বাহাউদ্দীন-শাহীনুর দম্পতির সংসারে আগুন বিয়ের পর থেকেই। গরীব ঘরের মেধাবী সন্তান বাহাউদ্দীন ডাক্তার, এখন অনেক অর্থ সম্পদের মালীক। একদা ভাইয়েরা বাজারে পাটি, মাদুর বিক্রি করে এক ভাইকে পড়িয়ে ডাক্তার বানিয়েছেন। কাবিন
শাহীনুরের মাতা-পিতা ধনী ও উচ্চশিক্ষিত। বাহাউদ্দীন লজিং থাকতেন শাহীনুরের চাচার বাড়ীতে। সে হিসেবে তাদের পরিচয়। অসম্ভব মেধাবী ও অমায়িক বাহাউদ্দীন শাহীনুরের জন্য বিয়ের প্রস্তাব দেন। পিতা-মাতা শুধুমাত্র মেধা ও ডাক্তারী পজিশন যাচাই করেই মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেন। সাথে চিন্তা করে কষিয়ে, কায়দা করে বসিয়ে দেন পঁচিশ লাখ টাকার কাবিন।
স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সমাজে ওদের অনেক সন্মান-সুখ্যাতি। বাহিরের মানুষ দেখে তাদের অর্থকড়ির অভাব নেই কিন্তু তাদরে মনের ভিতরে জ্বলছে দাউ দাউ আগুন। সমস্যা হল তাদের মধ্যে রুচির মিল নাই, এক জনের কাছে যেটা দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী, অন্য জনের কাছে সেটা হিনমন্যতা।
স্বামীর দৃষ্টিতে যে কাজ উপকারী, স্ত্রীর দৃষ্টিতে সেটা লোক দেখানো ছোটলোকি কাজ! স্ত্রী বলেন, দুলাভাই দাওয়াত করেছেন, তিনি সরকারী বড় কর্মকর্তা, আরো মেহমান আসবে, কোট টাই পরে তৈরী হও। আমাদের অর্থকড়ি আছে কিন্তু তুমিতো গাড়ী কিনতে রাজী নও।
যাক, সেটা বুঝতে দেবার দরকার কি একটি কার ভাড়া করে নাও। সবাই মিলে একসাথে যাই। স্বামী বলেন, এতকিছুর দরকার কি? তাদের বাসার সামনে কি বেবী টেক্সি, রিক্সা থামেনা? আমরা সবাই তিনটা রিক্সাতেই যাব। টাকা থাকলেই কি খরচ করতে হবে! পকেটের টাকা কি শরীর কামড়ায়? টাকা বেঁচে থাকলে আমাদেরই থাকবে।
শাহিনুরের সাফ কথা, বাকি জীবনেও আমি তোমার সাথে কোথাও বের হবনা। মন্তব্য করে কিপটা, অসমাজিক মানুষকে বিয়ে করেই যেন নরকে ঢুকেছি। তোমার কি টাকার এতই অভাব যে, একটি কার ভাড়া করলে তুমি গরীব হয়ে যাবে। দশজন মানুষ কিভাবে চলে তা দেখতে পাওনা?
ব্যস! লেগে গেল ঝগড়া। স্ত্রী বুঝেনা স্বামীর মন, স্বামী বুঝেনা স্ত্রীর মন, ফলে রুচির প্রশ্নে কেউ কাউকে গুরত্ব দেয়না। দুটো সন্তান হবার পরে শাহীনুরের এ সংসার আর ভাল লাগেনা। সে বিদ্রোহী হয়ে উঠে, সন্তানদের প্রতি মায়া কেটে যায়।
উল্টো এসব সন্তানও তাদের বাপের মত আরেক মুখচোরা ব্যক্তি হিসেবেই গড়ে উঠবে বলে স্বামীর কাছে তালাক চায়। পঁচিশ লাখ টাকার ব্যাপার, চাট্টিখানি কথা নয়! স্বামীও ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে বলতে থাকে, গেলেই বাঁচি। দেরী না করে আজই চলে যাও।
দু’জনের মুরুব্বীরা এক হয়, সন্তানদের মায়াবী মুখের কথা তুলে বুঝাতে থাকে। সবাই ভাঙ্গা লাকড়ি জোড়া লাগানোর কসরত করে। যাই হোক ইতিমধ্যে আরো দু’টো সন্তান জন্ম হয়। কিন্তু এসব সন্তান নিয়ে এই দম্পতির কোন আগ্রহ নেই।
তাদের মধ্যে চলতে থাকে ঝগড়া। মহিলা কাবিনের টাকা ছাড়া যাবে না। সে জন্য স্বামীকে উত্ত্যক্ত ও খোঁচাতে থাকে। স্বামীও কখনও গায়ে হাত তোলে, সমানে বলতে থাকে এক্ষুনি চলে যাও, আমি আরেক জনকে আনি। অগত্যা তিনি একদিন আরেকজনকে যোগাড় করে নতুন করে সংসার পাতে।
সন্তানেরা অসহায় ভাবে তাকিয়ে থাকে, কান্না করতেই থাকে। ভদ্রলোক মার-পিট ও মানসিক টেনশনের মাত্রা বাড়িয়ে তুলে। উভয়ে মামলা করে আদালতে। তখনই মানুষ জানতে পারে তাদের মধ্যে বিশাল দূরত্বের খবর।
এতদিন কার তাদের হু হু কান্না, এক নদী চোখের পানি বইয়ে গেলেও পাশের প্রতিবেশীর দৃষ্টিতে তারা ছিলেন সুখী দম্পতি! অনেকের কাছে অনুকরণীয়। তাদের মেকি আভিজাত্য রুচির কাছে হার মেনেছে। আর কাবিনের টাকার বিশাল বোঝা তাদেরকে করেছে নির্দয়, নির্মম। দু’জনেই আলাদা হতে চায় কিন্তু টাকার অঙ্ক তাদেরকে জোর-জবরদস্তি করে একত্রে থাকতে বাধ্য করে।

Discussion about this post