অকর্মণ্যতা একটি চরিত্রগত ও সামাজিক ব্যাধি। শিক্ষিত, অশিক্ষিত, ধনী, দরিদ্র যে কেউ অকর্মণ্য হয়ে যেতে পারে। কোন ভদ্র লোকের ঘরে অকর্মণ্য সন্তান জন্ম নিলে, অচিরেই সেই পিতার মেজাজ তিরিক্ষি হবে। ভদ্র লোকের মুখের ভাষাও বিশ্রী হতে পারে। এমন সন্তানের অভিভাবক হবার বেদনায়, স্বামী স্ত্রীকে দোষ দিবে, স্ত্রী স্বামীকে দোষারোপ করে। কারো সংসার জীবনে স্বামী কিংবা স্ত্রী একজন অকর্মণ্য হলে, তার জীবন রসাতলে যায়। স্বামী-স্ত্রী দুজনই অকর্মণ্য হলে, তাদের হাত লম্বা হবার অভ্যাস গড়ে উঠে, কদাচিৎ চুরি বিদ্যাতে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। এ ধরনের কেউ কারো প্রতিবেশী হলে তিনিই বুঝতে পারে সমাজে বসবাসের কত জ্বালা।
অকর্মণ্য মানুষ সর্বদা উপদেশ দিতে থাকে, এটাই তার প্রধান সম্বল। অকর্মণ্য স্বামীর উপদেশ বাণীর অন্যতম লক্ষ্য হল তার স্ত্রী! যাতে করে সে ক্ষিপ্ত হয়ে না উঠে এবং যেভাবেই হোক তার সাথে সংসার করতে লেগে থাকে। দরিদ্র অকর্মণ্য সহজে স্ত্রীকে নিপীড়ন করেনা কিন্তু তাকে সর্বদা মানসিক চাপে রাখে, যেন আশে পাশের প্রতিবেশীর ফরমায়েশ মেনে কিছু দানা-পানির ব্যবস্থা করতে পারে।
গ্রাম্য চায়ের দোকানে কিংবা কোন সমাগমে বসলে অনেক দামী কথা বলতে থাকে। এসব কথা সে শিখতে থাকে। যাতে করে মানুষ তাকে অধিক বুঝের মানুষ হিসেবে ভাবতে থাকে। এসব মানুষ সর্বদা কপাল ও ভাগ্যকে দোষারোপ করে। ঐ কারণে সে সফল হবার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেও আছড়ে পড়েছে। ওর অসহযোগিতার কারণে তার অত বড় সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। এই আপনজন যদি তাকে একটু সহযোগিতা করত তাহলে আজ সে কোটিপতি হিসেবে থাকত। এটাই তার বক্তব্যের মূল বিষয়। একটু তুচ্ছ সহানুভূতির জন্যই অকর্মণ্য মানুষ এসব কথা বলে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকে নিবদ্ধ রাখে।
অকর্মণ্য মানুষ নিজের প্রয়োজনকে খুব বড় করে দেখায়। অন্যের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেয় না। সে জন্য এসব মানুষকে কাজের উপযোগী করা কঠিন। এদের কোন কাজ দিয়ে, তা আদায় করাও বিরক্তি জনক। এরা নিজেকে গড়ার জন্য বড় স্বপ্ন দেখতে পারেনা, সে জন্য উচ্চবিত্তদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। যে ব্যক্তি নিজের চেষ্টায় বড় হয়েছে, অকর্মণ্যরা তাকে উপহাস ও ঘৃণা করে। একজোড়া স্যান্ডেল, একটি মাপলার কিংবা গেঞ্জির মত ছোট্ট প্রয়োজন টুকু নিজের চেষ্টায় পূরণ করতে পারেনা। বিপরীতে একটি ক্ষুদ্র জিনিষের জন্য কারো কাছে হাত পাততে লজ্জিত হয়না। নিজের সখের জিনিষটা পাবার ক্ষেত্রে এরা চাতুরী করে। অভুক্ত স্ত্রী-পুত্র, অসুস্থ পিতা-মাতা এদের কাছে দ্বিতীয় সাড়ির বিষয়। ব্যক্তিত্ব-হীনতা অকর্মণ্য মানুষদের ঘেরাও করে রাখে, ফলে এরা পুত্র-কন্যার জমানো ঈদির টাকা দিয়ে গোপনে বিড়ি টানতেও দ্বিধা করেনা।
অকর্মণ্য মানুষ কাজকে ভয় পায়। এই সমস্যা যতটা না সামাজিক তার চেয়েও বেশী পারিবারিক। পিতা-মাতা অনেকাংশে দায়ী। বাচ্চাদের কাজ না করানোর বাজে ফল হল এই অকর্মণ্যতা। শিশুদের আদর করে খাইয়ে পুতুলের মত স্বভাব বানানো, শুধুমাত্র লিখা-পড়া করাটাই শিশুদের কাজ এই মনোভাব সৃষ্টি করা, ঘরের কাজ কাজের বুয়া করবে, বাজার টানবে বাবা! গাড়ীর মালামাল নামিয়ে দেবার দায়িত্ব রিক্সাওয়ালার। এভাবে কাজের শ্রেণীবিভাগ বানাতে গিয়ে নিজ সন্তানের জন্য কাজ রাখা হয়নি। এসব সন্তান উচ্চ শিক্ষিত হলেও, নিজের প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারে না। পাশ্চাত্য দেশ সমূহে ছাত্রদের কাজ শিখানোর জন্য আলাদা করে ফি দিতে হয়। অথচ আমাদের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমরা শিশুদের কাজ থেকে দূরে রাখি। পরিণতিতে তাদেরকে ক্ষুদ্র একটি কাজের জন্য কারো সহযোগিতার জন্য হাত পাততে হবে। এটাও এক ধরনের অকর্মণ্যতা।
ঠোটে করে বয়ে আনা খাদ্য, ছানাদের খাইয়ে দিতে, মা পাখীদের এমন আদরণীয় দৃশ্য আমরা বহুবার দেখেছি। কিন্তু আমরা এমন দৃশ্য খুব কমই দেখেছি যে, মায়ের ঠোটে বয়ে আনা খাদ্য বাচ্চাদের দেখিয়ে, ঘ্রাণ লাগিয়ে, ক্ষিদের প্রকোপ বাড়ীয়ে, তাদের সবার ঠোট হা করিয়ে, মা পাখির আনিত সেই খাদ্য নিজেই খেয়ে নিয়েছে! হ্যাঁ শিশুদের একটা বয়সে মা পাখি এই কাজ করে থাকে। মা পাখি বুঝিয়ে দেয়, এখন বড় হয়েছে, বাঁচতে হলে নিজেদের খাদ্য নিজেরা যোগাড় করে খাও। এতে শিশু পাখিরা ক্ষিপ্ত ও অপমানিত হয়, পরিশেষে নিজেরাই খাদ্যান্বেষণে বেরিয়ে যায়।
প্রায় একই ধরনের শিক্ষা স্বয়ং আল্লাহ আদম (আ) কে দিয়েছিলেন। জান্নাতে তিনি পরম সুখে ছিলেন কিন্তু দুনিয়াতে আসার পরে নিজের জীবন ও সন্তানদের বাঁচানোর তাগিদে তিনি কৃষি কাজ সহ যাবতীয় কাজ করেছিলেন। জান্নাতে থাকাবস্তায় আল্লাহ তার স্বীয় কুদরতে তাঁকে সকল কাজ শিখিয়েছিলেন। তিনি আমাদের পিতা, তিনি যেভাবে তার সন্তানদের পালন করেছিলেন, আমাদেরকে তা হুবহু অনুসরণ করা জরুরী। তাও যদি না পারি তাহলে অন্তত প্রকৃতি ও পশু-পাখিদের দেখে হলেও যেন শিখি। আসুন আমরা সন্তানদের কর্মঠ ও কর্মমুখী করি। নিজের কাজ নিজেরা করি এবং সকল ধরনের কাজে জড়িয়ে পড়ি।

Discussion about this post