জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে মানুষ সর্বদা পাপে লিপ্ত। চোখ, কান, মুখ, কণ্ঠ, পাদচারণা ও চিন্তায় এসব পাপ কামিয়ে থাকে। মুমিন যখন ওজু করে তখন তার পাপ খসে পড়ে। না সকল পাপ নয়! অকৃতজ্ঞ, প্রবঞ্চক, আল্লাহ দ্রোহীর পাপ এভাবে ক্ষমা হয়না। সে জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে পূর্বের কাজ থেকে ফিরে আসতে হয়। পুনরায় সেটি না করার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হয়। কুলসিত সমাজের সর্বত্র পাপের উপাদান বেশী। তাই এ সমাজের ভিতরে চলতে গিয়ে মানবিক দুর্বলতা কিংবা নিজের অজান্তে বহু পাপ যোগ হতে থাকে। সর্বাধিক সচেতন মানুষও এ থেকে মুক্ত থাকতে পারে না!
কেউ বলতে পারে, তিনি কেন ক্ষমা চাইবেন? তিনি তো পাপ করেন নি! এটা অহংকার, দাম্ভিকতা ও অজ্ঞানতার লক্ষণ। এ কারণেই যে, তিনি জানেন না, তার সৃষ্টির পিছনে কত ম্যাকানিজম কাজ করেছে। সে দুনিয়াতে আসার পিছনে, আল্লাহর স্বদিচ্ছা, আগ্রহ ও দয়া কত বড় ভূমিকা রেখেছে। মূলত, আল্লাহর কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে নিজের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ, দুর্বলতা স্বীকার ও আনুগত্যের প্রমাণ করে। ফলে বারে বারে ক্ষমা চাওয়ার প্রবণতা মানুষকে কৃতজ্ঞ, মহৎ করে তুলে। সারা জীবনে জ্ঞাতসারে একটি দোষ, কিংবা পাপ না করার পরও, রাসুল মোহাম্মদ (সা) দৈনিক কম করে সত্তর বার আল্লার কাছে ক্ষমা চাইতেন! আর সে কারণেই জগতে তিনি সর্বাধিক বেশী সম্মানিত।
প্রশ্ন আসতে পারে, এই ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে সুখী ও সমৃদ্ধশালী হবার কি সম্পর্ক আছে? মূলত, দুনিয়াবি জীবনে মুমিনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আখিরাত। সর্বক্ষেত্রেই তারা আখিরাতকে প্রাধান্য দেয়। তারপরও তাদেরকে এই দুনিয়াবি জীবনে মানুষের সাথে, তাদেরই সমাজে চলতে হয়। তাদেরও চাহিদা আছে, অভাব আছে, একটি সুন্দর মন আছে। অন্যদের মত চিত্তের তাগিদে তারা যখন যা ইচ্ছা তা করতে পারেনা। এই সীমাবদ্ধতার করণে, তাদের এসব ইচ্ছা আল্লাহ নিজ থেকে পূরণ করে দেন। যদি তারা ক্ষমা চাওয়ার অভ্যাসে জীবনকে গড়ে তুলে। পবিত্র কোরআনে দুনিয়াবি চাহিদা ও সমৃদ্ধি অর্জনের কথা যেখানে বলা হয়েছে, সেখানেই ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেখানেই আল্লাহ নিজেকে অধিক দয়ালু হিসেবে ঘোষণা করেছেন! অর্থাৎ তোমরা ক্ষমার মাধ্যমে সাহায্য চাও, কোন প্রচার প্রশ্ন ব্যতিরেকে দিয়ে দেওয়া হবে।
ওমরের (রা) জমানায়, অনাবৃষ্টি হেতু তাঁকে, দোয়া করতে বলা হলে, তিনি লম্বা দোয়া করলেন। এক সাহাবী প্রশ্ন করলেন, “হে আমীরুল মুমীনিন, আপনি তো শুধু ক্ষমাই চাইলেন! বৃষ্টির জন্য তো দোয়া করলেন না?” ওমর (রা) বললেন, “আমি আসমানের সেই সব দরজার কড়া নাড়িয়েছি, যেখান থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হয়।” বলেই তিনি কোরআনের এই আয়াত পড়ে শোনান। “তোমরা নিজেদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা চাও। নিঃসন্দেহে তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল। তিনি আকাশ থেকে তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষাবেন। সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন। তোমাদের জন্য বাগান সৃষ্টি করবেন আর নদী-নালা প্রবাহিত করে দিবেন।” সুরা নুহ : ১০-১২
হাসান আল বসরী (র) কাছে এক ব্যক্তি অনাবৃষ্টি, আরেক ব্যক্তি দরিদ্রতা, আরেক ব্যক্তি ফসল হানির কথা তুললে তিনি সবাইকে আল্লার কাছে ক্ষমা চাইতে বললেন! সবাই আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলেন, সকল সমস্যারই এটাই একমাত্র সমাধান? তখন তিনিও সুরা নূহের উপরের আয়াত সমূহ ও সুরা হুদের এই আয়াত গুলো শুনিয়ে দেন, “তোমরা যদি তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তাঁর দিকে ফিরে আস তাহলে তিনি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তোমাদের উত্তম জীবনোপকরণ দান করবেন।” হুদ-৩
তাই আসুন, প্রতিনিয়ত আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলি, নিজের চরিত্রকে বদলিয়ে ফেলি, আল্লাহকে খুশী করি, আপনাকে রক্ষা করি এবং নিজেও অন্যকে ক্ষমা করার মানসিকতা সৃষ্টি করি। ক্ষমা হল আল্লাহ প্রদত্ত গুন, এটা অর্জন করতে হলে, প্যাকটিস করতে হয়। আর সেজন্য দরকার, ক্ষমার বিপরীত বদগুণ হিংসা, ঘৃণা ও ক্রোধকে চিরতরে না বলা। কেননা, কারো হৃদয়ে দুটো বিপরীত ধর্মী গুন কখনও একসাথে অবস্থান করতে পারেনা।

Discussion about this post