বরশীতে খাদ্য গেঁথে পানিতে ফেলে, মাছের খোঁটের আশায় একনিষ্ঠ চিত্তে দীর্ঘ অপেক্ষায় বসে থাকার নাম ধৈর্য নয়। আবার কিছু না করে সুযোগের অপেক্ষায় বসে থাকার নামও ধৈর্য নয়। ধৈর্য হল প্রকৃত সফলতা না আসা পর্যন্ত, একনিষ্ঠ মনে এক ধ্যানে চেষ্টা-প্রচেষ্টার মাধ্যমে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো।
জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল আকাঙ্ক্ষিত কিছু একটার অভাবই মানুষকে ধৈর্যশীল বানায়। শিশুদের কোন আবদার চাওয়া মাত্রই পূরণ করতে নেই। চাওয়া-পাওয়ার এই হিস্যার মাঝেই শিশুদের ধৈর্য ধরার চরিত্র গড়ে তুলতে হয়। যদি করা না হয়, তাহলে সেই শিশু কোনদিনই ধৈর্যশীল হয়না। পিতা-মাতার জন্য অচিরেই বোঝা হয়ে উঠবে। চাওয়া ও পাওয়ার মাঝে নাটকীয়তা তৈরি করতে হয়। শিশু যাতে উপলব্ধি করতে পারে, এই পাওয়াটা অনেক কষ্ট করে অর্জিত হয়েছে।
এই পৃথিবীর যত অভিনবত্ব, যত আবিষ্কার একদল ধৈর্যশীল মানুষের হাতেই হয়েছে। শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত, ধনী কিংবা দরিদ্র যে কোন ব্যক্তিই যদি ধৈর্যশীল হয় তাহলে তার জীবনে চরম সাফল্য আসবেই। হিটলারকে আমরা একনায়ক হিসেবেই চিনি কিন্তু সে ছিল ধৈর্য ধরার এক চূড়ান্ত প্রতীক।
রাস্তায় রুটি কুড়িয়ে নিঃস্ব যে ছেলেটি জীবন ধারণ করত, একটি টাকার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াত। সে ছেলে ১৯১৯ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জাতিকে মাত্র বিশ বছরের মাথায় আবারো বিশ্বশক্তিতে রূপান্তরিত করে তুলে। অতঃপর ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়।
সে যদি যুদ্ধ জিতে নিত, তাহলে ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত। ধূলায় ভূলুণ্ঠিত একটি জাতিকে সংক্ষিপ্ত সময়ে দাঁড়াতে শিখিয়েছিল এই ব্যক্তি। হিটলারের এই প্রবল মনোবল ও বিপুল শক্তি সৃষ্টি হয়েছিল শুধুমাত্র একনিষ্ট ধৈর্যের কারণে।
কল্পিত চিন্তায় যুবকের মনে দৃঢ়তা এসেছিল, বিদ্যুৎ দিয়ে বাতি জ্বালানো যাবে। একে একে বিরাশীটি পরীক্ষায় ব্যর্থ হবার পর বন্ধুরা বলল, “ব্যস! যথেষ্ট হয়েছে, এবার ছাড়! এত পরীক্ষা ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে তুমি বুঝতে পেরেছ যে, বিদ্যুত দিয়ে কোনদিন বাতি বানানো যায় না।“
উত্তরে যুবক বলেছিল, “আমি বিরাশিটি পরীক্ষার কোনটাতেই ব্যর্থ হয়নি! বরং আমি শিখতে পেরেছি, যে জিনিষ আমি সৃষ্টি করতে চাচ্ছি, সেটি এসব জিনিষ দিয়ে হবে না!” নাম তার টমাস আলভা এডিসন।
তিনি আরো বহু পরীক্ষার মাধ্যমে অবশেষে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালাতে পেরেছিলেন। পুরা দুনিয়া আলোকিত হয়েছে এডিসনের এই কীর্তির মাধ্যমে। এডিসন যদি ধৈর্যশীলতা গুন না থাকত, তাহলে বিশ্ববাসীকে আরো বহু কাল অন্ধকারে থাকতে হত। জীবন চলার পথে যে কোন একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে যদি মানুষ ধৈর্যের সাথে লেগে থাকে সে সফল হবেই।
মানব জীবনের সর্বোৎকৃষ্ট গুনের নাম ধৈর্য। পবিত্র কোরআনের পরতে পরতে ধৈর্যের কথা বর্ণিত আছে। একটি সফলতা অর্জনের কথা বলতে গিয়ে আল্লাহ বলেছেন, “…ধৈর্যশীল ছাড়া এ গুণ আর কারো ভাগ্যে জোটে না এবং অতি ভাগ্যবান ছাড়া এ মর্যাদা আর কেউ লাভ করতে পারে না”। হামিম সিজদা-৩৯।
কোরআনে ধৈর্যশীল মানুষকে ভাগ্যবান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মানব চরিত্রে ধৈর্য এমন একটি উপাদান, দুনিয়ার লালসায় কেউ যদি ধৈর্যশীল হয় সেও সমৃদ্ধশালী হয়। আর মুসলমানেরা সারা জীবন, হালাল-হারাম বাছাই করে, আজীবন নামাজ-রোজা করতে থাকে, পরকালে জান্নাত পাবার আশায়। এটা হল চরম ধৈর্যের আত্মবিশ্বাসী উদাহরণ।
মুহাম্মদ (সা) কে আল্লাহ ধৈর্যশীল মানুষ হিসেবে প্রশংসা করেছেন। সংক্ষিপ্ত সময় ইসলামের আলোকে বিশ্বময় করার অন্যতম হাতিয়ার ছিল এই ধৈর্য। তাই আসুন, আমরা সন্তানদেরকে কে ধৈর্যশীল বানাই। কোথাও একবার ব্যর্থ হলে বার বার করার জন্য উৎসাহ দেই।
একবার ফেল করলে পরের বারে দেবার মত মানসিকতা সৃষ্টি করি। পড়া একবার মুখস্থ না হলে পরের বারে, অংক মাথায় না আসলে বারে বারে চেষ্টা করার জন্য উৎসাহ দিই। ধৈর্যের গুন ও যোগ্যতা কারো কাছে না থাকলে পরিবারে সে সহনীয় হয়না, উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারেনা, সে আত্মহত্যা প্রবণতার মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠে। এক ধ্যানে সিগারেট পানও সেভাবে আত্মহত্যা এবং এটি ব্যক্তি জীবনে অধৈর্যের লক্ষণ।

Discussion about this post