সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদ আজ চরম ঝুঁকির মাঝে। তিনি মরণাপন্ন। যে কোন মুহূর্তে বিদায় ঘণ্টা যেতে পারে। আমাদেরও হতে পারে। অনেকে তার কর্মকাণ্ডের উপর বিরক্ত। যথেষ্ট কারণ আছে। ফেসবুকের চালচিত্র দেখে বুঝা যায়, তার মৃত্যু সংবাদ অনেক কে আহ্লাদিত করবে, অনেকে হাস্য রসাত্মক ট্রল করবে। কেউ মোক্ষম সময়টির জন্য অগ্রিম পোষ্ট বানিয়ে রেখেছেন। যাতে করে তার সতীর্থদের প্রতি তীব্র ঘৃণা আর উপহাসের বান মারা যায়।
১৯৮২ সালে প্রেসিডেন্ট এরশাদ যখন ক্ষমতা দখল করে, আমি তখন দশম শ্রেণির ছাত্র। তার ক্ষমতার কালে আমাদের শিক্ষা জীবন শেষ হয়। উত্তাল তারুণ্যের দিনগুলো তার শাসনামলে কাটিয়েছি। স্বৈরাচার এরশাদের জুলুম নির্যাতন যখন চরমে তখন আমাদের কলেজ জীবন শেষের দিকে। ফলে তার বিরুদ্ধে সংঘটিত সকল প্রতিবাদ মিছিলে অন্যদের মত আমরাও সহযোদ্ধা ছিলাম। অন্যদের বলতে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৫ দল, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দল ও জামায়াত মিলে যুগপৎ আন্দোলন করেছে। আওয়ামী জোট ও বিএনপি জোটের ছাত্র সংঘটন মিলে ২২ দলীয় ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। আলাদা ভাবে যুক্ত থাকে ছাত্র শিবির।
প্রেসিডেন্ট এরশাদের জাতীয় পার্টির বরাবর দুর্বল অবস্থানে ছিল, তার কোন ছাত্র সংগঠন ছিলনা। বানাতে চেষ্টা করেছে, বারে বারে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে তিনি অপরাপর ছাত্র সংগঠন গুলোর মাঝে মারামারি ও ছাত্র সংঘাত লাগিয়ে রাখত। এতে তার দল নিরাপদ বোধ করত। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ভয়ঙ্কর লড়াই শুরু হত। মনে হত এসব যেন এক মিনি ক্যান্টনম্যান্ট। সবচেয়ে বেশী সংখ্যক ছাত্র এরশাদের আমলেই হতাহত হয়। ফলে তার ক্ষমতার শেষ দিকে, সকল বিরোধী দল প্রায় এক কাতারে চলে আসে। জনসমর্থন হীন একটা দুর্বল সরকারকে হঠাতে দেশের সকল শক্তি এক হয়েও, তাকে টলাতে অনেক কষ্ট হয়েছে। এটা বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ।
আমাদেরকে চট্টগ্রাম শহরে যেতে হলে, শহরের আতুরার ডিপো পার হয়ে যেত হত। সেখানে ছিল ট্যানারি। রাস্তার পাশেই চামড়া কারখানা, রাস্তাতেই চামড়া শুকানো হয়। বাসে করে এই জায়গা পাড়ি দেবার সময় আমার বমি হয়ে যেত। ফলে বমি ধরে রাখার জন্য পলিথিন ব্যাগ সাথে রাখতে হত।
যখন ছাত্রজীবন শেষ হয়ে যায়, তখনো এরশাদ ক্ষমতায়। আন্দোলন তুঙ্গে। রাতদিন কারফিউ, দিনের পর দিন। সারা শহর ভূতুরে নগরীতে পরিণত হয়। তারপরও সাহসী যুবকেরা চূড়ান্ত ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নামত। প্রতিবাদ মিছিলের কোন সময় নাই, যখনই কোন মিছিল নামত, সে মিছিলে যোগ দিতাম। কার মিছিল, কোন দলের মিছিল সেটা ভাবা-ভাবির সময় নাই। সারা দেশের প্রতিটি শহরেরই দৃশ্য এমন। ঢাকায় নূর হোসেনের মৃত্যুতে ছাত্র-জনতা রাস্তায়। তার উপরে ডা. মিলন নিহত হলে সরকার সারা দেশে নিয়ন্ত্রণ হারায়। রাস্তায় যে নেমেছে অথচ পুলিশী নির্যাতন, বিডিআরের লাটির আঘাত খায়নি এমন তরুণ খুবই কম।
পুলিশ বিডিয়ারের চোখে পড়ে যাই। শহরের পরিচিত এলাকা থেকে পালাতে হবে। পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিলাম, ছিন্নমূল বস্তিবাসীদের ওখানে। সেখানে বিপদ আরো বেশী। সবাই যেন গুপ্তচর। লুকাতে আশ্রয় পেলাম ট্যানারির ভিতরে। সেই ট্যানারি যার পাশ দিয়ে গেলেই বমি আসে। এখন সেখানে বসবাস করছি। দেখলাম অবলীলায় এখন খানাও খেতে পারছি! বিপদে পড়ে অভ্যাস রপ্ত হয়েছে। আমি আজিবন এই ব্যক্তিকে ঘৃণা করেছি কিন্তু মৃত্যুর এই কঠিন সময়ে নয়।
গ্রামের মা-বাবা কেউ জানেনা, তরুণেরা কতটুকু রিস্ক নিয়ে লড়ছে। আমিও তাদের সহযোদ্ধা। কারণ একটাই এরশাদ মুক্ত বাংলাদেশ চাই। কল্পনায় ছবি আঁকতাম এরশাদ মুক্ত ভিন্ন আরেকটি বাংলাদেশের ছবি। যে সমাজে জুলুম থাকবে না, হানাহানি থাকবে না, রাষ্ট্রীয় লুণ্ঠন থাকবে না, মারামারি, হানাহানি চিরতরে মিঠে যাবে, ছাত্ররা নির্ভয়ে লেখাপড়া করতে পারবে। মানুষ দলীয় প্রভাব মুক্ত চাকুরী পাবে (যদিও তখন সহনীয় ছিল) ঘুষ থাকবে না, দুর্নীতি থাকবে না, শোষণ থাকবে না, কড়া শাসন থাকবে না।
অত্যাচারী হাজ্জাজ বিন ইউসুফের জুলুমের প্রতিকার চাইতে এক ব্যক্তি বিখ্যাত তাবীঈ হাসান আল বসরী (রঃ) কাছে এসেছিলেন। তিনি বললেন, আজকের দিনটি সুন্দর ভাবে কাটাতে পারার জন্য শোকরিয়া করো। দিন যেটা চলে যায়, সেটা ভালই, মন্দ দিনটি হল আগামী কাল।
এখন ভাবী একটি সুন্দর বাংলাদেশের প্রত্যাশায় যেভাবে লড়েছি, তার পুরোটাই ভুল ছিল। চোখের সামনে জ্বলন্ত সাক্ষ্য যে, এরশাদ মুক্ত যে রাষ্ট্রের কথা ভেবে আমরা লড়েছিলাম তা সবই পণ্ডশ্রম, ব্যর্থকাজ। কেননা এরশাদ পরবর্তী ত্রিশ বছরের জমানাকে যেভাবে দেখছি তা এরশাদের জমানার চেয়ে উত্তম হয়নি। অনেক স্থানে উন্নতর বিবেচনায় সমানও হয়নি। অনেক দ্বিমত করবে কিন্তু দেশের অবস্থা বহুলাংশে বর্তমানের চেয়ে ভাল ছিল। সকল মুসলিম দেশ গুলোর সাথে সর্বাধিক ভাল সুসম্পর্ক সৃষ্টি হয়। দেশ উপকৃত হয়। প্রবাসে মানুষ যাবার স্রোত সৃষ্টি হয়।
তাই তার অসুস্থতা নিয়ে আমরা যাতে ট্রল না করি। তাকে তার কর্মের উপর সোপর্দ করি। যে ব্যক্তি যতটা আমল করে তার ততটা ফল সে ভোগ করবে। আমরা যাতে আমাদের কদাকার চিত্র তুলে ধরে নিজেদের মধ্যে হিংসা না বাড়াই। নিজেদের হিণমন্যতা প্রকাশ না করি। সবাইকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। পৃথিবীর জীবনে সবচেয়ে ঘৃণিত, চরম শত্রুর, জানের শত্রুর দশা কবরে কেমন হবে সেটা যদি দুনিয়ার কেউ দেখত। তাহলে সে ব্যক্তি গোস্বা ভুলে উল্টো তার ক্ষমা ও মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকত। আসুন আজকের সুন্দর দিনটার জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা করি, আগামী কালের সম্ভাব্য মন্দ দিনের ক্ষতি হতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।

Discussion about this post