আমরা কমবেশি সবাই সেলাই মেশিনের সাথে পরিচিত।তার মধ্যে অনেকের কম-বেশী সুই-সূতা দিয়ে সেলাই করার অভিজ্ঞতা আছে। আচ্ছা, আমরা কি কখনও ভেবেছি আগে-পিছে আবদ্ধ, দুইটি সুতা কিভাবে মেশিনের ভিতরে প্যাঁচ খায়! কেউ বা বলবেন, এখানে ভাবা-ভাবির কি আছে? কেউ বলবেন ভেবে দেখার দরকার পড়েনি! যাই হোক, এখন তো একটু ভেবে দেখতে পারি। মেশিন তো আমাদের চোখের সামনেই আছে, জ্ঞানীরা দশ দিন ধরে ভাবতে থাকুন তো, কতজনের মাথায় এই প্যাঁচ খাওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার হয়!বেশীরভাগ মানুষের পক্ষেই হয়ত সম্ভব হবেনা।
মানুষ যত বড় জ্ঞানীই হোক, চিন্তা যদি না করে, সে সৃষ্টিশীল ক্রিয়ার দিকে আগাতে পারে না। শিশুকালের কল্পনা থেকে প্রাজ্ঞদের চিন্তার সৃষ্টি। আবার ইতিবাচক চিন্তায় যখন বস্তুনিষ্ঠ কল্পনা যোগ হয় তখন মানুষের মন সৃষ্টিশীল হয়ে উঠে। মানুষের এই ইতিবাচক সৃষ্টিশীলতা তাকে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করে।
ভারতের প্রেসিডেন্ট আবদুল কালাম বলেছিলেন,”তোমরা ঘুমিয়ে যে স্বপ্ন দেখ তা মূলত স্বপ্ন নয় বরং স্বপ্ন হল সেটি, যেটি সৃষ্টির প্রেরণায় তোমাকে ঘুমাতে না দেয়”। স্বপ্ন সম্পর্কে সম্ভবত এটি সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা মূলক উক্তি! এটা সৃষ্টিশীল মানুষকে বারুদের মত গতিময়তা দান করে কিন্তু তারপরও আমরা স্বপ্নের প্র্যাকটিস করি কিন্তু ঘুমের মাধ্যমেই। জীবন শুরুর এই স্বপ্ন যদি যথাযথ না হয়, তাহলে মানবজীবন উচ্ছন্নে যায়। একটি সুন্দর স্বপ্ন যেভাবে মানুষকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসাতে সাহায্য করে একটি দুঃস্বপ্ন সেভাবে অত্যাচারী শাসককে ভীতু করতে পারে। এই স্বপ্ন দেখার সাথে কিন্তু মানুষের পরিবেশ, শিক্ষা ও ধর্মের প্রভাব রয়েছে। আরো রয়েছে আল্লাহর সাহায্য, যা তিনি দুনিয়াতে একনিষ্ঠ প্র-চেষ্টাকারীকেই দিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে তিনি ধর্ম-বর্ণ বিবেচনায় নেন না। যারা গভীর চিন্তায় মনোনিবেশ করবে, স্বপ্ন বাস্তবায়নে লড়তে প্রস্তুত, তারাই এই অফুরান খোদায়ী সাহায্য পেয়ে থাকেন।
বলছিলাম সেলাই মেশিনের কথা। আমেরিকান প্রকৌশলী ‘এলিয়াস হোউই’ কারখানার বিরাট মেশিনের বিপরীতে, ঘরে চালানোর উপযোগী একটি সেলাই মেশিনের কথা ভাবছিলেন। মেশিনও একটা বানালেন কিন্তু সূই’কে কোথায়, কিভাবে বিন্যস্ত করে সূতায় প্যাচ লাগানো যায়; সেটা কোনভাবেই মাথায় ঢুকছিল না! দীর্ঘদিনের ভাবনায় তিনি কোন কুল-কিনারা করতে পারছিলেন না। একদা রাতে তিনি একটি স্বপ্ন দেখেন! যেখান থেকে তিনি সূই-সুতার তত্বটি পেয়ে যান। খুশীতে লাফ দিয়ে উঠেন ‘হোউই’ সুন্দর সকালের একটু পরিশ্রমেই সৃষ্টি করেন জগত বিখ্যাত সেলাই মেশিন। যা মানব সম্প্রদায়ের রুচি-অভিরুচিকে উন্নতর মানে নিয়ে যায়। সেই ক্ষুদ্র সেলাই মেশিনটি হয়ে যায় সকলের নাগালের মধ্যে। মানুষ যখন তার চিন্তা, কল্পনার প্রান্তে এসে থেমে যায়, আটকা পড়ে; সেখান থেকেই আল্লাহ মানুষকে সহযোগিতা করে স্বপ্নের মাধ্যমে! এটা আল্লাহর একটি নীতি।
একটু স্বাভাবিক জীবন লাভ করার জন্য যখন সারাবিশ্বের ডায়াবেটিস রোগীরা পাগল পারা। তখন কানাডিয়ান চিকিৎসা বিজ্ঞানী স্যার ফ্রেডরিক গ্র্যান্ড বেন্টিং ডায়াবেটিস রোগের ঔষধ বের করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। না তিনি ডায়াবেটিসের ঔষধ বানাতে পারেন নাই। তবে, তার ঘুমের মধ্যে দেখা একটি স্বপ্ন তার অগ্রযাত্রায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে। চিন্তায় ভিন্ন মাত্রার পরিবর্তন আসে। ডায়াবেটিস চিরতরে ভাল করতে না পারলেও, ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রণে আনার কৌশল উদ্ধার করেন। অবশেষে বন্ধুর সহায়তায় তিনি জগতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঔষধ তথা ইনসুলিন আবিষ্কার করেন। সে জন্য তাকে নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হয়। আমরা দেখতে পাই, একজন একনিষ্ঠ প্র-চেষ্টাকারী যখন থেমেছেন, তখন আল্লাহ তার সাহায্যার্থে এগিয়ে এসেছেন।
গবেষণার মাধ্যমেও যখন কোন কিছু উদ্ধারে ব্যর্থ হতেন। ইবনে সিনা ঘুমের স্বপ্নের মাধ্যমেই পথ-রেখা পেয়ে যেতেন। ডেনিশ বিজ্ঞানী Aage Niels Bohr দীর্ঘ গবেষণার পরও পরমাণুর গঠন প্রক্রিয়াটি যথাযথ ব্যাখ্যা করতে পারছিলেন না! তিনি একটি স্বপ্নে দেখেন সূর্যের চারিদিকে কিভাবে গ্রহগুলো ঘুরছে। খুশীতে লাফিয়ে উঠলেন বোর, ঘোষণা দিলেন এই স্বপ্নেই রয়েছে পরমাণু গঠনের ব্যাখ্যা ও সঠিক উত্তর। তিনি এজন্য নোবেল পুরষ্কার পান।
রাসুল হবার আগে মোহাম্মাদ (সাঃ) তো দিবালোকের মত পরিষ্কার স্বপ্ন দেখতেন! আকারে ইঙ্গিতে নয়, হুবহু স্বপ্ন দিনের বেলায় চলমান ও ঘটতে দেখতেন। যদিও আজকে আমার বিষয় স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেওয়া নয়। তারপরও মানব ইতিহাসের হাজারো তথ্য থেকে কয়েকটি তথ্য সামনে আনা হয়েছে চিন্তাশীল মানুষের মনের খোরাকের জন্য।
এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আবিষ্কারের অন্যতম একটি হল ‘কুড়াল’ আবিষ্কার!না, না, এটা কোন বিজ্ঞানী কিংবা গবেষকের কথা নয়; আমার বিশ্লেষণ মাত্র! বিশেষায়িত লোহা তথা দা, কুড়ালের পিছনে কাঠের টুকরার ঠ্যাঙ্গা লাগিয়ে ক্ষুদ্র এই অস্ত্র দিয়ে বিশাল আকৃতির গাছের পতন ঘটানো যায়। এখন এটা আবিষ্কার মনে হলেও শুরুতে এটা আবিষ্কার ছিলনা! মানুষের জীবন-যাপন সাবলীল করার জন্য আল্লাহ বহু নবীদেরকে স্বপ্নের মাধ্যমে বস্তুগত জিনিষ বানানোর দক্ষতা দিয়েছেন। দাউদ (আ) তো রীতিমত স্বপ্ন দেখতেন, আর নিত্য নতুন ব্যবহার্য সামগ্রী বানাতেন! অচিরেই তিনি সারা দুনিয়ার সম্পদশালী মানুষে পরিণত হয়ে যান। নিশ্চয়ই পাঠক এতক্ষণে অনুধাবন করতে পারছেন, মানুষের জীবনে স্বপ্ন দেখাটা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদেরকে ভয়ের বস্তু দেখিয়ে আতঙ্কিত করানো হয়। যা একেবারেই ঠিক কাজ না! জীবনের শুরুতে শিশুরা জানেনা কোনটা ভয়ের জিনিষ, কোনটা নিরাপদ বস্তু। তার কাছে বাঘ, কুকুর, বিড়াল, হাঁস সবই দেখার জিনিষ এবং একই। শিশুরা ভয়ের সাথে পরিচিতি হয় কর্কশ শব্দে,আতঙ্কিত ডাকে, বিকট আওয়াজ কিংবা হঠাৎ কাণ্ডে। শিশু যদি বাহিরে গাড়ীর টায়ার ফাটার প্রচণ্ড শব্দ শুনে এবং তার অ-পছন্দনীয় মানুষটিকে সেই মুহূর্তে দরজার সামনে উপস্থিত দেখে কিংবা মটর সাইকেলটি দাঁড়ানো দেখে; তখন সে ভাবতে শিখে এই মানুষ অথবা মটর সাইকেল তার জন্য ভীতিকর তথা অনিরাপদ! যতদিন এ দুটো জিনিষ দেখতে থাকবে ততদিন ভয় পেতে থাকবে। পিতা-মাতা সন্তানের এই অর্থহীন ভয়ের কারণ বের করতে ব্যর্থ হয়ে, ডাক্তার-ওঝা-বৈদ্যের শরণাপন্ন হয়।
ঘুমের মধ্যে শিশুরা ভয় পায়, আতঙ্কিত স্বরে ঘুম থেকে জেগে উঠে। এটা দুঃস্বপ্ন দেখার কারণেই হয়! আরো তাজ্জবের বিষয়, এটা শিশুর নিকটজন তথা বড় ভাই- বোন কারো নিকট থেকেই লাভ করে। শিশুকে কুকুর দেখিয়ে যদি বলা হয়, ওমা! ওরে বাবারে! এটা একটা ভয়ের শব্দ শিশু বুঝবে না। ঠিক সেই মুহূর্তে যদি কুকুর অনাহুত কারণে গর্জন দিয়ে উঠে, সে ঠিকই ভয় পাবে। এর পর থেক কুকুরে ডাকে পরম ভয় পাবে। ওমা, ওরে বাবারে শব্দ শুনেও ভয়ের কথাটা মনে পড়ে যাবে এবং আতঙ্কিত হবে, শিশু ভয়ার্ত চোখে চারিদিকে তাকাবে! কোন এক দিন ঘুমানোর বেলায় যদি কুকুর ডেকে উঠে, শিশু ভয় পাবে এবং শব্দটি তার ঘুম সম্পর্কিত স্মৃতির মধ্যে গেঁথে যাবে। শুধু নতুন মাত্রা যোগ হবে, ঘুম অবস্থায় কখনও ওমা শব্দ তার কানে গেলে, সে অবচেতন নিদ্রায় ভয় পাবে। শিশুরা বড় হলে ঘুমের এই ভয় ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠে বটে কিন্তু ঘুম যে একটা শাস্তিরও বিষয়, সেটা সারাজীবন উপলব্ধি করবে। বাকী জীবনে সে মন সু-স্বপ্ন দেখার অন্তরায় হয়ে যায়।
পাঠকেরা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন এখন হাই ওয়েব ফিক্রোয়েন্সীতে গান-বাদ্য করা হয়। মাস্তি-নাস্তি অবাধে চলছেই। এটা মানব সমাজের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর এবং ভয়ঙ্কর। যুবক বয়সে হার্টের কার্যকরী ক্ষমতা প্রখর বলে এটার ক্ষতিকর দিক তারা উপলব্ধি করে না। এই শব্দাতঙ্ক সবচেয়ে বেশী ক্ষতিকর শিশুদের জন্য। এসব শিশু ইহ-জনমে আর সু-স্বপ্ন দেখতে পারবে না। তার চেয়ে বেশী ক্ষতিকর বৃদ্ধদের জন্য। যার রক্তচাপ বেশী, সে ব্যক্তি যত বেশী মাত্রায় ট্যাবলেট গ্রহণ করুন না কেন। ক্ষুদ্র এই ওয়েব তরঙ্গ ধমনীর প্রতিটি রক্তকণিকার চলাচলকে বাধাগ্রস্ত করে। একজন পক্ষাঘাত রোগী, আপনজনকে কোনদিন বলে যেতে পারবে না এসি কক্ষে থেকেও, তার নাতি-নাতনির গানের ফ্রিকোয়েন্সির তালে, সে তিলে তিলে আঘাতে-প্রত্যাঘাতে কিভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে!
তাই আমাদের সবার উচিত, শিশু যাতে অনাবিল আনন্দ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারে সে পরিবেশ নিশ্চিত করা। কোলাহল, হৈ-হুল্লোড় সমাজে, না চিন্তাশীল মানুষের জন্ম হয়? না কেউ স্বপ্ন দেখতে পারে। যৌবনের রক্তের জোশে যদি নিজের ঘরকে ক্ষুদ্র শব্দ বোমার রিহার্সাল সেন্টার বানানো হয়। তাহলে ধৈর্য ধরুন, অল্প কদিন পরেই; প্রতিনিয়ত, ক্ষণে ক্ষণে নিজের শিরা-ধমনীর রক্ত টগবগ করে উথলাতে থাকবে। প্রতিবাদের ভাষা উন্মাদের মত হবে! আর এটা করলে উত্তর আসবে, দাদা-বাবা বুড়ো হয়ে পাগল হয়ে গেছে। এই পাগলের কোন ডাক্তার নাই, এ পাগলামির কোন ঔষধ নাই।

Discussion about this post