোদ্যম বাড়ী, বিলাস বহুল গাড়ি, বিঘা বিঘা জমি, বিস্তীর্ণ ভূমি, জনপ্রিয় নেতা, লাখো-কোটি শ্রোতা, পাওয়ার পরও মানুষ সুখের দেখা পায় না। সেটা একটা মাত্র কারণেই, যার ব্যাখ্যাটা ইসলাম ধর্মে সুন্দর ভাবে দিয়েছে।
পবিত্র কোরআনের একেবারে শুরুতেই মুত্তাকী তথা সর্বোত্তম মানুষের ক্রাইটেরীয়া দিতে গিয়ে তিনটি গুনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তার শেষের গুনটি হল, “তারা তাদের উপার্জন থেকেই খরচ করে”। এই কথাটির গভীরতা বুঝার জন্য একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতে হবে।
ধরুন একজন মানুষের ব্যাংকে দশ লাখ টাকা জমা আছে। তিনি চিন্তা করলেন, যদি এই মুহূর্তে তার পনের লাখ টাকা থাকত, তাহলে উপ-শহরের রাস্তার পাশের পাঁচ কাটার প্লটটি নিতে পারত।
এতে করে যখন অবসর যাওয়া হবে, তখন সেখানে একটি বাড়ী বানিয়ে ভাড়ায় খাটিয়ে বৃদ্ধ কালের দুর্বল সময়টি পার করতে পারত। জীবনটা সুখী হত। এই ধরণের কাছাকাছি চিন্তা কম-বেশী প্রতিটি মানুষের মনে উদয় হয়। তাহলে কি করা উচিত?
প্রথমে ব্যাংক আছে। মোটা অংকের কর্জ নিয়ে কাজটি সাড়া যায়। অথবা কোম্পানি থেকে প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে দীর্ঘমেয়াদী কিস্তিতে পরিশোধ যোগ্য কর্জ নেওয়া যায়। অথবা সামান্য টাকা হাওলাত কিংবা অতি তাড়াতাড়ি দিয়ে দিবে বলে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে কোন ধনী বন্ধু থেকে ধার করা যায়।
মানুষের কাছে যখন কিছু অর্থ জমা থাকে, তখন উপরোক্ত ধারনাটি মাথায় চেপে বসে। বেশীর ভাগ মানুষ উপরের মত করে জীবন সাজাতে চায়। তাই কর্জ করে এবং দীর্ঘ মেয়াদী পেরেশানি মাথায় চাপিয়ে একটি মন্থর জীবনের যাত্রা শুরু করে।
এটি মানুষের একটি অপরিকল্পিত চিন্তার ফসল। মানুষ যখন অনর্থক কর্জ করে, তখন তার সামনের ভবিষ্যৎ দিনগুলো হতাশার গ্যাঁড়াকলে পড়ে যায়। তিনি পঞ্চাশ হাজার টাকা বেতন পেলেও মাসিক কর্জ পরিশোধ করতে গিয়ে তার জীবনটি দশ হাজার টাকা বেতনের মানুষের সমান হয়ে যায়।
সে জীবন নিয়ে সে আর তৃপ্তি পায় না। এতে হতাশা আর অবসাদ গ্রস্ততা তাকে চেপে ধরে। যদি সুদি কর্জ করে, তাহলে তো সাড়ে সর্বনাশ মাথায় তুলে নেয়।
সুদের ভিতরে যে একবার উকি মেরেছে তার জীবন থেকে প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি ধ্বংস হয়েছে। প্রথমত, সুদ খেলে কিংবা সুদ দিলে তার মাসিক আয়ে চিরস্থায়ী বরকত নষ্ট হয়ে যায়।
কোন জিনিষ থেকে যখন বরকত চলে যায়, স্বভাবত সেখান থেকে কল্যাণ উঠে যায়। যখন কল্যাণ উঠে যাবে তখন সব কিছুতেই অশান্তি ভর করবে। মানুষের খালি চোখে অকল্যাণের ধারনাটি একটু ভিন্ন।
গাড়ি এক্সিডেন্ট হওয়া, আগুন লেগে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জ্বলে যাওয়া, বন্যার পানিতে ঘর বাড়ী তলিয়ে যাওয়া, সন্তানের অকাল মৃত্যু কিংবা ব্যবসায়ের চলমান লোকসানকেই মানুষ খোদায়ী গোস্বা বলে চিন্তা করে।
ফলে তারা এসব দূর করতে পীর-ফকিকের দরগাহে যায়। মূলত এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষার নাম মাত্র। আল্লাহ যাদেরকে ভালবাসেন, তাদের জন্যও উপরোক্ত ঘটনাবলী ঘটে থাকে।
আল্লাহ ওয়ালা মানুষেরা এ ধরনের পরিস্থিতিতে ভেঙ্গে পড়েনা। তারা এতে ধৈর্য ধারণ করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়। এই পরীক্ষায় কেউ আল্লাহর কাছাকাছি হয় আর বাকীরা পীর-দরবেশের খানকায় গিয়ে পরিপূর্ণ পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে।
আল্লাহর শাস্তি দেবার অন্যতম একটি স্থান হল তার পরিবার। মানুষ পরিবারের সদস্যদের জন্যই, অন্যায় ভাবে আহরণ করে। প্রতিবেশীকে উচ্ছেদ করে। ভবিষ্যতে সুন্দর ভাবে থাকার জন্যই সুদ খায়, ঘুষ খায়, জবরদস্তি করে সম্পদ দখল করে।
আল্লাহ তার জীবনে অশান্তি দেবার জন্যই ঠিক সেখান থেকেই মর্মজ্বালা সৃষ্টি করেন। যাদের জন্য তিনি এসব সংগ্রহ করেছিলেন; তাদের দিয়ে তিনি শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে দেন।
স্ত্রী-পুত্র অবাধ্য হয়ে উঠা, পিতা-মাতা ক্ষিপ্ত থাকা, অধীনস্থরা অবিশ্বস্ত হওয়া এসবকে মানুষ খোদায়ী গজব মনে করেনা। বরং মামুলী সমস্যা বিবেচনা করে অবহেলা করে, উপেক্ষা করে।
আর এটাতেই তার অপমান জনক পতন ঘটে। ডিসি সাহেবের জন্য সিসি ক্যামরা তার অধীনস্থরাই বসিয়েছিল, তিনি এদেরকে পাত্তা দিতেন না কিন্তু সারা জনমের জন্য অপমানের কাজ তারাই করেছে।
তাহলে পরিবারে শান্তি আসার উপায়?
একটিই পথ এবং তা একেবারেই সহজ। নিজের সামর্থ্যের মধ্যে যে আয় হয়, সেই আয় থেকেই খরচ করা, সেই আয় থেকেই দান-খয়রাত করা, সেই আয়ের মধ্যে নিজের জীবনকে সীমাবদ্ধ করে রাখা। যোগ্যতানুসারে যত আয় করা যায়, সেটার মধ্যে সন্তুষ্ট থাকা।
হালাল আয় বাড়ানোর জন্য অবিরত চেষ্টাকে আল্লাহ নিরুৎসাহিত করে নি। সোলায়মান (আ) অধিক সমৃদ্ধশালী হবার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন। না, আল্লাহ এতে বেজার হননি বরং তিনি তার দোয়া কবুল করেছিলেন।
কিন্তু সুখের আশায়, সাধ্যের বাইরে গিয়ে ধার-দেনা করে, সুখী হয়ে শান্তিতে বসবাস করার ধারনাটি আল্লাহর দেখিয়ে দেওয়া পন্থা নয়। আর সুদী কর্জ করে তো নয়ই। সুদ মিশ্রিত পথে সুখ-শান্তি তো দূরের কথা। নিজের উপার্জনের ভাল দিকগুলোও বরবাদ হয়ে যায়।
নিজের আয়ের উপর সন্তুষ্টি থাকার জন্য ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তটি আমরা বহুবার শুনেছি, আজো শুনি। অর্ধ দুনিয়ার খলিফা, ওমর (রা) তাঁর শিশুপুত্রের ঈদের জামা ক্রয়ের জন্য টাকার দরকার।
তিনি বায়তুল মালের রক্ষকে কাছে লিখে পাঠালেন, এই পরিমাণ টাকাটা তার জন্য অগ্রিম দরকার। যা আগামী মাসের ভাতা থেকে কর্তন করে দেবেন। উত্তরে জানানো হল, আমি দুঃখিত আমিরুল মোমেনিন! আপনি যদি এই নিশ্চয়তা দিতে পারেন যে, আগামী মাস পর্যন্ত আপনি বাঁচবেন তাহলে আপনার জন্য এই টাকাটা অগ্রিম দেওয়া যাবে।
খলিফা জানালেন, আমি এই নিশ্চয়তা দিতে পারব না। উত্তরে জানানো হল, তাহলে এই টাকাটাও আপনাকে কর্জ দেওয়া যাবেনা। এটি একটি সাধারণ ঘটনা কিন্তু এই চরিত্রের মানুষের কথা পবিত্র কোরআনের একদম প্রথম পৃষ্ঠায় বলে দেওয়া হয়েছে,
‘যারা নিজের আয় থেকেই খরচ করে’।
তারাই মুত্তাকি এবং কোরআন তাদের জন্যই পথ প্রদর্শক। এই পৃথিবীতে এ ধরনের মানুষই প্রকৃত সুখী ও শান্তির বাহক।
তাই পৃথিবীতে সুখী হতে চাইলে নিজের বর্তমান পরিস্থিতির উপর সন্তুষ্ট থাকতে হবে। যৎসামান্য আয় আছে তা দিয়েই জীবন চালাতে হবে। যদি কষ্টকর হয়, তাহলে হালাল রুজি বাড়ানোর জন্যে চেষ্টিত হতে হবে।
হালাল রুজি অর্জন কোন কঠিন কাজ নয়। শুধু দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হয়। নিজের দুটো হাত সচল থাকলে, পৃথিবীতে ছোট-খাট প্রচুর হালাল কাজ ছড়িয়ে আছে।
যেখানে লুকিয়ে আছে সৌভাগ্য আর শান্তি।
আল্লাহ নিজেই বলেছেন, “স্বহস্তে উপার্জন কারী আল্লাহর বন্ধু”।
এই ধরনের মানুষদের স্ত্রী-সন্তানকে অনেক অনুগত ও সহনীয় বানিয়ে দেয়। এরা কখনও পরিবারের জন্য অকল্যাণকর হয়না। ধার-দেনা করে কখনও কোন ব্যক্তি স্বাবলম্বী হতে পারে না। আর সুদের মাধ্যমে কর্জ স্বাবলম্বী তো দূরের কথা নিজেকে ভাগ্যহত মানুষের সাড়িতে দাঁড় করায়।


Discussion about this post