দেশের প্রায় সকল মসজিদে ফরজ নামাজের সালাম ফিরিয়েই ইমাম সাহেব মুনাজাত শুরু করেন। সালাম ফিরানো আর মুনাজাত ধরার মধ্যে দশ সেকেন্ডের ব্যবধানও থাকেনা! এটা আহামরি এমন কোন মুনাজাতও নয়। সর্বোচ্চ চল্লিশ সেকেন্ডের মত লম্বা হয়। অতঃপর মুসল্লিদের প্রায় শতভাগই পরবর্তী সুন্নাত কিংবা নফল নামাজের জন্য দাড়িয়ে যায়!
কয়েকজন ইমামকে প্রশ্ন করেছিলাম, “আপনারা মুনাজাত ধরার জন্য এত তাড়াহুড়ো করেন কেন? মুসল্লিদের অন্তত একটু সময় দেন যাতে করে তারা তসবিহ ও আয়াতুল কুরসি পড়ে নিতে পারে! আপনারা কি ফরজ নামাজের শেষে আয়াতুল কুরসি ও তাসবীহ এর গুরুত্ব কখনও কোনদিন আলোচনা করেন না?
দেখলাম সকল ঈমামেরাই এটার গুরুত্ব বুঝেন! তাদের কথা, সাধারণ মুসল্লিরা মুনাজাত না করলে তৃপ্তি-বোধ করে না। মুনাজাত করেনা এমন ইমামদের কথাও শুনতে চায় না। তাই, শুরুতে সাধারণ মানুষের চিন্তার বাহিরে গিয়ে কিছু ঘটানো হলে, তারা যে এখন আমাদের কথা শুনছে, তখন তাও শুনবে না। তাই এটা একটা কৌশল, আগে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি করি তারপর যথাসময়ে হক কথা বলা শুরু হবে।
প্রশ্ন করলাম, যেহেতু আপনি সেটার গুরুত্ব বুঝেন তাহলে মানুষদের না জানালেও ব্যক্তি জীবনে নিজে আমল করতে দোষ কোথায়? নিজে আমল না করলে পরবর্তীতে আপনি কিভাবে মানুষদের দাওয়াত দিবেন। কয়েক ওয়াক্তে দেখলাম, আপনি নিজেই মুনাজাত পরিচালনা করে অন্য দশজনের মত নফল নামাজে দাড়িয়ে গেলেন!
আপনাকেও তো ও আমল করতে দেখিনি। বেদায়াত উচ্ছেদের নিয়তে, তার সাথে কিছুটা কম্প্রোমাইজ করতে গিয়ে নিজেই বেদয়াতের মধ্যে চুবে গেলেন! তাহলে মুসল্লিদের কবে সংশোধন করা হবে? এটা আক্রমণাত্মক আলোচনা ছিলনা। যেহেতু ইমাম সাহেব আমার একান্ত জানাশোনা, তাই তাকে এভাবে বলাটা সহজ হয়েছিল।
অতঃপর আমি নিজেই তৎপর হলাম। কিছু মানুষদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলাম। দেখলাম সবাই জানে ফরজ নামাজের পরে তাসবিহ ও আয়াতুল কুরসির গুরুত্বের কথা। তাদের দাবী ইমাম সাহেব যদি একটু পরেই মুনাজাত টা করেন তাহলে আমরা সেই আমলটা করতে পারি।
ঈমাম সাহেব যখন সালাম ফিরিয়ে নিজেই মুনাজাত ধরেন। তখন সবাই হাত তুলে বসে। মাঝপথে দু’একজন হাত না তুললে তো বিশ্রী দেখায়। কেউ আমাদের অতি আমলি নামাজি বলে টিটকারি করার সুযোগ নেয়। তাই সবাই যেহেতু হাত তুলে, আমরাও তুলি।
মূলত এটাই সত্যি কথা! মসজিদে সবাই মুনাজাতে মত্ত, মাঝপথে কেউ একজন তাসবিহ কিংবা আয়াতুল কুরসি পড়ায় ব্যস্ত থাকলে, সবাই তার দিকে তির্যক দৃষ্টিতে তাকায়। কিছু কিছু মুরুব্বী তো আক্রমণাত্মক হয়ে উঠে।
যাই হোক আমাদের সবার সতর্ক হওয়া উচিত। রাসুল (সা) ফরজ সালাতের শেষে বহু দোয়া পড়তেন। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নিচে উল্লেখ করা হল। তার আগে একটি ঘটনা তুলে ধরছি।
ফরজ সালাতের শেষেই এক ব্যক্তি উঠে দাড়াতে গেলে, ওমর (রা) তার হাত ধরে টেনে বসিয়ে দিয়ে বলেন, ফরজ শেষে তাড়াহুড়ো করো না। অতীতের সকল জাতির ধ্বংস ও অধঃপতনের মুল কারণ ছিল তারা নামাজ শেষে তাড়াহুড়ো করে বের হয়ে যেত। স্বয়ং রাসুল (সা) এ দৃশ্য দেখে বললেন, ‘ওমর তুমি ঠিক বলেছ’! আশ্চর্যজনক সত্য হল আজ আমরা তাই করছি।
রাসুল (সা) নামাজের শেষেই তিনবার ‘আসতাগফিরুল্লাহ’ পড়তেন। এটা এ কারণেই, বান্দাহ যাতে তার আন্তরিক অনুভূতি প্রকাশ করে এই মর্মে যে, “আল্লাহ! তুমি আমার নিকট যে ধরনের সালাত প্রত্যাশা কর, সে মানের সালাত আমি করতে পারিনি।
তাই আমায় ক্ষমা করো, আমার ত্রুটি মাফ করো, আমার গাফিলতি স্বীকার করছি তুমি আমায় রক্ষা করো”। মানুষের মনে বারে বারে যাতে এই চেতনা কাজ করে সেজন্য আসতাগফিরুল্লাহ। এখন এই অনুভূতি প্রকাশ তো দূরের কথা, হঠাৎ মুনাজাত ঢুকিয়ে দিয়ে চিন্তাটাকেই অপহরণ করা হয়। আল্লাহ এসব ইমামদের সাহস ও প্রজ্ঞা দিন এবং এবং তাদের দুর্বলতা ক্ষমা করুন।
আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা) যখন নামাজের সালাম ফেরাতেন, উচ্চস্বরে বলতেন-
“আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই; তিনি একক, তার কোন শরিক নেই, রাজত্ব তারই এবং তারই সব প্রশংসা। তিনি সর্বশক্তিমান। আল্লাহর ব্যতীত আমাদের কোন সাহায্যকারী নেই, কোন উপায় ও শক্তি নেই। আল্লাহ ব্যতীত মাবুদ নেই। আমরা তাকে ব্যতীত আর কাউকে সেজদা করি না। তারই নেয়ামত, তারই অনুগ্রহ, তারই জন্য উত্তম প্রশংসা। আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই।” -সহিহ মুসলিম শরিফ
আবু হুরায়রা (রা.) হতে থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“যে ব্যক্তি প্রত্যেক নামাজের পর ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৩ বার আল্লাহু আকবার পাঠ করবে আল্লাহ তার সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন, যদিও গোনাহ সমুদ্রের ফেনা পরিমাণ হয়।” –সহিহ মুসলিম
এই হাদিসটি সবার মুখে মুখে,
“যে ব্যক্তি প্রতি ফরয নামায শেষে আয়াতুল কুরসি পড়ে, তার জান্নাতে প্রবেশ করতে মৃত্যু ছাড়া কোন কিছু বাধা হবে না”।
এবার আসুন নামাজের পরে মুনাজাত নিয়ে,
আবু বাহিলি (রা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) জিজ্ঞাসা করা হলো, কোন সময় দোয়া কবুল হয়? তিনি বললেন, ‘শেষ রাতে এবং ফরজ নামাজের পর।’ –সুনানে তিরমিজি
লক্ষণীয়, আরবি মুনাজাত শব্দের অর্থ হল ‘কানে কানে কথা বলা’। অন্যভাবে চুপি-চুপি, ফিস-ফিস, একাকী একান্তে আলাপ চারিতা। ফরজ সালাতের পর দোয়া কবুলের জন্য যে মুনাজাতের কথা বলা হয়েছে, সেটা হল নিজের একান্ত মুনাজাত। সময় নিয়ে বসে আল্লাহর কাছে একান্তে নিজের সমস্যাগুলো তুলে ধরে, তাঁর সাহায্য চাওয়া। এখানে সম্মিলিত মুনাজাতের মাধ্যমে করতে বলা হয় নি। রাসুল (সা) প্রায় ১৭টি স্থানে সম্মিলিত মুনাজাত করেছেন সেটা ভিন্ন বিষয়। আলাদা কোন এক সময়ে লিখা হবে, ইনশায়াল্লাহ।
রাসুল (সা) সারাজীবনে কোথাও ফরজ নামাজের শেষে সম্মিলিত মুনাজাত করেছেন এমন দলীল পাওয়া যায় নি! অথচ সুন্নাতের নামে আমরা সেটাকেই কঠিন ভাবে আঁকড়ে ধরেছি। .
এটা তাঁর উপর বদনাম! আর রাসুল (সা) সালাতের পরে সারাজীবন যে আমল কোনদিন ছেড়ে দেন নি! আমরা সজ্ঞানে সেটাকেই ছেড়ে দিয়েছি! এটা তার প্রতি অবহেলা। আসুন সবাই, সত্য অনুসন্ধান করি এবং সেভাবে জীবন গড়তে চেষ্টা করি।

Discussion about this post